গণেশ পাইনের (১৯৩৭-২০১৩) কিছু বিরল ছবির প্রদর্শনী হয়ে গেল, ‘সোসাইটি অব কন্টেম্পোরারি আর্টিস্টস’-এর উদ্যোগে, কসবায়। তাঁদের বি. আর. পানেসর গ্যালারিতে। কিছু ব্যক্তিগত সংগ্রহের এই ছবি নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি খুব সুচারুভাবে কিউরেট করেছেন জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য।
এই প্রদর্শনীর গুরুত্ব এখানে যে— শিল্পীর একান্ত অবসরে করা অনুশীলনমূলক ছোট-ছোট ড্রয়িং, স্কেচ, ডায়েরিতে লেখার সঙ্গে রেখায়, কখনও-বা রঙে কোনও একটা রূপ সৃষ্টির প্রয়াস, কাউকে চিঠি লিখতে গিয়ে সঙ্গে প্রীতি উৎসারিত কিছু রূপ, এর ভিতর দিয়ে শিল্পীর একান্ত আত্মগত চেতনার কিছু প্রতিফলন ধরা পড়ে। শিল্পীর সৃজনশীল, নিভৃতমনটির অন্তর্লীন আলোর প্রতিফলনটুকু যেন ছুঁয়ে যায় দর্শককে। বড় ছবিতে তো শিল্পী নির্মাণ করেন নিজস্ব তত্ত্ববিশ্ব। দীর্ঘ চিন্তা ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে, ইমারতের মতো স্তরে-স্তরে তৈরি হয় তা। এর প্রস্তুতি হিসেবে ছোট-ছোট স্কেচ বা ড্রয়িং করতে হয় একজন শিল্পীকে। সেই সব ছোট স্কেচের মধ্যেও থাকে, তাঁর নিভৃত মনের নানা বিচ্ছুরণ। সারা জীবনে গণেশ পাইন অজস্র অলংকরণ-গ্রন্থচিত্রণ করেছেন। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’-এর জন্য যেমন এঁকেছেন, কোনও প্রতিষ্ঠিত লেখকের গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের জন্য যেমন এঁকেছেন, তেমনি তাঁর পরিচিত অনেক তরুণকবির কবিতার জন্যও ছবি এঁকেছেন। এইসব ছবি তো সব সময়ে দেখার সুযোগ হয় না, কিন্তু এর মধ্যেই ধরা পড়ে শিল্পীর মনের নানা আলোছায়া। আলোচ্য প্রদর্শনী, দর্শককে সুযোগ করে দেয় সৃজনের সেই বিরল পরিসরটি অনুধাবনের।
গণেশ পাইন খুব বহুপ্রজ শিল্পী ছিলান না। তিনি ছবি আঁকতেন খুব ধীরে, দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। একটি টেম্পারা শেষ করতে, অনেক সময়ে তাঁর কয়েক মাস লেগে যেত। ছবি আঁকার জন্য, তাঁর মধ্যে নিরন্তর একটা যন্ত্রণা চলত। নানা ডায়েরিতে বা চিঠিতে বারবার তিনি সেটা উল্লেখ করেছেন। সে-মনোবেদনার প্রকাশও ঘটত তাঁর ওইসব ছোট ছবিতে।
একবার আমি তাঁর কাছে, বছর ধরে-ধরে ছবির তালিকা ও সংগ্রাহকের নাম জানতে চেয়েছিলাম। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ সালের তালিকা তিনি দিয়েছিলেন। আমার ‘গণেশ পাইনের ছবি’ বইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণে সে-তালিকা দেওয়া রয়েছে। তাতে দেখা যায়, টেম্পারা, জলরং, ড্রয়িং এসব মিলিয়ে— এই বারো বছরে তিনি ৩৫৭-টি ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৯৯-তে ছবির সংখ্যা মাত্র চারটি। ১৯৯৮-তে ১৯, ১৯৯৭-তে ১৬, এই রকম। এ-সব ছবিই কেউ-না-কেউ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে কোনও-কোনও ছবি হয়তো হাত বদল হয়েছে। একটা সময়ে ছবি আঁকার জন্য তাঁর ভিতর ভীষণ যন্ত্রণা ছিল। ছবি বিক্রি না হওয়ার জন্যও কষ্ট ছিল। উপার্জনের অভাব বা দারিদ্র্য তাঁকে খুব পীড়িত করত। তাঁর নানা ডায়েরিতে এর উল্লেখ আছে। ১৯৬৪-র ১২ মার্চ তাঁর ডায়েরিতে এরকম উল্লেখ পাচ্ছি। লিখছেন— ‘ছিঁড়ে যাচ্ছি। ড্রয়িং। আকার। স্বাভাবিক প্রত্যয়। এই সবের ঠোকাঠুকিতে বিশ্রী লাগছে ক’দিন। তবু যদি একখানাও মনের মতো ছবি বেরোত।’ পরের অনুচ্ছেদে লিখছেন— ‘নষ্ট করছি। নষ্ট করছি।’ এর পরেই এই সময়ে ও আধুনিকতা সম্পর্কে, তাঁর অমোঘ উক্তি— ‘আধুনিক সময়টা যেন একটা কুৎসিত আর স্বার্থপর জন্তু। নবীনদের উদরস্থ না করে, তার লালসা কিছুতেই মেটে না। তার ভুল তার ভয় তার অযোগ্যতা সব জেনেশুনেই তার ক্ষুধার গ্রাস হতে হয়। এই যন্ত্রণায় ইদানিং ভুগলাম”। (সূত্রঃ ‘গণেশ পাইনের ডায়েরি, ১৯৬৪-১৯৭৪’। কথকতা প্রকাশন, ২০২২। পৃ-৪৮)।

১৯৮০-র পর থেকে, তাঁর ছবি কিছু-কিছু বিক্রি হতে শুরু করে। তখন অনেক সংগ্রাহক, যাঁরা তাঁর ছবির গুরুত্ব বুঝতেন, তাঁরা খুব কম দামে তাঁর ছবি কিনতেন। অর্থের প্রয়োজনে তিনিও দিতে বাধ্য হতেন। একজন সংগ্রাহক তাঁর সঙ্গে শর্ত করেছিলেন, সারা বছরে তিনি যা ছবি আঁকবেন, প্রতিটি এক হাজার টাকা করে তিনি কিনে নেবেন। আজকের পরিস্থিতিতে এরকম ভাবা যায়? এরকম চলেছিল কিছুদিন। ২০০০ সালের পর তাঁর ছবির একটা চাহিদা তৈরি হয়। সরবরাহ কম ছিল বলে, দামও বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালে তাঁর প্রয়াণের পর এই চাহিদা তুঙ্গ স্পর্শ করে। যেহেতু তাঁর ছবির সংখ্যা সীমিত, তাই মূল্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সুযোগে কিছু অসাধু ছবির কারবারী, তাঁর ছবি নকল করে বাজারে ছাড়তে থাকে। সে-রকম নকল ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনীও হল কিছুদিন আগে। আজকের অনেক তরুণ/তরুণী দর্শক বিভ্রান্ত হতে পারেন, নকলকেই আসল বলে ধরে নিয়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর প্রকৃত ছবি মানুষের সামনে উপস্থাপিত করা, একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ‘সোসাইটি’ আয়োজিত আলোচ্য প্রদর্শনীটি সে-দিক থেকেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা তথা সমগ্র ভারতে, গণেশ পাইন একজন অবিস্মরণীয় শিল্পী। ছয়ের দশক পরবর্তী চিত্রকলায়, তাঁর প্রধান অবদান এই যে— ছবিতে তিনি ঐতিহ্য অন্বিত একদেশীয় আত্মপরিচয় সন্ধান করেছিলেন। এই সন্ধান শুরু হয়েছিল, বিংশ শতকের গোড়া থেকে প্রথমে অবনীন্দ্রনাথের একক প্রচেষ্টায়, তারপর নব্য-ভারতীয় ঘরানার শিল্পীদের সমবেত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিংশ শতকের প্রথম তিনটি দশক পর্যন্ত— আমাদের চিত্রকলায় দু’টি রূপরীতির প্রাধান্য ছিল। একটি ব্রিটিশ ঘরানার স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিক। দ্বিতীয়টি নব্যভারতীয় ধারার স্বদেশী চেতনাভিত্তিক রূপরীতি, যেখানে অনেক সময়েই অতীতের ধ্রুপদি চেতনা প্রাধান্য পেত বলে, একে রিভাইভালিস্ট বা পুনরুজ্জীবনবাদী বলে চিহ্ণিত করা হত। এই নব্য-ভারতীয় ঘরানার ঐশ্বর্যের দিকটি আমরা বুঝতে পারি অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার প্রমুখ শিল্পীর পরিণত পর্বের শ্রেষ্ঠ কাজগুলি দেখে। তবু অনেক কম প্রতিভাযুক্ত শিল্পীর কাজে, কিছু