স্বপ্ন, চিঠি, ফুটবল

৯৬ মিনিটে একটা ফ্রি-কিক। পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে। দূরত্ব আন্দাজ, ২৫ মিটার। আইভরি কোস্ট গোল পেয়ে গেলে, ম্যাচ ড্র! এক্সট্রা টাইমে পৌঁছবে। যেন সমস্ত আফ্রিকা আরও কিছুক্ষণ শ্বাস পাবে। দৌড়বে। গোলের জন্য মরিয়া হবে আবার। ততক্ষণে গ্যালারিতে নরওয়ে সমর্থকদের আইকনিক সেলিব্রেশন শুরু হয়েছে। ভাইকিং রোর। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান জলদস্যু ছিল যারা, আদিমকালে, হুংকার দিচ্ছে মুহূর্মুহূ।

ফ্রি-কিক স্পটে বল বসিয়ে, আমাদ ডিয়ালো পিছিয়ে এলেন কয়েক পা। আমরাও, স্লো মোশনে ফিরে যাচ্ছি অতীতে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে, বেআইনি পথে, প্রতি বছর প্রায় ১৫,০০০ কিশোর পা রাখছে ইউরোপে। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং-এর মাধ্যমে। কেউ ড্রাগ-কার্টেলে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ পরিণত হচ্ছে, যৌনদাসে। কেউ ফুটবল খেলছে। আমাদ ডিয়ালো তাদেরই একজন। আবিদজান ছেড়ে পালাতে চাইছিল সে। ঠিক তখনই, সম্পূর্ণ এ-লেখার স্বার্থেই আমরা দেখতে পাব, আইভরি কোস্টের লেফট উইং ধরে দৌড়চ্ছেন ইয়ান ডিওমান্ডে। পিছনে তিনজন নরওয়ের ডিফেন্ডার।

বোনের উদ্দেশে একটা চিঠি লিখেছিল ইয়ান। বিশ্বকাপের ঠিক আগে। আমরা পড়ি।

আরও পড়ুন: অভিবাসীদের ফুটবল আখ্যান সম্পূর্ণ করে এই ছবি!
লিখছেন শান্তনু চক্রবর্তী…

ইয়ান ডিওমান্ডে

“প্রিয় রক্সেন,

তোর মনে আছে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের একটা নকল জার্সি আমায় কিনে দিয়েছিল কেউ? জার্সির পিছনে আমি কালো মার্কার দিয়ে লিখেছিলাম: Ronaldo। তার ঠিক নীচেই, 7।

কারণ আমরা জানতাম না, ধনী অথবা দরিদ্র। শুধু জানতাম, ওই নকল জার্সিতেই আমাদের সুখ।

আবিদজান শহরে, আমাদের সেই ছোট্ট ঘরে পঁচিশজন মানুষ একসঙ্গে ঘুমোচ্ছিল, মনে পড়ছে তোর? আমাদের মা দেখতে চাইছিলেন তাঁর পছন্দের, সোপ অপেরা। আমি ঘুমনোর ভান করছিলাম তখন। তারপর সকলে যখন ঘুমিয়ে পড়ত, চারিদিক অন্ধকার, টিভির ভলিউম কমিয়ে আমরা ফুটবল দেখতে বসতাম। ফুটবলের স্বপ্নও।

তোর মনে আছে,ফুটবল খেলার জন্য যেদিন প্রথমবারের জন্য বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে গেলাম? একদম একা। আমার বয়স তখন, ৯। ঘানা বর্ডারের গায়েই, একটা অ্যাকাডেমি। কী নাম ছিল বল তো? ইন্টার ফুট সুড কোমোয়া। কখনও তোকে বলা হয়ে ওঠেনি, জানিস অ্যাকাডেমির পাশেই যে গ্রাম, সেখানে আমরা আলু চুরি করতে যেতাম। আসলে এত খিদে পেত!

আমি যেদিন বাড়ি ফিরলাম, তুই আমাদের বন্ধু আর প্রতিবেশীদের বলেছিলি, ‘তোমরা ফুটবল প্র্যাকটিস থামিয়ে দিলে কেন? ইয়ান কিন্তু তোমাদের গাড়ি কিনে দেবে না। তোমাদের প্র্যাকটিস জারি রাখতে হবে।’

তখন তোর বয়স মাত্র ১০।
তখন থেকেই তুই আমার এজেন্ট…”

আমাদ ডিয়ালো অবৈধ পথে পৌঁছেছিল ইতালি। কে সাহায্য করেছিল? হামিদ মামাদৌ ট্রাওরে। সে কোচ হতে চেয়ে ইতালি গিয়েছিল, ২০০০ সালে, কিন্তু পারেনি। দেশে ফিরে এসে একটি ফুটবল অ্যাকাডেমি খুলেছে। নাম, লিডার ফুট। সেখানেই প্রথম পরিচয় আমাদ-এর সঙ্গে। আসলে সমগ্র আফ্রিকা জুড়েই হামিদের মতো অগুনতি মানুষ ছড়িয়ে আছে, যারা ইউরোপে ফুটবল খেলার স্বপ্ন দেখায়, টাকা দেখায় এবং ট্র্যাফিকার হয়ে ইউরোপে পাচার করে হাজার হাজার আফ্রিকান কিশোর। ইতালির জনপ্রিয় ক্লাব, আটালান্টায় ফুটবলিং কেরিয়ার শুরু করেছিল আমাদ। সেখান থেকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড।

