১৯৩২ সালের ৩ জুলাই স্বর্ণকুমারী দেবীর মৃত্যুদিন। জন্ম ১৮৫৫ সাল নাগাদ। কে এই স্বর্ণকুমারী? আশপাশে হাওয়ায় প্রশ্নটা ভাসিয়ে দিয়ে দেখুন, যাঁরা জানেন স্বর্ণকুমারীকে, তাঁরা বলবেন, ‘উনি দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতনি, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে’, ‘রবীন্দ্রনাথের দিদি’। মজার ব্যাপার, একই প্রশ্ন যদি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে করা হত তাহলে কখনও শুনতেন কি, রবীন্দ্রনাথ স্বর্ণকুমারীর দেবীর ছোট ভাই! ঠিক এখান থেকে স্বর্ণকুমারীকে জানার প্রয়োজন হয়।
তাও স্বর্ণকুমারীর ভাগ্য ভাল, উনিশ শতকের শিক্ষিত মহিলাদের দলে তাঁর বংশপরিচয়ের দৌলতে কখনও-কখনও শুনতে পাবেন, স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যিক সত্তার কথা। সেই কারণে উনিশ শতকের লেখিকা হিসেবে পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে আলোচনাও হয়েছে অন্যদের চেয়ে একটু বেশি। তবুও, ১৮৭৬ সালে ২০ বছর বয়সি এই স্বর্ণকুমারীকেই তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’ প্রকাশ করতে হয়েছিল বিনা পরিচয়েই। তারপর তাঁকে আর থেমে থাকতে হয়নি। ‘মিরাজরাজ’ (১৮৮৭), ‘মালতী’ (১৮৭৯), ‘বিদ্রোহ’ (১৮৯০) ইত্যাদি দশের অধিক উপন্যাস; শেষে এসে ত্রয়ী উপন্যাস ‘বিচিত্রা’ (১৯২০), ‘স্বপ্নবাণী’ (১৯২১), ‘মিলনরাত্রি’ (১৯২৫) দিয়ে উপন্যাসে ইতি। ছোটগল্প, নাটক, গান কোনও দিকেই সংখ্যাটা কম নয়। ১৮৭৯-এ গীতিনাট্য ‘বসন্ত উৎসব’ রচনা করেন। স্বামী ইংল্যান্ডে থাকার সময় জোড়াসাঁকোয় এসে স্বর্ণকুমারী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে নতুন নতুন গান-নাটকের সংরূপের খেলায় মেতে ওঠেন।
আরও পড়ুন: ‘উনিশ শতকে ‘অশ্লীলতা’ শব্দটা এসেছিল ইংরেজদের হাত ধরে!’
অরুণ নাগের সাক্ষাৎকার…
স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যচর্চার ধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ‘ভারতী’ পত্রিকা। ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন পারিবারিক পত্রিকা ‘ভারতী’ প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বর্ণকুমারীর ‘সক্রেটিস দাদা’। তাঁরই বিশেষ প্রশ্রয়ে ‘ভারতী’-র সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেন স্বর্ণকুমারী। পত্রিকা চালানোর প্রয়োজনেই হয়তো স্বর্ণকুমারী সবসময়ে কলম ধরে থেকেছেন। আর সেখানেই স্বর্ণকুমারী নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গেছেন। স্বর্ণকুমারীর বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্পাদক জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে। স্বামীর সঙ্গযাপনে তিনিও জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় দীক্ষিত হন। সেজন্যই হয়তো প্রথম উপন্যাস ‘দীপনির্বাণ’-এও জাতীয়তাবাদী ভাবনার উপাদান মেলে। জাতীয়তাবাদী ভাবনার আলোয় মেয়েদের যে ছবি তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাসে উঠে আসে, সেখানে রয়েছে ‘সহ্য করে কর্তব্যপালন’-এর কথা। মেয়েদের জীবনের সার্থকতা রয়েছে ‘মাতৃত্বে’। উনিশ শতকের এই স্টিরিওটাইপ ভাবনার মধ্যেই তাঁর ছোটগল্পে এমন কিছু চরিত্র আসবে, যাঁরা অভিমান করতে জানে। এই অভিমান জগৎসংসারের বিধানের ওপর, প্রিয় মানুষদের বিশ্বাসের ওপর। এই অভিমানেই যমুনা (যমুনা) বলে, ‘তুমি আমার স্বামী, কিন্তু আমি তোমার পত্নী নহি—’, কিংবা ‘তিনটি দৃশ্য’ গল্পের নায়িকাও তাঁর আত্মসম্মানের দাবি জানায় তাঁর স্বামীর কাছে। এই অভিমানই রবীন্দ্রনাথে এসে হবে আকাঙ্ক্ষা। ভাবনা বদলের আকাঙ্ক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
গল্প-উপন্যাসে এইসব ভাবনার বাইরে সাহিত্যিক স্বর্ণকুমারীর আরেকদিকের প্রকাশ পাওয়া যায় ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদিকা হিসেবে। প্রাবন্ধিক স্বর্ণকুমারীর আত্মপ্রকাশ ঘটে এভাবেই। বিচিত্র সেসব প্রবন্ধের বিষয়। সমাজ-রাজনীতি-ব্যক্তি কোনওকিছুই বাদ পরেনি। ১৮৯৮ সালে তিনি স্থাপন করেন ‘সখীসমিতি’। হিন্দু বিধবা মহিলাদের সাহায্য করার জন্য এই সমিতি কাজ করত। অর্থসাহায্য যেমন ছিল, তেমনই ছিল তাঁদের স্বনির্ভর করার ব্যবস্থা। বিধবাদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাঁদের শিক্ষিকা হিসেবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে সাহায্য করত সখীসমিতি। বিদ্যাসাগর যে কাজ সম্পূর্ণ করতে পারেননি, সখীসমিতির সদস্যরা মিলে সে কাজকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছিল সেসময়। আর এই ভাবধারার প্রচারে স্বর্ণকুমারীকে লিখতে হচ্ছিল প্রবন্ধ। ‘একটি প্রস্তাব’ ও ‘আর একটি প্রস্তাব’ এগুলি সখীসমিতির ভাবনা ও কার্যক্রমকে ব্যাখ্যা করে। স্বর্ণকুমারী অন্তঃপুরের মহিলাদের সঙ্গে শিক্ষিত মহিলাদের সম্মেলনের প্রস্তাব দেন প্রবন্ধের আকারে। শিক্ষিত পুরুষদের কাছে জানতে চান, তাঁদের ঘরের শিক্ষা কি জরুরি ছিল না। স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি না করলে সমাজ অর্ধেক ক্ষতিগ্রস্থ হয় না শুধু, সমাজের সম্যক উন্নতিই ব্যহত হয়। এমনটাই ‘ভারতী’-র সম্পাদিকার মত। ‘রাজনৈতিক প্রসঙ্গ’, ‘কর্ত্তব্য কোন পথে?’ ইত্যাদি প্রবন্ধে তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী বোধকে জাগ্রত করবার অভিপ্রায়ে স্বর্ণকুমারীর ভাবনার প্রতিফলন দেখা যাবে।
প্রথাগত বিজ্ঞান শিক্ষার বাইরে বিজ্ঞান বিষয়ে স্বর্ণকুমারীর আগ্রহ ধরা পরে ‘ভারতী’-র পাতায় পাতায়। কখনও নিজে লিখতেন, কখনও অন্য কাউকে দিয়ে বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ লিখিয়ে নিতেন। ‘প্রলয়’, ‘অন্যান্য গ্রহগণ জীবের নিবাসভূমি কি না?’, ‘মঙ্গলে জীব থাকিতে পারে কিনা’ ভূতাত্ত্বিক আলোচনা থেকে আধুনিক পাশ্চাত্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব— সব বিষয়েই আলোচনা আছে এসব প্রবন্ধে। বাদ পড়েনি প্রাণীবিদ্যা কি প্রকৃতির প্রসঙ্গও। স্বাদু বাংলা গদ্যে বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়কে সকলের জন্য সহজ ও চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা ছিল স্বর্ণকুমারীর।
