বিষ-রূপ দর্শন: পর্ব ৬

Representative Image

বিষের রাজা রাজার বিষ

কাহিনিটা মেরির। মেরি, ফ্রান্সের সাদাসিধে বিশেষত্বহীন একটা মেয়ে। যদিও, মেরির সঙ্গে ফ্রান্সের রাজ-পরিবারেরও রক্তের সম্পর্ক আছে, যদিও তা কলঙ্কময়। কানাঘুষোয় শোনা যায়, ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় লুই ফিলিপের সঙ্গে নাকি সে-কালের বিখ্যাত লেখিকা স্টেফানি ফিলেসিটের অবৈধ প্রণয় ছিল। তাঁদের এই সম্পর্কের ফলস্বরূপ এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, নাম তাঁর হারমাইন। আমাদের এ-কাহিনির নায়িকা মেরি, হারমাইনের নিজের নাতনি। মেরির ছোটবেলাতেই, তাঁর বাবা দুর্ঘটনায় মারা যান। বছরকয়েক বাদে মা-ও মারা গেলেন। আঠারো বছর হতে-না-হতেই, মেরি হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ অনাথ। মেরির মাসি তাকে দত্তক নিল। মাসি-মেসো, মেরিকে খুব স্নেহ করেন। তাদের সংসারে মেরির কোনও অভাব নেই। এমনকী, মেরির  স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ করতেও তাঁরা কোনও কার্পণ্য করেননি। কিন্তু মেরি হীনমন্যতায় ভোগে। মাসির সংসারে সে নিজেকে কিছুটা অপাংক্তেয় বোধ করে।

এভাবেই বছর পাঁচেক কাটল। মেরি এখন বিবাহযোগ্যা। মাসি-মেসোর কপালে চিন্তার ভাঁজ। মেরির বংশ-ইতিহাস কলঙ্কিত, উপরন্তু সে ডাকসাইটে সুন্দরীও নয়। তাই বিয়ের বাজারে মোটা অঙ্কের পণই ভরসা। মাসি-মেসো তা দিতেও প্রস্তুত। এখন যেমন দেখে-শুনে বিয়ের ক্ষেত্রে ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট গুলো ভরসা, তখন ও-দেশেও ম্যাট্রিমোনিয়াল এজেন্সি ছিল। মেরির মাসি-মেসো তেমনই এক এজেন্সির ঘটকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সে ঘটকের কাছে, পাত্রের খোঁজ আছে বটে। পাত্র, প্যারিসেরই এক মফস্‌সলে থাকে। নাম, চার্লস লাফার্জ। এককালে সে-অঞ্চলে লাফার্জরা ছিল অভিজাত। চার্লসের বাবাও বেশ পয়সাকড়ি করে, ভিলা-এস্টেট কিনে বেশ জাঁকিয়ে বসেছিল। কিন্তু কথায় আছে, অভিজাত বংশের তিনপুরুষ থাকে— আয়ারাম, কেনারাম, আর বেচারাম। তো, চার্লস হচ্ছে সেই বেচারাম। বংশের যা জমি-জমা-সম্পত্তি ছিল, সব প্রায় বেচে, নিজের একটা লোহার কারখানা করতে টাকা লাগিয়েছিল। সে ব্যাবসা তো চলেইনি, উপরন্তু চার্লস এখন কপর্দকশূন্য, গলা অবধি ঋণে ডুবে। পাওনাদারদের হানায় পালিয়ে বেড়ায়।

ঘটক যখন চার্লসের কাছে মেরির সম্বন্ধ নিয়ে এল, চার্লস দেখল— এই হল মোক্ষম সুযোগ। মেরির মেসো-মাসি যে অঙ্কের পণ দেবে বলছে, তাতে অন্তত বাজারের দেনাগুলো মেটানো যাবে। কিন্তু চার্লসের এখন যা হাল, তাকে বিয়ের জন্য কোনও ভদ্রঘরের মেয়েকে রাজি করানো মুশকিল। চার্লস, ম্যারেজ এজেন্সির ঘটককে হাত করল। ঠিক হল, মেরির সঙ্গে যদি সে চার্লসের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারে, তবে সে পণের টাকার কিছু ভাগ পাবে। ঘটক, এ-লোভ সামলাতে পারল না। বিয়ের বাজারে চার্লসের মতো এমন অচল  ফুটো কড়ি চালিয়ে দেওয়ার বহু ফন্দি-ফিকির তার জানা আছে।

