জুলাই
জুলাই মাসের এক মেঘলা বিকেল। ইকো পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসে আছে নীলা। মাথা নীচু। হাতে মোবাইল ফোন। স্ক্রিনে খোলা অফিসের অ্যাপ্রাইজাল লেটার। আকাশে কালো মেঘ জমেছে। মাঝেমধ্যে দমকা হাওয়া দিলে কিছু বৃষ্টির দানা ছড়িয়ে এসে পড়ছে ওর কোলে। ঠিক তখনই পেছন থেকে সেই পরিচিত গলা—
নীলাব্জ: কী ব্যাপার? এমন মেঘলা মুখে বসে আছ? পৃথিবীর অর্থনীতি ভেঙে পড়ল নাকি?
নীলা মুখ তোলে না।
নীলা: না। আমার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।
নীলাব্জ এসে পাশে বসে।
নীলাব্জ: ওহ্! ইনক্রিমেন্ট?
নীলা ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখে।
নীলা: হাইক, বোনাস— দুটোই এমন দিয়েছে যে, এর চেয়ে না দিলেই পারত। তারপর মিটিংরুমে বসিয়ে ম্যানেজার এক ঘণ্টা ধরে বোঝাল যে আমি ‘নট রেডি ফর দ্য নেক্সট লেভেল’— আরও নাকি ‘ইনভলভ্ড’ হতে হবে! আর মার্কেট খুব ডাউন, আমি যে এইটুকু পেয়েছি এতেই আমার নাকি আনন্দে থাকা উচিত!
নীলাব্জ: তাই বলে এমন মুখ করে বসে থাকবে?
নীলা: অদ্ভুত! মন খারাপ হবে না? তাহলে সারা বছর পরিশ্রম করলাম কেন? আমি তো আরও হালকা নিতে পারতাম।
নীলাব্জ: আমি সব সময়ে তাই বলি তোমায়, হালকা নাও!
নীলা: শাট আপ! তোমার কথা শুনলে আমার চাকরিটাই থাকত না।
নীলাব্জ মুচকি হাসে।
নীলা: এদিকে জুলাই এসে গেল।
নীলাব্জ: জুলাই এসেছে তো কী হয়েছে?
নীলা: ছ’মাস শেষ হয়ে গেল। বছরের শুরুতে কত প্ল্যান ছিল। প্রোমোশন পেলেই নতুন চাকরি খুঁজব। একটু সেভিংস বাড়াব। একটু নিজের শরীরের দিকে নজর দেব। কোথাও ঘুরতে যাব। একটা নতুন কোর্স করব। একটা বই পড়ব। কিছুই হল না। হাফ বছর কেটে গেল আর আমি ঠিক যেখানে ছিলাম সেখানেই আছি। মাইনেও তেমন বাড়ল না।
নীলাব্জ হেসে ফেলে।
নীলা: হাসছ কেন?
নীলাব্জ: না, তোমার ঘুরেফিরে সেই এক কান্নাকাটি! তোমাকে দেখি আর ভাবি, মানুষ নিজের জীবনটাকে কী সুন্দর স্প্রেডশিট বানিয়ে ফেলেছে।
নীলা: স্প্রেডশিট?
নীলাব্জ: জানুয়ারি থেকে জুন। টার্গেট, অ্যাচিভমেন্ট, প্রোগ্রেস, কেপিআই। তারপর নিজের জীবনকে লাল, হলুদ, সবুজ রং দিয়ে বিচার করছে। মানুষ তো না, যেন কর্পোরেট ড্যাশবোর্ড!
নীলা: অদ্ভুত! আমি জীবনে কিছু করতে চাই।
নীলাব্জ: করতে চাওয়ায় সমস্যা নেই। কিন্তু এটাকে বাঁচা বলে না। তুমি খালি হিসেব রাখছ।
নীলা: যাদের কিছু পারে না, কিছু অর্জন করার ক্ষমতা নেই, তারাই বলে জীবন অ্যাচিভমেন্টেরর জন্য না। তোমার মতো ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়ালে আমার চলবে?
