থিয়েটারের রামকিঙ্কর

১৯২৩ সালের পয়লা জানুয়ারি চিত্তরঞ্জন দাশ কংগ্রেস দল ছাড়েন এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘স্বরাজ্য দল’। সারা ভারত পরিভ্রমণ করে তাঁরা দলের নীতি ও কর্মসূচি প্রচার করতে শুরু করেন। সেই দলেই যুক্ত হন বাঁকুড়ার প্রবাদপ্রতিম রাজনৈতিক যোদ্ধা অনিলবরণ রায়। দলের আদর্শ ও কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এবং দলের কাজ চালানোর অর্থ সংগ্রহের জন্য, অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাঁকুড়ায় আসেন চিত্তরঞ্জন দাশ। ন্যাশনাল স্কুলে আয়োজন করা হয়েছিল সেই সভা, যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন অনিলবাবু। সেই সভায় চিত্তরঞ্জন দাশ যখন আসেন, তখন সদ্য তিনি জেল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত, মুখভর্তি দাড়ি। মঞ্চের সামনে বসে একটি বাচ্চা ছেলে সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে এক মনে তাঁর ছবি এঁকে যাচ্ছে। তীক্ষ্ণরেখায় যেন মিশে যাচ্ছে তাঁর ভাষণের কণ্ঠস্বর— ‘তাহলে আমরা কি আর ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করব না— আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসব?’ সমবেত ধ্বনি ভেঙে পড়ছে— ‘না…।’ কথা বলা শেষে চিত্তরঞ্জন ভেতরে চলে যাওয়ার পরেও স্বপ্নালু কিশোরের মন সেই ছবির মধ্যে। হঠাৎ অনিলবাবু আর ন্যাশনাল স্কুলের মাস্টারমশাই বিভূতিবাবু এসে আবিষ্কার করেন, চিত্তরঞ্জন দাশের পোর্ট্রেট ভেসে উঠেছে সেই কিশোরের খাতায়। পরে চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে সেই ছবি নিয়ে গেলে তিনি বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘আরে! এ যে দেখছি আমিই! বাহ্‌, কে আঁকল এটা অনিলবাবু?’ অনিলবাবু একপ্রকার জোর করে কাছে টেনে এনে সেই লাজুক কিশোরকে আলাপ করিয়ে দিলেন— ‘এই যে, এ… রামকিঙ্কর… রামকিঙ্কর প্রামাণিক।’ চিত্তরঞ্জন দাশ তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সেইদিনই বলে দিয়েছিলেন, ‘এখন থেকে পার্টির জন্য আঁকা, লেখার সমস্ত কাজের জন্য ওকে পয়সা দেবেন। অন্যত্র থেকেও এইসব কাজ যাতে ওকে দেওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করবেন।’ দরিদ্র ক্ষৌরকার পরিবারের সেই সন্তানই পরবর্তীকালে পদবি বদলে, রামকিঙ্কর বেইজ।

পেশাদার শিল্পী হিসেবে জীবনের পথটা অনিল জ্যাঠা তৈরি করে দিলেও, থিয়েটার থেকেই রামকিঙ্করের জীবনে প্রথম পেশার পথ তৈরি হওয়া; এবং সেখান থেকেই জন্ম থিয়েটারের প্রতি অগাধ প্রেমের। রামকিঙ্কর বলছেন, “নাটক ও অভিনয় ছোটবেলা থেকেই আমাকে টানত। থিয়েটারের সিন আঁকা, স্টেজ করা, রিহার্সাল দেওয়ানো, আবার অভিনয়ের লোক কম পড়লে তখন অভিনয় করা; এসব খুব করতুম। একবার শিশির ভাদুড়ীর নাম শুনে তাঁর নাটক দেখতে কলকাতায় গিয়েছিলাম। তাঁর ‘ষোড়শী’ ও ‘সীতা’ ভীষণ ভালো লেগেছিল।’ রামকিঙ্কর যতখানি শান্তিনিকেতনের, ততখানিই বাঁকুড়ার। বাঁকুড়ার গুরুত্বপূর্ণ নাট্যদল অরোরা নাট্য মন্দির এবং কালীমাতা নাট্য মন্দির-এর হয়ে ড্রপসিন আঁকতেন রামকিঙ্কর।

