ইনিংসের শেষে

খেলাধুলোর ইতিহাস বলে আগামিদিনে কিছু থাকবে কি না জানি না, কারণ এখন ইতিহাসকে ‘নস্ট্যালজিয়া’ বলে দেগে দিয়ে বর্তমানের সবকিছুকেই সর্বকালের সেরা বলার যুগ। এ-যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার মতো চল্লিশোর্ধ্বদের বেশ অসুবিধে হয়। আমার বাড়াবাড়ি রকমের দুষ্টু বন্ধুদের পাড়ার জ্যাঠামশাই থেকে স্কুলের মাস্টারমশাই প্রকাশ্যে ‘হনুমান’ বলে অপমান করতেন। এখন সেই বন্ধুরা ভাবে ‘একবার যদি দিনগুলো ফিরে পাই, স্যরদের দেখে নেব।’ আমি অঙ্ক ভুল করে কানমলা খেয়ে ধমক শুনতাম ‘ছাগল’। এখন দেখছি, কাউকে ছাগল বলে না মানলে তাকে অপমান করা হয়। আমরা জানতাম A for apple, B for bat যেমন, তেমনই G for goat। এখন দেখি ছোটবেলায় শেখা ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করে লিখতে হয় GOAT. কিন্তু সেকথার ছাগল ছাড়াও একটা গূঢ়তর, বৃহত্তর অর্থ আছে— সর্বকালের সেরা (Greatest of All Time)। তাই সকল ভক্তকুল নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়কেই ছাগল বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

আরও পড়ুন: ট্রাম্প কার্ড বনাম ফুটবলের বিকল্প বিশ্ব! লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী...

অবশ্য ব্যাপারটা ভক্তকুলের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে বহুজাতিক ব্যবসায়িক সংস্থা আর গণমাধ্যমের ভূমিকা অতুলনীয়। যে ফুটবলারকে দিয়ে বিজ্ঞাপন করালে সবচেয়ে বেশি জিনিস বিক্রি হয়, তাঁকে ছাগলের সঙ্গে বসিয়ে ফটোশুট, মাঠের মধ্যে তাঁর ছায়া হিসাবে একখানা ছাগলের ছায়া দেখিয়ে ছবি তৈরি— সুচারু ব্যবস্থা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও নিদারুণ। গোটের ছড়াছড়ি। সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে নাকি বিরাট কোহলি গোট, একদিনের ক্রিকেটে নাকি রোহিত শর্মা গোট, রবিচন্দ্রন অশ্বিন অবসর নেওয়ার সময়ে শুনলাম তিনিও গোট, ইদানীং শোনা যায় অলরাউন্ডার হিসাবে রবীন্দ্র জাদেজা গোট, এমনকী, মাঝেসাঝে খেলে এক-আধটা ম্যাচ জিতিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টার জন্যে হার্দিক পান্ডিয়াও গোট হয়ে যান। এর ওপর আছেন ‘ইউনিভার্স বস’ ক্রিস গেল এবং ‘গড’ শচীন তেন্ডুলকর। মানে ক্রিকেট মাঠে দিন-দিন মানুষই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। এমন দিনে কি তারে বলা যায় যে, গ্যারি সোবার্স বলে একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, যিনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (৩৬৫) তাঁর দখলে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে মোট সর্বোচ্চ রানও তাঁর?

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)। কী বল করতেন? আঙুলের কারিকুরিতে স্পিন, কবজির মোচড়ে স্পিন, সুইং, সিম— এককথায় যতরকম বোলিং সম্ভব। এখানেই শেষ নয়। স্লিপে আর ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে তাঁর মতো ফিল্ডারও ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব বেশি আসেনি।

পরিসংখ্যানের খাতিরে বলা যেতে পারে, তিনি টেস্টে ১০৯খানা ক্যাচ নিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি ক্যাচ সেইসময় একমাত্র কলিন কাউড্রে আর ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ছিল। কিন্তু ওই পরিসংখ্যান আসল কথা নয়। অমন ফিল্ডার যে বিরল, সেকথা বলেছেন কারা? যাঁরা সোবার্সের খেলা দেখেছেন, তাঁরা, যাঁরা ওঁর সঙ্গে বা বিরুদ্ধে খেলেছেন, তাঁরাও। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলা ছেড়েছেন ১৯৭৪ সালে। স্বভাবতই তাঁর খেলার খুব বেশি ভিডিও সংরক্ষিত নেই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, ভিডিও আবিষ্কারের আগে, দিনরাত যাবতীয় খেলার সরাসরি সম্প্রচারের আগেও পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিল। তখনও মানুষ প্রেম করত, সন্তানের জন্ম দিত, তাকে বুক দিয়ে লালন করত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত, গান গাইত এবং খেলাধুলো করত। কারণ এসব করতে ভাল লাগত। যারা দেখত, তারাও ভাল লাগত বলেই দেখত। আর যা দেখতে ভাল লাগে, তা মানুষ শতমুখে বলে এবং লিখে অন্যকে জানায়। তাই ব্র্যাডম্যান, সোবার্স, পেলে, রড লেভার, দিয়েগো মারাদোনাদের মহত্ত্বের লিখিত ইতিহাস আছে। তাঁদের কেউ গোট বলত না, কারণ কে সবার সেরা— তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না।