প্রাবন্ধিক স্বর্ণকুমারীর উপস্থাপনার এই দক্ষতা আমরা দেখতে পাবো তাঁর ভ্রমণ-বিষয়ক লেখাগুলিতেও। এ-বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
স্ত্রীশিক্ষার প্রসারই যে মেয়েদের অবস্থানকে সমাজে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে না, স্বর্ণকুমারী তা বিচক্ষণ জানতেন, তাই জোর দিয়েছিলেন স্বনির্ভরতায়। এই ভাবনা উনিশ শতকের মেয়েদেরই ভাবনা। মেয়েদের হয়ে পুরুষের দেখা নয়। বংশপরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্বর্ণকুমারী নিজের সাহিত্যিক-সামাজিক সত্তাকে যেভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজ সে প্রসঙ্গেই কথা হওয়া উচিত। ঠাকুরবাড়ির প্রতিভার ভিড়ে, সেই মাপকাঠিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা এ এক নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠার গল্প।
অজানাকে নিয়ে ভয় ও তাকে জানার আগ্রহ— এই দুই’ই মানুষের সহজাত। সেই আগ্রহ থেকেই মানুষ যুগে-যুগে ভ্রমণে আগ্রহ দেখিয়েছে। কখনও ধর্মের নামে, কখনও লেখাপড়া, জীবন, জীবিকার উদ্দেশ্যে, কখনও বা শুধু জানার আনন্দেই। তাকে লিপিবদ্ধ করে রাখার চেষ্টাও সে করেছে। সাহিত্যের একটি বড় অংশ তাই ভ্রমণ-সাহিত্য। কিন্তু এই ভাগটিই বোধহয় সাহিত্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত ভাগ। আজ স্বর্ণকুমারীর লেখালিখির কথা বলতে হলে তাঁর লেখা ভ্রমণ-অভিজ্ঞতাগুলিকে আলাদা করে বলতে হয়।
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনায় ভারতীয়দের একসময় কালাপানি পার করলে যেমন সমাজচ্যুত করা হোত, তেমনই অন্যদিকে মাইকেল মধুসূদন, কেশব সেনরা লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েয়েছেন সুদূর ইংল্যান্ড। বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার, বিজ্ঞানের বোধ, পৃথিবীর সাহিত্যের হাতছানি ছিল সেই ভিনদেশে। ভারতীয়দের আগ্রহ তৈরি হয়েছে তাকে জানার। ভ্রমণ আসলে একটি ‘অপর’-এর ধারণাকে গড়ে তোলে। ‘আমার’ জীবন-অভিজ্ঞতা, আমার ভাবনার সীমাবদ্ধতা সব নিয়ে নতুন এক দেশ-সমাজ-সংস্কৃতিকে জানার চেষ্টা করা হয়। তুলনা, প্রতিতুলনায় আমার ভাবনার প্রসারতা তৈরি হয়। দেখার দৃষ্টির বদল হয়। তাই রমেশচন্দ্র দত্ত তাঁর ‘Three Years in Europe’-এ বলেন, ইংরেজি লেখাপড়ার দৌলতে এতদিন তো ইংল্যান্ডকে ইংরেজের দৃষ্টিতে দেখেছি, সত্যি কি তাকে জেনেছি? এত অন্ধের হস্তীদর্শন! বাঙালি ভারতীয়র চোখে সেই দেশ দেখা হলে নিশ্চিত তা অন্যরকম এক দেখা হবে। ভ্রমণসাহিত্যে এই ‘স্থান’ ও ‘দেখা’— এই দু’টি খুব গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে। রমেশচন্দ্র দত্ত উনিশ শতকে দাঁড়িয়েই যে ‘ভারতবর্ষ’-র বোধ নিয়ে ইংল্যান্ডকে দেখার কথা ভাবেন, কৃষ্ণভাবিনী, রমাসুন্দরী বা গিরীন্দ্রমোহিনীরা কি একই ‘ভারতবর্ষ’-র কথা ভাবেন? তা যদি না হয় তবে তাঁদের ‘অপর’-কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন হবে। ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখার কথনও ভিন্নতর হবে, সন্দেহ নেই।