বিদ্যুৎ ছিল না, রামকিঙ্কর গাইতেন ও আমার চাঁদের আলো!
লিখছেন সুপ্রিয় ঠাকুর…

অসহযোগ আন্দোলন ও বাংলা থিয়েটার রামকিঙ্করের শিল্পীজীবন গড়ে ওঠার প্রাথমিক কঙ্কাল। অসহযোগ আন্দোলনের জন্য সরকারি স্কুল বন্ধ হয় যখন— সেই সময়ে তিনি রজব আলির পালকিগাড়িতে ছবি আঁকা, কখনও-কখনও বায়না পেতেন তাঁর পছন্দের কাজ সাইনবোর্ড লেখার। এতে দুটো পয়সা পেতেন, বাবার হাতে তুলে দিতে পারতেন। পয়সার অভাবে যখন রং ফুরিয়ে যাচ্ছে, তখন ভাস্কর্য তৈরির প্রাথমিক পাঠ নিচ্ছেন অনন্ত জ্যাঠার কাছ থেকে। মূর্তি তৈরি করছেন, যে-মূর্তি নিয়ে তাঁর বাবা বাজারে যাচ্ছেন বিক্রি করতে। সঠিক মূল্য অনেক সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকই, তবুও সেসব মূর্তি কিন্তু বিক্রি হয়ে যাচ্ছে!

রামকিঙ্কর রামবিলাস কর্মকারের বাড়িতে ছবি আঁকছেন— বড় দেওয়াল জুড়ে রাজপ্রাসাদের দ্বারী। সেই ছবি দেখেই মুগ্ধ হচ্ছেন বাঁকুড়ার বিখ্যাত নট্ট যামিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। মোক্তার যামিনীকান্ত অবাক হয়ে যান, তাঁরই বাড়িতে আসা ক্ষৌরকার চণ্ডীচরণের ছোট ছেলে এত ভাল ছবি আঁকতে পারে! থিয়েটারের অন্দরমহলে পাকাপাকিভাবে প্রবেশ করেন রামকিঙ্কর। কোনও নাটকের সিন আঁকার জন্য, বিশেষ করে অবয়বের প্রয়োজন হলে কিঙ্করের কথাই মনে পড়ে যামিনী মোক্তারের। সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। যদিও জানতেন, দরিদ্র পরিবারে অধিকাংশ টাকাই চলে যাবে পারিবারিক খরচে; তবু যতটুকু বাঁচে, তাই দিয়ে অল্প হলেও তো রং-তুলি কেনা যায়! পরবর্তীতে যামিনী নট্ট ঠিক করেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে সিন আঁকার সরঞ্জাম কেনার জন্য কলকাতায় যাবেন। থিয়েটারের সেট ডিজাইন বিষয়ে, তিনি সম্পূর্ণ দায়িত্ব রামকিঙ্করের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এবং থিয়েটারের হাত ধরেই রামকিঙ্করের জীবনের প্রসার আস্তে-আস্তে বৃদ্ধি পেতে লাগল। সুখেন্দু হীরা ‘বাঁকুড়ার রামকিঙ্কর’ বইতে লিখছেন— ‘কালীমাতা নাট্য সমিতির পরিচালক, নট ও নাট্যকার ভূদেবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে রামকিঙ্করের সখ্য ছিল। এই কালীমাতা নাট্য মন্দিরের জন্য উড়ন্ত হাঁসের পিঠে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতিকৃতি আঁকা ড্রপসিন এঁকেছিলেন। সেটা বহুদিন পর্যন্ত কালীতলার ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে ছিল। শোনা যায় সেটি বিশ্বভারতীর কলাভবনের কিউরেটর রবি পাল মহাশয় কলাভবনে রাখবেন বলে ভূদেব বাবুর বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।’ (পৃ. ৪৬)