মনে পড়ছে, এফএ কাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। লিভারপুল বনাম ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। হাইভোল্টেজ ম্যাচ। ১১২ মিনিটের মাথায় মার্কাস র‍্যাশফোর্ডের গোল। খেলার ফল, ৩-৩। ঠিক ১২০ মিনিটে, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের একটা অপ্রতিরোধ্য কাউন্টার অ্যাটাক। আলেহান্দ্রো গার্নাচোর একটা অ্যাসিস্ট। পেনাল্টি বক্সের সামান্য বাঁ-দিকে সরে এসে, অত্যন্ত শান্ত মাথায় ডান পোস্ট বরাবর একটা শট। অসামান্য গোল! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের আকাশে, সেই প্রথম ‘স্টার’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল আমাদ। ফ্যাকাশে মুখ। কৃষ্ণাঙ্গ। তবু জ্বলজ্বল করছে।

আমাদ ডিয়ালো

“…বয়স যখন ১৫, আমেরিকা পৌঁছলাম। ওরা আমায় হাই স্কুলে ভর্তি করল। বোর্নবাউথ, চেলসি, ক্রিস্টাল প্যালেসের মতো ইংলিশ প্রিমিয়ারের লিগের ক্লাবগুলোয় ট্রায়ালে নিয়ে গেল। কিন্তু কোনও ক্লাবই সই করাতে আগ্রহ পেল না। মেজর সকার লিগের বি-টিমগুলোতেও আমি জায়গা পেলাম না। ওরা আমায় নিয়ে সারা ইউরোপের ক্লাবে-ক্লাবে ঘুরল, কিন্তু কী আশ্চর্য, সকলেই বলেছিল, ‘না’। এখনও জানি না, কেন!

ততদিনে আমার ভিসা শেষ। স্বপ্ন শেষ। ওরা আমায় আফ্রিকা ফেরত পাঠিয়ে দিল। তারপর আমরা একসঙ্গে খুব কেঁদেছিলাম, মনে পড়ছে তোর?

কিন্তু তুই-ই একমাত্র, যে আমার ওপর থেকে কখনও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেনি! কিছুদিন পরেই, স্প্যানিশ ক্লাব লেগানেজ-এ আমি সই করলাম। সেদিনও আমরা একসঙ্গেই কাঁদলাম। গতবারের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কান্না!

লেগানেজ ক্লাবের হয়ে ডেবিউ করেছি জানিস। আমার বয়স ১৮, আমার বিপক্ষে রিয়েল মাদ্রিদ। কখনও ভেবেছিলাম? আমি তখন আত্মহারা আনন্দে। আমি তখন স্বপ্নালু।

কিছুদিন পরে, বাড়ি থেকে ফোন এল। ওরা বলল, তোমার বোন মারা গেছে। কোনও এক পার্টিতে, তোমার বোনের ড্রিংকে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল কেউ। সে আর ঘুম থেকে ওঠেনি।

তোর বয়স, ১৫।
১৫।

তুই জানিস, রিয়েল মাদ্রিদ ম্যাচের পরে আমি কী করেছি? এমবাপের সঙ্গে জার্সি বদলেছিলাম। টিভিতে ফুটবল দেখতে-দেখতে আমরা স্বপ্ন দেখতাম, ফ্রান্সের কোনও শহরে একটা বাড়ি হবে আমাদের। আর মনে আছে, তুই তখন কী বলতিস? ‘এমবাপে? ভাল খেলোয়াড়। কিন্তু আমার দাদা, এমবাপের চেয়েও ভাল…”

গ্রুপ পর্বের ম্যাচে, ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে আমাদ ডিয়ালোর গোল। ৯০ মিনিটে। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, ইয়ান ডিওমান্ডে। বুন্দেশলিগায়, আর-বি লাইপজিগের হয়ে ৩৬ ম্যাচে গোলসংখ্যা, ১৩। আশ্চর্য কিছু ড্রিবলিং স্কিল, দুরন্ত গতি, দুই উইং-এ ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্য এবং উইং ধরে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে আসা। নরওয়ে ম্যাচেও তাই করে গেলেন পুরো ৯০ মিনিট। আইভরি কোস্ট, ছাপিয়ে গেল তাই।

৭২ মিনিট। রাইট উইং থেকে আমাদ ঢুকছে পেনাল্টি বক্সে। একা। নিকোলার পেপের সঙ্গে ছোট ওয়াল খেলে নিয়ে, চারজন ডিফেন্ডারের মধ্যে থেকে গোল। বিবিসি স্পোর্টস লিখল, ‘গোল অফ দ্য টুর্নামেন্ট’। যেন অপার্থিব এক ইন্ডিভিজুয়াল ব্রিলিয়েন্সের গোল।

ফিরে আসি, ৯৬ মিনিটে। একটা মারকাটারি ফ্রি-কিক নিল আমাদ। আমরা দেখলাম, নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিচ্ছে নরওয়ের গোলকিপার উরয়্যান নায়ল্যান্ড। শ্বাস কমে আসছে। আফ্রিকান চিৎকার কমে আসছে। ফুটবলের খিদে কমছে না।

আইভরি কোস্ট বললে, বুঝতাম দিদিয়ের দ্রোগবা। ইয়াইয়া টুরে। এবার থেকে বুঝব, আমাদ ডিয়ালো। ইয়ান ডিওমান্ডে…

‘…আগামিকাল বিশ্বকাপ খেলতে রওনা দিচ্ছি। সত্যি সত্যি। তোর দাদা, আইভরি কোস্টের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। বড় ইচ্ছে হয়, তোকে সামনে পেয়ে বলি, আমরা পেরেছি!

আমি প্রমাণ করব, তোর প্রত্যেকটা কথা আসলে সত্যি। অথবা, প্রমাণ করার চেষ্টা জারি রেখেই মরে যাব একদিন। তুই দেখিস।

ইতি,

তোর দাদা, ইয়ান।’