ভ্যাম্পায়ারের লোককথার পিছনেও কি আর্সেনিকের বিষক্রিয়া? পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ৫…

সে, মেরির মেসো-মাসির কাছে গিয়ে চার্লসের গুনগান গাইল— ছেলে এক্কেবারে রাজপুত্তুর। বিষয়-সম্পত্তিতে রাজাকেও হার মানায়। নিজের বিশাল এস্টেট আছে। ছেলে ধনকুবের, বিজনেস টাইকুন। এমন বড়লোক সুপাত্র শুনে, মেরির মেসো-মাসি তো এক পায়ে রাজি। তারা চার্লসের সঙ্গেই মেরির বিয়ে পাকা করে ফেললেন।

মেরি লাফার্জ

সময়টা, ঊনবিংশ শতকের তিনের দশকের শেষ দিক। সে-সময়ে বিয়ে ঠিক হলে, পাত্র-পাত্রী সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়ার অত রেওয়াজ ছিল না। লোকেরা ম্যারেজ এজেন্সিগুলোকেই খুব ভরসা করত। তাই, চার্লসের আসল পরিস্থিতির ব্যাপারে মেরির পরিবার কিছু জানতেও পারল না। বিয়ের আগে চার্লস আর মেরি এক-দু’বার দেখা-সাক্ষাৎও করেছিল। তবে চার্লসকে, মেরির খুব একটা হৃদয়গ্রাহী মনে হয়নি। ওই চলনসই আর কী! কিন্তু চার্লসের সঙ্গে কথাবার্তা বলে মেরি যখন জানল, চার্লস দোজবেরে, মেরি প্রথম মানসিক ধাক্কাটা পেল। কিন্তু চার্লসের অমন বিপুল সম্পত্তি আর অভিজাত বাড়ির বউ হওয়ার লোভে, মেরি শেষমেষ বিয়েতে মতও দিল। তার বিয়েটি যে মস্ত এক ধোঁকার টাঁটি, সে আন্দাজ মেরির নেই।

১৮৩৯-এর আগস্ট নাগাদ দু’জনের বিয়ে হল। বিয়ের পর ফিটনে চেপে চার্লস, মেরিকে নিয়ে চলল নিজের বাড়ি। দীর্ঘ পথযাত্রা শেষে মেরি যখন পৌঁছালো তার শ্বশুরবাড়ি, তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! কোথায় অট্টালিকা, প্রাসাদ, এস্টেট! একটা নোংরা স্যাঁতস্যাঁতে জীর্ণ ফার্মহাউস, চারপাশে ইঁদুরের দৌরাত্ম্য, আর তারই মধ্যে গাদাগাদি করে কয়েক পরিবারের— এই তার শ্বশুরবাড়ি! এই বিয়েটা যে নিছকই এক শঠতা, মেরির বুঝতে তা আর বাকি রইল না। প্রচণ্ড ক্ষোভ, হতাশা, দুঃখে তার চোখ ফেটে জল এল। আর তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন? প্যারিসের শহুরে পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা মেরির কতগুলো আনকালচার্ড, গেঁয়ো ভূতকে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় হিসেবে মানতে ঘেন্না করে।

কী করবে সে! ওদিকে আজই যে তার বাসর রাত। ওই ঠগ-জোচ্চরটা নাকি তার স্বামী? ওই লোকটা তাকে আজ রাতে ঘনিষ্ঠভাবে স্পর্শ করবে! ভাবতেই গা গুলিয়ে ওঠে মেরির। কিন্তু আজ রাতের শারীরিক স্পর্শে  সে শারীরিক ‘পবিত্রতা’ হারালে, বিয়ে নামক এই প্রহসন থেকে তার মুক্তি মেলা অসম্ভব। ভাবতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে মেরির। যে করেই হোক, বাসর-রাতকে বানচাল করতে হবে। চার্লসকে কিছুতেই ঘনিষ্ঠ হতে দেওয়া চলবে না। মেরি একটা ভুয়ো গপ্প ফাঁদল। মেরি চার্লসকে বলল— সে চালর্সকে বিয়ে করেছে মাসি-মেসোর চাপে পড়ে। নাহলে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে ইতিমধ্যেই তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তাই চার্লসের কাছে তার অনুরোধ— এই বিয়ে থেকে সে তাকে মুক্তি দিক। নাহলে তাকে বাধ্য হয়ে ব্যভিচারী হতে হবে। আর একজন মেয়ের জন্য ব্যভিচারী হওয়ার চেয়ে আর্সেনিক খেয়ে আত্মত্যাগই বরং শ্রেয়, তাতে অন্তত নারীর সামাজিক শুচিতা রক্ষা হয়।

