রাজনীতির ফুটবল

Representative Image

‘ইটস আ ডিজাস্টার ওয়ার্ল্ড কাপ! টুর্নামেন্ট চলাকালীন আমরা যে একাধিক সমস্যার কথা জানিয়েছিলাম, ‘ফিফা’ সেগুলো এড়িয়ে গেছে শুরু থেকেই। সমাধান করেনি কখনও…’

মেহেদি তারেমি বলছিলেন। মুখে বিষাদচিহ্ন। গলার স্বর অত্যন্ত মৃদু। ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন। আমরা জেনেছি, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ইরান। গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচেও হেরে যায়নি। গোল পার্থক্যে ছিটকে গেছে। ‘পরিসংখ্যানের কী নিষ্ঠুর পরিণতি’!

‘আওয়ার টিম ইজ দ্য মোস্ট অপ্রেসড…’
দেখুন, ইরানের কোচ আমির ঘালেনোই প্রেস কনফারেন্সে ব্যবহার করলেন একটি শব্দ, ‘অপ্রেসড’। অর্থ হয়, পায়ের নীচে দাবিয়ে রাখা। দাবিয়ে রাখতে-রাখতে পিষে দেওয়া। নির্বিকার! কিন্তু ফুটবল সেই ক্ষমতা ভেঙে বেরোয়। ড্রিবল করে। তারপর স্টেপওভারে একটা গোল। এইবার, তা হল না। আমাদের দারুণ হাসি পেল। স্টেশনে, বস্তিতে, ফুটপাথে বুলডোজার চালিয়ে দিলে যেমন পায়! আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সেক্রেটারি, মার্কোয়েন মালেন ‘হ্যাপি ডান্স’ করলেন। হেসে বললেন, ‘৩২ রাউন্ডে ইরান পৌঁছতে পারেনি, তাই আমি খুব খুশি। আমেরিকায় ওরা আর ফিরতে পারবে না। শান্তি!’ অপ্রেসড শব্দটা আমাদের রক্তে ঢুকে যাচ্ছে। মজা পাচ্ছি প্রবল।

গ্রুপ পর্বে যে-তিনটি ম্যাচ খেলেছিল ইরান, প্রত্যেকটি আমেরিকার কোনও স্টেডিয়ামে। এ অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, বিশ্বকাপের ট্রেনিং বেস হোক অ্যারিজোনার ‘কিনো স্পোর্টস কমপ্লেক্স’—ইরান ফুটবল ফেডারেশান তেমনই প্রস্তাব দিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ সে প্রস্তাব বাতিল! একইসঙ্গে, ইরানি ফুটবলারদের ভিসা নিয়ে তৈরি হতে থাকে নানাবিধ সংশয় আর অনিশ্চয়তা। কতকটা বাধ্য হয়েই ইরানের ট্রেনিং বেসের স্থান পরিবর্তন করতে হয়। মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরে। যে-শহর থেকে আমেরিকা পৌঁছতে সময় লাগে, তিন থেকে ছ’ঘণ্টা। ‘ফিফা’ কিছু বলেনি।

আরও পড়ুন: আত্মঘাতী গোল হয়ে উঠল ফুটবলার খুনের কারণ? লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…

চলতি বিশ্বকাপে একমাত্র ইরান সেই দল, কঠোরভাবে বলা হয়েছিল যাদের— প্রতিটি ম্যাচ শুরুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে আমেরিকায় প্রবেশ করার অনুমতি পাবে। খেলা শেষ হওয়া মাত্র পাততাড়ি গুটিয়ে ফিরে যাবে। ‘ফিফা’ তবু কিছু বলেনি।

এমন নিদান দিয়েছিল কে? ‘ফিফা’ কিছু বলে না। আমরা দেখি, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামছে ইরান। গ্যালারিতে অসংখ্য ইরানের পতাকা। মূলত দু’ধরনের, ইসলামিক রিপাবলিক এবং প্রাক-বিপ্লব আমলের—পরস্পর বিরোধী। তারই মধ্যে একটা পোস্টার। সাদা কাপড়ের ওপর কালো কালিতে লেখা: ‘MINAB 168’। আমাদের মনে পড়বে, ইরানের মিনাব শহর। শাজারেহ তায়েবেহ এলিমেন্টারি স্কুল। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। আমেরিকান মিসাইল হানায় নিহত ১৬৮ জন শিশুর থ্যাঁতলানো মুখ। ইরানের এগারোজন খেলোয়াড় যেন সম্মিলিতভাবে বহন করবেন একটা শোক। তারপর আমরা ভুলে যাব।   

