ময়দানের যুদ্ধ
কেলেঙ্কারির বিশ্বকাপ! পেলেকে সরানোর নীল-নকশা আগে থেকেই তৈরি ছিল
দৃশ্য এক: লিভারপুলের গুডিসন পার্কে, ৪৭ হাজার দর্শক ছুটে এসেছেন, ‘যোগো-বোনিটোর’ টানে। পোর্তুগিজ শব্দ ‘যোগো বোনিটো’ মানে, দৃষ্টিনন্দন ফুটবল। উপর্যুপরি দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, কাপ জয়ের হ্যাট্রিকের লক্ষ্যে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেছে বুলগেরিয়ার সঙ্গে। ম্যাচের কিছুক্ষণের মধ্যেই হলুদ-সবুজ জার্সির সোনালি আভায় ছেয়ে গিয়েছে গোটা মাঠ।
কিন্তু দেখা গেল, ছিপছিপে চেহারার এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক, বক্সের আশেপাশে বল ধরে টার্ন করলেই, তার পা লক্ষ্য করে, বিপজ্জনক ট্যাকল করছেন দু-তিনজন বুলগেরিয়ান ডিফেন্ডার। বক্সের ঠিক বাইরে আবার, যুবকটিকে ফাউল করলেন স্পার্টাক সোফিয়ার ডিফেন্ডার দাব্রোমির জেচেভ। গ্যাবলারিতে তুমুল উত্তেজনা দর্শকদের মধ্যে; তারই মধ্যে বল বসিয়ে ফ্রিকিক নিলেন ওই বছর ছাব্বিশের কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। তবে তাঁর ট্রেডমার্ক ব্যানানা ফ্রি-কিক নয়, নীচু শট। বুলগেরিয়ার ওয়ালের ফাঁক দিয়ে, গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জড়িয়ে গেল জালে। গ্যালারিতে, বিশেষ করে ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। এই কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের ‘শৈল্পিক টাচ’ দেখতেই মাঠে এসেছেন অনেকে। কারণ ততদিনে তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সুইডেন ও চিলি বিশ্বকাপে, ব্রাজিল তাদের শৈল্পিক ঘরানার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে— চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর। এই নান্দনিক ফুটবলের ‘স্টাইলই’, ‘যোগো-বোনিটো’ নামে পরিচিত! তাই ইংল্যান্ডের মাটিতেও ব্রাজিল দল ও তার কোহিনুর নাসিমেন্টো পেলেকে নিয়ে, প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। প্রথম ম্যাচেই পেলের গোল, সেই প্রত্যাশাকেই আরও বাড়িয়ে তুলল। আর সেই শ্রেষ্ঠত্ব আর প্রত্যাশাই বহু আগে থেকে পেলেকে, ‘টার্গেট’ বানিয়ে দিয়েছিল মাঠের মধ্যে। তাই, ব্রাজিল টিম স্বমহিমা প্রদর্শন করে চললেও, সমস্যা হল অন্য জায়গায়। বুলগেরিয়ান ডিফেন্ডাররা বারবার তাকে ফাউল করতে লাগলেন।
১৯৬৬-র ১২ জুলাই, ফুটবলে তখনও প্রচলন হয়নি হলুদ কার্ড, লাল কার্ড, খেলোয়াড় পরিবর্তন প্রথার। দ্বিতীয়ার্ধে পেলের সতীর্থ গ্যারিঞ্চা, ফ্রিকিক থেকেই আবার একটি গোল করলেন। কিন্তু প্রথমার্ধেই, পেলেকে সাত-সাতবার ফাউল করা হল। দ্বিতীয়ার্ধের অনেকটা সময়ই তিনি কাটালেন মাঠের বাইরে। পশ্চিম জার্মানির রেফারি, স্রেফ ফাউলের বাঁশি বাজিয়ে ছেড়ে দিলেন, বুলগেরিয়ার কোনও প্লেয়ারকে মার্চিং অর্ডার দিলেন না! ফোলা হাঁটু, খালি গায়ে কম্বল জড়ানো অবস্থায়, আহত মুখ নিয়ে পেলেকে দেখা গেল মাঠের ধারে। ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতলেও, পেলের এই চোট ব্রাজিল-শিবিরে ছিল বড় ধাক্কা। হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে, গ্রুপলিগের পরের ম্যাচ থেকে ছিটকে গেলেন ব্ল্যাক পার্ল।
বিশ্বকাপকে নিজের ক্ষমতার মঞ্চ বানিয়েছিলেন মুসোলিনি!