মেরির এমন কঠোর প্রতিজ্ঞায় চার্লসের মাথায় বাজ। সে ভেবেছিল, ভুলিয়ে-ভালিয়ে একবার মেরিকে বিয়ে করতে পারলে, বাকি সব এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মেরিকে এত সহজে বাগে আনা মুশকিল। শেষমেষ পরিবারের মধ্যস্থতায় মেরিকে বোঝানো হল— বিয়ে যখন একবার হয়েই গেছে, তখন ঝোঁকের বশে দুম করে সব ছেড়েছুড়ে দেওয়াটা বড় হঠকারী। তার চেয়ে বরং ছ’মাস সময় দিয়ে দেখাই যাক। তখনও যদি মেরি এই বিয়েকে মেনে নিতে না পারে, তাহলে নয় ডিভোর্সের কথা ভাবা যাবে। মেরি এই প্রস্তাবে সম্মত হল। তবে শর্ত একটাই— তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই ছয় মাস, চার্লস তাকে শারীরিক স্পর্শ করতে পারবে না। অতঃপর দু’জনের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা হল।

কিন্তু দিন যত যায়, চার্লসের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক সহজ হয় মেরির। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন হয়তো গেঁয়ো, তার মতো শিক্ষা-সংস্কৃতি তাদের নেই, কিন্তু মেরিকে তারা ভালবাসে, মাথায় করে রাখে। ক্রমে ক্ষেদের বরফ শীতল দেওয়াল গলে চার্লসের সঙ্গেও মেরির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকেই মনের কোণে একটু একটু রঙ ধরা। তারপর একদিন দু’জনের বেডরুম এক হল। সে-বছর (১৮৩৯) নভেম্বরে চার্লস ঠিক করল, সে কিছুদিনের জন্য প্যারিস যাবে। যদি, তার নতুন ব্যাবসার জন্য কিছু ঋণ জোগাড় করা যায়, সে-আশাতেই।

প্যারিসে মেরির কিছু চেনা-পরিচিত থাকায়, মেরি চিঠিপত্র দিয়ে কিছু সুপারিশও করে দিয়েছে। প্যারিস চলে গেল চালর্স। মেরি রয়ে গেল শ্বশুরবাড়িতেই। এখন সে রীতিমতো গিন্নি হয়ে উঠেছে। সংসার তারই হাতের মুঠোয়। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ— সংসারের সব খুঁটিনাটি তাকেই তো সামলাতে হয়। ঘরকন্নার কাজের ফাঁকে অবসর কাটে— চার্লসকে চিঠি লিখে, আর আর্সেনিক দিয়ে ঘরের ইঁদুর মেরে। আর্সেনিক দিয়ে ইঁদুরের হত্যালীলায় মেরি এক অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করে। ইঁদুরকে নির্বংশ করে মনের কোনও গোপন কুঠুরিতে এক বহুদিনের গুহ‍্য বাসনা যেন কিছুটা পরিতৃপ্ত হয়। এইসব ছোটখাটো নিধনযজ্ঞ আসলে হাতপাকানো। কোনও এক লক্ষ্যকে চরিতার্থ করার জন্য নিরন্তর অনুশীলন।

