‘গোল’ নিয়ে গোলমাল
‘বিশ্বকাপ জিততে পারে কলম্বিয়া’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিযোগিতা শুরুর মাস দুয়েক আগে বলেছিলেন পেলে। ‘না হলে অন্তত সেমিফাইনাল খেলবেই।’ কার্লোস ভালদেরামা-ফ্রেডি রিঙ্কন-আলেক্সিস গার্সিয়ারা বিশ্বকাপ খেলতে রওনা হওয়ার আগে পর্যন্ত, ২৬ টি ম্যাচে মাত্র একটিতে হেরেছিলেন। বুয়েনোস আইরেসে যোগ্যতা অর্জনকারী ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে পাঁচ গোলে হারানোর পর কলম্বিয়া হয়ে উঠেছিল লাতিন আমেরিকান ফুটবলের এক নতুন বিস্ময়কর শক্তি।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাই ফুটবল সম্রাট পেলের মন্তব্য অনুযায়ী, ভালদেরামাদের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে ধরা হল। সেই মতো বাজির দর ঠিক করলেন বুকিরা। অথচ লাতিন আমেরিকার যোগ্যতা অর্জনকারী গ্রুপ সাফল্য পেলেও, বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে কলম্বিয়া তখনও ছিল এক অজানা-রহস্যময় টিম। তাদের অধিকাংশ ফুটবলারই তখনও পর্যন্ত খেলতেন, ‘অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনাল’ বা ‘আমেরিকা দি কালি’র মতো তাদের ঘরোয়া লিগের বড় ক্লাবগুলোতে।
কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানাও দেশের ক্লাবেই কোচিং করে জাতীয় দলের কোচ হয়েছিলেন। তাই কোথায় তাদের মূল শক্তি, কোথায় তাদের দুর্বলতা, তা নিয়ে সম্যক ধারণাই ছিল না বহির্বিশ্বের। সেই বিশ্বকাপে ‘ফিফা’র স্লোগান ছিল, ‘গো ফর গোলস’। ১৯৯০ ইতালি পর্ব দেখেছিল সর্বনিম্ন গোলের বিশ্বকাপ; তাই রক্ষণাত্মক ফুটবলকে আক্রমণাত্মক করতে, ‘ফিফা’ একগুচ্ছ নতুন নিয়ম চালু করেছিল। সে-বারই প্রথম গোলকিপারকে ব্যাকপাস করা নিষিদ্ধ হয়, গোলমুখী বলে শেষ ডিফেন্ডার ফাউল করলে, তাকে সরাসরি লালকার্ড দেখানোর ক্ষমতা দেওয়া হয় রেফারিদের, গ্রুপ ম্যাচ জয়ের জন্য দু’য়ের বদলে তিন পয়েন্ট দেওয়া হয় নির্দিষ্ট দলকে।
বিপ্লবী ফুটবলারের ট্র্যাজিক পরিণতি! পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৭,
লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…
১৯৯০ বিশ্বকাপের মূলপর্বে ২৮ বছর পর ফিরেছিল কলম্বিয়া। গ্রুপ লিগে শেষ মুহূর্তে ফ্রেডি রিঙ্কনের পাল্টা গোলে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ড্র করে চমক দিয়েছিলেন ভালদেরামারা। সেই সঙ্গে প্রথমবারের জন্য পৌঁছে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে। কিন্তু প্রতিযোগিতায় সাড়া ফেলে দেওয়া দল ক্যামেরুনের কাছে, ১-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা।
কলম্বিয়া টিমে নজর কেড়েছিল তাদের সাদা পরচুলা পরিহিত অধিনায়ক, ভালদেরামা-র ‘টাচ-প্লে’। মাঝমাঠ থেকে তিনিই দলকে চালনা করতেন। ’৯৪-তে আবার যখন বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার ছাড়পত্র পেলেন ভালদেরামারা, তখন চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। ভালদেরামা-রিঙ্কন-গার্সিয়াদের নিয়ে গড়া মাঝমাঠের সৃজনশীলতা, কৃষ্ণকায় স্ট্রাইকার জুটি ফস্টিয়ান আসপ্রিলা-অ্যাডোলফো ভ্যালেন্সিয়ার গোলক্ষুধা— কলম্বিয়ার সোনালি প্রজন্মকে নিয়ে বিশ্ব ফুটবলে তখন চলছে রীতিমতো জল্পনা-কল্পনা।

নৈশ ক্লাবের বাইরে
মেদেলিনের এক নৈশ ক্লাব, ‘এল ইন্দো বার’। রাত বেশ গভীর, ঘড়ির কাঁটা মাঝরাত পেরিয়ে গিয়েছে অনেক্ষণ। বাইরের পার্কিং লটে এক যুবক তাঁর বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে এলেন। নিজের গাড়ির কাছে এসে গাড়ির চাবি খুলে, ভেতরে ঢুকে চালকের আসনে বসলেন। অন্ধকারের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলেন আরও জনা চারেক ব্যক্তি। তাঁরা যুবকটিকে অপমানজনক কিছু বলে দোষারোপ করতে লাগলেন। যথাসম্ভব শান্ত ও সংযত থেকে যুবকটি নিজেকে সৎ ও নির্দোষ দাবি করলেন। বোঝাতে চাইলেন, তার সেই বিশেষ ভুলটি ছিল অনিচ্ছাকৃত। দু’পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হল। ক্রমেই তা তপ্ত হয়ে উঠল। চড়া হল গলার স্বর। এবার কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ‘ফেগট’ শব্দটি (একটি অশ্লীল গালাগাল) বারবার নিক্ষেপ করা হচ্ছে চালকের আসনে