রাসসুন্দরী দাসী যখন তাঁর আত্মজীবনীতে (‘আমার জীবন’) ভারতবর্ষে তিনি এই আশি বছর কাল জীবনধারণ করেছেন বলেন, তখন সে ‘ভারতবর্ষ’ কোন ‘ভারতবর্ষ’? জীবনে ৪০ বছর বয়স অবধি তো তিনি রামদিয়া গ্রামের বাইরে যাননি! ‘স্থান’ ও ‘দৃষ্টি’-র সঙ্গেই জুড়ে থাকে আরও কত জরুরি বিষয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও লিঙ্গগত অবস্থান। রাসসুন্দরী আর স্বর্ণকুমারী— দু’জনেই উনিশ শতকের নারী, দু’জনেই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমাজে এগিয়ে থাকা শ্রেণির মানুষ, তবু স্বর্ণকুমারী যখন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, সম্পাদিকা; তখন রাসসুন্দরী স্বশিক্ষিত হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন। স্বর্ণকুমারীর স্বামী জানকীনাথ তাঁর স্ত্রীয়ের লেখালেখির অন্তরায় তো হননি, বরং রাজনৈতিক কাজকর্মেও তিনি সহধর্মিনীকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। স্বর্ণকুমারীও সেই সুযোগকে হাতছাড়া করেননি মোটে। জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে বাঙালি মহিলা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। রাসসুন্দরীর স্বামীর ক্ষেত্রে সেই উৎসাহ নজরে পড়ে না। রাসসুন্দরীর লড়াই তাই একার লড়াই। একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই, সেদিন মেয়েদের দেখার মন তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন পুরুষরাই। না-হলে স্বর্ণকুমারীর ভারতবর্ষ জাতীয়তাবোধে জাগ্রত ভারতবর্ষ হত না। আবার লিঙ্গগত অবস্থানের কারণেই কিন্তু এই ভারতবর্ষকে জানকীনাথ যেভাবে দেখেছেন, স্বর্ণকুমারী সেভাবে দেখেননি। তাঁদের উদ্দেশ্য এক থাকলেও দেখা ভিন্ন। সমাজে মেয়েদের সীমিত সীমারেখার মধ্যে থেকে ডানা মেলে স্বাধীনতার স্বাদকে যেভাবে অনুভব করতে হয়েছে, সেভাবে অনুভব করতে হয়নি পুরুষকে। তাই মেয়েদের ‘দেখা’ তৈরি করে সমাজের এক ভিন্নতর ভাষ্য।
ভ্রমণসাহিত্য প্রসঙ্গে এতগুলো কথা বলতে হচ্ছে, কারণ ভ্রমণসাহিত্য বা প্রবন্ধে একজন লেখকের ভাবধারার সরাসরি প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। গল্প, উপন্যাসে তা একটু আড়ালে থাকে। স্থানিক বোধ যে ‘দেখা’-র দৃষ্টি তৈরি করল, সেটাই ভ্রমণে ‘অপর’-কে নির্মাণ করবে। আবার সেই ‘অপর’-এর প্রেক্ষিতে সে নিজেকেও গড়ে তুলবে। তাই ভ্রমণসাহিত্যে থাকে আত্মনির্মাণ ও আত্মপ্রকাশ। সীমন্তি সেন তাঁর ‘Travels to Europe’ বইতে উনিশ শতকের প্রেক্ষিতে এই ভ্রমণ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘It was also around this time that travel writing emerged as one of the forms of modern self-expression’। উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষা, মুদ্রণ, যুক্তিবোধ যে ‘আধুনিক’ ‘আত্ম’-কে নির্মাণ করছিল, বাঙালি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার ভ্রমণ-বিষয়ক লেখালিখিতে তার প্রভাব পড়তে দেখা যায়।

