যন্তরমন্তর ঘরে মগজের বদলে ঢুকে গেল আস্ত একখানা ফুটবল।
‘অ্যাঁ, ফুটবল? ফুটবলের মগজটা আছে কই যে মগজধোলাই হবে?’
‘আচে মশাই আচে, আপনি বুইচেন না। এ যেমন তেমন বল নয় হে—এর নাম ট্রিওন্ডা!’
‘ট্রিওন্ডা— জাপানি নাকি? অ বুঝেছি। আমেরিকায় খেলা। আশি বছর পর জাপান তাই হিরোসিমার বদলা-টদলা নেওয়ার জন্য বলের মধ্যে…’
‘থামুন থামুন। মশাই, দিনকাল ভাল না— আপনি এসব বললে কিন্তু সোজা গারদে পুরে দেবে।’
‘বড় জেলখানা থেকে ছোট জেলখানায় গেলে ক্ষতি কী?’
‘যত্তসব আঁতেল কতাবাত্তা আপনার— তা যেটা বলচিলাম সেটা শুনুন না। বলে নাকি চার্জ দিতে হবে!’
বিদায়বেলায় মেসি-রোনাল্ডো! লিখছেন অর্পণ গুপ্ত…
‘সে কী! আগে ছিল ফোনে চার্জ, তারপর এল হেডফোনে চার্জ, তারপর ঘড়িতে চার্জ— এখন আবার বলে? তা এই বলের চার্জারখানা কি ধর্মতলায় পাব? না মানে, এককালে আমরা বলতুম না, যে ধর্মের ষাঁড় ছাড়া আর সবই ধর্মতলায় পাওয়া যায়। এখন অবশ্যি ষাঁড়টাও…’
‘আপনি এত চার্জ খরচা করবেন না, একবার চার্জ দিলে সে বলে নাকি ৬ ঘণ্টা খেলা যাবে!’
‘বা বা! এ তো ডবল ইঞ্জিনের মতো ডবল ব্যাটারি!’
‘নইলে আর বলচি কী, আর সাথে একটা চিপ-ও লাগানো আছে।‘
‘এই চিপটা কি ওই ২০০০ টাকার নোট থেকে খুলেই ফিফা ঝেড়ে দিল?’
‘ধ্যার! সবেতে একটা মশকরা করাটা আপনার ইয়েতে দাঁড়িয়ে গেচে।’
‘কী করব বলুন, সময়টাই এত ইয়ে…যাক গে! আপনি বলুন, চিপের ছিপে কী কী উঠবে?’
‘সেটাই তো বলচি— একে আডিডাস বলছে ট্র্যাকিং চিপ— যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার রেকর্ড করে সিগন্যাল পাঠাতে পারবে যে বলটা কী়ভাবে এবং কত ইস্পিডে ঘুরচে বা নড়াচড়া করচে।’
‘বাপ রে! এ বল না হামিংবার্ডের ডানা?’
‘আর যদি কোনও খেলোয়াড়ের সামান্য ‘টাচ’ থাকে বলের গায়ে, মানে ধরুন, ওই, থ্রো-ফো নিয়ে যে বাওয়ালটা হয়, বা বক্সে হ্যান্ডবল-প্লান্টি ফান্টি নিয়ে যে ক্যাচাল— সব একদম নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করে দেবে। মানে রেফারি ভার (VAR) নিলে, প্লেয়ারের টাচ আচে কিনা, সেটাও স্ক্রিনে দেখিয়ে দেবে— সব এই বলের কামাল!’
‘এ তো ভয়ংকর স্পর্শকাতর! দেখবেন মিস্টার প্রেসিডেন্টের আবার বেশি নজর না পড়ে এদিকে বেশি— উনি তো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে খুবই আগ্রহী…’
‘আপনি মশাই মোটে সুবিধের লোক নন, বলচি একটা, কইচেন আরেকটা। আপনি কি জানেন এই বলটায় এআই আচে?’
‘হ্যাঁ! আর্টিফিশিয়াল ইন্ট্যালিজেন্স তো এখন কাঁঠালি়কলার মতো। না থাকলেই অবাক হতুম।’
‘অ্যাঁ… আডিডাস বলচে এটাকে— ‘এআই এনেবেলড এনটিটি’, আর যে সেন্সরটা আছে, সেটা হল ৫০০ হার্জ ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট মোশন সেন্সর। এই সেন্সরটা পিচের ধারে যে মানে মাঠের সাইডলাইনের বাইরে যে সেন্সরগুলো থাকবে, তাকে কমপ্লিমেন্ট করবে— কমপ্লিমেন্ট মানে বুইচেন তো?’
‘হ্যাঁ! যেমনটা আমাদের বিশ্বগুরু মিস্টার প্রেসিডেন্টকে করছেন।’
‘আবার?’