বসা যুবকটির উদ্দেশ্যে। হঠাৎ ওই লোকগুলোর মধ্যে তৃতীয় এক ব্যক্তি পকেট থেকে একটি রিভলভার বের করে গুলি চালিয়ে দিলেন যুবকটিকে লক্ষ্য করে। তারপর আবার গুলি চালালেন, পরপর ছ’বার। প্রতিবার ঘোড়া টেপার পর একবার করে আততায়ী ব্যক্তিটিকে আওড়াতে শোনা গেল ‘গোল’ শব্দটি। ফুটবল মাঠের ‘গোল’ বোঝাতে চাইলেন কি ওই অজ্ঞাত আততায়ী? যুবকটির মাথা লুটিয়ে পড়ল গাড়ির স্টিয়ারিং এর ওপর, গুলি শরীরে ঢুকেছে পিঠের চামড়া ফুঁড়ে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার জামা। যুবকের বুকে রিভলভারের পুরো ম্যাগাজিন খালি করে ওই লোকগুলো নিজেদের গাড়িতে উঠে অকুস্থল ছেড়ে পালাল। গুলিবিদ্ধ যুবকের সঙ্গীরা আরও-একটি অ্যম্বুলেন্স ডেকে, যুবকটিকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর দেহ প্রাণহীন নিথর হয়ে গিয়েছে। দিনটা ছিল ২ জুলাই, ১৯৯৪।

রোজবোল, পাসাডিনা থেকে মেদেলিন
‘আমাদের সময়ে খেলতে হত মনে অনেক ভয় নিয়ে। তাই আমি চেয়েছিলাম, ফুটবলাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের দক্ষতা মেলে ধরুক। তাই, এরকম চোখ ধাঁধানো ফুটবল খেলে দল বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছে।’— কলম্বিয়ার কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানা।
বিশ্বকাপে মোক্ষম সময়ে মাতুরানার টিম কি ‘ভয়হীন’ ফুটবল খেলতে পেরেছিল?
আয়োজক মার্কিনদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে নেমেছে কলম্বিয়া; কানায়-কানায় পূর্ণ গ্যালারি। ভালদেরামাদের কাছে এই ম্যাচ, ‘ডু অর ডাই’; সাতটি ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করে ছিল কলম্বিয়া। কিন্তু প্রথম ম্যাচে, ঘর্গে হাজি-র রোমানিয়ার কাছে তারা বিশ্রীভাবে হেরে যায় ১-৩ গোলে। যদিও কলম্বিয়া ম্যাচটি হারার মতো খেলেনি, রোমানিয়ার গোলকিপার বোগদান স্টিলিয়া অবিশ্বাস্য কয়েকটি সেভ করেন, আর ততোধিক অবিশ্বাস্য একটি গোল করেছিলেন, রোমানিয়ার অধিনায়ক হাজি, যা কলম্বিয়ার ম্যাচে ফেরার আশা একেবারে শেষ করে দিয়েছিল। সেই থেকেই মনস্তাত্ত্বিক চাপ পর্বের শুরু কলম্বিয়া-শিবিরে। মার্কিনদের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ জিততেই হবে কলম্বিয়াকে, নিদেনপক্ষে ড্র। হারলেই নিশ্চিত মৃত্য! গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে জেতে হবে স্বয়ং পেলের চিহ্নিত করে দেওয়া ফেভারিটদের!

এই যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে বহু প্রদর্শনী ম্যাচ খেলেছিল কলম্বিয়া, এবং সবকটিতেই তাঁদের হারিয়ে ছিলেন ভালদেরামারা। কিন্তু ২৩ জুন খেলা শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, কলম্বিয়ানরা প্রচণ্ড চাপে। সেই চাপ ফুটে উঠছে আসপ্রিলা-গার্সিয়াদের চোখেমুখে। চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শানাচ্ছেন তাঁরা, কিন্তু হয়ে যাচ্ছে ছোটখাটো ভুল; যার ফলে গোল হচ্ছে না। কলম্বিয়ানদের এই ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে, প্রবল উদ্যমে লড়াই করছেন মার্কিনিরা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটের মাথায় অকস্মাৎ বদলে গেল ম্যাচের রং। মার্কিন মিডফিল্ডার জন হার্কস বাঁ-দিক থেকে বক্সের মধ্যে একটি নীচু সেন্টার করলেন। সামান্য জোর ছিল সেন্টারটিতে। কলম্বিয়ার স্টপার আন্দ্রেইস এসকোবার, ছ’গজের বক্সের মাথায় স্লাইড করে বলটি ব্লক করতে গেলেন। বল এসকোবারের বুটের স্পাইকে লেগে, হার্কসের সেন্টারের গতিপথ অনুসরণ করে সম্পূর্ণ উলটো দিকে ঝুঁকে পড়া গোলকিপার অস্কার কর্ডোবাকে নীরব দর্শক বানিয়ে, জালে আশ্রয় নিল! হতভম্ব গোটা মাঠ, ক্যামেরার লেন্স এবার আত্মঘাতী গোলদাতার ওপর ফোকাস করল। গম্ভীর, বিষণ্ণ মুখে উঠে দাঁড়িয়ে সেন্টার সার্কেলের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন এসকোবার। কলম্বিয়ার স্টপার যা করতে চেয়েছিলেন, তা গোলমুখে ওই পরিস্থিতিতে একজন ডিফেন্ডারের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