নীলাব্জ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তারপর আবার হাসে।
নীলাব্জ: আজকে কি ব্যক্তিগত আক্রমণও শুরু হল?
নীলা: আমি সিরিয়াস।
নীলাব্জ: আমিও।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। হঠাৎ হাওয়া একটু জোরে বইতে শুরু করে। দূরে বিদ্যুৎ চমকায়। নীলাব্জ আকাশের দিকে তাকায়।
নীলাব্জ: দেখো… বৃষ্টি নামবে।
নীলা মুখ বাঁকায়, ‘আরেকটা মন খারাপের কারণ।’
নীলাব্জ: বৃষ্টি দেখে কারও মন খারাপ হয় নাকি?
নীলা: হয়।
নীলাব্জ: কেন?
নীলা: সব কেমন অন্ধকার হয়ে যায়। আকাশটা ধূসর। সারাদিন ঘুম পায়। জামাকাপড় শুকোয় না। অফিস যেতে কাদা। জুতো নষ্ট হয়। রাস্তা জ্যাম। তারপর ডেঙ্গু, মশা, জল জমা। এর মধ্যে আবার কেউ-কেউ বলে, ‘আহা, কী রোম্যান্টিক!’
নীলাব্জ: তোমাদের মতো মানুষদের জন্যই বর্ষাকাল হতাশ হয়ে যায়।
নীলা: বর্ষাকাল আবার হতাশ হয় নাকি?
নীলাব্জ: অবশ্যই। এত সুন্দর একটা ঋতুকে তোমরা এক্সএল শিট দিয়ে মাপতে চাইছ। কত মিনিট দেরি হল, উবার সার্জ কত, কাপড় শুকোল কি না। এগুলো দিয়ে কী হয়?
হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। ওরা উঠে পড়ে। চারপাশে গাছগুলো বেশ দুলছে।
নীলা: কারণ আমাদের জীবন আছে। অফিস আছে। দায়িত্ব আছে। বর্ষার কবিতা দিয়ে আমাদের জীবন চলে না। বর্ষার জন্য আমাদের ডেডলাইন পিছিয়ে যায় না।
নীলাব্জ: উফ্! তুমি একটা ঋতুকে অনুভব করতেই পারো না।
নীলা: কারণ মানুষ আর গুহায় থাকে না। আমরা শহরে থাকি!
নীলাব্জ: গুহায় থাকতেও বলছি না। তুমি প্রকৃতিকে এখন শুধু একটা ইনিকনভিনিয়েন্স হিসেবে দেখছ।
নীলা: ইনিকনভিনিয়েন্স নয়তো কী?
নীলাব্জ: আনন্দ।
নীলা: কার আনন্দ?
নীলাব্জ: এই যে প্রথম বৃষ্টির গন্ধ… পেট্রিকোর…
নীলা: আর তার দু’মিনিট পরে নর্দমার গন্ধ।
নীলাব্জ: এই যে গাছগুলো ধুয়ে যায়…
নীলা: তারপর ডাল ভেঙে গাড়ির উপর পড়ে।
নীলাব্জ: পলিউশন যে কমে! তার বেলা?
নীলা: বাতাসে পলিউশন কমে, জলের পলিউশন না।
নীলাব্জ: আহ্! তোমার খালি নেগেটিভ কথা। এই যে মানুষ একটু ধীরে হাঁটে…
নীলা: কারণ রাস্তা পিছল। পড়লেই কোমর ভাঙবে।
নীলাব্জ: দেখো… বৃষ্টি নামবে।
নীলা মুখ বাঁকায়, ‘আরেকটা মন খারাপের কারণ।’
নীলাব্জ: বৃষ্টি দেখে কারও মন খারাপ হয় নাকি?
নীলা: হয়।
নীলাব্জ: কেন?
নীলা: সব কেমন অন্ধকার হয়ে যায়। আকাশটা ধূসর। সারাদিন ঘুম পায়। জামাকাপড় শুকোয় না। অফিস যেতে কাদা। জুতো নষ্ট হয়। রাস্তা জ্যাম। তারপর ডেঙ্গু, মশা, জল জমা। এর মধ্যে আবার কেউ-কেউ বলে, ‘আহা, কী রোম্যান্টিক!’