সীমাবদ্ধতা তো ছিলই। সে-জন্য অনেক সমালোচনাও হত, আজও হয় এই আঙ্গিকের গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে। এই অতৃপ্তিবোধ থেকেই গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর বা যামিনী রায়ের মতো শিল্পী, এই দুই রূপরীতির সঙ্গে সম্যক পরিচিত থেকেও, নতুন পথের সন্ধান করেছেন এবং উজ্জীবনের নতুন আলো সন্ধান করেছেন। ১৯১৯-এ রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে তাঁর বিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে, ‘কলা ভবন’ খুললেন। নন্দলাল বসুর উপর এর শিক্ষকতার দায়িত্ব অর্পিত হল। নব্য-ভারতীয় ঘরানার বিকল্প এক পথের সন্ধান চলল, যেখানে সমগ্র বিশ্বের ঐতিহ্য আত্তীকরণের সুযোগ তৈরি হল। এরই শ্রেষ্ঠ ফসল বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ— প্রমুখ শিল্পী। ১৯২০-র দশকের শেষ পর্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ নিজে ছবি আঁকা শুরু করলেন। আধুনিকতাবাদের সূচনা হল তাঁর ছবির মধ্য দিয়ে।
১৯৪০-এর দশকের আগে পর্যন্ত, বাংলা তথা ভারতের চিত্রকলার এই যে অর্জন বা বিবর্তন, তা প্রবলভাবে নাড়া খেল। চারের শকের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশের ভিতরে ঔপনিবেশিকতা বিরোধী আন্দোলন, ব্রিটিশ সরকারের প্রবল শোষণ, এসবের সম্মিলিত ফলশ্রুতিতে দেখা দিল— ১৯৪৩-এর ভয়াবহ মন্বন্তর। এর পর একে-একে এল ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার নামে দেশভাগ, উদ্বাস্তুর মিছিল, খাদ্যসংকট ইত্যাদি ভয়াবহ পরিস্থিতি। এসবের সমবেত প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪০-এর দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের ছবির প্রত্যয় ও আঙ্গিকে বিপুল পরিবর্তন এল। পূর্ববর্তী প্রবাহিত পরম্পরার যে-প্রচলিত আঙ্গিক পদ্ধতি, চারের দশকের শিল্পীরা তার অনেকটাই পরিহার করলেন। দেশীয় লৌকিক ও পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদের উৎস থেকে গ্রহণ করে তাঁরা নতুন রূপরীতি তৈরির চেষ্টা করলেন। প্রতিবাদী চেতনাই হয়ে উঠল তাঁদের অধিকাংশের প্রকাশের ভিত্তি। তথাপি তাঁদের আঙ্গিকে এক ধরনের ‘হাইব্রিডিটি’ও দেখা দিল।
পাঁচ ও ছয়ের দশকে উত্তর-ঔপনিবাশিক পরিস্থিতিতে, শিল্পীদের সামনে স্বদেশ চেতনার এক নতুন আহ্বান এল। শিল্পীরা দু’ভাবে এর মোকাবিলা করলেন। পূর্ববর্তী আঙ্গিক-প্রকল্পগুলিকে নব মূল্যায়নে গ্রহণ করলেন তাঁদের অনেকেই। নব্য-ভারতীয় ঘরানা ও স্বাভাবিকতাবাদী রূপরীতি— এই দুইয়েরই সদর্থক দিককে তাঁরা আত্মস্থ করলেন। গণেশ পাইনের ছবিতে যেমন অবনীন্দ্রনাথ ও ভারতীয় রীতির অনেক প্রধান শিল্পীর রূপচেতনা আত্মস্থ হল, বিকাশ ভট্টাচার্য তেমনি স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিককে নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ ও রূপান্তরিত করলেন। অন্যান্য শিল্পীদের কাজেও এই দুই প্রবণতার প্রাধান্য দেখা গেল। এই ভিত্তির উপর তাঁরা নির্মাণ করলেন— তাঁদের সৃজনবিশ্ব।