ঠিক সেই সময়ে বহু দূরে, ওই ডিফেন্ডারের শহর মেদেলিনে টিভির সামনে বসে খেলা দেখতে-দেখতে বছর নয়েকের এক কিশোর তার মাকে বলেছিলেন, ‘মা, ওরা আন্দ্রেইসকে মেরে ফেলবে এর জন্য।’ মা ছেলেকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, ‘একটা ভুলের জন্য কাউকে মেরে ফেলা হয় না, বাবা। এখানে সবাই আন্দ্রেইসকে ভালবাসে।’ এই কিশোরটি হল এসকোবারের ভাগ্নে। পরে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তার মা, অর্থাৎ এসকোবারের একমাত্র সহোদরা এস্টার মারিয়া, জানিয়েছিলেন তার পুত্রের আশঙ্কার কথা।
মারিয়ার বালক পুত্রের আশঙ্কার একটা বড় কারণও ছিল। পাসাডিনায় যখন বিশ্বকাপ ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল কলম্বিয়া শিবির, তখন দেশে তাদের মেদেলিন শহর জ্বলছে! পাবলো এসকোবার নামক মাদক-কার্টেলের (একচেটিয়া চোরাকারবারীদের সিন্ডিকেট) সর্বেসর্বা খুন হওয়ার পর থেকেই মেদেলিনে অশান্তির আগুন ক্রমাগত বেড়েই চলছিল।
পাবলো খুন হয়েছিলেন ডিসেম্বরের ২ তারিখ। কলম্বিয়া সরকারের ‘সবথেকে বড় শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত পাবলো নিহত হওয়ার পেছনে ছিল ‘লস পেপেস’ নামক এক আধাসামরিক বাহিনী, তার সঙ্গে জুড়েছিল পাবলো-গোষ্ঠী ও তার বিপক্ষ ‘কালি কার্টৈল’-এর কিছু গুন্ডা। এছাড়া ছিল কলম্বিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্ত-পুলিশও। পাবলো নিছক মাদক চোরাচালান কারবারের একছত্র অধিপতিই ছিলেন না, ওতপ্রোত জড়িয়ে ছিলেন ফুটবল ও রাজনীতির সঙ্গেও। কলম্বিয়ার সেরা ক্লাব ‘অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনাল’-এর তিনি ছিলেন মালিক, আবার সংসদে নির্বাচিত হয়েও পরে বহিষ্কৃত হন। পাবলোর গ্যাংয়ের শিকারের তালিকায় ছিলেন, কলম্বিয়ার মন্ত্রী, বিচারপতি, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকী একজন রেফারিও। অন্যান্য চোরাচালানকারী গোষ্ঠীর অসংখ্য সদস্য তো ছিলেনই। এহেন পাবলো কিন্তু ফুটবলে ঢালাও টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। ন্যাশিওনাল ক্লাবের মালিক হয়ে নগদ অর্থে টিকিট বিক্রি ও স্টার প্লেয়ারদের ট্রান্সফার ফি থেকে কোটি-কোটি ডলার রোজগারও করেছিলেন। মেদেলিনের বহু ফুটবল মাঠ তিনি প্রস্তুত করে দেন, যা থেকে উঠে এসেছিলেন কলম্বিয়ার সোনালি প্রজন্মের বহু ফুটবলার। আন্দ্রেইস এসকোবার তার ক্লাব টিমেরই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। সুপারস্টার গোলকিপার রেনে হিগুইতা, মিডফিল্ডার লিওনেল আলভারেজ-সহ অনেকেই পাবলোর টিমে দীর্ঘদিন খেলেছিলেন।
আসলে আটের দশকের শুরু থেকেই, কলম্বিয়ার ফুটবলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল এই মাদক চোরাকারবারী কার্টেলগুলো। ও-দেশে এদের অর্থ ও প্রতিপত্তি ছিল ক্রমবর্ধমান। দেশের প্রতিটা বড় ক্লাবেরই মালিক ছিলেন, কোনও-না-কোনও কার্টেলের চাঁইরা। যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী ‘কালি’ গোষ্ঠী, ‘আমেরিকা দি কালি’ ক্লাবটির চালাত। এই ‘প্রভাবশালীরা’ বিশ্বকাপে ফ্রান্সিসকো মাতুরানার টিমের ওপর মোটা টাকা বাজি ধরেছিল। অন্ধকার জগতের ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার শুরু আছে, কিন্তু তার কোনও শেষ নেই!
এই কার্টেল-বসদের মধ্যে পাবলোর প্রভাব ছিল আকাশছোঁয়া; তাকে যে-কোনও মূল্যে ধরে, নিজেদের দেশের আদালতে বিচার করতে উদগ্রীব ছিল মার্কিন সরকার। সেই মতো কলম্বিয়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল তারা। আর সেই প্রত্যর্পণ আটকাতে, পাবলো কলম্বিয়া সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এই শর্তে যে, তাঁকে তাঁর নিজেরই নির্মিত বিলাসবহুল লা ক্যাতেদ্রাল জেলে ‘বন্দি’ রাখতে হবে, ও নিজের পছন্দসই দেহরক্ষী নিয়োগ করতে দিতে হবে। এটা পাবলোর এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল ছিল। একদিকে মার্কিনদের হাতে প্রত্যার্পণ আটকানো, আবার প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীদের হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।