শুধু তাই নয়, ৯৩ খানা টেস্ট খেলে প্রায় ৫৮ গড় ধরে রাখার রেকর্ড আজও খুব বেশি ক্রিকেটারের নেই। এই ২০২৬ সালেও গড়ের দিক থেকে তিনি টেস্টের ইতিহাসে ১১ নম্বরে। কিন্তু ওপরের দশজনের চারজন ৩০ খানা টেস্টও খেলেননি। এদিকে অবসরের সময়ে সোবার্স ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী (লান্স গিবসের পরেই)।

খেলার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আনন্দ পাওয়া— যে খেলে তার পক্ষেও, যে দেখে তার পক্ষেও। তারপর আসে স্কোরবোর্ড, হার-জিতের হিসেব। তারও পরে আসত খেলাকে ঘিরে ব্যবসা। সেটা মন্দ নয়, কারণ খেলা যদি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক দিতে পারে, তাহলে তাঁরা আরও মন দিয়ে খেলতে পারবেন। কিন্তু সোবার্স যে যুগের ক্রিকেটার, তখন ক্রিকেট নিয়ে ব্যবসা হত, ব্যবসার জন্যে ক্রিকেট হত না। ব্র্যাডম্যান, সোবার্সদের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার তাগিদ ছিল না। তাঁদের ব্র্যান্ড করে তোলার জন্যে পাকা মাথার লোকেরা দিবারাত্র লেগেও থাকত না। ফলে দর্শক, সাংবাদিক, সমালোচক— সকলের কাছেই মুহূর্তের মূল্য ছিল, সৌন্দর্যের দাম ছিল। অতি সফল অলরাউন্ডার সোবার্সের জন্য সবাই পাগল হত, কিন্তু জর্জ হেডলি বা রয় ফ্রেডরিক্সকেও কেউ ভুলত না। যে-দল হেরে গেল, সে-দলের ক্রিকেটারদের জন্যও জয়ী দলের সমর্থকদের ভালবাসা থাকত।

সে-যুগের লোক বলেই সোবার্স ওরকম ঝুঁকি নিতে পারতেন, যা নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক হিসাবে ১৯৬৮ সালে পোর্ট অফ স্পেনে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে চতুর্থ টেস্টে। তিনি এমন এক সময়ে দ্বিতীয় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, যখন ইংল্যান্ডকে ঘণ্টাদুয়েক ব্যাট করতে হবে আর জিততে গেলে দরকার মাত্র ২১৫ রান। সোবার্সের ধারণা ছিল, ইংল্যান্ড ওইটুকু সময়ও টিকতে পারবে না, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতে যাবে। কিন্তু কাউড্রের ইংল্যান্ড অনায়াসে সাত উইকেটে জেতে। কেন ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? ‘দ্য গার্ডিয়ান ’ কাগজে সোবার্সকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ভিক মার্কস জানিয়েছেন, সোবার্সের উত্তর ছিল, ‘সিরিজটা বড্ড বোরিং ছিল। প্রথম তিনটে টেস্ট ড্র হয়েছিল। ইংল্যান্ড ঘণ্টায় ১২-১৩ ওভার করে বল করছিল। আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম। আমি ক্রিকেট বলতে যা বুঝি, ওটা তা নয়।’ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম আর বেন স্টোকসের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যেভাবে দর্শকদের আশীর্বাদ পেলেও ক্রিকেটমহলে সমালোচিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়— পৃথিবী বদলে গেছে। এখানে জেতাটাই বড় কথা, কারণ জয়ই বিক্রয়যোগ্য। পরাজয় নয়। জয়ীই ব্র্যান্ড হয়। তাই সারাক্ষণ তর্ক লাগিয়ে রাখতে হবে— মেসি গোট, না রোনাল্ডো? বিরাট গোট, না জো রুট? কখনও বিশ্বকাপ না জেতা জোহান ক্রুয়েফ বা অতি সামান্য টেস্ট খেলতে সুযোগ পাওয়া ব্যারি রিচার্ডসকে সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় আনা যাবে না। তাছাড়া কোনওমতেই যা করা যাবে না, তা হল অতীতের কেউ বর্তমানের কারও চেয়ে মহান খেলোয়াড় ছিলেন, তা বলা। কারণ ওটা বিপণনবিরোধী ব্যাপার। কোনও কোম্পানি কি তার এখনকার ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনে বলতে পারে ‘এই যেটা বের করেছি এটা ভাল, তবে আগেরটা আরও ভাল ছিল?’ খেলাকে এবং সফল খেলোয়াড়কে বিক্রি করাই আজকের খেলার উদ্দেশ্য। তাঁদের ব্যবহার করে যত বেশি সম্ভব বিজ্ঞাপন দেখানোই উদ্দেশ্য। তাই আইপিএলে আছে ‘টাইম আউট’, ফুটবল বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক।’ কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সন্ধে-রাতের খেলায় মিনিট কুড়ি অন্তরই নাকি খেলোয়াড়দের বিরতির দরকার হচ্ছে।

