চোখ-কান খোলা : পর্ব ৩২

কবিতা ও কচুরি

গত কয়েকদিনে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি কবিতা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা চলতি কথায় যাকে বলে প্যারোডি, তাই শুরু হয়েছে। কবিতাটি লিখেছেন অনিকেত দেবনাথ। ছোট্ট তিন লাইনের কবিতা— ‘মানুষের মৃত্যুতে/গাছ পুড়ে যায়/মানুষ কচুরি খায়।’আজকাল এই ধরনের কবিতায় সাহিত্যজগৎ ছেয়ে গেছে সন্দেহ নেই, প্রশংসার পাশাপাশি তবু ব্যঙ্গের ঘূর্ণিতে কেউ-কেউ আটকে পড়েন আচমকাই। তাঁর কিছুই করার থাকে না তখন। হাজারও ব্যঙ্গবাণ ধেয়ে আসবে, এমন কল্পনা কবিতা লেখার আগে কেউই করেন না। তাহলে ভাবনাবৃত্তে কী থাকে? থাকে স্বীকৃতির লোভ, থাকে প্রশংসিত হওয়ার বাসনা। আর যদি তা না ঘটে? তখন প্রশ্ন উঠবে,প্রশংসা যদি নিতে পারি, ব্যঙ্গ-কটাক্ষ নেওয়ার ক্ষমতা আমার থাকবে তো? না কি যিনি ব্যঙ্গ করছেন, তাঁকে উলটে আমিও আক্রমণ করে বসব? 

এই নিয়ে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে, যা সহজে শেষ হওয়ার নয়। তবে তারও আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে মনের ভাব-প্রকাশ অর্থে কোনটাকে কবিতা আর কোনটাকে ভাবালুতা বলা যায়। কবিতা এবং কাব্য-ভাবুকতা যে এক জিনিস নয়, তা অনেকে বুঝেও বুঝতে চান না। তার্কিকেরা অবশ্য আরও সরাসরি প্রশ্ন তুলতে পারেন— বুঝতে চান না, না কি বোঝেন না! সে-বিতর্কে না ঢুকে, এটুকু অন্তত বলা যায়, যাঁরা ‘কাব্য-ভাবুকতা’কে ‘কবিতা’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট, তাঁরা শিল্প থেকে বহুদূরে অবস্থান করেন। কেননা, কবিতা কেবল আবেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা আবেগকে শিল্পে রূপান্তরিত করে। অনুভূতিকে শৈল্পিক রূপ দেয়। অন্যদিকে, কাব্য-ভাবুকতা অনেকটা ‘কবিতার মতো’; কিন্তু যথার্থ কবিতা নয়। 

এআই কি ডেকে আনবে জলসংকট?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩১…

আলোচ্য মূল কবিতাটিও কিন্তু ‘কাব্য-ভাবুকতা’র এই স্তরেই আটকে। তাঁর আবেগ হয়তো এই সত্যই জানান দিতে চেয়েছে— মানুষের মধ্যে থেকে মানবিকতার বোধ ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে,শোক ছাপিয়ে জেগে থাকছে হুল্লোড়। শ্রাদ্ধবাড়ির যা পরিচিত দৃশ্য, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তির ছবিতে মালাটুকু দিয়েই হইহই করে খাওয়া-দাওয়া— তাকেই খানিক ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন হয়তো-বা তাঁর লেখায়। কিন্তু যেহেতু সে-রচনা শিল্পোত্তীর্ণ হয়নি, পরিণতি হল উলটো। তাঁর লেখার ধরনই, তাঁকে পরিহাসের পাত্র করে তুলল।নেট-দুনিয়ায় নানান স্টেটাস উঠে এল, যার কয়েকটি এরকম: ১. ‘গাছের মৃত্যুতে/মানুষ পুড়ে যায়/গাছ কচুরি খায়।’ ২. মানুষের মৃত্যুতে/কচুরি পুড়ে যায়/মানুষ গাছ খায়।’ ৩. ‘কচুরির মৃত্যুতে/গাছ পুড়ে যায়/মানুষ মানুষ খায়।’