এই জেলে তিনি বিরাট অর্থের বিনিময়ে দিয়েগো মারাদোনাকে পর্যন্ত ভাড়া করে নিয়ে আসেন ’৯১তে, তার সঙ্গে একটি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেওয়ার জন্য। ম্যাচের পর রাতভর বিশ্বসেরা ফুটবলারের সম্মানে একটি জমকালো পার্টি দিয়েছিলেন পাবলো। মারাদোনা নিজের স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ‘এই পাবলোর নাম আমি সেভাবে শুনিনি। কিন্তু নিমন্ত্রিত হয়ে ওই পার্টিতে গিয়ে যে-রকম সেরা সুন্দরী মহিলাদের উপস্থিতি দেখেছিলাম, জীবনে আর কোনও পার্টিতে একসঙ্গে এত সুন্দরী রমণী দেখিনি!’ আবার অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া কয়েকশো বস্তিবাসীর ঘর পুনর্নির্মাণের জন্য মোটা অর্থ বিনিয়োগ করেন পাবলো। বহু যুবক তার কারবারে বা ক্লাবে নিযুক্ত ছিল। তাই পাবলোর কিছু জনপ্রিয়তাও ছিল; তাই তিনি ভোটে জিতে কলম্বিয়ার সংসদে যেতে পেরেছিলেন।

এহেন পাবলো এস্কোবারকে একসময়ে সাধারণ জেলে স্থানান্তরিত করতে চাইছিল কলম্বিয়া সরকার। কারণ তার ব্যক্তিগত জেলকে সদরদপ্তর বানিয়ে দিব্যি মাদক-কারবার চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই মাফিয়া ‘ডন’। তা আঁচ করতে পেরে পাবলো পালান এবং মেদেলিনের পার্শ্ববর্তী একটি লোকালয়ের এক গোপন ডেরায় গা ঢাকা দেন। সেই ডেরার ছাদেই তাকে ধাওয়া করে গিয়ে গুপ্তহত্যা করে পুলিশ ও পেপে বাহিনী। এই পেপে বাহিনীর কলম্বিয়ার বহু বিচারবহির্ভূত হত্যা ও-উচ্ছেদ অভিযানে বড় ভূমিকা নিয়েছিল সেই সময়ে।
পাবলোর মৃত্যুর পর, তাঁর কারবারের দখল নেওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র হিংসাত্মক সংঘর্ষ শুরু হয়। তার বহু সম্পত্তি ধ্বংসেরও হিড়িক পড়ে যায়। ঘরবাড়ি জ্বলছে, গাড়ি জ্বলছে, লাশ পড়ে রয়েছে, মেদেলিন শহর তখন এক হত্যাপুরী। এক সমীক্ষা অনুযায়ী কলম্বিয়ায় ওই সময়ে প্রতি এক লক্ষ মানুষ পিছু ৩৮০ জন খুন হতেন! জাতীয় দলের ফুটবলার লুইস হেরেরার শিশু পুত্রকে একদিনের জন্য অপহরণ করে আবার মেদেলিনে ফেরত দিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। পেপে বাহিনীতে নিযুক্ত কিছু চোরা কারবারীর দাপট বারে। এইরকমই দুই ভাই ছিলেন পেদ্রো ও সান্তিয়াগো গ্যালোঁ। যাদের দেখা গিয়েছিল সেই ২ জুলাই-এর সেই অভিশপ্ত রাতে, এল ইন্দো বারের পার্কিং স্লটে। পাবলো হত্যার পর এই ভাতৃদ্বয় মনে করতে শুরু করেছিল, মেদেলিনের চোরা কারবার জগতের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ তাদের হাতে চলে আসবে।

মার্কিন ম্যাচের প্রস্তুতির সময়েই কোচ মাতুরানা পেয়েছিলেন একটি হুমকি বার্তা, যাতে বলা ছিল, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার গ্যাব্রিয়েল ‘বারাবাজ’ গোমেজকে যদি তুমি নামাও, তাহলে পুরো টিমের মৃত্যু নিশ্চিত। কলম্বিয়া টিম হোটেলের ঘরে-ঘরে টিভিতে প্রোগ্রাম করে এই হুমকি দেওয়া হতে থাকে। কোচের পরিকল্পনাতে গোমেজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই ম্যাচের আগে টিম মিটিংয়ে এসে কেঁদে ফেলেছিলেন মাতুরানা। দলের সদস্যরা বুঝছিলেন, এ-সবের পেছনে কাজ করছিল কাদের হাত। এই ‘প্রভাবশালী’দের পছন্দের প্লেয়ারদের দিয়ে শুরু করছিলেন না বলে, কলম্বিয়া কোচের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।

আর-একটি দুঃসংবাদ কলম্বিয়া শিবিরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার ‘চোন্টো’ হেরেরার ভাই মেদেলিনে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় রহস্যজনক ভাবে মারা যান, রোমানিয়া ম্যাচের পরদিন! ওই রাতে হেরেরার পাশে সারাক্ষণ ছিলেন বন্ধু এসকোবার। এই খবর কলম্বিয়া শিবিরে পৌঁছনোর পর, ভালদেরামা আর আসপ্রিলা দেলে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন! এই ‘ভয়ে’ মাথায় নিয়ে সে-দিন রোজবোলে ৯৩ হাজার দর্শকের গর্জনের মধ্যে মাঠে নেমেছিলেন ভালদেরামারা। দ্বিতীয়ার্ধের মিনিটের সাতেকের মধ্যেই কাউন্টার-অ্যাটাকে আর-একটি গোল করে বসলেন আর্নি স্টুয়ার্ট; যা কলম্বিয়ার মনোবল ভেঙ্গে শেষ করে দিল। ইঞ্জুরি টাইমে অ্যাডোলফো ভ্যালেন্সিয়া একটি সান্ত্বনা গোল করলেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে কলম্বিয়ার বিদায় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। শেষ ম্যাচে ২৬ জুন ক্যালিফোর্নিয়ায় সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দাপটে খেলে ২-০ হারালেন ভ্যালেন্সিয়া-এসকোবাররা, কিন্তু রোমানিয়া মার্কিনদের হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। সুইজারল্যান্ড হেরেও দ্বিতীয় হল গ্রুপে, আর সমসংখ্যক পয়েন্ট পেয়ে অন্যতম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ছিটকে গেলেন ভালদেরামারা। পেলের ভবিষ্যদ্বাণী মাঠে মারা গেল।