নীলাব্জ: এই যে চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ে…
নীলা: কারণ কেউ অফিসে পৌঁছতে পারছে না।
নীলাব্জ মাথা নাড়ে।
নীলাব্জ: তোমার কাছে প্রতিটা সৌন্দর্যের একটা মেনটেনেন্স কস্ট আছে।
নীলা: অবশ্যই আছে।
নীলাব্জ: কিন্তু সৌন্দর্যটা?
নীলা: সৌন্দর্য দিয়ে আমার কী? আমি তো কবি নই! আমি শহুরে একটা মানুষ। আমার তো অফিস যেতে সমস্যা হয়, হয় তো? দেরি হলে কেউ ছেড়ে কথা কইবে না, তাই তো? এদিকে EMI তো কাটা যায় প্রতি মাসে, যায় তো?
নীলাব্জ হেসে ফেলে।
নীলাব্জ: আবার অ্যাচিভমেন্টে ফিরে এলে।
নীলা: কারণ ওটাই জীবন।
ঠিক তখনই বৃষ্টির গতি বাড়ে। লোকজন দৌড়তে শুরু করে। কেউ ছাতা খুলছে। কেউ দোকানের শেডের নীচে দাঁড়াচ্ছে। দুজনে একটা চায়ের দোকানের টিনের চালার নীচে গিয়ে দাঁড়ায়।
নীলাব্জ: শুনতে পাচ্ছ? কী সুন্দর শব্দ।
নীলা: টিনে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে ভালো লাগে তোমার। কিন্তু যাদের বাড়ির ছাদ টিনের, তাদের কাছে এটা মোটেও রোম্যান্টিক না। তাদের ভয় অন্য।
নীলাব্জ: ঠিক কথা।
নীলা: সমস্যা কী জানো? যাদের জীবনে কোনো সমস্যা নেই, দুঃখ-কষ্ট নেই, তারাই বর্ষাকে সবচেয়ে বেশি রোম্যান্টিসাইজ করে।
নীলাব্জ: মানে? গরিব মানুষ বৃষ্টি চায় না?
নীলা: কাচের জানলার পাশে বসে কফি খেতে খেতে ইন্সটাগ্রাম স্টোরি দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু যে-লোকটা আজ সারাদিন বাইকে ডেলিভারি করবে, তাকে গিয়ে বলো, ‘এনজয় দ্য রেইন্স’।
নীলাব্জ: সেই মানুষটার-ও মন আছে। তোমার মতো এরকম বেরসিক নয়। যখন কষ্ট পাওয়ার পাবে, কিন্তু তারপর বৃষ্টি উপভোগ-ও সে করবে। এরকম একমুখী ঘ্যানঘ্যান সেও করবে না।
নীলা: যাও না গিয়ে কথা বলো, দেখবে সেও ঘ্যানঘ্যানই করবে, তোমার মতো ফুলবাবু তো নয় সবাই!
নীলাব্জ পাত্তা দেয় না, ‘জানো, আমার মনে হয় আমরা এই সভ্যতা বানিয়েছি এই কঠিন প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে-করতে।’
নীলা: অবশ্যই।
নীলাব্জ: কিন্তু এখন যুদ্ধটা এত সফল হয়েছে যে প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
নীলা: সম্পর্ক?
নীলাব্জ: আগে মানুষ আকাশ দেখত। বাতাসের গন্ধ শুঁকত। মেঘ দেখে আন্দাজ করত বৃষ্টি হবে কি না। এখন ওয়েদার অ্যাপ না খুললে মানুষ জানেই না বাইরে কী হচ্ছে।
নীলা: কারণ ওয়েদার অ্যাপ অনেক বেশি অ্যাকিউরেট।
নীলাব্জ: হতে পারে। কিন্তু একটা জিনিস হারিয়ে গেছে।
নীলা: কী?
নীলাব্জ: প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক।
নীলা: তুমি সব কিছুর মধ্যে এরকম বস্তা-পচা নস্টালজিয়া খুঁজে পাও কেন?