কলকাতার মতো বাঁকুড়ার থিয়েটারেও, একটা সময়ের পর থেকে মহিলারাই অভিনেত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করে। রামকিঙ্করের দায়িত্ব এসে পড়ে সিন আঁকার পাশাপাশি নাটকের মেয়েদের মেক-আপ করানোর। শিক্ষিত-সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোকেরা নাটকের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও, নাটকের মেয়েদের মানুষ ভাল চোখে দেখত না। রামকিঙ্করের বউদি বসন্তবালা একদিন বলেই ফেলে, ‘ঠারপো— উ ভদ্দরলকগুলান ঐ বেশ্যা মাগীদের সাথে সঙ্গ করে? আর তুমি উদেরকে সাজ্জাও!’ মেক-আপ করে দুটো পয়সা আসে, এই কথা যেমন সত্য; তেমনই সত্য সমাজের তথাকথিত নৈতিকতা, যা বুঝিয়ে দেয় থিয়েটারে পুরুষ-অভিনেতারা অভিনয় করে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, আর অন্যদিকে অভিনেত্রীরা শুধুই ‘বেশ্যা’। 

বাঁকুড়া থেকে শান্তিনিকেতন কালপর্বে, এক নতুন রামকিঙ্করকে আমরা খুঁজে পাব— নির্দেশক, অভিনেতা ও গায়ক রামকিঙ্কর। দেখব, নিজের ঘরের চারপাশের উঠোন জুড়ে ভাস্কর্যের মাঝখানে গড়ে তুলছেন নাটমঞ্চ। ছবি ও ভাস্কর্যের রামকিঙ্কর তখনই জীবন্ত, যখন প্রাণময় মানুষের চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলতে থাকেন প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে।  ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০— রামকিঙ্করের জীবনের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি এই সময়পর্বে মজা করে ছবি আর ভাস্কর্য নির্মাণকে বলতেন দুই ঘোড়ায় সমান তালে চলা, এবং তার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন তৃতীয় আর এক ঘোড়া— থিয়েটার ও গান। গান শোনা, গান শেখায় খুব উৎসাহ ছিল তাঁর। কৃত্রিম রাবীন্দ্রিক ঘরানাকে অপছন্দ করতেন ঘৃণাভরে। এইসব গানের গায়কিকে সমালোচনা করে প্রায়শই কিঙ্কর তাঁর প্রিয় গায়ক পল রবসনের প্রশংসা করে বলতেন, ‘নাভিমূল থেকে রবসানের গান উঠে আসে— শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়।’ গানের প্রতি তাঁর এই ভালবাসা আর থিয়েটারের প্রতি দুর্মর আকর্ষণ আকৃষ্ট করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও। রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায় রামকিঙ্কর অভিনয় করেন; তাঁর প্রথম নাট্যাভিনয় রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘মালিনী’। এর আগে ছোটবেলায় একবারই  রামকিঙ্করকে অভিনয় করতে হয়, তা হল ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে সিরাজের ছেলেবেলার চরিত্রে।

অন্ত্যজ শ্রেণির একজন বাঙালির ‘ভদ্র’ শ্রেণির পরিসরে ঢুকে পড়বে, এতটা উদার জাতি বোধহয় আমরা কোনওকালেই ছিলাম না। রামকিঙ্করের জীবন ছিল কাঁকর ও কাঁটার ক্যানভাস দিয়ে তৈরি। এই ধারাকে প্রতিহত করার জন্য যতবার অপমানের বাঁধ তৈরির চেষ্টা করা হয়, রামকিঙ্করের এক-একটা তুলির টান কিংবা ছেনি-হাতুড়ির তীব্র আঘাতে দুরমুশ হয়ে যায় তা অনায়াসেই। ‘ধান ঝাড়া’ মূর্তিটি নিয়ে আশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদ হলে, রামকিঙ্কর বেশ ভেঙে পড়েন অপমানে। ১৯৪৫ সালের নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও তাঁর ভাল ছিল না। অনেকদিন কোনও ভাস্কর্য এবং ছবি নির্মাণের কাজে নিজেকে যুক্ত করেননি তিনি। এরপর অভিমানী কিঙ্কর জবাবের জন্য বেছে নিলেন থিয়েটার। থিয়েটারের উৎসই যে প্রতিবাদ— সে নাট্যশাস্ত্রেই হোক কিংবা এক শিল্পী/ভাস্করের থিয়েটার প্রযোজনায়, তা প্রমাণিত হল আরেকবার। 

