বন্ধু-বাগান
আশুতোষ কলেজ, জিওগ্রাফি, ফার্স্ট ইয়ার। স্কুল ছেড়ে এসেছি ক’দিন আগে, মনমেজাজ খুব খারাপ তাই। এমনিতেই নতুনদের সঙ্গে মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পারি না, তায় সেই ছোটবেলা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত, স্কুলের মায়ায় জড়িয়ে থাকা আমি, বেশ একলা বোধ করছিলাম।
স্কুলে নার্সারি থেকে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে পড়েছি, পাশাপাশি বড় হয়েছি। এখানে সে-সুযোগ নেই। ভূগোলে মেয়েদের জন্য ক্লাসের দরজা তখনও খোলা নয়। কেন, কে জানে। তার ওপর দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রিন্সিপাল, তার ভয়ে সারা কলেজ সিঁটিয়ে থাকে। এইসব নিয়ে চলতে-চলতে দু’চারজনের সঙ্গে একটু-আধটু বন্ধুত্ব হতে থাকল। আমাদের বিভাগেই ছিল সৌরভ আর সোমনাথ, সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের দুই ছাত্র, তাদের সঙ্গে জমে গেল। মাঝেমধ্যেই সৌরভের ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে সন্ধে কাটাই, একসঙ্গে কলেজের কাজ করি। সোমনাথের বাড়ি ছিল কলেজ থেকে চার-পা দূরে, হাজরাতেই। পুরনো শরিকি বাড়ি, সেখানেই আড়াইতলার ওপর একটা ছোট্ট ঘরে, সোমনাথের একার ডেরা। সেখানেও আমাদের আড্ডা বসত, তবে সেই আড্ডাদল ছিল আলাদা। সে-কথাতেই আসছি এবার।
ইংরেজি বিভাগে কিছু বন্ধুবান্ধব হল। সোনালি, শৌভিক, কৌশিক। বাংলা বিভাগের মিলি, যার ভাল নাম সুস্মিতা। এদেরই মধ্যে কৌশিক কিছুটা কাছের হয়ে উঠল। ইংরেজি সাহিত্য পড়ে বটে, তবে বাংলায় কবিতা লেখে দিব্যি। আঁকার হাত চমৎকার, শিল্পী হবার স্বপ্ন দ্যাখে। সেই সঙ্গে, আমার মতো, তার নেশা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত। বহু পুরনো খানদানি বন্দিশ তার কণ্ঠস্থ, আমাদের একতলা বাড়ির লাল মেঝেয়, হারমোনিয়াম কোলে টেনে নিয়ে সেসব শুনিয়েও যায় মাঝেমধ্যে। মা-বাবা ওকে খুব স্নেহ করেন। তাই ওর সঙ্গে জমে উঠতে সময় লাগল না। এরই সঙ্গে জুড়ে গেল সোমনাথ। সেও অদ্ভুত প্রতিভাবান ছেলে। পড়ে ভূগোল, কিন্তু ইংরেজিতে গল্প লেখে তরতরিয়ে। তার নেশা অ্যানথ্রোপলজি। সে-সব নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ সে ইতোমধ্যেই লিখে ফেলেছে, নানান পত্রপত্রিকায় পাঠাচ্ছে সেসব। দেখতে-দেখতে সোমনাথ-কৌশিক-আমি মিলে একটা দল গড়ে উঠল দিব্যি।
তা সে-দলের কাজ কী? মূল কাজ আড্ডা দেওয়া। তবে আড্ডা মানে পরনিন্দা পরচর্চা নয় মোটেই, আমাদের বন্ধুবৃত্তে ও-জিনিস খুব জনপ্রিয় ছিল না কখনওই। আমি তখন তাড়া-তাড়া কবিতা লিখছি ডায়েরি ভর্তি করে, সেসব ছাপা হচ্ছে না কোথাও। পত্রপত্রিকা থেকে ফেরত আসছে লাগাতার। কিন্তু ব্যর্থতারও শ্রোতা প্রয়োজন হয়। সোমনাথ আর কৌশিক আমার নিবিড় শ্রোতা হয়ে উঠল অচিরেই। বিকেল-সন্ধে ঘেঁষে আমাদের আড্ডা বসত সোমনাথের ছোট্ট ঘরে। একটা চৌপায়া একপাশে, তারই পাশে তোবড়ানো একখানা টেবল ফ্যান। মশারি অবিন্যস্ত ফেলা থাকত সারাদিনই। একদিকে কাগজপত্র আর বইখাতা ডাঁই করা একখানা টেবল, আর অন্যদিকে একটা ছোট জানলা, যেখান থেকে সোমনাথদের শরিকি উঠোন দেখা যেত। ওই চারচৌকো ঘরই আমাদের রংমহল হয়ে উঠল। মজলিসের জন্যে যে বৈভব লাগে না, লাগে ভালবাসা, সেটা ভাগ্যিস আমরা ওই বয়সেই বুঝতে পেরেছিলাম!