ধরা যাক শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই পঙ্‌ক্তি, ‘মণীষার ভালোবাসা মাহুতের চেয়ে ছিল উঁচু’— পড়ার পর, বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই বাক্যের বিস্তার। ভালবাসার বিশালত্বকে কবি এখানে ‘মাহুত’ শব্দের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেন মাহুতের প্রসঙ্গ এল, মণীষার ভালবাসা বোঝাতে গিয়ে? কারণ, মাহুতের কাজই হল এক অতিকায় জীবকে নিয়ন্ত্রণ করা; আর যিনি ওই অতবড় জীবকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর ক্ষমতা কি আর সাদা চোখে ধরা পড়ার!

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

কাব্য-ভাবুকতার প্রসঙ্গটিতে আরও কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভালবাসার প্রসঙ্গে কোনও কবি যদি লেখেন, ‘তোমাকে আমি পাগলের মতো ভালবাসছি/না দেখলেই কান্না পাচ্ছে/একবার দেখা দাও’ কিংবা ‘আণবিক দূরত্ব ছিল/তবু গ্রানাইট বিশ্বাস কিংবা সভ্যতা খুঁড়ে/করোটিতে তোমার ফোয়ারা’— আমাদের পড়ে কি তা কবিতা মনে হবে? প্রথম লাইনত্রয়ীর মধ্যে স্পষ্টত যে-আবেগের প্রকাশ, তা স্পর্শ করা গেলেও, তা তিনটি প্রেমজ বাক্য ছাড়া আর কিছু না। অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, লাইনত্রয়ী এতই বিমূর্ত, তা পুরোপুরি স্পর্শ করা যাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু ‘কবিতার মতো’ মনে হচ্ছে যেন। অর্থাৎ, ‘কাব্য-ভাবুকতা’। কখনও তা আবেগে আটকে যাচ্ছে, নয়তো বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে কষ্টকল্পিত নির্মাণে। অথচ ধরা যাক শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই পঙ্‌ক্তি, ‘মণীষার ভালোবাসা মাহুতের চেয়ে ছিল উঁচু’— পড়ার পর, বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই বাক্যের বিস্তার। ভালবাসার বিশালত্বকে কবি এখানে ‘মাহুত’ শব্দের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। কেন মাহুতের প্রসঙ্গ এল, মণীষার ভালবাসা বোঝাতে গিয়ে? কারণ, মাহুতের কাজই হল এক অতিকায় জীবকে নিয়ন্ত্রণ করা; আর যিনি ওই অতবড় জীবকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁর ক্ষমতা কি আর সাদা চোখে ধরা পড়ার! যা পরিমাপ করতে পারি না আমরা, মণীষার ভালবাসা ছিল তার চেয়েও উঁচু। অর্থাৎ, ‘মাহুত’— এই একটা শব্দের ভেতর দিয়ে প্রেম কী বিশাল আকারে দেখা দিল আমাদের সামনে!

কয়েকটা কথা এই প্রসঙ্গে আমাদের ভাবা জরুরি। বলা ভাল, নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরি। আরও একবার। প্রথমত, কবিতা লিখে আমরা ঠিক কী চাই? দ্বিতীয়ত, কোন মুহূর্তে মনে আসে একটা লেখা প্রকাশ করা উচিত? তৃতীয়ত, ঠিক কোন কারণে একটা লেখাকে ‘কবিতা’ বলব? চতুর্থত, সোশ্যাল মিডিয়ায় কবিতা প্রকাশ করলে কি বাড়তি কিছু মানসিক তৃপ্তি ঘটে? এবং পঞ্চমত, কেউ-কেউ নয়, সকলেই কবি? লেখকের স্বাধীনতা নিয়ে সরব হওয়ার পাশাপাশি, এ-কথা কি আমরা যাচাই করে নেব না, কে লেখক আর কে নয়! এবং এই সব কথা মানুষই ভাববে, কেননা গাছ ও কচুরি এক্ষেত্রে আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।