ব্যাপারটা সব খেলাতেই হচ্ছে, দুদ্দাড় করে সব রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। কাল যে রেকর্ডকে মনে হত ধরাছোঁয়ার বাইরে, আজ সে রেকর্ড ধুলোয় লুটোচ্ছে। শচীনের একদিনের ক্রিকেটে শতরানের রেকর্ড বিরাট ভেঙে দিয়েছেন। সে-রেকর্ড হয়তো আর ভাঙবে না, কারণ খেলাটাই থাকবে না। কিন্তু কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলা চলছেই। আইপিএলে বৈভব সূর্যবংশী এক মরশুমেই সবথেকে বেশি ছয়, অভিষেক হওয়া খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি রান, সবচেয়ে কম বয়সে ৭০০-র বেশি রান আর এক মরশুমে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জেতার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন। আর্লিং হাল্যান্ড যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে অনেকে মনে করছেন মেসির গোল করার যাবতীয় রেকর্ডও তিনি ভেঙে দিতে পারেন। খেলা যেহেতু আর প্রাথমিকভাবে আনন্দ পাওয়ার, সৌন্দর্যের রসাস্বাদন করার জিনিস নেই, তাই খেলোয়াড়দের মহত্ত্বের মাপকাঠি হয়ে গেছে পরিসংখ্যান। যাঁর পরিসংখ্যান দুর্দান্ত নয় বা পাওয়া যায় না, তাঁরা সর্বকালের সেরাদের আলোচনায় ঢুকতে পারেন না। তাই ক্রিকেটে গোটের আলোচনায় কখনও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট বা অ্যালান নট আসেন না। ফুটবলের গোটের আলোচনায় লেভ ইয়াশিন বা গর্ডন ব্যাংকস, ববি মুর, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বা ফ্র্যাংকো বারেসির নাম আসে না।

সুতরাং, যতই অমর বলি, পাঁচ বছর পরে সোবার্সকে ক’জন ক্রিকেটপ্রেমীর মনে থাকবে সন্দেহ আছে। শচীন, কোহলি, রুটদের ৩০-৪০ হাজার রানের পাশে সোবার্সের আর কী দাম? অলরাউন্ডার হিসেবে কপিলদেব, ইয়ান বোথাম, রিচার্ড হেডলি, ইমরান খান তো ছিলেনই; এখন জাদেজাও ৪০০০ রান আর সাড়ে তিনশো উইকেট নিয়ে ফেলেছেন। কপিলদের সময়ে কিন্তু সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল— অলরাউন্ডার হিসাবে সবার ওপরে স্যর গ্যারি। বাকি সবাই তাঁর নীচে। কারণ তখন ক্রিকেটার, দর্শক, সাংবাদিক বা ধারাভাষ্যকার— কেউ-ই খেলাটাকে এক্সেল শিট মনে করতেন না। আসলে বিপণনের লোকেদের এক্সেল শিটই দরকার। সব খেলাই এখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, তাই সব খেলাতেই ব্র্যান্ড নির্মাণ আর এক্সেল শিট তৈরি চলছে সচেতনভাবে। খেলার সৌন্দর্যকে (এবং মহান অনিশ্চয়তাকে) মারো গুলি। টেনিস নিয়ে এই কথা ক’দিন আগে বলেছেন স্বয়ং রজার ফেডেরার। এক পডকাস্টে তিনি বলেছেন, সমস্ত প্রতিযোগিতায় কোর্ট অল্পবিস্তর একইরকম করে দেওয়া হচ্ছে, বলও। যাতে শেষমেশ ফাইনালে পৌঁছন কার্লোস আলকারাজ আর ইয়ানিক সিনার। ঘাসের কোর্ট, হার্ড কোর্ট, ক্লে কোর্টে টেনিস খেলার আলাদা চ্যালেঞ্জ ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। ব্যাপারটা বদলানো দরকার।

তাই বলতে হবে, সোবার্স এবারে সঠিক সময়ে ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। আগামী ২৮ তারিখ নব্বইয়ে পা দেওয়ার কথা ছিল, নির্ঘাত অনেকেই সেদিন তাঁর শতায়ু কামনা করতেন। কিন্তু শততম জন্মদিনে কি আর কেউ স্মৃতিচারণ করত, বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে ডেনিস লিলিকে তছনছ করে দেওয়া ২৫৪ রানের কথা? ও জিনিসের মূল্য দিতে গেলে তো বুঝতে হবে, লিলি কেমন ছিলেন? আজকের প্রজন্ম তো পরিসংখ্যান দেখে বলবে— টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীদের তালিকায় লিলি অনেক নীচে। তাঁকে পেটানো আর এমন কী ব্যাপার? লিলির গতি বা সোবার্সের স্ট্রোকের শৌর্য ও সৌন্দর্য আলোচ্যই নয়।