ক্রমে নভেম্বর পেরিয়ে এল ডিসেম্বর। ক্রিসমাস আসন্ন প্রায়। সেই আমেজেই সবাই মজে। এই উৎসবের মরশুমে চার্লস পরিবারের সঙ্গে নেই। তাই মেরি নিজের হাতে কেক বানিয়ে পাঠাল চার্লসকে। আর, সেদিন সন্ধ্যায় প্যারিসে বসে মেরির প্রেমপূর্বক চিঠিগুলো পড়তে-পড়তে মেরির বানানো কেক খেল চার্লস। আর তার পরপরই শুরু হল ভয়ানক বমি। চার্লস নিছক পেটের গোলমাল ভেবে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব না দিলেও, শরীর খারাপের জেরে চার্লস বাধ্য হয়েই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। আর বাড়ি ফিরেই শয্যা নিলেন চার্লস।

মেরি এখন সু-গিন্নি হয়েছে। তাই পতিব্রতা স্ত্রীর মতো মেরিই নিজের হাতে চার্লসের শুশ্রূষা করে। তাকে ওষুধ দেয় নিয়ম করে, পথ্য খাওয়ায়। বাড়িতে ইঁদুরের উপদ্রব বাড়ে, মেরি দোকান থেকে আর্সেনিকের প্যাকেট কিনে আনে। চালর্সের অবস্থাও আরও সঙ্গিন হয়। অগত্যা মেরিকে মাউস আর স্পাউস দু-জনের দেখভালের দায়িত্বই নিতে হয়। কত দায়িত্ব তার!

মেরির উপর তার শ্বশুরবাড়ির লোকের প্রথম সন্দেহ জন্মাল দিনকয়েক বাদে।

মেরির সেবা-শুশ্রূষাতেও চার্লসের কোনও উন্নতি হচ্ছিল না। মেরি বাচ্চা মেয়ে, সে কী আর একা হাতে স্বামীর সেবা করতে পারে! সেই ভেবেই মেরির শাশুড়ী দু’জন আত্মীয়াকে মেরির সাহায্যের জন্য নিযুক্ত করল। তারাই একদিন লক্ষ করল, মেরি তার হাত-বাক্স খুলে চালর্সের স্যুপের পেয়ালায় কী যেন সাদা গুঁড়ো মতো মেশাচ্ছে। মেরিকে জিজ্ঞেস করলে, সে যদিও বলে চিনির গুঁড়ো, কিন্তু সে-স্যুপ খেয়ে চার্লস আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল। পারিবারিক চিকিৎসক এলেন। অসুস্থ চার্লসকে নিয়ে সকলে যখন ব্যস্ত, একজন আত্মীয়া সুযোগ বুঝে সেই পেয়ালা নিজের জিম্মায় সাবধানে রাখল। তারপর পারিবারিক চিকিৎসককে বিস্তারিত সব জানিয়ে, সে পেয়ালাটাও দেখাল। তার তলানিতে তখন সাদা-সাদা গুঁড়ো ভাসছে। ডাক্তারবাবু আঙুলে করে একটু গুঁড়ো, পেয়ালা থেকে তুলে জিভে ছোয়ালেন। জিভ জ্বলে উঠল তার। তবুও এতে তিনি সন্দেহের কিছু দেখলেন না। উনি এসব ব্যাপারকে বেশি গুরুত্ব দিলেন না। বললেন— ‘ও কিছু না। ঘরের ছাদ থেকে চুন খসে পেয়ালায় পড়েছে বোধহয়। আপনাদের যা পুরনো বাড়ি!’

কিন্তু চার্লসের শারীরিক উন্নতির কোনও লক্ষণ নেই। দিনকয়েক বাদে এক সকালে চার্লসকে দেখতে এসে পারিবারিক ডাক্তার বুঝলেন— শিয়রে শমন। মৃত্যুদূত অপেক্ষারত। তিনি শেষ চেষ্টা অনেক করলেন বটে, কিন্তু ঘণ্টাকয়েক বাদেই চার্লস মারা গেল। সন্দেহ সর্বাগ্রে পড়ল মেরির উপরই। শ্বশুরবাড়ির লোক মেরির ওই হাতবাক্স বাজেয়াপ্ত করল। ফরেন্সিকের প্রাথমিক পরীক্ষাটা করলেন পারিবারিক চিকিৎসকই। হাতবাক্সের ওই সাদা গুঁড়োর কিছুটা ফায়ারপ্লেসের আগুনে ছুঁড়ে দিতেই রসুনের মতো মৃদু ঝাঁঝালো গন্ধে ঘর ভরে উঠল। ডাক্তারের মালুম হল— সামথিং ইজ ভেরি ফিসি। তিনিই পুলিশ ডাকলেন।

