দগ্ধ ইউরোপ

‘ইউরোপে ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পড়েছে, তাই নিয়ে বাড়াবাড়ির কী আছে! আরে, এ তো আমাদের ডিসেম্বরের মতো গরম! তা নিয়ে এত ‘হিট ওয়েভ, হিট ওয়েভ’ করে কাঁদার কী আছে? প্রথম বিশ্বের সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি! কলকাতা তথা বাংলার মানুষ যখন ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে অফিস যাচ্ছেন, ট্রাম-বাসে চড়ছেন, রাস্তার ধারে বসে এক কাপ চা খাচ্ছেন, তখন খবরের কাগজ, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট— সব জায়গায় ইউরোপের ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রেড অ্যালার্ট, স্কুল বন্ধ, বৃদ্ধদের ঘরে থাকার নির্দেশ, রেল পরিষেবা ব্যাহত, এমনকী মৃত্যুর খবর! এসব শুনে বাড়াবাড়ি মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু সুইডেনে নিজের বাড়িতে বসে, যে-বাড়িতে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও আরামে থাকা যায়, এমনভাবে বানানো— সেই বাড়িতে বসে ২৮-৩০ ডিগ্রিতে কী যে প্রচণ্ড গরম লাগে, তা বোঝানো মুশকিল। আসলে ইউরোপের সব বাড়িঘর শীত থেকে বাঁচতে এবং গরম ধরে রাখার জন্য তৈরি করা। হিটিং সিস্টেম একদম বন্ধ করে রাখলেও, কাঠের বাড়ির বৈশিষ্ট্যই হল গরম ধরে রাখা। গেলবার বাড়ির একটা ঘরের দেওয়াল ঠিক করার সময়ে দেখলাম, কত কী দেওয়া থাকে দেওয়ালের মাঝে, যাতে তাপ আটকে রাখা যায়— স্পঞ্জের মতো বিশাল আস্তরণ, প্লাস্টিক কভার, তার সঙ্গে পুরু ইনসুলেশন। ফলত, দিনের-পর-দিন বাইরে যখন ২৫-৩০ ডিগ্রি চলতে থাকে, তখন আমাদের বাড়িগুলো যেন এক-একটা ওভেনে পরিণত হয়।

আর ইউরোপের উত্তরাংশে সূর্য অস্ত যায় রাত দশটা-এগারোটায়। এই সময়টায় আবার সূর্য উঠে পড়ে ভোর তিনটের আগেই। সহজেই অনুমেয়, সারা দিন-রাত রোদ পেয়ে বাড়িগুলোর কী অবস্থা হয়! শুধু বাড়ি কেন, বাইরেও একই অবস্থা। দিনে কুড়ি ঘণ্টা রোদ পাওয়ার পর সবকিছুই যেন তেতে ওঠে।

আরও পড়ুন: গ্রেট নিকোবরের অরণ্যছেদনে বিপন্ন কচ্ছপরা?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

অনেক সুইডিশ আমাকে যেমন কলকাতার ১০-১২ ডিগ্রি ঠান্ডায় আমরা কুপোকাত হয়ে যাই বলে হাসাহাসি করেছে, ঠিক তেমনই। তাদের আমি সব সময়ে বোঝাই যে, দেশে আমাদের বাড়িগুলো বানানো হয় হাওয়া-বাতাস খেলার জন্য, যেখানে বাইরে ১০ ডিগ্রি মানে ঘরের ভেতরেও প্রায় ১০ ডিগ্রি।

এ-বছরের ২১ জুন থেকে প্রচণ্ড গরমে ইউরোপে অন্য প্রান্তেরও হাঁসফাঁস অবস্থা। স্পেন তো জ্বলেই যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ৪৪-৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। হাসপাতালগুলোতে নাকি লোকের ভিড়ে পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রান্সের সরকার নাকি মদ বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ করছে। এ-সপ্তাহে প্যারিস শহর ৪০ ডিগ্রি অতিক্রম করেছে। তাহলে ওরকম বড় লোহার একটা আইফেল টাওয়ার কী গরমই না হয়েছে! তবে প্যারিসের বাড়িগুলিতে এসি প্রায় নেই বলেই চলে। আসলে, সারা ইউরোপেই এসি লাগানো বাড়ির সংখ্যা খুবই কম। প্রসঙ্গত, ফ্রান্সেও অন্য বছরের তুলনায় নাকি এ-বছরের জুনে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।

ইংল্যান্ডের অবস্থাও তথৈবচ। আমার দিদি বলছেন, ‘কাল রাত্রের ভাত জলে ভিজিয়ে ফ্রিজে তুলে রেখেছিলাম, আজ দুপুরে সেটা বার করে পান্তা খাব।’ ইংল্যান্ডে পান্তা? কলকাতা লন্ডন হয়ে যাচ্ছে, আর লন্ডনে বসে বাঙালি পান্তা খাবে না, তা কখনও হয়?