এসকোবার— ‘এল কাবালেরো দেল ফুতবল’
‘জীবন এখানে শেষ হয়ে যায় না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জীবন এখানে শেষ হতে পারে না। যতই কঠিন হোক, আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে উঠে দাঁড়াতেই হবে। আমাদের সামনে দুটো মাত্র উপায় রয়েছে— এই রাগ আর ক্ষোভ আমাদের পঙ্গু করে দিক আর সামাজিক হিংসা চলতে থাকুক, অথবা আমরা এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠে সর্বতোভাবে চেষ্টা করি অন্যদের সাহায্য করতে। কোনটা করব, তা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। চলুন, আমরা শ্রদ্ধা বজায় রেখে চলি। আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাই সবাইকে। এটা একটি অসাধারণ ও বিরল অভিজ্ঞতা হল। খুব তাড়াতাড়ি আমরা আবার মিলিত হব। কারণ জীবন এখানে শেষ হবে না।’— আন্দ্রেইস এস্কোবার
(দেশে ফেরার পর বোগোটার এল তিয়েম্পে সংবাদপত্রে নিজের কলামে)
সাত সকালে ট্যাক্সিতে করে এক মক্কলের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন সরকারি কৌঁসুলি জিসাস আলবেইরো ইয়েপস। ট্যাক্সি-চালক রেডিও শুনছিলেন। সকালের খবর শুরু হল। সংবাদপাঠিকা পড়লেন, ‘গতকাল রাতে এক নৈশ ক্লাবের পার্কিং স্লটে কিছু অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের হাতে মর্মান্তিক ভাবে নিহত হয়েছেন জাতীয় দলের ফুটবলার আন্দ্রেইস এসকোবার।’ চমকে উঠলেন ইয়েপস। শুনলেন, চালক ব্যক্তিটির মুখ থেকে ক্ষোভের সঙ্গে একটি অশ্রাব্য শব্দ বেরিয়ে এল! বিদ্যুতের মতো একটি সম্ভাবনার কথা মাথায় এল ইয়েপসের, যা আগেও কয়েকবার তার মনে হয়েছিল কলম্বিয়া হারার পর। এই মামলার দায় তার ওপরই বর্তাবে তখনও জানতেন না ইয়েপস।
‘ছেলেবেলার বন্ধু জুয়ান জায়রো গ্যালিয়ানো ও আরও একজনের সঙ্গে সেদিন ওই নাইট ক্লাবের একটি টেবিলে বসেন আন্দ্রেইস। উদ্দেশ্য আড্ডা দিয়ে মনের ভার কিছুটা হালকা করা। কিন্তু অদূরেই এক টেবিলের কয়েকজন আন্দ্রেইসকে চিনে ফেলল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওরা তাকে ওই আত্মঘাতী গোল নিয়ে দোষারোপ, গালমন্দ করতে শুরু করে।’ পরে এক সাক্ষাৎকারে জানান ইয়েপস। ‘জায়রো গ্যালিয়ানোর কাছ থেকে আরও জানতে পারি, মৃদু প্রতিবাদ করে চুপ করে যায় আন্দ্রেইস। এরাই ওই গ্যালোঁ ভাই ও তার সাঙ্গপাঙ্গ। অস্বস্তি বোধ করতে থাকে আন্দ্রেইস ও কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিল ছেড়ে বন্ধুদের নিয়ে উঠে চলে যায়। ব্যাপারটা এখানেই মিটে যেত, কিন্তু ওরা ওর পিছু ছাড়ল না।’
পেশাদার ফুটবল যে সাফল্য-সংস্কৃতি তৈরি করেছে, সেখানে জেতা ছাড়া আর সবকিছুই গুরুত্বহীন। কেউ হারলে সে হয়ে পড়ে অস্তিত্বহীন। এই সংস্কৃতি থেকেই আসে পরাজিতের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা ও আক্রোশ। এসকোবার ঘটনার কিছুদিন আগেই ক্যামেরুনের গোলকিপার থমাস বেলের বাড়ি আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়েছিল, ’৯৪ বিশ্বকাপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ছ’গোল খাওয়ার জন্য! ইতিহাসেও এরকম আক্রোশের শিকার হয়েছে বহু দল, বহু ফুটবলার। ’৯২-তে ইথিওপিয়ার কয়েকজন ফুটবলার জাতিসংঘের কাছে আশ্রয় চাইতে বাধ্য হন মিশরের কাছে ১-৬ গোলে হেরে। ’৮২-স্পেন বিশ্বকাপে, চিলের সেজলি একটি পেনাল্টি মিস করেছিলেন; দেশে ফেরার পর তার জীবন দুর্বিসহ করে তোলে কিছু উগ্র সহনাগরিক। ১৯৫৮-তে সুইডেন থেকে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে নামার পরই দেশবাসীরা কয়েন ছুড়ে মারতে থাকেন আর্জেন্টিনা দলের সদস্যদের, বিশ্বকাপে হতাশ করার জন্য। কিন্তু খুন হওয়ার ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব, যা ঘটেছিল মেদেলিনের ওই নৈশ ক্লাবে। ফুটবল কিছু ব্যক্তিকে দেবত্ব আরোপ করে আকাশের তারার উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে তাদের ভক্তদের প্রতিহিংসার রোষের মুখে ফেলে দেয়!