আমির ঘালেনোই বলছেন, ’৯০ মিনিটের একটা ফুটবল ম্যাচ। যে-কোনও খেলোয়াড়েরই নিজেকে রিকভার করতে প্রয়োজন, গোটা একটা রাত। পরদিন দুপুরে, সে শারীরিক ও মানসিকভাবে ট্রেনিং বেসে ফেরার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।’

অর্থাৎ, ইরানের নিরন্তর যুদ্ধ মাঠের বাইরেও। যে-পরিবেশ, যে-স্বাচ্ছন্দ্য, যে সমর্থন—একজন ফুটবলারের ন্যূনতম চাহিদা— পৃথিবীর যে-কোনও টুর্নামেন্টের আয়োজক সংস্থা প্রোভাইড করে থাকে, তেমনই সমীচীন, কারণ প্রফেশনালিজমের তেমনই রীতি। ‘ফিফা’ তা মানেনি। অর্থ হয়, একজন খেলোয়াড়ের যেটুকু অধিকার, মাঠে এবং মাঠের বাইরে, সেটুকু কেড়ে নেওয়া হল। এভাবেই, একজন মানুষের বেঁচে থাকার খাতে যেটুকু অধিকার বরাদ্দ, যেন রোয়াব নিয়ে বলা হচ্ছে, ‘বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছিস, এটুকুই যথেষ্ট। আর কোনও অধিকার দেব না। কী করবি?’

‘ফিফা’ ক্যাম্পেন ব্যাজে লেখা থাকে, ‘ফুটবল ইউনাইটস আস’। ‘ফিফা’ কিছু বলেনি।  

ইউনিটি আসলে একটা মিমের মতো। ফুটবল ও ফুটবলের যত মসিহা— উভয়ের টিকি-ক্ষমতা ও পুঁজির কাছে বাঁধা। যা একধরনের প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। অথচ এটুকু হজম করে নিলেই আমাদের যাবতীয় ন্যাকাকান্নার দ্য এন্ড। ইরানের ফুটবল দলের যাঁরা সাপোর্ট স্টাফ, সংখ্যায় ১৪, ইরানি সাংবাদিক, ইরান ফুটবল ফেডারেশানের প্রেসিডেন্ট— আমেরিকায় প্রবেশের অনুমতি পায়নি। মিশরের বিপক্ষে, ৯৩ মিনিটে ইরানের মিডফিল্ডার খালিলজাদেহ্-র একটা গোল। ভার(VAR) সেই গোল বাতিল করে দিল, মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের জন্য অফসাইড! অসম্ভব এক পরিসংখ্যানের কথা বলি। চলতি বিশ্বকাপে, ইরানের গোল বাতিলের সংখ্যা, ৩। যা একটি টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, এ হল পার্ট অফ দ্য গেম! একজন খেলোয়াড় তাহলে কী করতে পারে? আমেরিকা-মেক্সিকো যাতায়াতে ভীষণ ক্লান্ত। সমর্থকেরা দু’ভাগে বিভক্ত। সে দেখতে পাচ্ছে, স্টেডিয়ামের বাইরে একদল উন্মাদ, চিৎকার করছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ফিনিশ দ্য জব!’ মাঠের ভেতরে, ইরানের গোলকিপার আলিরেজা। সামনে রোমেলো লুকাকু, কেভিন ডি-ব্রুয়েনা, জেরেমি ডকু। বারপোস্টের তলায় মাটি কামড়ে পড়ে আছে। এক ম্যাচে, ৭টা অকল্পনীয় সেভ। ক্লোজ রেঞ্জ থেকে বেলজিয়ান ডিফেন্ডার ডি-কায়পার একটা শট নিলেন। রিবাউন্ড হয়ে আবার। ফ্র্যাকশান অফ আ সেকেন্ড। আলিরেজা দু’বারই গোল বাঁচিয়ে দিলেন। পার্ট অফ দ্য গেম, হে পাঠক!