মৃত্যুশয্যায় চার্লস লাফার্জ

দিন দুই বাদে চার্লসের মৃতদেহের পোস্ট-মর্টেম হল। পাকস্থলি ও অন্ত্রে লালচে ক্ষত স্পষ্ট। কিছু স্থানে রক্তক্ষরণের চিহ্ণও আছে। অন্ত্রের কিছু স্থানের ক্ষত এতটাই গভীর যে, অন্ত্রের দেওয়াল প্রায় ফুটো হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ক্ষতের প্ৰকৃতি দেখে আর্সেনিকের বিষক্রিয়াই মনে হয়, তবে টক্সিকোলজি পরীক্ষা না করে, নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়। অতএব, চার্লসের পাকস্থলি ও অন্ত্র রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য কেটে নেওয়া হল। যারা পোস্টমর্টেম করছিলেন, ওঁরফিলার আর্সেনিক বিষয়ক কাজকর্ম সম্পর্কে তাঁরা বিশেষ ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাই, পাকস্থলি ও অন্ত্র ছাড়া দেহ অভ্যন্তরীণ আর কোনও অঙ্গ তাঁরা সংগ্রহ করেননি।  চার্লসের বমি পরীক্ষা করে আর্সেনিকের কোনও খোঁজ মেলেনি। পাকস্থলিতে থকথকে হলদেটে কিছু একটা মিলেছিল, বিজ্ঞানীদের আশা ছিল ওতে হয়তো আর্সেনিক মিললেও মিলতে পারে, কিন্তু পরীক্ষা করার সময়ে দুর্ঘটনাবশত টেস্টটিউব গেল ভেঙে। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হাতছাড়া।

ওঁরফিলা তখনও সরাসরি এ-কেসে নিয়োজিত না হলেও, পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে কেসের সব আপডেটই পাচ্ছিলেন। উনি সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘ওসব বমি, পাকস্থলির অপাচিত খাদ্য পরীক্ষা করে বিশেষ লাভ নেই। ওতে কিছু প্রমাণ হয় না।’

ওদিকে, বিজ্ঞানীদেরও হাত-পা বাঁধা। তাঁদের হাতে তো ওসব ছাড়া পরীক্ষার জন্য আর কিছুই নেই। এদিকে মেরির ওই হাতবাক্স আর ওই স্যুপের পেয়ালা পরীক্ষা করে যথেষ্ট আর্সেনিক মিলেছে। সেই ভিত্তিতে এবং পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মেরিকে গ্রেপ্তার করা হল। কিন্তু কোর্টে মেরির অপরাধ প্রমাণ করতে গেলে, শুধু পেয়ালা আর হাত-বাক্সে আর্সেনিক পেলে চলবে না। চার্লসের শরীরেও আর্সেনিক মেলা জরুরি। না হলে আদালতে কেস দাঁড়াবে না। কারণ, ওই পেয়ালায় আর হাতবাক্সে চার্লসের মৃত্যুর পর কেউ ষড়যন্ত্র করে মেরিকে ফাঁসানোর জন্যেও তো আর্সেনিক মিশিয়ে রাখতে পারে! সুতরাং, সেই সম্ভাবনা দূর করার একমাত্র উপায় চার্লসের মৃতদেহে আর্সেনিকের সন্ধান করা।

আলদাত নতুন একদল বিজ্ঞানী ও ডাক্তারের টিম ঠিক করে দিল। তারা নতুন উদ্যমে চার্লসের দেহাংশে খোঁজ শুরু করল আর্সেনিকের। তাঁরা মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতিই ব্যবহার করলেন। কিন্তু হা হতোস্মি! চার বোতল পাকস্থলিস্থিত তরল, বমি, পাকস্থলি, অন্ত্র তন্ন-তন্ন করে খুঁজে এক ফোঁটা আর্সেনিকের খোঁজও মিলল না। চারিদিকে প্রশ্ন ওঠে গেল, মেরি কি সত্যিই দোষী? তবে, বিচারক মহাশয় সম্ভবত ওঁরফিলার কাজকর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। উনি জানতেন, পাকস্থলি, অন্ত্রে আর্সেনিক না মিললেও, অন্যান্য দেহ অভ্যন্তরীণ অঙ্গেও আর্সেনিক মেলা সম্ভব।