‘ভারতী’-তেই প্রকাশিত হয়েছে স্বর্ণকুমারীর ভ্রমণ-বিষয়ক লেখাগুলি। ১২৯৩ বঙ্গাব্দে ‘প্রয়াগ যাত্রা’, ১৩০২-এ ‘সমুদ্রে’। ‘পুরী’, ‘পাণ্ডারপুর’, ‘পত্র’ ইত্যাদি লেখায় স্বর্ণকুমারীর বম্বে, এলাহাবাদ, পুরী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করা আছে। কখনও স্বামীর সঙ্গে সঙ্গী হয়ে, কখনও বা বেড়ানোর উৎসাহে। স্বর্ণকুমারীর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লেখার কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেখানে তিনি বেড়াতে যাচ্ছেন, সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও স্থাপত্যের বর্ণনা তিনি দেন শুধুই মুগ্ধতার দৃষ্টিতে নয়, সেখানকার মানুষের জীবনযাপন-ভাবনাকে জুড়ে দেখতে চেয়েছেন সবসময়। পুরীর সমুদ্রের শোভা বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সমুদ্রে মানুষের স্নানের দৃশ্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন, ‘ভীম তরঙ্গের উপর ক্ষুদ্র মানুষের এত সহজ প্রভুত্ব দেখিয়া আমার মনে হইত, সংযমই সিদ্ধিলাভের উপায়।’ সোলাপুর যে বোম্বাই নগরের মতো সুন্দর নয়, সে-কথা বলবার সময় তিনি সৌন্দর্য ও পুরনো স্থাপত্যের সঙ্গে গরিব মানুষের ঘরের বর্ণনা দিতে ভোলেন না। স্বর্ণকুমারীর লেখায় স্থাপত্য, সৌন্দর্যের থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক অবস্থানের আলোচনা। পাণ্ডারপুরের পাণ্ডা হোক বা পুরীর মৎসজীবী সমুদ্রনাবিক ‘নুড়িয়া’— তাঁদের জাতিগত অবস্থান, নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ভ্রমণসাহিত্যের একটি অংশ, সেকথা তিনি মনে করিয়ে দেন।
বিশেষত স্বর্ণকুমারীর ভ্রমণ-বিষয়ক সব লেখায় যে দেশে তিনি বেড়াতে গেছেন, সেখানকার মেয়েদের সামাজিক অবস্থানকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। মিলিয়ে দেখেছেন তৎকালীন বাংলার মেয়েদের অবস্থানের সঙ্গে। বম্বেতে গিয়ে মনে হয়েছে, স্ত্রীশিক্ষার প্রসার এখানে আগে হলেও বর্তমানে বাংলায় শিক্ষিত মেয়েদের অবস্থান ভাল। সখীসমিতির কথা প্রচারও করেছেন সভা-সমিতি করে। পুনায় গিয়ে ‘রাণাদে মহাশয়’-এর সভার উল্লেখ করে দেখাচ্ছেন, সেই সভার নিয়ম অনুযায়ী এই সভার সভ্যরা বিধবাবিবাহে উৎসাহ দেবেন। যৌবন-বিবাহে আপত্তি করবেন না ইত্যাদি। ‘প্রয়াগ যাত্রা’ লেখাতে স্বর্ণকুমারীর তাঁর ‘পাশি’ সম্প্রদায়ের চৌকিদারের দুই বিবাহের গল্প মজার ছলে বলতে-বলতে এলাহাবাদের সমাজে মেয়েদের অবস্থানের কথা বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভ্রমণ-সাহিত্যিক