মেহেদি তারেমি বলছেন, ‘কে আমাদের সাহায্য করতে চায়? কে? ‘ফিফা’ চেয়েছে, বলেছে গেট আউট, তাই আমরা বিদায় নিয়েছি। ইটস নট ফেয়ার!’

আমাদের যুদ্ধদশা কাটে না। যুদ্ধের লাইনের বাইরে বেরোতে চাইলে, অফসাইড! সেই যে জাফর পাহানি একটি ছবি তৈরি করলেন, নাম রাখলেন ‘অফসাইড’। ইরানে যেহেতু ফুটবল মাঠে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ, তাই ছেলের সাজপোশাকে মেয়েটি স্টেডিয়ামে ঢুকেছে। পুলিশি চোখ-রাঙানি এড়িয়ে। ইরান বনাম বাহারিনের ম্যাচ দেখবে সে। স্টেডিয়ামের নাম, আজাদি। যে অপ্রেসড, সে আজীবন থাকবে না। প্রকৃতির নিয়মই তাই।

প্রশ্ন উঠবে, আয়াতোল্লা খোমেনেই যে ইসলামিক রেজিমের প্রধান হয়ে বেঁচেছিলেন, সেই রেজিমের সমর্থনে মেহেদি তারেমি এত কথা বলছেন? উত্তর হল, না। ঠিক চার বছর আগে, কাতার বিশ্বকাপ চলছিল। ইরানের নীতি-পুলিশের হাতে গুমখুন হয়েছিলেন এক তরুণী। মাশা আমিনি। সে যেহেতু খোলা চুলে ঘুরছিল শহরের রাস্তায়। সেই মুহূর্তে, কাতারে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শুরু আগে, ইরানের প্রথম একাদশ জাতীয় সংগীত গাইতে বিরত থাকে। এই বোধ আসলে তৈরি করে দেশপ্রেম। চারিদিকে যে-দেশপ্রেমের জিগির উঠেছে আমাদের, সেই সবের চেয়ে আলাদা। মহৎ। বৃহত্তর। সেই দেশপ্রেমের তাড়নায়, সে বলে, ‘ইটস নট ফেয়ার’। আমরা নক আউট পর্বে পৌঁছতে পারতাম। পোটেনশিয়াল ছিল। ওরা চাইল না। ‘ফিফা’ তারপরও কিছু বলে না।

ইরানের নীতি-পুলিশের হাতে গুমখুন হয়েছিলেন এক তরুণী। মাশা আমিনি। সে যেহেতু খোলা চুলে ঘুরছিল শহরের রাস্তায়। সেই মুহূর্তে, কাতারে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শুরু আগে, ইরানের প্রথম একাদশ জাতীয় সংগীত গাইতে বিরত থাকে। এই বোধ আসলে তৈরি করে দেশপ্রেম।

তাই লস অ্যাঞ্জেলস স্টেডিয়ামে লকার রুমে রেখে যায় একটা চিঠি। লেখে, ‘হাজার বছরের পুরনো পারস্য যুগ পেরিয়ে আজ, এই ইরানের সভ্যতা— আমাদের আত্মা, ইরানের আত্মা, এখনও অটুট এবং প্রাণবন্ত। লস অ্যাঞ্জেলসে আমরা এসেছিলাম গৌরবে, মাঠে লড়াই করেছি সম্মানের সঙ্গে এবং ফিরে যাচ্ছি মর্যাদা নিয়েই। ধন্যবাদ লস অ্যাঞ্জেলস, তোমাদের আতিথেয়তার জন্য। পৃথিবীর সমস্ত দেশের ভেতরে শান্তি, শ্রদ্ধা এবং বন্ধুত্ব— জারি থাকুক।’

এইবারও ‘ফিফা’ কিছু বলে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ধুলো জমে। আর আমাদের দারুণ হাসি পায়।