গণেশ পাইনের ছবিতে এই ঐতিহ্য আত্তীকরণ বিশেষ এক মাত্রা পেল। কৈশোর থেকেই তিনি অবনীন্দ্রনাথে মুগ্ধ ছিলেন। আর্ট কলেজে যদিও ‘ফাইন আর্টস’ বা ‘পাশ্চাত্য রীতি’তেই তিনি শিক্ষা নিয়েছেন, কিন্তু ভারতীয় রীতির প্রতি তাঁর যথেষ্টই ঝোঁক ছিল। একবার পরীক্ষায়, ‘কম্পোজিশন পেইন্টিং’-এ যুদ্ধ বিষয়ে ছবি আঁকতে বলা হয়। তিনি এঁকেছিলেন রামায়ণের ‘লঙ্কা দহন’ অবলম্বনে।
আর্ট কলেজে একবার রেমব্রান্টের উপর একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছিল। তা দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, রেম্ব্রান্টের ছবির আলোছায়ার রহস্যের প্রতি। অন্ধকারের এই রহস্যময়তার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল শৈশব থেকেই। এই অন্তর্মুখীনতা তাঁর অন্তর্গত চেতনার মধ্যেই ছিল। কলকাতার কবিরাজ রো-তে, তাঁর পুরনো পৈত্রিক বাড়ির স্থাপত্যের মধ্যে ছিল— সেই অন্ধকারের পরিমণ্ডল, যা তাঁর অন্তর-প্রবণতার জন্যই তাঁকে আকৃষ্ট করত ছেলেবেলা থেকেই। এই অন্ধকারের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল তাঁর অতীত ও পৌরাণিক ভাবনার জগৎ। ছেলেবেলায় ঠাকুরমার মুখে রূপকথার গল্প শোনা, পুরাণকল্পের সেই অতীতকে জাগিয়ে তুলত তাঁর মধ্যে। এই অতীতের অন্ধকারের সঙ্গে মিলেছিল— তাঁর দেখা মৃত্যুর প্রত্যক্ষ অভিঘাত। মাত্র ন’বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে, এই জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে আলোড়িত করেছিল।

স্বাধীনতার আগে ও পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, হত্যা ও মৃত্যুর বীভৎসতা নিজের চোখে দেখেছেন। পাঁচের দশকে, দেশের যে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি, দারিদ্র্য, এ-সমস্ত কিছু তাঁর শৈশব-কৈশোরকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। এই সামগ্রিক সামাজিক ও আত্মিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার পশ্চাৎপটে। এ-সমস্ত অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে সৃজনের যে-বিশ্ব তিনি গড়ে তুলেছেন, তাতে রয়েছে এই অন্তর্মুখীনতা ও মৃত্যুচেতনা। তাঁর অনেক ছবিতেই কঙ্কাল, করোটি, মৃতের অস্থিপঞ্জর আসে মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে। কিন্তু এই শূন্যতাতেই শেষ হয়ে যায় না তাঁর ছবি। অন্তত ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত— তাঁর অধিকাংশ ছবিতেই থাকত কোনও উজ্জীবনের প্রতীক। কোনও দীপশিখা বা অন্য কোনও প্রাণের প্রতীক। যেমন ১৯৭১-এ্র ‘ফিশারম্যান’ বা ১৯৭২-এর ‘হারবার’, যা তাঁর অন্যতম দু’টি শ্রেষ্ঠ ছবি, সেখানে দেখতে পাওয়া যায় এই উজ্জীবনের প্রতীক। কিন্তু বিংশ শতকে পৌঁছে, এই উজ্জীবনের অভীপ্সা ক্রমেই ম্লান হতে থাকে। একেবারে শেষ পর্যায়ের ‘মহাভারত’ চিত্রমালার সর্বব্যাপী বিনাশের কোনো বিকল্পের সন্ধান তিনি দিতে পারেননি।
গণেশ পাইনের ছবিতে এই ঐতিহ্য আত্তীকরণ বিশেষ এক মাত্রা পেল। কৈশোর থেকেই তিনি অবনীন্দ্রনাথে মুগ্ধ ছিলেন। আর্ট কলেজে যদিও ‘ফাইন আর্টস’ বা ‘পাশ্চাত্য রীতি’তেই তিনি শিক্ষা নিয়েছেন, কিন্তু ভারতীয় রীতির প্রতি তাঁর যথেষ্টই ঝোঁক ছিল। একবার পরীক্ষায়, ‘কম্পোজিশন পেইন্টিং’-এ যুদ্ধ বিষয়ে ছবি আঁকতে বলা হয়। তিনি এঁকেছিলেন রামায়ণের ‘লঙ্কা দহন’ অবলম্বনে।