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৩…
ফেরেঙ্ক পুসকাস-ককসিসদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে, হাঙ্গেরি সে-বার বেশ শক্তিশালী দল। ফ্লোরিয়েন অ্যালবার্ট, ফেরেঙ্ক বেনেরা— পেলেহীন ব্রাজিলকে পেয়ে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক হলেন। শুরুতেই, বেনে, গোল করে হাঙ্গেরিকে এগিয়ে দিলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই গোল শোধ করে দিলেন ব্রাজিল তারকা টোস্টাও। কিন্তু এরপরই ব্রাজিলের দু’টি গোল বাতিল করলেন, ইংরেজ রেফারি কেনেথ ড্যাগনাল। প্রথমার্ধের খেলা ১-১ শেষ হল। গোল বাতিলে অশনিসংকেত দেখলেন কেউ-কেউ। শুরু হল দ্বিতীয়ার্ধের খেলা। মিনিট কুড়ির মধ্যে হেড করে, হাঙ্গেরিকে এগিয়ে দিলেন জানোস ফার্কাস। এর কিছুক্ষণ পরেই পেনাল্টি পেলেন বেনেরা। গোল করে ৩-১ করে দিলেন কামান মেৎজোলি।
১৯৫৪-র কোয়ার্টার ফাইনালের, ফেরেঙ্ক পুসকাসদের কাছে হারার পর— বিশ্বকাপে প্রথমবার মুখ থুবড়ে পড়ল সোনালি ডানার চিল। ‘অবজার্ভার’ পত্রিকা লিখল, ‘ব্রাজিলের আক্রমণে সেই জিনিয়াসটাই অনুপস্থিত ছিল।’ গ্রুপের শেষ ম্যাচের আগে, পেলেরা পড়ে গেলেন প্রবল চাপের মুখে।
দৃশ্য দুই: পেলে তখনও পুরো ফিট নন। প্রতিপক্ষ পোর্তুগাল প্রতিযোগিতার সাড়া জাগানো দল। পেলের মতোই আরেক কৃষ্ণকায় যুবক, পোর্তুগালের ইউসেবিও তখন বিশ্বকাপের এক বিস্ময় প্রতিভা। এই পরিস্থিতিতে, ‘ম্যাচফিট’ না হয়েও, খেলতে রাজি হয়ে গেলেন পেলে।
পেলে-ইউসেবিও টক্কর দেখতে, ১৯ জুলাই গুডিসন পার্কের গ্যালারি ভরিয়ে দিলেন ৫৫ হাজার দর্শক। ওয়েম্বলি ছাড়া এই বিশ্বকাপে আর কোনও মাঠ এত দর্শক সমাগম দেখেনি।
ইউসেবিও-হোসে তোরেস, মারিও কোলুনা সমৃদ্ধ পোর্তুগালের এই সোনার প্রজন্ম অভিযান শুরু করেছে— প্রথম দু’টি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে দাপটে উড়িয়ে দিয়ে। শেষ আটে যাওয়া নিশ্চিত করতে গেলে, তাঁদের বিরুদ্ধে অন্তত তিন গোলে জিততে হবে গ্যারিঞ্চাদের। আর জিততে না পারলে, গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হবে দু’বারের চ্যাম্পিয়নদের, যদি না শেষ ম্যাচে বুলগেরিয়ার কাছে হারে হাঙ্গেরি!