উনি তাই, চার্লসের মৃতদেহ কবর থেকে তোলার নির্দেশ দিলেন। মাটি খুঁড়ে তোলা হল চার্লসের অর্ধগলিত শব। এবার, চার্লসের দেহ থেকে যকৃৎ, বৃক্ক, হৃদপিণ্ড, মস্তিস্ক, ব্লাডার, ফুসফুস— এসবও কেটে নেওয়া হল পরীক্ষার জন্য।

কিন্তু দৈবের এমন ফের, দিনরাত এক করে এসব দেহাংশ মার্সের পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেও এক ফোঁটা আর্সেনিক মিলল না। মার্সের পরীক্ষার উৎকর্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেল। বাদী পক্ষের উকিল অবশ্য হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তিনি একবার শেষ চেষ্টা করতে চান। তিনি আদালতের কাছে ওঁরফিলাকে ডেকে আনার আর্জি জানালেন। আদালত তা মঞ্জুর করল। ওঁরফিলার কাছে টেলিগ্রাম গেল। ওঁরফিলা রাজি হলেন, এই কেস নিতে।

ফ্রান্সের জনগনের মধ্যেও তখন পুঞ্জীভূত হচ্ছে ক্ষোভ। ফ্রান্সের জনগণ তখন দুই দলে বিভক্ত— যাঁরা একটু রক্ষণশীল, তাঁরা শিক্ষিত শহরের মেয়ে মেরিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সংসারের বিপদ হিসেবে দেখছেন। আর আরেক দল, মেরির পক্ষে সওয়াল করছেন। তাঁরা গলা চড়িয়েছেন আদালতের অতি-সক্রিয়তার বিরুদ্ধে। বারবার পরীক্ষা করেও যখন চার্লসের দেহে আর্সেনিক মিলছেই না, তখন কেন আদালত মেরিকে নির্দোষ ঘোষণা না করে, পুনরায় ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য অনুমতি দিচ্ছে? আদালত কি জোর করে মেরিকে দোষী সাব্যস্ত করতে চায়?

দিনচারেকের মধ্যেই ওঁরফিলা তাঁর দলবল নিয়ে এসে পৌঁছালেন। আদালতের বাইরের মাঠেই রীতিমতো তাঁবু খাঁটিয়ে অস্থায়ী ল্যাবরেটরি তৈরি হল। তারপর দিন রাত চলল পরীক্ষা। চালর্সের সমস্ত দেহাংশ একেক করে পরীক্ষা শুরু হল। দেহাংশগুলোকে কয়েক ঘণ্টা ধরে পাতিত জলে ফোটানোর পর, সেই নির্যাসকে নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে শোধন করা হল। তারপর সেই পরিশ্রুত তরলকে মার্স টেস্টে ব্যবহার করা হল।

দিন দুয়েক পরে, ওঁরফিলা তার পরীক্ষার ফলাফল মুখবন্ধ খামে বিচারকের কাছে জমা দিলেন। আদালত কক্ষে পিন পতনের স্তব্ধতা। বিচারক খাম খুলে সেই রিপোর্ট পড়লেন। চার্লসের সব দেহাংশ পরীক্ষা করেই আর্সেনিক মিলেছে, এবং সে আর্সেনিক পরীক্ষায় ব্যবহৃত কোনও দ্রব্য থেকে আসেনি, চার্লসের কবরের মাটি থেকেও আসেনি, তারা চার্লসের শরীরের স্বাভাবিক বা ‘ন্যাচারাল’ আর্সেনিক নয়।