আন্দ্রেইস এসকোবারের মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে গিয়েছিল ফুটবলকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেড়ে ওঠা একটি সুন্দর স্বপ্ন! ছোটবেলা থেকেই ফুটলের প্রতি আকৃষ্ট আন্দ্রেইস, স্কুল-প্রতিযোগিতা গুলোয় চুটিয়ে খেলতে থাকে। তার দাদা সান্তিয়াগো ক্লাব ফুটবল খেলতেন। ‘অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনাল’-এর মতো বড় ক্লাবেও ডাক পান। আন্দ্রেইসও স্কুল পর্যায়ের সাফল্যের জন্য লেখাপড়ার থেকে ফুটবলকে অগ্রাধিকার দিতে থাকেন। এবং একটু তাড়াতাড়িই ন্যাশিওনাল-কর্তাদের নজরে পড়ে যান, আঠেরো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। তখন খেলতেন মাঝমাঠে, মূলত ডিফেন্সিভ হাফ হিসবে। তার উচ্চতা, হেডিং দক্ষতা ও বল কন্ট্রোল পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য স্থানীয় কোচ কার্লস রেস্ত্রেপো তাকে স্টপারে খেলার পরামর্শ দেন। তবে ন্যাশিওনাল জার্সিতে অভিষেক হওয়ার জন্য তাঁকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কোচ ফ্রান্সিসকো মাতুরানার নজরে পড়েন তিনি দু’বছরের মধ্যে। প্রথম দলে নিয়মিত জায়গা পাওয়ার সেই শুরু। এসকোবার কিছুটা ভাগ্যবানও ছিলেন। মাতুরানাই তখন জাতীয় দলের কোচ। নিজের ক্লাব দলের পছন্দের সেন্টার ব্যাককে তিনি জাতীয় দলে ডেকে নেন ’৮৮-র মার্চ মাসেই। বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জনকারী ও কিছু ফ্রেন্ডলি ম্যাচে দেশের হয়ে খেলতে থাকেন আন্দ্রেইস। গ্যারি লিনেকার, জন বার্নস, ব্রায়ান রবসনদের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একটি প্রদর্শনী ম্যাচে কলম্বিয়া পিছিয়ে এক গোলে। অন্তিম লগ্নে গার্সিয়ার কর্নারে মাথা ছুঁইয়ে গোল শোধ করে দেন তিনি। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ভালদেরামা, হিগুইতাদের মতো সুপারস্টারদের সঙ্গে জাতীয় দলের জার্সিতেও নিয়মিত খেলতে থাকেন তিনি। কলম্বিয়ার ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ে তার নাম।


পরের মরসুম আন্দ্রেইস জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। ঘরোয়া লিগ-সহ একাধিক ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হয়ে ন্যাশিওনাল ছাড়পত্র পায় ‘কোপা লিবার্টেডর্স’-এ খেলার। একের-পর-এক বাধা টপকে ফাইনালে মুখোমুখি হয় প্যারাগুয়ের অলিম্পিয়ার। এসকোবার প্রতিটা ম্যাচ খেলে, সাদা-সবুজ জার্সির রক্ষণের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠেন। দু’লেগ ফাইনালে বাইরের ম্যাচে ০-২ হেরে, ঘরের মাঠে ২-০ জিতে টাই করে ন্যাশিওনাল। এরপর এক ম্যারাথন টাইব্রেকারে সাডেনডেথে জয়ী হয় ইতিহাস গড়েন হিগুইতা-এসকোবার-আলভারেজরা। কলম্বিয়ার প্রথম ক্লাব হিসেবে ’৮৯-এ এই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে। এরপর কনকাকাফের চ্যাম্পিয়ন দল মেক্সিকোর উনামকে দু’লেগের খেলা মিলিয়ে, মোট ৬-১-এ উড়িয়ে আন্ত-আমেরিকা কাপেও জয়ী হন এসকোবাররা। সুযোগ পান ’৯১-এর ইন্টার কন্টিনেন্টাল কাপে খেলার। সেই প্রতিযোগিতার ফাইনালে কোরিয়ায় ফ্রাঙ্কো বারেসি, পাওলো মালদিনি, কার্লো আনসেলোত্তি, ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের মতো তারকা সমৃদ্ধ এসি মিলানের কাছে এক গোলে হেরে রানার্স হয় তারা। এরপর সুইজারল্যান্ডের একটি ক্লাব দলে অফার পেয়ে, ইউরোপে খেলতে যান এসকোবার। নিয়ে যান তার দাদাকেও। কিন্তু আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে, এক বছরের মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন। দেশের হয়ে খেলে ফেললেন ’৯১র কোপা আমেরিকাতেও।
’৯৩-তে ক্লাব খেলতে গিয়েই হাঁটুতে মারাত্মক চোট পেলেন আন্দ্রেইস। তাঁকে বাদ দিয়েই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনকারী পর্বে দল নামাতে হত মাতুরানাকে। খেলতে পারলেন না ’৯৩-এর ‘কোপা আমেরিকা’-তেও, যেখানে ভালদেরামারা তৃতীয় স্থান পেয়েছিলেন। ততদিনে ভালদেরামার অনুপস্থিতিতে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়াও হয়ে গিয়েছে। চোট সেরে ম্যাচফিট হয়ে উঠলেন যখন, দরজায় কড়া নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ। যে-বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে গোটা কলম্বিয়া। অনেক সময়ে কোনও ছোট দেশ বা কোনও গরিব জাতির মানচিত্রে জায়গা পাওয়াই নির্ভর করে ফুটবলকে কেন্দ্র করে। ’৯৪-এ কলম্বিয়ার ব্যাপারটা কিছুটা সে-রকমই ছিল। আবার জাতীয় দলের সাফল্য, যা বিশেষজ্ঞদের থেকে বাড়তি গুরুত্ব আদায় করে নিয়েছিল, তা দেশের ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একচেটিয়া মাফিয়াদের অর্থলিপ্সা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা কলম্বিয়া টিমের ওপর বিরাট অর্থ বাজিতে লাগিয়েছিলেন। আবার ফুটবলকে ঘিরে এই অস্তিত্বের বিষয়টা শুধু ছোট বা গরিব দেশেই সীমিত নয়।