ম্যাচের প্রথম পর্ব থেকেই দেখা গেল, ইউসেবিওরা যতই প্রতিভার স্ফুরণ দেখান না কেন, তাঁদের ডিফেন্সেরও ‘টার্গেট’ সেই পেলে! পেলে প্রথম বল ধরতেই, সেন্টার সার্কেলে এসে তাকে ফাউল করলেন জোয়ান মোরাইস। ইঙ্গিত পরিষ্কার! আন্তোনিও সিমোসের গোলে, এগিয়ে গেল পোর্তুগাল। আক্রমণে পেলে, ওয়াল খেলে বক্সের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করছেন, স্পোর্টিং লিসবনের মোরাইস, তাঁর হাঁটু লক্ষ্য করে বিশ্রীভাবে পা চালালেন। মাটিতে পড়ে একবার ঘাড় উঠিয়ে মোরাইসকে কিছু বলার চেষ্টা করলেন পেলে, পরক্ষণেই শুয়ে পড়ে ছটফট করতে শুরু করলেন; ছুটে এলেন দলের ম্যানেজার ও ডাক্তার। দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে মাঠ ছাড়ছেন পেলে, যন্ত্রণা কাতর চোখমুখ, এ-ছবি সারা বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ রেফারি জিওর্জ ম্যাককাবে ফাউলের বাঁশি বাজিয়ে, মোরাইসকে সামান্য সতর্ক করে ছেড়ে দেন। আগেই বলা হয়েছে, সে-যুগে ফুটবলার পরিবর্তনের নিয়ম চালু হয়নি। হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বেঁধে, আহত পেলে তাই মাঠে নামলেন খোঁড়াতে-খোঁড়াতে।

ইতোমধ্যে ইউসেবিওর গোলে, ব্রাজিল ০-২ পিছিয়ে পড়েছে ২৬ মিনিটে। পেলে একটু নীচ থেকে অপারেট করতে শুরু করলেন। দৌড়তে পারছেন না, বল ধরে ওয়ান-টাচে পাস করে দিচ্ছেন সতীর্থদের। ওই অবস্থাতেও অধিকাংশ পাস নিখুঁত ও সামনের দিকে; দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েও ম্যাচটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন ফুটবলের জাদুকর। পনেরো মিনিট বাকি থাকতে ব্রাজিলের রিল্ডো একটি গোল শোধ করে দিলেন। এতেই আবার সন্ত্রস্ত হয়ে গেল পোর্তুগিজ শিবির। আবার মোরাইস, আবার সেই আহত হাঁটু, আবার একটি চার্জ বক্সের মধ্যেই! আর কোনও সুযোগ দিতে চাইল না পোর্তুগাল। ম্যারকাবে ফাউল দিলেন না। পেলে আর ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারলেন না! ৮৫ মিনিটে, কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিলেন ইউসেবিও। প্রথমবার পেলের উপস্থিতিতে, বিশ্বকাপে কোনও ম্যাচে হারল ব্রাজিল। এর আগে, চিলিতে চেকোস্লোভাকিয়া ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করেছিল ব্রাজিল। ওই ম্যাচেও হ্যামস্ট্রিংয়ে বড় চোট পান পেলে। ওই বিশ্বকাপে, আর কোনও ম্যাচ খেলা হয়নি তাঁর। পেলের অনুপস্থিতিতে, টিমকে চ্যাাম্পিয়ন করতে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন ’৫৮-র আরও এক নায়ক, গ্যারিঞ্চা।
ইংরেজ রেফারির লম্বা বাঁশি বাজার সঙ্গইয়-সঙ্গেই, ইংল্যান্ড-বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল সেলেশাও। স্পোর্টসম্যানশিপ দেখিয়ে, ইউসেবিওদের সঙ্গে করমর্দন করে, চোখেমুখে আঘাতের যন্ত্রণা আর পরাজয়ের তীব্র গ্লানি নিয়ে, গ্যারিঞ্চা-টোস্টাওদের সঙ্গে মাঠ ছাড়তে দেখা গেল পেলেকে। তাদের তিনটি ম্যাচের প্রথমটিতে রেফারি ছিলেন পশ্চিম-জার্মান, ও বাকি দুটিতে ইংরেজ।
আহত ফুটবলারের চোটের জায়গাকে নিশানা করে, বারবার আঘাত! প্রথম বুলগেরিয়া ম্যাচের পরই,পূর্ব ইউরোপের দলটির কোচ বলেছিলেন, “অন্য দলগুলোও একইভাবে ওকে ‘খাতির’ করবে!” সেই মানসিকতা নিয়েই জেচেভ-মোরাইসরা যা করে গিয়েছিলেন, তা ফুটবলের স্বাভাবিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কোনও ফাউল নয়। সেই প্রতিটা ‘পদক্ষেপ’-এ ছিল, গোপন হিংসা থেকে উদ্ভুত এক অন্ধকারময় কপট অভিসন্ধি। শৈল্পিক সৌন্দর্য আর দক্ষতাকে শেষ করে, ষড়যন্ত্র আর পাশবিকতার জয়কে নিশ্চিত করা! এর পেছনে শুধু দুটো বিপক্ষ দলের কয়েকজন ফুটবলার ও কোচ নয়, রয়েছে ফুটবল আইনের রক্ষকরা, রয়েছে নিয়ামক সংস্থা ‘ফিফা’, রয়েছে শক্তিশালী আয়োজক দেশ-সহ ক্ষমতার প্রতিটি স্তম্ভ! ব্রাজিলই একমাত্র সেই বহিরাগত দল, যারা ইউরোপের মাটি থেকে বিশ্বকাপ জিতে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৫৮তে। তাই ব্রাজিলকে এত ভয়!