কৌশিকের একটা ডাকনাম ততদিনে আমরা দিতে পেরেছি। ককৌকু। অর্থাৎ, কবি কৌশিক কুণ্ডু। নামটা গোপনও থাকেনি। কলেজের নানা মহল থেকে ওকে, ককৌকু বলেই ডাকা হচ্ছে তখন। সোমনাথের ঘরে যখন সূর্যের ক্লান্ত রশ্মি মিইয়ে আসছে, আমার ডায়েরি বন্ধ হবার পর, খুলে যাচ্ছে কৌশিকের খাতা। তার লেখা নতুন কবিতা এবার আমাদের আসর মাতাবে। এক-একটা করে লেখা শোনা, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করা, এই ছিল আমাদের আড্ডার শর্ত। শেষে লম্বা সাদা খাতা খুলত সোমনাথ। মুক্তোর মতো রোমান হরফে লেখা ইংরেজি প্রবন্ধ, তার প্রিয় বিষয় নিয়ে। কিন্তু আমার বা কৌশিকের সে-সব বুঝতে খুব অসুবিধেও হতো না, এমনই প্রাঞ্জল ভাবে লেখা।
এসবের সঙ্গে একটু পানীয় না-হলে কি চলে? কিন্তু হপ্তায় তিন-চার দিন পানীয় কেনার পয়সা তখন কোথায়? উদ্ধারকর্ত্রী, বান্ধবীরা। কারও কাছ থেকে দশ, কারও থেকে কুড়ি টাকা ধার করে, দু’খানা ঠান্ডা বিয়ারের বোতল কিনে নিয়ে আমরা ঢুকতাম সোমনাথের ঘরে। দুইকে তিন দিয়ে ভাগ করে যে-নেশা তখন হত, আজ একা-একাও তার ধারেকাছে পৌঁছনো যায় না। নেশাটা আসলে সময়ের। বন্ধুত্বের। স্বপ্নের। পানীয় ছিল বাহানামাত্র। এ-সময়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতেন আরও দু’জন। গুলাম আলি আর জগজিৎ সিং। সোমনাথের একটা বাঁকাচোরা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল, তার মধ্য থেকেই গেয়ে উঠতেন ওই দু’জন, আমরা তখনও ‘উল্লাস’ বলতে শিখিনি।
দুইকে তিন দিয়ে ভাগ করে যে-নেশা তখন হত, আজ একা-একাও তার ধারেকাছে পৌঁছনো যায় না। নেশাটা আসলে সময়ের। বন্ধুত্বের। স্বপ্নের। পানীয় ছিল বাহানামাত্র। এ-সময়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতেন আরও দু’জন। গুলাম আলি আর জগজিৎ সিং। সোমনাথের একটা বাঁকাচোরা ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল, তার মধ্য থেকেই গেয়ে উঠতেন ওই দু’জন, আমরা তখনও ‘উল্লাস’ বলতে শিখিনি।
সোমনাথের সঙ্গে বহু বছর আর যোগাযোগ নেই। দেখা নেই, কথা নেই, কিচ্ছু নেই। কোনও খবরও নেই। তবে কীভাবে কে জানে, আমি আর কৌশিক টিকে গেছি। সে এখন অনেক দূরে থাকে। ইংরেজি নিয়ে পাশ করে, আর্টই ছিল তার পড়াশোনার ক্ষেত্র। আজ বেশ কিছু বছর হল, সে রাজস্থানে। আজমের-এর ঐতিহ্যশালী মেয়ো কলেজে শিল্পকলা বিভাগের অধ্যক্ষ। জীবন আমাদের কারওরই খুব সহজ হয়নি। তবু, দিনের শেষে যে, আঁকা আর লেখার কাছে ফিরে আসতে পারছি, আজও আমরা, তার চেয়ে বেশি আর কী-ই বা চাইতে পারি? আজও ফোনের এপার থেকে ওপার, নতুন লেখার আদানপ্রদান চলে আমাদের মধ্যে। মাঝরাত পার করে দরবারি-র কোনও পুরনো বন্দিশ গেয়ে রেকর্ড করে পাঠায় কৌশিক। আমাদের ককৌকু। হারমোনিয়ামের রিড-এর সঙ্গে আজমের-এর গভীর রাতের ঝিঁঝিরা তখন পাল্লা দিচ্ছে, আমাই জেগে থাকছি ট্র্যাফিক-মুখরিত কলকাতায়।
আমার তো যাওয়া হয় না রাজস্থান। কৌশিকই বাড়িতে আসে বছরে দু’দফা। একবার বর্ষায়, একবার শীতে। আমরা বসে যাই কোনও-না-কোনও পানশালায়, কখনও বাড়িতেও। এখন আর বান্ধবীদের কাছ থেকে ধার করতে হয় না, এই যা। কখনও হেমিংওয়ে, কখনও মার্ক রথকো, কখনও রামকিংকর, আবার কখনও শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়ে আমাদের আসর গড়ায়। খাতা নয় আর, কৌশিকের ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসে ট্যাব। তাতে হাতের লেখায় নতুন কবিতা। পানশালার কলতানের মধ্যেই পড়ি সে-সব। আমার নতুন লেখাও শোনাই। আর ফিরে যেতে চাই, ১৯৯৫-৯৬ সালের সেইসব বিকেল-সন্ধেয়, পারি না। ভাবি, বান্ধবীদের কাছ থেকে যদি পুরনো দিনগুলো ধার চাওয়া যেত…



