যুদ্ধের শিকার

দ্বন্দ্ব-জীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের পাশাপাশি চলেছে আর-একরকম লড়াই। রণক্লান্ত মাটি সাক্ষী থাকে আরও নৃশংস হিংসার। ইতিহাস লিখে রাখে সংখ্যার হিসেব। ড্রোন হানা কিংবা বিস্ফোরণে মৃত্যুর খতিয়ান। তারই পাশাপাশি নিশ্চুপে হয়ে চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন। সম্মানজনকভাবে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ধুলোয় মিশিয়ে দেয় উর্দিধারী সেনা। কিন্তু সেই ভয়াল যৌন নির্যাতনের নারকীয় অভিজ্ঞতা বাইরের দুনিয়ার কাছে প্রকাশ হতে দেওয়া চলবে না। ক্ষমতাধর রাষ্ট্র সব প্রমাণ লোপাট করে, কোনওমতেই স্বীকার করতে চায় না ঘৃণ্য অপরাধ। রাষ্ট্রপুঞ্জ সে-রাষ্ট্রকে কালো তালিকাভুক্ত করলেও তাদের খুব একটা কিছু আসে যায় না।

রাষ্ট্রপুঞ্জের এই বছরের রিপোর্ট থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম ভূখণ্ডে যার শিকার হতে হয়েছে চোদ্দজন পুরুষ, সাতজন নারী, ন’জন বালক এবং এক বালিকাকে। এর মধ্যে গত বছর ঘটেছে ১৩টি ঘটনা। আর বাকি ১৮টি ঘটেছে ২০২৩-’২৪ সালে। যৌন হিংসার ধরন সম্পর্কেও তথ্য প্রকাশ করেছে রিপোর্টটি, যা জানলে শিউরে উঠতে হয়। 

বারংবার ধর্ষণ। বাইরে থেকে কোনও শক্ত জিনিস বলপূর্বক প্রবেশ করিয়ে… কখনও আবার গণধর্ষণ। কখনও যৌনাঙ্গে নির্মম নির্যাতন। নিরাপত্তা যাচাইয়ের দোহাই দিয়ে জোর করে পোশাক খুলে দিয়ে অত্যাচার এবং ধর্ষণের হুমকি। সবই চলেছে একের পর এক। ইজরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী এবং সশস্ত্র রক্ষীদের হাতে গাজার ন’জন প্যালেস্তিনীয় নাগরিককে বারবার সহ্য করতে হয়েছে ধর্ষণের নারকীয় যন্ত্রণা। নির্যাতিতদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের সময় এ-ধরনের অত্যাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। কখনও সেনাছাউনি, কখনও বন্দিদের শিবির, আবার কখনও চেকপয়েন্ট— সব জায়গাতেই সংঘটিত হয়েছে যৌন অপরাধ। নির্যাতনের হাত থেকে বাদ পড়েননি সাংবাদিক এবং মানবাধিকার রক্ষাকর্মীরাও। এই সব অত্যাচারের মুহূর্ত রেকর্ড করে বা ছবি তুলে ক্যামেরাবন্দি করার অভিযোগও রয়েছে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। যৌন অত্যাচারের বর্বরতা সীমা ছাড়িয়েছে, নির্যাতিত কয়েকজন শারীরিকভাবে মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। 

যৌনগন্ধী রসিকতার কোনও প্রতিবাদ হবে না?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৫…

গত বছর সারা দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোয় দশহাজারের কাছাকাছি এমন যৌন অপরাধ হয়েছে বলে দাবি রাষ্ট্রপুঞ্জের। সম্প্রতি সাধারণ নাগরিকের ওপর ইজরায়েলি সেনার যৌন হিংসার অভিযোগ ওঠায় সে-দেশকে কালো তালিকায় ঠাঁই দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। ‘যুদ্ধদীর্ণ ভূখণ্ডে যৌন হিংসা’-সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনের অংশে এই তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছে মে মাসের শেষ দিকে। একই অভিযোগ উঠেছে রুশ প্রশাসনের বিরুদ্ধেও। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে ধারাবাহিকভাবে অকথ্য যৌন হিংসার শিকার হতে হচ্ছে যুদ্ধ-ধ্বস্ত ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিককে। ইউক্রেনে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার রক্ষায় নিয়োজিত পর্যবেক্ষক দল রুশ সেনার দ্বারা নির্যাতনের ৩১০টি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে বলে জানিয়েছে। এক্ষেত্রেও ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌনাঙ্গে বিকৃতি ঘটানো, ইলেকট্রিক শক এবং যৌনাঙ্গে আঘাত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে রুশ সেনার বিরুদ্ধে। নৃশংস অত্যাচারের শিকারে আহত হয়েছেন ২৮০ জন পুরুষ, ২৬ জন মহিলা এবং চার শিশুকন্যা।

রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর-পরই বিষয়টিতে নিজেদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে ইজরায়েল। সে-দেশের বিদেশ মন্ত্রক তড়িঘড়ি বক্তব্য দিয়ে জানিয়েছে, এ-ধরনের রিপোর্টের সঙ্গে তারা সহমত নয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবে তারা। রাষ্ট্রপুঞ্জে ইজরায়েলি দূত ড্যানি ড্যানন ক্ষুব্ধ হয়ে এক্স হ্যান্ডেলে মন্তব্য করেন, ‘এই সেক্রেটারি জেনারেলেক আর নেওয়া যাচ্ছে না! এই মহাসচিব আর তাঁর দল ইজরায়েল সম্পর্কে কেবল মিথ্যে অভিযোগ ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। হামাস জঙ্গি আর আমাদের একই তালিকায় রাখা হচ্ছে। এটা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়।’

যদিও গত বছর অগস্টেই রাষ্ট্রপুঞ্জ এক রিপোর্টে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছিল, বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টার এবং কারাগারে বন্দি প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের ওপর ইজরায়েলি সেনা যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের পর্যবেক্ষকদের ওই সব বন্দির সঙ্গে কোনওভাবে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও ড্যাননের দাবি, ‘ওইসব হাস্যকর অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য আমরা রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধিদের ইজরায়েলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। ওরাই তো আসেননি।’ 

রাষ্ট্রপুঞ্জের আধিকারিক প্রমীলা প্যাটেন পাল্টা জানান, আমন্ত্রণ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু কোনও মতৈক্য তৈরি না হওয়ায় তাঁরা সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। বস্তুত বারংবার লিখিত আবেদন এবং বিভিন্ন বৈঠকে অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও ইজরায়েলের তরফে কিছু বিষয় নিয়ে কোনও সদর্থক বার্তা আসেনি বলে প্রমীলার দাবি। বন্দি শিবির সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সেই সংক্রান্ত বিষয়ে ইজরায়েলের মুখে সবসময়ই কুলুপ।

রাষ্ট্রপুঞ্জে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অর্থ কী? ইজরায়েল বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে কি? অর্থাৎ, তাদের ওপর কোনও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। জানা যাচ্ছে, তেমন কিছু না হলেও যৌন হিংসার অভিযোগে কালো তালিকায় নাম তুললে আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে ইজরায়েল কিংবা রাশিয়ার কিঞ্চিত মাথা হেঁট হয় বইকি। আর এই তালিকায় বারবার নাম ওঠার অর্থ— রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিকামী দলের যে-কোনওরকম সক্রিয় কর্মপদ্ধতি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া।

প্রমীলা প্যাটেন বলছেন, যে-ধরনের যৌন হিংসার রিপোর্ট নিয়মিতভাবে উঠে আসছে, তা হৃদয়বিদারক তো বটেই, একইসঙ্গে তা বেশ ভয়ংকর প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। সেটাই উদ্বেগজনক। আর যতটুকু তথ্য সামনে আসছে, তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। তাঁর মতে, ‘আমরা এমন একটা সময়ের সাক্ষী যখন রেকর্ড-সংখ্যক হিংসার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আর হিংসায় মদতদাতারা শাস্তির অভাবে দিনে-দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অপরাধ ঘটিয়ে ফেলা যেন আর কোনও ব্যাপারই নয়।’

তাঁর কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়, নৃশংস অত্যাচারের খতিয়ান প্রকাশ্যে আনছেন যাঁরা, উল্টে তাঁরাই অভিযুক্ত রাষ্ট্রের কোপের মুখে পড়ছেন। ইজরায়েলি সেনার যৌন অত্যাচার ও বর্বরতার বয়ান উঠে এসেছিল আটক প্যালেস্তিনীয় বন্দিদের মুখে। গত মাসের মাঝামাঝি সে-খবর প্রকাশ করে মার্কিন দৈনিক ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’। সেই খবর বেরনোর তিনদিনের মধ্যে দৈনিকটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয় ইজরায়েলি প্রশাসন। প্রতিবেদক নিকোলাস ক্রিস্টফ নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট ১৪ জন প্যালেস্তিনীয় নির্যাতিতের বয়ান প্রকাশ্যে এনেছিলেন। ইজরায়েলের ধারাবাহিক হিংসার বিরুদ্ধে ওই প্রতিবেদনকে প্রামাণ্য নথি হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। কাগজও প্রতিবেদকের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের বক্তব্য, সমস্ত তথ‍্য যাচাই করে তবেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

শুধু এই ঘটনায় নয়, এর আগেও মার্কিন ওই দৈনিকের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত বছর ইজরায়েলের পরিকল্পিত গণহত্যার সময়েই গাজায় না খেতে পেয়ে মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ্যে এনেছিল দৈনিকটি। তাতেই জ্বলে ওঠেন নেতানিয়াহু, এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন— ‘আমার নেতৃত্বে ইজরায়েল চুপ করে বসে থাকবে না।’ 

দাবি-পাল্টা দাবির মধ্যে যুদ্ধদীর্ণ দেশের বাস্তব বদলায় না। মাথার ওপর থেকে ছাদ কবেই সরে গিয়েছে। দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাওয়ার ন্যূনতম অধিকারটুকুও বেঁচে নেই, মানুষ হিসেবে সম্মানটাও রাষ্ট্রীয় সেনার হাতে নিলাম হচ্ছে রোজ।