নীলাব্জ: না। আমি খুঁজে পাই অনিশ্চয়তা।
নীলা: অনিশ্চয়তা মানুষ কমাতে চায়, এটাই তো সভ্যতা।
নীলাব্জ: আর আমি বলছি, সব অনিশ্চয়তা মুছে দিলে জীবনটাও একটু-একটু করে মুছে যায়। সব কিছু মিলেমিশে আছে।
নীলা: বাহ্! তাহলে বন্যা, খরা, সাইক্লোন, সুনামি, মহামারী— সব কিছুর জন্য অপেক্ষা করে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচো!
নীলাব্জ: যা! আমি কি তাই বললাম নাকি? ওই অ্যাপ দেখতে গিয়ে তোমার আর বৃষ্টি দেখা হল না! তোমার মাথায় অন্য সমস্যা।
নীলা গেটের বাইরে তাকায়। রাস্তার উপর জল জমতে শুরু করেছে। একটা ছোট ছেলে হঠাৎ জুতো খুলে সেই জলে ঝপাঝপ লাফাতে শুরু করে। পাশে তার মা বকছে। ছেলেটা শুনছে না। হেসেই চলেছে। নীলাব্জ ছেলেটার দিকে আঙুল দেখায়।
নীলাব্জ: দেখলে?
নীলা: কী?
নীলাব্জ: ওর কাছে বর্ষা এখনও বর্ষা।
নীলা: আর ওর মা ভাবছে বাড়ি গিয়ে জ্বর হবে।
নীলাব্জ: সেটাও ঠিক।
নীলা: এটাই তো জীবন। একজন আনন্দ করছে, আরেকজন তার পরিণাম ভাবছে।
নীলাব্জ মৃদু হেসে বলে, ‘তারপর বড় হতে-হতে সবাই পরিণামটাই শুধু ভাবে। মনটা মরে যায় তো…
নীলা: কারণ পরিণামগুলোই সত্যি।
নীলাব্জ: আর আনন্দ মিথ্যা?
নীলা: আনন্দ ব্যাপারটা মানুষের নিছক কল্পনা। আমি যদি নিজেকে বুঝিয়ে বলি যে, এই বৃষ্টি দেখে আমার কোনো আনন্দ নেই, তাহলে নেই। আর তুমি তখন থেকে উলটো কথা বলে যাচ্ছ।
নীলাব্জ: আচ্ছা নীলা… যদি এই জুলাই মাসে তুমি কোনো অ্যাচিভমেন্ট না-ও পাও, কিন্তু আজকের এই বৃষ্টিটার কথা যদি দশ বছর পরে মনে থাকে, সেটা কি একেবারেই মূল্যহীন?
নীলা উত্তর দিতে পারে না। বাইরে তাকিয়ে থাকে বৃষ্টির দিকে।
নীলা: সমস্যা হল নীলাব্জ… তখন এই বৃষ্টিটার কথা মনে রাখার জন্যও হয়তো আমাকে এটার একটা ছবি তুলে রাখতে হবে।
নীলাব্জ: উফ্! আবার তোমার সেই ছবি, হার্ড ডিস্ক…
নীলা: আমার বৃষ্টি ভাল লাগে না নীলাব্জ। সমস্যা ছাড়া কিছুই হয় না এই বাদলদিনে। এই নিয়ে তিনবার বললাম, আমি কবি নই, শহরের কবিতার ছবি আমার প্রয়োজন নেই। বৃষ্টিতে ভিজলে আমার প্রোমোশনটা হয়ে গেলে আমি নিশ্চয় ভিজতাম। আমাকে ক্ষমা করো।
নীলাব্জ: ক্ষমা করার আমি কে? আমার দুঃখ শুধু তুমি বৃষ্টি বুঝলে না, প্রেম বুঝলে না।
নীলা কটমট করে তাকায় নীলাব্জর দিকে। নীলাব্জ আর কথা বাড়ায় না।
ছবি এঁকেছেন সায়ন চক্রবর্তী