১৯৪৯ সালের ২০ মার্চ, কলাভবনের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’ নাটকটি কলকাতার নিউ এম্পায়ার বোর্ডে করানো হলে, সেখানেও মুখোশ বানানো থেকে সংগীত পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। জন্তুদের গলার নকল কেমন করে করতে হবে, শিখিয়েছিলেন তিনি।

যামিনী মোক্তারের কাছে ‘মালিনী’, ‘রিজিয়া’ কিংবা ‘কারাগার’-এ অভিনয় ছিল নিছক আনন্দ; কিন্তু ১৯৪৬ সালে বলরাজ সাহানির ‘শতরঞ্চ কি খিলাড়ি’র অঙ্গসজ্জা ও মঞ্চসজ্জা থেকে একটা নতুন দায়িত্ব রামকিঙ্করের মধ্যে তৈরি হয়। ১৯৪৭ সালে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের করা পরশুরামের ‘ভূশণ্ডীর মাঠে’ গল্পটির গীতিনাট্যরূপের দ্বিতীয় অভিনয়ে রূপসজ্জা ও মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব নেন। ভূতুড়ে কাহিনি তাই অভিনেতাদের খালি গায়ে কালো ব্রাশ চালিয়ে গা-পা-মুখ থেকে অল্প-অল্প করে রং মুছে (এক প্রকার বডি-পেইন্টিং বলা যায়) মেক-আপ শেষ করেন। মঞ্চভাবনা প্রকৃতির মধ্যে; কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা এ-ই, নাটকটি অমাবস্যায় শুরু হয়ে শেষ হয় পূর্ণিমায়। অন্ধকার থেকে আলোর উত্তরণের জন্য কিঙ্কর রাতের আকাশকে কেমন করে ব্যবহার করেছিলেন সামান্য আলো আর চাঁদের আলো ব্যবহারের মাধ্যমে, তা স্তম্ভিত করে দেয় দর্শককে। স্বয়ং রাজশেখর বসু (পরশুরাম) নাটক দেখতে গিয়েছিলেন— তিনিও মোহিত হয়ে যান। পরবর্তীকালে তাঁর চেষ্টায় কলকাতার রংমহল মঞ্চে এই নাটকটি আবার অভিনীত হয়। 

১৯৪৯ সালের ২০ মার্চ, কলাভবনের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’ নাটকটি কলকাতার নিউ এম্পায়ার বোর্ডে করানো হলে, সেখানেও মুখোশ বানানো থেকে সংগীত পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন রামকিঙ্কর বেইজ। জন্তুদের গলার নকল কেমন করে করতে হবে, শিখিয়েছিলেন তিনি। আর এই নাটকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল মেক-আপ। রামকিঙ্করের তুলির টানে এক-একজন ছাত্র-ছাত্রী হয়ে উঠেছিল বিড়াল, কাক্কেশ্বর কুচকুচে (যেখানে অমিতাভ চৌধুরী অভিনয় করেছিলেন), হিজিবিজবিজ, সজারু, কুমির। পাশাপাশি মঞ্চশৈলীতে স্তম্ভিত করে দেন ‘মুক্তধারা’ নাটকে, যেখানে তিনি ধনঞ্জয় চরিত্রে অভিনয়ও করেন। যন্ত্রের বিরাটত্ব তৈরি করে যন্ত্ররাজ বিভূতি চরিত্রের অভিনেতাকে অভিভূত করে দেন। এছাড়া নানা সময়ে শান্তিনিকেতনে আরও কিছু রবীন্দ্র-নাটকের পরিচালনা, মঞ্চভাবনা ও রূপসজ্জা করেছেন তিনি। যেমন— ‘অরূপরতন’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘রক্তকরবী’। নাটক তৈরির সময়ে ড্রপসিন তোলার সংকেত দেওয়ার জন্য সুকুমার দত্ত নামে একটি ছেলেকে দায়িত্ব দেওয়া হত, যে সম্পূর্ণ রিহার্সাল চলাকালীন থাকত। নির্দেশক রামকিঙ্কর বলতেন, ‘সামনের দিকে ঘুরেই যে সংলাপ বলতে হবে তার কোনও যুক্তি নেই…’; তাঁর মতে, সংলাপ হবে পরিস্থিতি অনুসারে। রামকিঙ্করের পরিচালনায় তৈরি হয়েছে হিন্দি, ইংরেজি নাটকও। হিন্দিতে ‘তোতাকাহিনি’ করিয়েছেন; পরিচালনা করেছেন শেক্সপিয়র ও বার্নাড শ’র নাটক। তাঁরই দায়িত্বে ছিল মঞ্চ, আলো ও মেক-আপ।