এটা কি ফুটবল? আঘাতে-আঘাতে বিপর্যস্ত পেলে, দেশে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন, এই বিশ্বকাপে, ফুটবল আর শিল্প ছিল না, দক্ষতার জোরে দর্শক টানা বন্ধ করে খেলাকে ‘ওরা’ যুদ্ধে পরিণত করেছে। হতাশা থেকে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আর কোনওদিন বিশ্বকাপে খেলব না।’

এরকম কিছু যে ঘটতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত বিশ্বকাপের চার মাস আগেই পেয়েছিল ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন। আয়োজক ইংল্যান্ডের তরফ থেকে তাদের জানানো হয় যে, প্রতিটা ম্যাচে, ব্রাজিলের মাত্র দু’জন করে চিত্র-সাংবাদিকের মাঠে থাকার অনুমতি মিলবে। ইংরেজদের জন্যে যদিও এই ছাড়ের সংখ্যা ১৪! এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ব্রাজিল ফেডারেশন পাল্টা অনুরোধ জানায়, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখার জন্য। কিন্তু সংগঠকদের তরফ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, টিকিটে ছাপানো নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ গ্যালারিতে পেশাদারি ছবি তোলা নিষিদ্ধ। যদি কাউকে সন্দেহজনকভাবে ছবি নিতে দেখা যায়, তাহলে পত্রপাঠ তাকে বের করে দেবেন নিরাপত্তারক্ষীরা। এছাড়া, আরও একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় ব্রাজিলে। ব্রাজিলে অবস্থিত ব্রিটিশ দূত, তার বিদেশ দফ্তরকে জানান, এতদিন অবধি ব্রাজিল এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সব দেশের পতাকা সরবরাহ করে এসেছে। এইবার সংগঠকরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে পতাকা সরবরাহ করতে বলায়, ব্রাজিলীয়রা ক্ষুব্ধ হয়েছে। কিন্তু সংগঠকরা এক্ষেত্রেও অনড় থাকেন, তাঁদের মত ছিল— অনভিপ্রেত ভুল এড়াতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে এর ফলে উল্টোটি দেখা গেল, বার্মিংহামে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও হাঙ্গেরির ভুল পতাকা ওড়ায়, সব পতাকা নামিয়ে নিতে হয়েছিল!