আগের বৈজ্ঞানিকেরা মার্স পদ্ধতিতে আর্সেনিক খুঁজে পায়নি, কারণ— তাঁরা মার্সের পদ্ধতিকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। তা তো আর মার্স পদ্ধতির খামতি নয়, বৈজ্ঞানিকদের অপারগতা, অনভিজ্ঞতা।  হাতে-কলমে মার্স পদ্ধতির প্রয়োগ করার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা তাঁদের ছিল না। সুতরাং, ওঁরফিলার এই রিপোর্টের পর চার্লসের শরীরে যে আর্সেনিক মিলেছে, তা যে কোনও ‘ফাউল-প্লে’-র অংশ, তা বুঝতে আর কোনও অসুবিধা হল না। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই মেরিকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। এই হেভিওয়েট কেসে মার্স পদ্ধতির অভাবনীয় সাফল্যের পর, আর্সেনিক-কেন্দ্রিক ফরেন্সিকের দুনিয়ায় মার্স টেস্ট হয়ে উঠল ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’।

তবে বিতর্ক তার পিছু ছাড়ল না। ওঁরফিলার ‘ন্যাচারাল’ আর্সেনিক তত্ত্ব নিয়েই নতুন বিতর্ক দানা বাঁধল। আর্সেনিক যদি মানবদেহের স্বাভাবিক উপাদানই হয়, তাহলে সেই পরিমাণটা কত? কোন-কোন অঙ্গে থাকতে পারে সেই স্বাভাবিক আর্সেনিক? কোনও ক্রিমিনাল কেসে যখন ভিক্টিমের প্রায় সমস্ত দেহাংশ থেকেই আর্সেনিক খোঁজার নিদান দেওয়া হচ্ছে, তখন এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর থাকাটাও জরুরি। কিন্তু ওঁরফিলার কাছে এসব প্রশ্নের সম্ভবত কোনও সদুত্তর ছিল না। কিংবা হয়তো, দাম্ভিকতার বশে তাঁর বিরোধী বিজ্ঞানীদের এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখারই প্রয়োজন বোধ তিনি করেননি।

বরং, ওঁরফিলার এই ‘ন্যাচারাল’ আর্সেনিক তত্ত্ব সুষ্ঠ বিচার ব্যবস্থার পরিপন্থী হয়ে উঠল। আদালতে, অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীর কাছে তা হয়ে উঠল মস্ত হাতিয়ার। তারা বিচারকদের কাছে জব্বর অ্যালিবাই খাড়া করলেন— ‘হুজুর, মহামতি ওঁরফিলা বলেছেন, মানব দেহে কিছু পরিমাণ স্বাভাবিক আর্সেনিক থাকে। কিন্তু তার পরিমাণ তো আমরা জানি না। তাই ভিক্টিমের দেহে যেটুকু আর্সেনিক মিলেছে, তা যে মানব দেহের স্বাভাবিক আর্সেনিক নয়, তা কেমন করে প্রমাণ হবে! সত্যিই তো, এ খুব সঙ্গত প্রশ্ন। বিচারকও শেষমেষ হতবুদ্ধি হয়ে অভিযুক্তকে খালাস করে দিতেন। ওঁরফিলার এই একটি বিতর্কিত তত্ত্ব, তাঁর বাকি সব আর্সেনিক-কেন্দ্রিক তত্ত্বের গরিমাকে ফিকে করে দিল।

সেই সঙ্গে, মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতির ভবিষ্যৎও পড়ে গেল প্রশ্নের মুখে। অনেক বিজ্ঞানীই ক্রিমিনাল কেসে মৃতদেহ থেকে আর্সেনিক অনুসন্ধানের ব্যাপারে পুরনো সব পদ্ধতিতেই পুনরায় ভরসা রাখলেন, মার্সের পদ্ধতিকে ত্যাগ করার দাবি জানালেন। অত, সূক্ষ্মতায় কাজ নেই বাপু। যে টেস্ট খোদ শরীরের স্বাভাবিক আর্সেনিককেও টেনে বের করে আনে, তাতে কাজের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বরং বেশি। অভাবনীয় সংবেদনশীলতা, যা  মার্স টেস্টকে অনন্য করে তুলেছিল, তাইই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াল।