‘আরে সরি সরি, আর ফোড়ন কাটব না। আপনি বলুন…’
‘এত ফোড়ন কেটেও তো কোনওদিন রেঁধে খাওয়ালেন না। বাদ দিন। তা এই সেন্সর মাঠের বাকি সব সেন্সারের সঙ্গে কানেক্টেড— পুরোটাই একটা ইউনিট হিসেবে ভিডিও অ্যাসিস্টেন্সের জন্য কাজ করবে। আর অফসাইডের সময়ে প্লেয়ারের থ্রি-ডাইমেনশাল ইমেজ তৈরি করে নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে হেল্পও করবে। মানে, গোদা বাংলায়, বল যার পায়ে, সেই প্লেয়ারকে স্ক্যান করবে বলটা।
‘সব্বোনাশ! এ তো একেবারে বজ্র আঁটুনি হে!’
‘আরেকটা জিনিস আডিডাস বলেচে, বলচে যে, এই বলটায় নাকি সবচেয়ে কম প্যানেল আচে।’
‘প্যানেল? বলেও প্যানেল?’
‘আরে সত্তর সালের টেলস্টারের কতা ভুলে গেলে? সাদা-কালো পঞ্চভূজের মতো প্যানেল জুড়ে জুড়ে…’
‘ও! আরে মনে আছে তো। সেবারে ফিফা বলেছিল যে সবাই সাদা-কালো টিভিতে দেখবে, তাই বলের রঙটা সাদা-কালো করতে যাতে স্ক্রিনে বোঝা যায়…’
‘একদম! ওই টেলস্টারে বত্রিশটা প্যানেল ছিল। সাদা আর কালো মিলে। তারপর থেকে প্যানেল কমেচে। এই জাবুলানি মনে নেই, আফ্রিকা?’
‘ও বাবা, সে আর থাকবে না?’
‘২০০৬ সালে টিমগেস্টে ছিল ১৪ টা প্যানেল— জাবুলানি-ব্রাজুকা সবেতেই প্যানেল কমতে-কমতে চ তা এসে ঠেকেছে মাত্র চারটেতে।’
‘আহারে! হারাধনের চারটি ছেলে…’
‘এত কিচু তো হল, তবে দামটা…’
‘কী? আরে চিন্তা করছ কেন? রামকৃষ্ণদেবই সারসত্যটা বলে গেছিলেন! টাকা মাটি, মাটি টাকা…’
‘তা বলে ১৫ হাজার টাকা? একটা ম্যাচ বলের দাম?’
‘তাতে কী! বিলিতি জিনিস…’
‘না ট্রেনিং বলটা হয়তো হাজারতিনেকে হয়ে যাবে।’
‘তবে আর কী! একটা ছেলের জন্য কিনেই ফেলো।‘
‘একটা কতা ভাবচিলাম, আচ্চা এতকিচু করেও কি ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ওয়ার্ল্ডকাপ হবে?’
‘গভীর ভাবনা। মারাদোনাকে লাগবে।’
‘এই তোমাদের নীল-সাদাদের সমস্যা। কিচু হলেই মেসি নয় মারাদোনা।’
‘আজ্ঞে তা বটে। কিন্তু এই যে ধরো পুলিশ-কমিশন-আইন-আদালত-সরকারি মন্ত্রক সবকিছুর চোখের সামনে দিয়ে দুর্নীতি করা যায়, এর টেমপ্লেটটা তো মারাদোনাই ’৮৬-তে দিয়ে গেছিলেন- স্টেডিয়ামে লাখখানেক লোক, মাঠের ধারে এতজন লাইন্সম্যান, মাঠে রেফারি- সব্বার চোখের সামনে দিয়ে লোকটা কিনা হাত দিয়ে গোল করে চলে গেল!’
‘তাহলেই দেকো, তোমাদের কেমন চোরচোট্টা প্লেয়ার সব একেকটা।’
‘আহা! মারাদোনার এই টেমপ্লেটটা তো নিলাম, কিন্তু গোল অফ দ্যা সেঞ্চুরি-রটা? ওটা ধার নেওয়া কি এত সহজ হে?’
‘ট্রিওন্ডা এলে তোমাদের টাইট দেবে দেকোই না। সব কিন্তু একেবারে বাজপাখির নজরে থাকবে। মোশন সেন্সর!’
‘আফসোস একটাই…’
‘কী হে?’
‘এই আজব বলখানা একবার মারাদোনার পায়ের থুড়ি হাতের স্পর্শ পেল না! হাজার হোক ঈশ্বরের হাত— নন বায়োলজিক্যাল ব্যাপার!’
‘ধুর! যত্তসব…’