এরও আগে, বিশ্বকাপ ঘিরে প্রথম দ্বিপাক্ষিক চাপান-উতোর শুরু হয়, যখন বিবিসি-র একটি ক্রু-ভ্যানকে ব্রাজিলে দেখা যায়— তাদের বিশ্বকাপ-প্রস্তুতি নিয়ে শুটিং করতে। ব্রাজিলীয়দের চোখে তা হয়ে যায় গুপ্তচরবৃত্তি, ও ক্রু-ভ্যানটি আক্রান্ত হয়। প্রতিযোগিতার কয়েকদিন আগে, বাধ্যতামূলক ড্রাগ (ডোপ) পরীক্ষার প্রবর্তন করা নিয়েও সামান্য বিতর্ক দেখা দেয়। এই পরীক্ষা-ব্য্বস্থা এক সাহেব ডাক্তারের মস্তিষ্ক প্রসূত হওয়ায়, ব্রাজিলীয় প্রতিনিধিরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁদের প্রতিনিধি দলের এক সদস্য, সাফ জানিয়ে দেন যে, ব্রাজিলীয়দের প্রিয় কফিকে যদি উদ্দীপক পদার্থ হিসেবে ধরা হয়, তাহলে ইংরেজদের প্রিয় চা-কেও একইভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে! কারণ চা, তাদের মতে কফির থেকেও বেশি উদ্দীপক। তবে এর থেকেও বড় সমস্যা হয় অনুশীলনের মাঠ নিয়ে। ব্রাজিলের জন্য বোল্টনের যে-মাঠ বরাদ্দ করা হয়, তাতে কোনও গোলপোস্টই ছিল না! একই সমস্যােয় পড়ে আর্জেন্টিনাও।
‘ফিফা’র তদানীন্তন ইংরেজ সভাপতি স্যর স্ট্যাননলি রাউসের হাতযশে, বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল ইংল্যান্ড; প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিম জার্মানিকে টপকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে বশ করতে পারেনি। প্রতিযোগিতা শুরুর তিনদিনের মধ্যেই, ব্রাজিল-সহ বহু বিদেশি সংবাদমাধ্যম আয়োজনের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে প্রতিবেদন করতে শুরু করে। সে-যুগে আজকের মতো হাজার-হাজার বিদেশি দর্শক বিশ্বকাপ দেখতে দূরদেশে পাড়ি দিত না, প্রতিযোগিতার মূল পর্ব ছিল ১৬ দেশীয়। কিন্তু বিদেশি সাংবাদিকদের অভিযোগ, আয়োজকরা মোটা টাকার বিনিময়ে, অতি নিম্নমানের পরিষেবার ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া সাংবাদিকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে, যা মিডিয়া সেন্টার থেকে বহু দূরে অবস্থিত। ট্রেন চলছিল দেরিতে, টেলিগ্রাম করতে দীর্ঘ সময় লাগছিল, ম্যাচ শুরু হচ্ছিল দেরিতে, হোটেলগুলোয় আগাম বুকিং সত্ত্বেও, পছন্দসই ঘর ও যথাযথ পরিষেবা মিলছিল না। এ-নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের এক আলোচনা সভায়, মেক্সিকোর এক প্রতিবেদক প্রস্তাব দেন যে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে, সরাসরি ইংল্যান্ডের রানির কাছে চিঠি দিয়ে হস্তক্ষেপ দাবি করা হোক। লন্ডনে বহু মেক্সিকান দর্শক চরম হেনস্থার মুখে পড়েছিলেন, আগাম বুকিং করেও অতি নিম্নমানের হোটেল পরিষেবা পেয়ে। মেক্সিকো দূতাবাসের কর্তা রুবেন গনজালভেজ সোসা, এই বিষয় লিখে, আয়োজকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু এর ফলস্বরূপ একটি হোটেলে আস্তানা নেওয়া ৮৮ জন মেক্সিকান আবাসিককে স্থানীয় পুলিশ মিথ্যে ডাকাতির মামলায় গ্রেফতার করে। এই প্রবল বিতর্কের আবহে, ওয়েম্বলিতে বল গড়াতে শুরু করে ’৬৬-র বিশ্বকাপে!