ওদিকে, বিশ্বের নানান প্রান্তের বৈজ্ঞানিকরাও তখন এই বিতর্ক সমাধানের উদ্দেশ্যে আর্সেনিকে মৃত নয়, এমন ব্যক্তির দেহাংশ-হাড় নিয়ে পরীক্ষা করা শুরু করেছেন। তাঁরা অনেকে কিন্তু সেইসব মৃতদেহে কোনও আর্সেনিকের চিহ্ন পেলেন না।আর্সেনিক যদি মানব দেহের স্বাভাবিক উপাদানই হয় তাহলে তো সব ক্ষেত্রেই তা পাওয়া উচিত। ওঁরফিলার বিরুদ্ধে মত ক্রমে জোরালো হচ্ছিল। শেষমেষ এর একটা স্থায়ী মীমাংসা খুঁজতে মাঠে নামল ফ্রান্সের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ মেডিসিন।তারা সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখে, ওঁরফিলাকে নির্দেশ দিলেন— তাঁদের সামনে পরীক্ষা করে দেখাতে, কী করে তিনি আর্সেনিকের মৃত নয় এমন ব্যক্তির দেহেও আর্সেনিকের সন্ধান পেয়েছেন।

ওঁরফিলা মার্সের টেস্টের মাধ্যমেই পরীক্ষা শুরু করলেন। কিন্তু এবার যেন এক ভোজবাজি ঘটল। ওঁরফলা তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও সে মৃতদেহে কোনও আর্সেনিকের চিহ্নই পেলেন না। ভাগ্যদেবতা, ওঁরফিলার থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। তাঁর এখন পতনের শুরু।

রয়্যাল অ্যাকাডেমি অফ মেডিসিনের কর্তা-ব্যক্তিরা ঘোষণা করলেন, ‘ন্যাচারাল’ আর্সেনিক বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব মানবদেহে নেই। আর্সেনিক, মানবদেহের স্বাভাবিক উপাদান নয়। আধুনিক বিজ্ঞানও এই মতবাদকেই স্বীকৃতি দেয়। সুতরাং, ওঁরফিলা পূর্ববর্তী পরীক্ষায় আর্সেনিকে মৃত নয় এমন ব্যক্তির দেহেও আর্সেনিক পেয়েছিলেন, তার বহু কারণ থাকতে পারে— এক, সে-কালে আর্সেনিক জাত বহু দ্রব্য দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হত, তেমন কোনও নিষ্পাপ উৎস থেকেও সেই ব্যক্তির দেহে জীবদ্দশায় আর্সেনিক প্রবেশ সম্ভব। তাঁর যদি আর্সেনিকজাত কোনও ওষুধ সেবন অভ্যেস থাকলে তাহলে সম্ভব।আর্সেনিক যেসব কাঁচের যন্ত্রপাতি, উপাদান পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করেছিলেন, সে-গুলোতেও কোনওভাবে আর্সেনিক অশুদ্ধি হিসেবে রয়ে যেতে পারে।

যে গোরস্থান থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়েছিল, তার মাটি আর্সেনিকে দূষিত হতে পারে। এমন হাজারও একটা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু ওঁরফিলা সেসব গুরুত্ব দিয়ে যাচাই না করেই, শুধুমাত্র একক খ্যাতির মোহে ‘ন্যাচারাল’ আর্সেনিকের তত্ত্ব আমদানি করেছিলেন। এতদিনের বৈজ্ঞানিক প্রতিভাবলে যে-সম্মান তিনি অর্জন করেছিলেন, খ্যাতির মোহ আর আত্মগরিমায় সে সম্মান আজ ভূলুণ্ঠিত।

এ-সময়েই ফ্রান্সে শুরু হল গণঅভ্যুত্থান, ইতিহাস বিখ্যাত জুলাই বিপ্লব। রাজতন্ত্রের পাশা উল্টালো। ওঁরফিলার রাজ অনুগ্রহের ছত্রছায়াও আর রইল না। বিজ্ঞানী সমাজের একচ্ছত্র আধিপত্যের মুকুট তিনি হারালেন। কিন্তু মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতি তার হৃত সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হল। ওঁরফিলার নাম ক্রমে বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে মিলিয়ে এল। কিন্তু মার্স আর তাঁর পরীক্ষা পদ্ধতি, চিরকালীন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রয়ে গেলেন ফরেনসিক বিজ্ঞানের দুনিয়ায়। তাঁর এই পরীক্ষা পদ্ধতির হাত ধরেই ফরেনসিক বিজ্ঞানের সাবালকত্ব লাভ। এমনকী বিংশ শতকের আটের দশক পর্যন্তও বহু ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতি ছিল অন্যতম ভরসা।