নেদারল্যান্ডসে থাকা ঋতুপর্ণাদিও একই কথা বলল। ওদের ক্যানালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেও নাকি গরম হাওয়া দিচ্ছে। আমাদের এক বন্ধুর নিজের নৌকো আছে। নিজের নৌকা থাকাটা নেদারল্যান্ডে বা ইউরোপের উত্তরাংশে খুব আনকমন নয়, ও বলল নৌকো নিয়ে বিকেলবেলা ক্যানালে-ক্যানালে ঘুরলে তবু একটু আরাম। জার্মানি থেকে সুরজিৎ আরও মজার খবর দিল। বলল, দিনে ১৮ ঘণ্টা ৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা আর সূর্যের আলো পেয়ে রেললাইন বেঁকে যাওয়া ইত্যাদি কারণে কিছু রেল পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।ইউক্রেনের সমস্যা অন্য। ট্যাংকের ভেতরে সৈন্যরা প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপ মহাদেশ এই মুহূর্তে পৃথিবীর দ্রুততম উষ্ণায়নশীল অঞ্চল। এখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গত কয়েক দশকে এই মহাদেশের তাপমাত্রা বেড়েছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। তার ফলে তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
বাড়ির অ্যাটিকে (চিলেকোঠা) তুলে রাখা সব ফ্যান নামাতে হয়েছে প্রত্যেককে। কিন্তু এ-বছর যেন মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছে, একটা এসি থাকলে মন্দ হত না।

এ-বছরের জানুয়ারিতে কলকাতায় ছিলাম। এক-দুদিন ওখানেও মনে হয়েছিল, একটা হিটার থাকলে মন্দ হত না! বছরের এই কয়েক মাস সাইকেলের পেছনে বসিয়ে মেয়েকে নিয়ে বেশ এদিক-ওদিক ঘোরা যায়। এ-বছর মেয়েকে স্কুলে দেওয়াও সেই বাংলার মফস্সলের বাবাদের মতো সাইকেলের পেছনে বসিয়েই হচ্ছিল। কিন্তু গত এক সপ্তাহে এমন রোদ, তার ওপর এখানে সাইকেল চালালে মাথায় হেলমেট পরতেই হয়— এই গরমে তা আর সম্ভব হচ্ছে না।

তপ্ত মানচিত্র

আমাদের বাড়ির আঙুরগাছের একটা অংশ সামনের বারান্দার ভেতরে খানিকটা ঢুকে গেছে। এমনই গরম সেই বন্ধ বারান্দার ভেতরটা যে, তাতে এখনই প্রায় আঙুর চলে এসেছে, যেটা সাধারণত আসে আরও দু’মাস পরে।

গ্রীষ্মকালে উত্তর ইউরোপে দিনের অনেকটা সময় সূর্য আকাশে যথেষ্ট উঁচুতে থাকে। আবার বায়ুদূষণ ও ধোঁয়াশা তুলনামূলক কম হওয়ায়, সূর্যের আলো অনেক বেশি সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ মনে হয়। কলকাতার মতো ধোঁয়া, ধুলো বা আর্দ্রতার আস্তরণ এখানে অনেক কম, ফলে সূর্যের তেজ যেন সরাসরি গায়ে এসে পড়ে।

নর্ডিক অঞ্চলে অনেক সময়ে বাতাস অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকে। তাই শরীরের ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং মানুষ বুঝতেই পারে না যে, শরীর কতটা গরম হয়ে উঠছে বা জলশূন্য হয়ে পড়ছে। আপনার ঘাম হবে না, কিন্তু রোদে দাঁড়ালে মনে হবে প্রচণ্ড শুকনো একটা তাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন।

আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অতিবেগুনি বা UV রশ্মি। গ্রীষ্মকালে উত্তর ইউরোপে দিনের দৈর্ঘ্য এত বেশি যে, মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যালোকে থাকে। ফলে ত্বকে রোদের জ্বালা ও পোড়া ভাব দ্রুত অনুভূত হয়।

তাই নর্ডিক দেশের গরমের দিনে অনেকেরই মনে হয়— ‘তাপমাত্রা খুব বেশি নয়, কিন্তু রোদটা যেন কামড়ে ধরছে!’
আসলে এটি শুধুই তাপমাত্রার বিষয় নয়; দীর্ঘ দিনের আলো, পরিষ্কার আকাশ, শুষ্ক পরিবেশ এবং শরীরের অভ্যাস— সব মিলিয়েই নর্ডিক সূর্যকে গ্রীষ্মে এতটা তীব্র বলে মনে হয়। এই এক সপ্তাহে বাড়ির মেনু হয়ে দাঁড়িয়েছে— মসুর ডাল, লাউজাতীয় সবজি, সালমন, সিবাস, সিব্রিম ইত্যাদি মাছের হালকা ঝোল— এসব। প্রবাসী বাঙালি বাড়িতে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন চিকেন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু পৃথিবী যুগে-যুগে প্রমাণ করেছে— খাদ্যাভ্যাস-সহ সব অভ্যাসই প্রকৃতি ঠিক করে, আর মানুষ তা পালন করে মাত্র।

গ্রেটা থুনবার্গের সুইডেনে বসে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে এই মুহূর্তে একটা কথাই মনে হচ্ছে—ইউরোপবাসী যেমন ৯-১০ ডিগ্রিতে কলকাতা তথা বাংলার মানুষকে নিয়ে ভাবে যে বাড়াবাড়ি হচ্ছে, ঠিক তেমনই আমার শহর কলকাতাও নিশ্চয়ই ৩৫ ডিগ্রির এই ইউরোপের গরম-গরম খবরকে বাড়াবাড়ি হিসেবেই দেখছে।