এই অন্তর্মুখীনতা, এই আলো অন্ধকারের দ্বৈত, ঐতিহ্যে স্থিত থেকেও, আধুনিকতার গহন নৈরাজ্যের বিশ্লেষণ, এগুলোই গণেশ পাইনকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা তথা ভারতের চিত্রকলায় শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছে। তাঁর যে কোনও রেখার মধ্যে, রেখাধৃত ছায়াতপের মধ্যে তাঁর অন্তর্চেতনার এই রহস্যময়তা বিধৃত থাকে। এ-জন্যই তাঁর যে-কোনও ড্রয়িং, অলংকরণ, অবসরের আঁকিবুকি, এ-সবের মধ্যে তাঁর শিল্পীচেতনার মূল বৈশিষ্ট্য অনুভব করা যায়। আলোচ্য প্রদর্শনীটি এ-জন্যই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এবারে এই প্রদর্শনীর কিছু ছবি নিয়ে বিস্তারে আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই বলি একটি ছবির কথা, এই প্রদর্শনীর ৩ নম্বর ছবি, যার শিরোনাম ‘মাঙ্কি’। মাধ্যম হিসেবে বলা হয়েছে, ‘টেম্পারা অন বোর্ড’ পেপার। ছবিটিতে শিল্পীর স্বাক্ষর রয়েছে, ১৯৫৮ সালের। ’৫৮ সালে তিনি টেম্পারা মধ্যম শুরু করেননি। টেম্পারা তিনি শুরু করেছিলেন ১৯৬৭ সালে। ’৬৮ থেকে তিনি পরিপূর্ণ মাত্রায় টেম্পারায় এঁকেছেন। ছবিটি দেখলেও বোঝা যায়, এটি জলরঙের কাজ। পরিকল্পনায় এই একটি ভুল রয়ে গেছে। প্রদর্শনীর প্রথম ছবি, তাঁর স্ত্রী মীরা পাইনের একটি প্রোফাইল মুখাবয়ব। কাগজের উপর মিশ্র মাধ্যমে আঁকা। ছবিটিতে যে-প্রশান্তি ও অন্তর্মুখীনতা, তাতে শিল্পীরই আত্মমগ্নতার পরিচয় পাওয়া যায়। দ্বিতীয় ছবি একটি দ্রুত করা জলরঙের স্কেচ। গঙ্গা বা কোনও নদীর ঘাটে ছাতা মাথায় বসে আছে একজন। দূরে একটি স্টিমার যাচ্ছে। শিরোনামহীন চতুর্থ ছবিটিতে, কোনও তারিখ নেই। কিন্তু দেখে বোঝা যায়, এটি ১৯৬২-৬৩-র কাজ। এই সময়ে শিল্পী অজস্র ছোট-ছোট ছবি করেছেন, যার ভিতর দিয়ে তাঁর সেই সময়ের বিষাদ ও হতাশা মূর্ত রূপ পাচ্ছিল। এই পর্যায়ের ছবির মধ্য দিয়েই— শিল্পী তাঁর নিজস্ব রূপচেতনায় পৌঁছেছেন সাতের দশকে। পঞ্চম ছবিটিতে আমরা দেখি, সুন্দর বর্ণিল একটি মুরগির রূপায়ণ। নব্য-ভারতীয় ঘরানার স্পষ্ট আদল রয়েছে এখানে।

১০ নম্বর ছবি, জলের মধ্যে একটি মাছ। উপর থেকে একটি বঁড়শি নেমে এসেছে জলের মধ্যে। মাছটি সে-দিকে অগ্রসর হচ্ছে ক্রমশ। জীবন ও মৃত্যুর এই এক দ্বৈত, এখানে খুব সুললিতভাবে উপস্থাপিত। ১১ নম্বর ‘দি নাইট’ ছবিটি কালি কলম ও ক্রেয়নের একটি সাদা-কালো ড্রয়িং। একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন। অন্ধকার ও নির্জনতাকে রূপবদ্ধ করেছেন সরু রেখার সুস্মিত হ্যাচিং-এর মধ্য দিয়ে। এ একেবারে গণেশ পাইনের নিজস্ব জগৎ। প্রদর্শনীতে প্রায় ৪১-টি ছবি ছিল। ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ নিয়ে করা ছোট-ছোট ড্রয়িংগুলি সূক্ষ্ম কারুকাজে অসামান্য। প্রতিটি ছবি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা সম্ভব নয়। ছোট ছবির সম্ভারের এই উপস্থাপনাটি শিল্পীর সৃজনের অন্তর্লীন জগৎকে বোঝার পক্ষে খুবই সহায়ক।




