উল্টো দূরবিন:পর্ব ১৮

Representative Image

অলিগলির গন্ধ

ভোলাময়রার নাম বলতেই তো ভুলে গেছি। ভোলাময়রা ছিলেন বিখ্যাত কবিয়াল। তাঁর গুরু হরু ঠাকুর। তিনিও বাগবাজারের। ‘আমি ময়রা ভোলা, হরুর চ্যালা বাগবাজারে রই…।’ রসগোল্লার নায়ক নবীন দাস বা নবীন ময়রা ছিলেন, ভোলাময়রার নাতজামাই। বিখ্যাত জাতীয়তাবাদী পত্রিকা, ‘অমৃতবাজার’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিশিরকুমার ঘোষের বাড়িও এখানেই ছিল। ওই বাড়িতেই ‘যুগান্তর’-এর অফিস। আনন্দ চ্যাটার্জি লেন। শিশিরকুমারের পরিবার ছিল বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত। শিশির কুমারের ছেলে তুষারকান্তি ঘোষ, ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ওঁরাই ‘অমৃত’ পত্রিকাটি করতেন। ‘অমৃত’-তেই আমার প্রথম গল্প ছাপা হয়। এই ঘোষ বাড়িতে, দোলপূর্ণিমার পর, ছাদে প্যান্ডেল বেঁধে নাম-গান হত, কীর্তন হত। এখানে ছবি বন্দ্যোপাধ্যায় এসে গান করেছেন, কান্তিলতা বলে একজন আসতেন, ওঁর জন্য অনেক দূর থেকে লোক আসত। আমার ঠাকুর্মা ছিলেন কান্তিলতার খুব ভক্ত, ঠাকুর্মাকে নিয়ে ও-বাড়িতে দু-তিনবার গিয়েছি। কান্তিলতা কীর্তন গাইতেন না শুধু। কথকতা করতেন। গল্প এবং গান। শ্রীরাধার বিভিন্ন সখীর কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গী আলাদা করে বলতেন।

অন্নদা চ্যাটার্জি লেনের পাশেই, শচীন মিত্র লেন। শচীন মিত্র ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বড় মর্মান্তিক। গান্ধীবাদী শচীন মিত্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী মিছিলেই ছুরির আঘাতে মারা যান। এই শচীন মিত্র লেনে, ছোটবেলায় দেখেছি তুবড়ি প্রতিযোগিতা হত। তুবড়ি দু’রকম। বসানো তুবড়ি আর উড়ন তুবড়ি, অনেক বাড়িতেই কালীপুজোর আগে তুবড়ি তৈরি হত। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে ঘরের তুবড়ি শিল্পও ধ্বংস হয়েছে। বাজারে কাঠ-কয়লা, গন্ধক, সোরা, লোহাচুর, অ্যালুমিনিয়াম-চুর কিনতে পাওয়া যেত। এসব হল তুবড়ির মশলা, বাড়ির কোনও দাদা, তুবরির ফর্মুলা জানত। সেটা যথাসম্ভব গোপন রাখার চেষ্টা করত। তিন দুই এক এক মানে, তিন ভাগ কাঠ কয়লা, দু’ভাগ গন্ধক, দু’ভাগ সোরা এবং এক ভাগ লোহাচুর। এটা ছয় চার তিন দুইও হতে পারে। অনেক তুবড়ি-বিষারদ গন্ধকের সঙ্গে সামান্য হরিতাল, কেউ ফিটকিরি ইত্যাদি মেশাত। উত্তর কলকাতার তুবড়ি ছিল বিখ্যাত, তার মধ্যে সেরা বাগবাজার। ঘুড়ি শিল্পেও সেরা বাগবাজার। থুড়ি, ঘুড়ির কথা এখন থাক। 

স্টিমারের ভোঁ শুনে মনে-মনে তাকে ভাবতাম বাঘের ডাক!
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১৭…

শচীন মিত্র লেনের কথায় আসি, ওখানে একটা ক্লাব, বসানো তুবড়ি-প্রতিযোগিতা করত। ব্যক্তি মানুষও অংশ নিতে পারত, আবার পরিবার হিসেবেও অংশ নেওয়া যেত। যেমন, কাশী বোস লেনের মিত্র পরিবার, ফড়িয়াপুকুরের লাহা পরিবার, কিম্বা অন্নদা নিয়োগী লেনের, রায় বাড়ি…। বিচারক থাকতেন, যাঁরা তুবড়ি বিশারদ। উচ্চতা, ঝাড়, স্থায়িত্ব— ইত্যাদি বিচার করে নম্বর হত। তুবড়ি প্রতিযোগিতা হত রাজবল্লভ পাড়াতেও, কিন্তু শচীন মিত্র লেনের তুবড়ি প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পাওয়াটা ছিল সম্মানের।