সে-বছরই ফাইনালে টাইব্রেকারে তার পেনাল্টি গোলপোস্টের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার পর, ইতালিতে রবার্তো বাজ্জিওর ছবিতে থুতু থেকে জুতো, সবই নিক্ষেপ করলেন একাংশ ইতালীয়। অথচ ইতালিকে ফাইনাল অবধি টেনে নিয়ে যেতে বাজ্জিওর বিরাট ভূমিকা ছিল। নকআউট পর্বের সব ম্যাচেই তিনি গোল পেয়েছিলেন, শুধু ওই গোলশূন্য ফাইনালটি ছাড়া! নাইজেরিয়া-স্পেন-বালগেরিয়া, তিন ম্যাচে বাজ্জিওর ম্যাচ-জেতানো পাঁচটি গোল ছিল। সে-বারই ইংল্যান্ড মূল পর্বে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ার পর, লন্ডনে ‘দ্য ডেইলি মিরর’ শিরনাম করেছিল, ‘দ্য এন্ড অফ দিস ওয়ার্ল্ড’।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচে তার আত্মঘাতী গোল হারের অন্যতম কারণ হওয়ায়, এসকোবার রাতে ঘুমতে পারছিলেন না। পরাজয়ের গ্লানি গ্রাস করেছিল পুরো দলকে। এসকোবারের ক্ষেত্রে এই গ্লানিটা ছিল একটু বেশি। অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়ছিলেন, মিয়ামিতে তার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে কয়েকদিন সময় কাটিয়ে আসতে। একটি কলম্বিয়ান টিভি চ্যানেল তাঁকে তাঁদের সম্প্রচার দলের সঙ্গে থেকে যাওয়ার অফার দিয়েছিল। এসকোবার দুটোই প্রত্যাখ্যান করেন, তিনি দেশে ফিরে মেদেলিনের মানুষকে নিজের মুখ দেখানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। প্রেমিকা পামেলা কাসকার্দোর সঙ্গে তার বাগদাদ পর্ব আগেই হয়ে গিয়েছিল। সে-বছরের শেষের দিকে ছিল বিয়ের পরিকল্পনা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছিলেন আন্দ্রেইস। তাই স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে ওই নৈশ ক্লাবে গিয়েছিলেন ওই রাতে, টিমমেট হেরেরা বা তার জাতীয় দলের কোচ মাতুরানার বারণে কর্ণপাত না করেই। মেদেলিনের রাস্তাঘাট তখনও জ্বলছে। আপাত চুপচাপ, শান্ত, নিরীহ প্রকৃতির হলেও এসকোবার ছিলেন শক্ত ধাতুতে গড়া। ফুটবলকে তিনি ঐক্যের মাধ্যম করতে চাইতেন, ছোটদের মূল্যবোধ ও সহনশীলতা শেখানোর একটি স্কুল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইতেন। পাবলোর মতো কলম্বিয়ার মাদক চোরা-কারবারীরা যে দেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন, তা বাকিদের মতো এসকোবারও হাড়ে-হাড়ে বুঝতেন। তাই মাঠে নিজেকে উজাড় করে দিলেও, ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে হিগুইতার মতো ঘনিষ্ঠ হতে চাননি আন্দ্রেইস। লা ক্যাথেদ্রাল জেলে পাবলোর সঙ্গে তার দেখা করতে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায়, গ্রেফতার হতে হয় হিগুইতাকে। বিতর্কের জেরে কলম্বিয়ার জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েছিলেন হিগুইতা; খেলা হয় নি ’৯৪ বিশ্বকাপে। পাবলো ফুটবারদের নিছক পণ্য হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে পেতে চাইতেন রাজনৈতিক কারণে। তাই তাদের জন্য লা ক্যাথেদ্রাল জেলে নানা পার্টির আয়োজন করতেন। বোন মারিয়া এস্টারকে আন্দ্রেইস একবার বলেন, ‘জানি আমার যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু পেশাদারি কারণে আমি যেতে বাধ্য হই।’
ফ্রাঙ্কো বারেসি তখন অবসর নিচ্ছিলেন। তার বিকল্প হিসেবে পরের মরসুমে এসি মিলানে খেলার অফার ছিল এসকোবারের কাছে। কলম্বিয়ার এক নম্বর ডিফেন্ডার প্রায় মনস্থিরও করে ফেলেছিলেন, ইতালি যাওয়ার ব্যাপারে। গ্যালোঁ ভাইরা তাকে হত্যা করে শেষ করে দিয়েছিল কলম্বিয়া ফুটবলের ভবিষ্যতের একটা বড় সম্ভাবনা। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ওই সোনালি প্রজন্মের অধ্যায়। ‘ওই সময় থেকেই কলম্বিয়া ফুটবলের এক পতনের পর্বের শুরু’, মনে করেন মাতুরানা।