দৃশ্য তিন: শুধু ব্রাজিলকে ছিটকে দেওয়র মধ্যে্ই এই চিত্রনাট্য সীমাবদ্ধ ছিল না। শেফিল্ডের হিল্সবোরোর সাজঘরের বাইরে, উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে সই শিকারী কিশোর-কিশোরীর দল। কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে, পশ্চিম জার্মানি-উরুগুয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল। জয়ী জার্মান দলের সদস্যরা ফিরে না তাকালেও, উরুগয়ের দু’জন ফুটবলার কিশোর-কিশোরীদের আবদার মেটালেন। সইয়ের সঙ্গে স্প্যানিশে লিখে দিলেন একটি বার্তা। কৌতূহল মেটাতে, স্প্যানিশ জানা লোক জোগাড় করে সেই বার্তার মানে বুঝল ওরা। ‘ইংরেজ রেফারি আমাদের থেকে ম্যাচটি চুরি করেছেন।’ দুটি বার্তারই সারমর্ম এক। ম্যাচটি পশ্চিম জার্মানি চার গোলে জেতে, উরুগুয়েকে প্রায় পুরো দ্বিতীয়ার্ধটা খেলতে হয়েছিল মাত্র ন’জনে। একই সময়ে ওয়েম্বলিতে আল্ফ রামসের প্রশিক্ষণাধীন ইংল্যান্ড, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর আর্জেন্টিনাকে হারায় এক গোলে, পশ্চিম জার্মানির এক রেফারির ‘বদান্যতায়’। আর্জেন্টিনাকে ৫৫ মিনিট খেলতে হয়েছিল দশজনে, তাদের ক্যাপ্টেনকে জার্মান রেফারি মার্চিং অর্ডার দেওয়ায়।
উরুগুয়ে-পশ্চিম জার্মানি ম্যাচের একটি প্রেক্ষাপট ছিল। ওয়েম্বলিতে প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী ম্যাচে, উরুগুয়ে ববি মুরের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে, যা রানি ও স্থানীয় দর্শকদের সামনে ব্রিটিশ ফুটবলকে অস্বস্তির কারণ করে তুলেছিল। সেই থেকে উরুগুয়ের ওপর খাপ্পা ছিলেন ইংল্যান্ডের ফুটবল-কর্তারা। ‘শিক্ষা’ দেওয়া হল কোয়ার্টার ফাইনালে; ক্যাপ্টেন হোরাসিও ট্রোশেকে ফাউলের অপরাধে, ৪৯ মিনিটে বের করে দিলেন সাহেব রেফারি। বেরনোর আগে জার্মানির উয়ে সিলারকে এক চড় কষিয়ে দেন তিনি। এর পাঁচ মিনিটের মধ্যেলই, আরেক ফুটবলার হেক্টর সিলভাকেও মার্চিং অর্ডার দেন তিনি। সিলভা বেরতে না চাওয়ায়, মাঠে পুলিশ ঢুকে তাকে বের করে নিয়ে যায়। ঠিক একইভাবে ওয়েম্বলিতে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও র্যাটিনকে বের করে নিয়ে যেতে হয়। জার্মান রেফারির একপেশে ম্যাচ পরিচালনার প্রতিবাদে, শুরু থেকেই মুখর ছিলেন র্যাটিন। এইজন্যেই পশ্চিম জার্মানির রেফারি রুডল্ফ ক্রেটলিন, তাঁকে মার্চিং অর্ডার দেন। তখন কার্ডের ব্যাপার না থাকায়, ভাষা সমস্যার জন্য হয়তো বুঝতে পারেননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক, হয়তো-বা বুঝেও না বোঝার ভান করছিলেন! পরে নিরাপত্তা কর্মীরা এসে তাকে বের করে নিয়ে যান।

উরুগুয়ের বিরুদ্ধে, ম্যাচে নজর কাড়লেন তরুণ জার্মান মিডফিল্ডার ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। ম্যাচে একটি গোল করেন তিনি, সেমিফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও তাঁর একটি গোল রয়েছে। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে, ন’জন হয়ে যাওয়ায়, উরুগুয়ের প্রতিরোধ ভেঙে যায়, তারা আরও দু’টি গোল হজম করে, যার একটি পেনাল্টিতে। ম্যাচ শেষে সাহেব রেফারিকে লাথি মেরে, ছ’ম্যাচের জন্য বহিষ্কৃত হন উরুগুয়ের হুলিও কর্টেস। সংবাদমাধ্যমের একাংশের দৃষ্টিকোণ, লাতিন আমেরিকার দলগুলোকে নিয়ে ইংল্যান্ডের বিশেষ ভীতি ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি ওয়েম্বলিতে অনেক স্টার্লিং আনতে সক্ষম ছিল। ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের সবকটি ম্যাচ দিয়ে, আয়োজক দেশকে বাড়তি সুবিধে পাইয়ে দেওয়া নিয়েও এই মহল প্রশ্ন তোলে।