হঠাৎ প্রাবন্ধিক হয়ে উঠেছেন মনে হবে! সেদেশে ক্ষত্রিয়দের মধ্যে বিধবা-বিবাহের চল আছে। তবে তা বেশিরভাগ পরিবারের মধ্যেই হয়। বম্বের তুলনায় এলাহাবাদে ভদ্রলোক পরিবারে বেশি কড়াকড়ি ‘জানানা’ মহলে। অন্তঃপুরের মহিলারা বাইরে আসেন না। স্বামীর স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর আগ্রহ থাকলেও সেই সমাজ বড় কড়া। অথচ এরই মধ্যে স্বর্ণকুমারী খুঁজে পান মেয়েদের স্বাধীনতার অন্য এক মাত্রা। এদেশে গরিব-বড়লোক নির্বিশেষে মেয়েদের নৃত্যগীত জানাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। নববিবাহিত পুত্রবধূ নাচতে জানে শুনে স্বয়ং শ্বশুরমশাই ঘুঙুর গড়িয়ে দেন। সব বাড়িতে ঢোলক থাকে নৃত্যগীতের জন্য। নৃত্যগীত মানুষের স্বাভাবিক প্রকাশ, একে ব্যহত করার কোনও কারণ খুঁজে পাননি স্বর্ণকুমারী। বাংলাদেশের মেয়ে হয়ে তাই বাংলাকেই প্রশ্ন স্বর্ণকুমারীর ‘কেন যে আর্য্য দেশে— এরূপ অনার্য্য আস্বাভাবিক প্রথা চলিত হইল তাহা ত বুঝিতে পারি না।– কেহ কি বলিতে পারেন?’
এই ‘দেশ’ স্বর্ণকুমারীর নিজের দেশের ধারণা, উনিশ শতকের শিক্ষিত মেয়ের ‘ভারতবর্ষ’-র ধারণা। স্বর্ণকুমারীর ছিল ‘আমাদের’ বোধ। সেই জন্য যেমন স্বামীর সঙ্গিনী হিসেবে গিয়েও বলেছেন ‘আমরা’ বেড়াতে গেলাম, তেমনই বেড়াতে গিয়ে সেখানকার মেয়েমহলের ভিতরে প্রবেশ করে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাদের অবস্থানকে। স্বর্ণকুমারীর আরেকটি দানের কথা বাংলা সাহিত্যকে স্বীকার করতেই হবে, তা স্বাদু বাংলা গদ্য। ‘পুরী’ রচনার শুরুতে কবিতার মতো গদ্যের চলনই হোক কি ‘প্রয়াগ যাত্রা’-র কৌতুকের আবহ তৈরির ভাষার সঙ্গে যুক্তিবাদী অবস্থানের বাংলা ভাষা— সবেতেই স্বর্ণকুমারীর ছিল অবাধ যাতায়াত। নিজের সামাজিক অবস্থানের সুযোগকে কখনও বিফলে যেতে দেননি স্বর্ণকুমারী। স্ত্রীশিক্ষার প্রসারই যে মেয়েদের অবস্থানকে সমাজে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে না, স্বর্ণকুমারী তা বিচক্ষণ জানতেন, তাই জোর দিয়েছিলেন স্বনির্ভরতায়। এই ভাবনা উনিশ শতকের মেয়েদেরই ভাবনা। মেয়েদের হয়ে পুরুষের দেখা নয়। বংশপরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্বর্ণকুমারী নিজের সাহিত্যিক-সামাজিক সত্তাকে যেভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজ সে প্রসঙ্গেই কথা হওয়া উচিত। ঠাকুরবাড়ির প্রতিভার ভিড়ে, সেই মাপকাঠিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা এ এক নতুন আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠার গল্প।
তথ্যসূত্র
১.অভিজিৎ সেন ও অনিন্দিতা ভাদুড়ী (সম্পা), ‘স্বর্ণকুমারী দেবীররচনা-সংকলন’,
দে’জ পাবলিশিং, কোলকাতা: সেপ্টেম্বর ২০০০
২. দময়ন্তী দাশগুপ্ত (সম্পা), ‘আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত’,
গাঙচিল, কোলকাতা: সেপ্টেম্বর ২০১৬
৩. Simonti Sen, ‘Travels to Europe’,
Orient Longman, 2005