জায়রো ভ্যালেসকুয়েজ ভাসকুয়েজ নামক পাবলোর এক ডান হাত, যিনি তখন তিনশোটি খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটছিলেন, জেল থেকেই এক সাক্ষাৎকারে জানান, এসকোবারকে গুলি করার পর, গ্যালোঁ ভাইরা অতি-দক্ষিণপন্থী আধাসামরিক নেতা কার্লোস কাস্টানিওকে গিয়ে তিন মিলিয়ন ডলার দেন সরকারি কৌঁসুলির অফিসকে কিনে ফেলার মূল্য হিসেবে। গ্যালোঁ ভাইরা তদন্তে বাধা দেওয়ার জন্য, ১৫ মাস জেল খাটার পর বেকসুর খালাস পেয়ে যান। মামলা এমনভাবে সাজানো হয় যে, খুনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন গ্যালোঁদের ড্রাইভার ও দেহরক্ষী উমবের্তো মুনোজ কাস্ত্রো। কাস্ত্রোর ৪৩ বছর জেল হলেও, জেলে ভাল ব্যবহারের জন্য দশ বছর পর তিনিও ছাড়া পেয়ে যান। ওই সাক্ষাৎকারে ভাসকুয়েজ আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছিলেন। তার মতে গ্যালোঁরা বাজিতে টাকা লোকসানের জন্য এসকোবারের ওপর গুলি চালায়নি, পাবলোর মৃত্যুর পর তারা নিজেদের একছত্র অধিপতি ভাবতে শুরু করেছিল। কেউ তাদের মুখের ওপর পাল্টা জবাব দিচ্ছে, এটা তারা আর সহ্য করতে পারছিল না! সেই রোষ থেকেই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্যে তার ওপর গুলি চালানো হয়! যদিও ভাসকুয়েজের এইসব বক্তব্যের সমর্থনে কোনও প্রমাণ নেই। তাই আজও এটা স্বচ্ছ নয় যে, সেই রাতে এসকোবারের ওপর ঠিক কে গুলি চালিয়েছিল। কলম্বিয়া-সংবাদমাধ্যম ও ফুটবল মহলের একটা বড় অংশ মনে করেন পাবলো জীবিত থাকলে, এভাবে তার টিমের ডিফেন্ডারের ওপর গুলি চালানোর সাহস হত না কারুর। এই কয়েকমাস আগে, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে কলম্বিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপতি গুস্তাভো পেত্রো জানান, মেক্সিকোর একটি হোটেলে এসকোবার হত্যায় মূল অভিযুক্তদের একজন—সান্তিয়াগো গ্যালোঁ গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হয়েছেন।
বলো ফুটবারদের নিছক পণ্য হিসেবে নয়, বন্ধু হিসেবে পেতে চাইতেন রাজনৈতিক কারণে। তাই তাদের জন্য লা ক্যাথেদ্রাল জেলে নানা পার্টির আয়োজন করতেন। বোন মারিয়া এস্টারকে আন্দ্রেইস একবার বলেন, ‘জানি আমার যাওয়া উচিত নয়, কিন্তু পেশাদারি কারণে আমি যেতে বাধ্য হই।’
এইসব দেখেশুনে আন্দ্রেইসের পিতা দারিও এসকোবার বলেছিলেন, ‘কলম্বিয়াতে বিচার বলে কিছু নেই মানুষের জন্য!’
ক্ষমতার এই যন্ত্রই বহু মানুষের হিংসার বলি হওয়ার কারণ। লাতিন আমেরিকায় এই অবিচার আর অপমান মানুষের আত্মাকে বিষিয়ে দেয়, নীতিহীনতাকে পরম্পরাগত ভাবে প্রশ্রয় দেয়, দোষীদের পুরষ্কৃত ও অপরাধকে উৎসাহিত করে, তাকে পরিণত করে এক চিরস্থায়ী জাতীয় বৈশিষ্ট্যে। তাই কলম্বিয়ার মতো দেশ হিংসা নামক এক ব্যাধিতে ভুগতেই থাকে। ফুটবল হিংস্র খেলা নয়, কিন্তু কখনও-কখনও তা হিংসার বাহক হয়ে ওঠে। পায়ে ফুটবল নিয়ে, জাতীয় দলের জার্সি বুকে দিয়ে যখন ফুটবলাররা মাঠে নামেন, তখন তাঁরা সংস্লিষ্ট দেশের যোদ্ধা হয় যান। আরও অনেক ক্ষেত্রের মতোই হারের এখানে কোনও জায়গা নেই, যিনি বা যাঁরা হারেন, তারা অনেক সময়ে লোকচক্ষে ‘পাপী’ হয়ে যান।
’৯৪ বিশ্বকাপের আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্ট অনুসারে, কলম্বিয়াতে ’৯৩ সালে পুলিশ ও পেপের মতো কিছু সরকার মদতপুষ্ট আধাসামরিক বাহিনীর হাতে কয়েকশো মানুষকে বিচারবহির্ভূত ভাবে হত্যা ও উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে আছেন বহু মাদকাসক্ত, যৌনকর্মী, সমকামী পুরুষ, মানসিক ভারসাম্যহীন, ভিক্ষুক, অনাথ শিশু ইত্যাদি, যারা সামাজিক ভাবে অনেক সময়ে ‘মানব জঞ্জাল’ হিসেবে চিহ্নিত হন। সামাজিক লেন্সে এরা চিরকাল ‘পরাজিত’, তাই সমাজ এদের কোনও স্থান দিতে চায় না। অর্থাৎ, দেশে সরকারি মদতে হিংসার একটা বাতাবরণ তৈরি হয়েই ছিল। সেই হিংসারই বলি হলেন আন্দ্রেইস এসকোবার।

‘কাকভোরে ফোনে যখন ওর মৃত্যুসংবাদ শুনি, তখন আমার জন্য জীবন থেমে গিয়েছিল। শেষকৃত্যের সময়ে আমার শরীরটা ছিল, কিন্তু আত্মা ছিল না। মনে হয়েছিল আমার ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।’ আন্দ্রেইসের মৃত্যুর পর তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, তার বাগদত্তা পামেলা ক্যাসকার্দো।
‘অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনাল’-এর সবুজ-সাদা পতাকায় মুড়ে এক লক্ষ মানুষ এসকোবারের কফিন নিয়ে শেষ যাত্রার সামিল হয়েছিলেন। ‘এল কাবালেরো দেল ফুতবল’ ব্যানার নিয়ে। যার অর্থ ফুটবলের এক সজ্জন ব্যক্তি। এখন মেদেলিন শহরের মাঝখানে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়েছে প্রয়াত ফুটবলারের স্ট্যাচুও। আজও আন্দ্রেইস এসকোবারকে স্মরণ করা হয় ‘জেন্টলম্যান অফ ফুটবল’ এর প্রতীক হিসেবে, যার মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ শোকস্তব্ধ করে দিয়েছিল সমগ্র ফুটবল বিশ্বকে।