দু’টি ম্যাচ চলাকালীন ও ম্যাচের শেষে যেন একের-পর-এক নাটকের দৃশ্যই অভিনীত হতে থাকে। ওয়েম্বলিতে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের মীমাংসা হয়, ম্যাচ শেষ হওয়ার মিনিট বারো আগে, জিওফ হার্স্টের হেড যখন আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে গেল। ম্যাশচের পর জর্জ কোহেন যখন আর্জেন্টিনার এক ফুটবলারের সঙ্গে জার্সি বদল করছেন, তখন ছুটে এসে তাঁকে বাধা দিয়ে ইংল্যান্ড কোচ রামসে বলেন, ‘জানোয়ারটার সঙ্গে জার্সি বদল কোর না।’ ‘ফিফা’র সহ সভাপতি হ্যারি ক্যােভানের মুখে থুতু ছিটিয়ে দেন এর্মিন্দো ওনেগা, ক্রেটলিনকে আক্রমণ করে বসেন তাঁর সতীর্থ রবার্তো ফেরেরো। দু’জনকেই তিনটে আন্তর্জাতিক ম্যানচের জন্যা নির্বাসিত করে ‘ফিফা’।
যদিও, সংবাদমাধ্যম ক্রেটলিনকে পক্ষপাতমূলক রেফারিং এর জন্যা ছিঁড়ে খায়। ব্রায়ান গ্ল্যাফনভিল ‘সানডে টাইমস’-এ লেখেন, ‘টাক মাথার একটা লোককে লক্ষণীয়ভাবে ছোটাছুটি করে, নোটবুকে আর্জেন্টিনার প্লেয়ারদের নাম লিখে রাখতে দেখা যায়।’ রাউসকে প্রকাশ্যে ‘মূর্খ’ বলে দেন আর্জেন্টিনা প্রতিনিধি দলের কর্তা, হুয়ান সান্তিয়াগো। ইতালির একটি কাগজ, ‘লিমেসেজ্জেরো’ শিরোনাম করে— ‘লন্ডনে কেলেঙ্কারি— ইংল্যিন্ডের প্রতি বড্ড বেশি পক্ষপাত করা হল।’ এই দুই ম্যাচে এত মার্চিং-অর্ডার, নির্বাসন! অথচ মোরাইস-জেচেভরা সম্পূর্ণ রেহাই পেয়ে গেলেন। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে, দুটো দেশেই ব্রিটিশ দূতাবাস আক্রান্ত হয়। দেশে ফিরে আর্জেন্টিনা দল অবশ্য বীরের মর্যাদা পায়, স্বয়ং রাষ্ট্রপতিও ইংল্যান্ডে দল যেভাবে দেশের সম্মান রক্ষা করেছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এর পরের মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকেই ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালু করে ‘ফিফা’।
বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে, ন’জন হয়ে যাওয়ায়, উরুগুয়ের প্রতিরোধ ভেঙে যায়, তারা আরও দু’টি গোল হজম করে, যার একটি পেনাল্টিতে। ম্যাচ শেষে সাহেব রেফারিকে লাথি মেরে, ছ’ম্যাচের জন্য বহিষ্কৃত হন উরুগুয়ের হুলিও কর্টেস। সংবাদমাধ্যমের একাংশের দৃষ্টিকোণ, লাতিন আমেরিকার দলগুলোকে নিয়ে ইংল্যান্ডের বিশেষ ভীতি ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম জার্মানি ওয়েম্বলিতে অনেক স্টার্লিং আনতে সক্ষম ছিল। ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের সবকটি ম্যাচ দিয়ে, আয়োজক দেশকে বাড়তি সুবিধে পাইয়ে দেওয়া নিয়েও এই মহল প্রশ্ন তোলে।