রামকিঙ্কর ও শেক্সপিয়র দুজনেই গ্রামের ছেলে। শহরের লোকজনের সঙ্গে আঁতাত, দুজনেরই খুব ভাল হয়নি। তবে, সমাজের মনের মধ্যে জমে থাকা ঈর্ষাকে শেক্সপিয়র যেমন করে ‘ওথেলো’য় ধরেছিলেন, তেমনই রামকিঙ্কর অনায়াসে দ্বারিক বাড়ি-র ইনস্টলেশনকে ব্যবহার করেছিলেন গথিক পিলারগুলোকে নিয়ে আবহ তৈরি করার জন্য। মোমের আলোর আভায় সেজে-ওঠা মঞ্চে— ওথেলো আর ফেরোভিয়াসের বাচনভঙ্গির রহস্যময়তা তৈরি করার পিছনে রামকিঙ্কর কত সহজেই মন ছুঁয়ে ফেলেছিলেন দর্শকদের! গ্রামের ছেলের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক তকমা না থাকা সত্ত্বেও, ইংরেজি নাটকের এমন পরিচালনা— সহজে মেনে নিতে পারল না শান্তিনিকেতনের পরিবেশ। তৈলচিত্র, ভাস্কর্য নিয়ে কাজ করার সময়ে বাধা-অপমান-অসম্মান যেমন হয়েছে— তেমনই নাটক করতে এগিয়ে আসার পর এই অন্ত্যজ মানুষটিকে কীভাবে নিঃস্ব করে দেওয়া যায়, তার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলে শান্তিনিকেতনের আপাতশান্ত আবহাওয়ার মধ্যেও। 

‘ওথেলো’র সফল মঞ্চায়নের পর ছাত্রদের অনুরোধে রামকিঙ্করের প্রিয় নাটককার বার্নাড শ-র ‘অ্যান্ড্রোক্লেস অ্যান্ড দ্য লায়ন’ মঞ্চস্থ করায় আগ্রহী হন তিনি। নিতান্ত সামান্য উপকরণের সাহায্যে প্রাচীন রোমের দৃশ্যাবলি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন। স্থির করেন, তারপরেই ‘পোয়েটেস্টার্স অফ ইস্পাহান’ করা হবে। বিশ্বভারতী ইচ্ছে করে ফান্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এক দিব্যোন্মাদকে আটকানোর জন্য পণ্ডিতরা বলে দিয়েছিলেন, ‘না, মানে না।’ রামকিঙ্কর তাঁর প্রাণের ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি রামকিঙ্কর, রামের বাহন হনুমান, আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না।’ আটকানো সম্ভব হয়নি তাঁকে। সেই নাটক মঞ্চস্থ হয় কলাভবনের গাছতলায়। সাধারণ মানুষদের জন্য যে থিয়েটার হয়, তা যে-ভাষারই হোক-না কেন, রামকিঙ্কর দেখিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম অভিনয় দেখানোর জন্য, তিনি তাঁর গ্রামের লোকজনকে আমন্ত্রণ জানান। সময় পার হয়ে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে এলে তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘আমার গ্রামের লোকজন এখনও পৌঁছায়নি, নাটক হবে না…।’ রামকিঙ্কর বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, মঞ্চে সাম্যের বা বঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলার আগে বাস্তবে তা প্রয়োগ করা শিখতে হয়। গ্রামের বাসিন্দারা সংগীতভবন ও কলাভবনের ছাত্র-ছাত্রী ও কিছু শিক্ষকের সঙ্গে একসঙ্গে বসে নাট্য উপভোগ করেছিলেন। মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে সে-নাটকের প্রশংসা। এরপর আশ্রমের এবং আশেপাশের বিভিন্ন মানুষের আগ্রহে, নাটকটি চারবার অভিনীত হয় এবং বিশ্বভারতী শেষে বাধ্য হয় অর্থ সাহায্য করতে। 