উপরের তিনটে দৃশ্যে জুড়লে, এই পর্বের বৃহৎ ছবিটা পাওয়া যাবে। লক্ষ্যে পৌঁছলেন রাউস-রামসেরা; লাতিন আমেরিকার চ্যালেঞ্জ শেষ হয়ে গেল। অনেকেই ভাবেন যে, ’৬৬-র ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে শুধুমাত্র পেলে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টা শুধু পেলে আর ব্রাজিলে সীমিত ছিল না। সেমিফাইনালে চারটি দলই ইউরোপীয়। ববি মুরদের প্রতিদ্বন্দ্বী পোর্তুগাল, আর জার্মানদের মুখে লেভ ইয়াসিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন। ব্রাজিলীয় ফুটবল ফেডারেশনের তদানীন্তন সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জ (পরবর্তীতে ’৭৪-এ ইনি ‘ফিফা’ সভাপতি হন) লেখেন, ‘মাঠের কিছু মারামারির ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিকৃত করে প্রচার করা হচ্ছে। লাতিন আমেরিকার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মধ্যে জনমত তৈরি করছে উদ্যোক্তারা। ‘ফিফা’র উচিত আমাদের প্রতি কিঞ্চিৎ সম্মান দেখানো। দুটো কোয়ার্টার ফাইনালই একটি বিপথগামী রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ।’
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের জয় নিয়ে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ ছিল না। ববি চার্লটনের জোড়া গোল, দলীয় সংহতির জোরে ইউসোবিওদের হারান মুররা। ইউসোবিও একটি গোল শোধ করলেও, দলের হার বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে জিওফ হার্স্টের শট বারে লেগে ড্রপ করে, গোললাইন পেরিয়েছিল কি না, তা নিয়ে আজও ঘোর সন্দেহ রয়ে গিয়েছে ফুটবল-বিশ্বে!

সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে, পেলে কিন্তু প্রবলভাবে ফিরে এসেছিলেন পরের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। ব্রাজিলের এই তৃতীয়বার বিশ্বজয়ের বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। দেশে তখন জেনেরাল এমিলিও গারাস্তাজু মেদিচির সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিন হাজারের বেশি মানুষ, সামরিক কর্তাদের হাতে হয় নিহত, নয় বন্দি। এই নিহতদের তালিকায় ছিলেন, কার্লস মারিঘেল্লার মতো গেরিলা যোদ্ধাও। শুরুতে খেলতে না চাইলেও, পেলের ওপর খেলার জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন সামরিক শাসকরা। অবশেষে পেলে ব্রাজিলের স্বার্থে খেলতে রাজি হন এবং মেক্সিকোয় সবকটি ম্যাচ জিতে চ্যালম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। মেদিচি ভেবেছিলেন, ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হলে, তা ‘মেদিচির বিশ্বকাপ জয়’ হবে, কিন্তু বাস্তবে ব্রাজিলের চিরতরে ‘জুলেরিমে’ ট্রফি জয়, পেলের বিশ্বকাপ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়ে গিয়েছে। গ্রুপলিগে প্রবল উত্তেজনার ম্যাচে, ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারায় ব্রাজিল; পেলের পাস থেকে জোয়ারজিনোর করা গোলে। ম্যা্চের পর ববি মুরের সঙ্গে জার্সি বদল করেন পেলে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মুখে পড়া দেশবাসীকে, সামান্য স্বস্তি দিতে পেরেছিলেন পেলে-রিভেলিনোরা এই বিশ্বকাপ জিতে।

ফিরে আসা যাক ’৬৬-তে। ছ’দশক পরে, জনমানসে অনেকটাই ঝাপসা হয়ে এসেছে সেই স্মৃতি। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড একবার বিশ্বচ্যাবম্পিয়ন হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু পেলের বক্তব্যকে বাদ দিয়ে, ইতিহাসের এই অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ‘ইংল্যান্ড টানা ম্যাচগুলো জিতেছিল, কিন্তু মাঠে তারাই সেরা দল ছিল না।’ এবং ওই বিশ্বকাপে নান্দনিক ঘরানার ফুটবলকে খুন করে, খেলাকে যুদ্ধেই রূপান্তরিত করা হয়েছিল!