থিয়েটারকে ভালবেসে রামকিঙ্কর সবচেয়ে বেশি অপমানিত হন ১৯৫৭ সালে। খ্যাতির সঙ্গে বিড়ম্বনাও যে এইভাবে যুক্ত থাকবে গ্রিক নাট্যের নিয়তির মতো, এ-কথা ভাবতে পারেননি তিনি। সে-বছর নভেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত যুব উৎসবে অংশগ্রহণ করার জন্য বিশ্বভারতী প্রস্তুতি নেয় গ্রিক নাটক ‘আন্তিগোনে’র। মহলা চলে সংগীতভবনে। ড. সুধীন ঘোষ ইউরোপ থেকে এসে ওই সময়েই বিশ্বভারতীর ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। অত্যন্ত অহংকারী, দুর্মুখ এই অধ্যাপক ছাত্রদের মুখে শুনেছেন রামকিঙ্করের মঞ্চ-আলো-রূপসজ্জা-পরিচালনার কথা। রামকিঙ্করকে আমন্ত্রণ জানান এই শিক্ষক। ২৫ অক্টোবর, ফাইনাল রিহার্সাল, রামকিঙ্কর সব সময়েই যেমন মদ খেয়ে নিজের মধ্যে নিজে ডুবে থাকতেন কিন্তু কারওর সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করতেন না, সেদিনও তিনি মহলায় সেইভাবেই যান। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখতে-দেখতে রামকিঙ্কর সেদিন বুঝতে পারছিলেন, স্পেসের ব্যবহার ও অভিনয়ের স্টাইল ঠিক হচ্ছে না। তিনি দু’তিনবার এই নিয়ে বলবার পরও যখন সেই ‘পণ্ডিত’ কোনও কর্ণপাত করলেন না, রামকিঙ্কর অপমানিত হয়ে স্ক্রিপ্টটা মাটিতে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে ড. ঘোষ ছুটে এসে এক ধাক্কা মেরে রামকিঙ্করকে মাটিতে ফেলে দেন, এবং তিনি কিছু বলার আগেই একটা লাঠি নিয়ে রামকিঙ্করকে মারতে শুরু করেন। মুখে বিজাতীয় ইংরেজি গালাগাল এবং বক্তব্য, ‘একজন মাতাল লোকের ভালভাবে ব্যবহার করা শেখা উচিত!’ ভাগ্যিস সেই মহলায় উপস্থিত ছিলেন পাঠভবনের শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়, তিনি কোনওমতে রামকিঙ্করকে এই শিক্ষকের হাত থেকে বাঁচান। কিঙ্কর হতবাক হয়ে যান। ‘এর উপযুক্ত আমি কী করেছি, আমি জানি না…’ বলে মহলাকক্ষ ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে যান। ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সুধীন ঘোষকে বহিষ্কার করেন। একটি বাংলা সংবাদপত্রে এই আক্রমণের বিবরণ প্রকাশিত হয় এবং রামকিঙ্কর বেইজের ওপর আক্রমণের সাফাই গাইতে গিয়ে ৩০ অক্টোবর ১৯৫৭, বুধবার, ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর সাতের পাতায় ‘All over rehearsal of drama: Conflicting Version of Shantiniketan’ এই শিরোনামে একটি বিকৃত তথ্য পেশ করা হয়। 

শিল্প ও থিয়েটারকে ভালবাসতে গিয়ে এক শিল্পী যা পেলেন এই বঙ্গদেশ থেকে! তবুও তিনি কত অনায়াসে যা বলতে পারেন, তা আমরা শুনতে পাই রামকিঙ্করের জীবন নিয়ে তৈরি হাওড়া সৃজনের নাটক ‘কলের বাঁশি’তে রামকিঙ্কর (এই চরিত্রে অভিনয় করছেন সঞ্জীব সরকার) বলছেন— “প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা, কিন্তু প্রবঞ্চিতকেই তো সবটুকু দেয়— প্রবঞ্চিতকে দেয় ‘দাহ’, যে-দহনশিখায় জেগে ওঠে গান— ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে এ জীবন পুণ্য করো’।”