বাগবাজারের বসু বাড়িটা বড় বিখ্যাত। বিরাট-বিরাট থামওয়ালা বাড়ি, বাড়ির লাগোয়া জমি অনেকটা। ওই মাঠ এখন আর নেই। বাগবাজার মাল্টিপারপাস গার্লস স্কুল হয়েছে। যখন স্কুল হয়নি, মাঠ, ওই মাঠে নেতাজি জয়ন্তীতে অনুষ্ঠান হত। ওই মাঠের খুব ছোটবেলার একটা স্মৃতি ঝলসে উঠল। একটা সিঁড়িতে এক ধুতি পরা যুবক, কোট-প্যান্ট পরা সাহেবকে ঘুঁষি মারছে। তলায় লেখা, ওটেন সাহেব ভারত বিরোধী কথা বলায়, সুভাষ উচিত শিক্ষা দিলেন। ওখানে বিকেলবেলায় বাজি পোড়ানো হতো ২৩ জানুয়ারিতে, ওই মাঠটাকে বলতাম নন্দ বোসের মাঠ, নন্দলাল বসুর সেই মস্ত বাড়িটি এখন হেরিটেজ। এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ওই বাড়ির এক তলায় একসময়ে অনেক গিয়েছি; ওদের বাড়ির ছেলে অমিত বসু ছিল আমার বন্ধু। অমিত শ্যামবাজার টাউন স্কুলে পড়ত। তখন এইসব বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলোতে, বড় ঘরের সন্তানদের সঙ্গেই তথাকথিত ছোট ঘরের সন্তানরাও অনায়াসে পড়ত, বন্ধুত্ব হত। এই নন্দলাল বসুর বাড়ির একতলায়, একটা বেশ বড় বসার ঘর ছিল। তার পাশে পারিবারিক লাইব্রেরি, তার পিছনে অমিতের নিজস্ব ঘর, ওখানে নিয়ে যেত; তখন কারও নিজস্ব ঘর কল্পনা করা যেত না। নন্দ বোসের বাড়ির লাগোয়া উঠোনে এবং বারান্দায়, বছরে দু’বার সাহিত্যসভাও হত। এরকম একটা সভায়, সুব্রত সেনগুপ্তের মুখে ‘কমলালেবু’ গল্পটা শুনেছিলাম একেবারেই অন্যরকম লেগেছিল। শাস্ত্র বিরোধী গল্প এরকম একটা সাহিত্যসভায়! জনৈক স্বপন চক্রবর্তী, আমার সদ্য অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাঁধানো দাঁত’ গল্পটা পড়ে দিয়েছিল। এরপরই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল পিতৃদত্ত নামটা পাল্টাতে হবে লেখার ক্ষেত্রে।

নন্দলাল বসু আর তার ভাই পশুপতি বসুর নামে দুটো রাস্তা আছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়, সে-বছরের ১৬ অক্টোবর তারিখে, রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন এই বাড়িতে। এই বাড়ি থেকেই রাখি-বন্ধনের সূচনা। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল’ এই উৎসবের জন্যই লেখা হয়েছিল। এই বাড়িটা শেষ হয় ১৮৭৮ সালে, সে-সময়ের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্থপতি নীলমণি মিত্র এর নকশা তৈরি করেছিলেন। ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর বাইরে গিয়ে, ভারতীয় এবং মুসলিম স্থাপত্য মিশিয়ে, বাড়িটা তৈরি করেছিলেন। এই বাড়িতে এখন বংশধরেরা কেউ থাকে না, পাশেই একটা ছোট দেশলাই-বাক্সর মতো আধুনিক বাড়িতে, বংশধরদের এক অংশ থাকে। অমিত চলে গেছে নিউ আলিপুরে, এই বসু বাড়িতে যাবার গলিতেই এখন নীলাচল নামে খাবারের দোকান, মাছের কচুরির কারণে সম্প্রতি বিখ্যাত।

বাগবাজারে কয়েকটি বিখ্যাত তেলেভাজার দোকানের কথা বলি। প্রধান দোকানটির নাম রামগোপালের তেলেভাজার দোকান। বহুদিন উঠে গেছে। নয়ের দশকের প্রথম দিকেই দোকানটা উঠে যায়, এই দোকানটাই পৃথিবীর একমাত্র তেলেভাজার ফাইভস্টার রেস্টুরেন্ট। শ্বেত পাথরের টেবিলে, কলাপাতায় গরম-গরম অর্গানিক তেলেভাজা পরিবেশন করা হত, যা খেয়ে সত্যিই অর্গাজম হত। তেলেভাজা প্রেমীরা সব সময়ে বসার সিট পেত না। ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে, ছাতা মাথায় দিয়ে তেলেভাজা খেতে আসত বাগবাজারিরা। খদ্দের বসলে, বয় এসে অর্ডার নিত। ধরুন, আমি বললাম, ‘একটা বেগুনি, দুটো কচুরি’। বয় বলল, ‘কচুরি খান আগে, বেগুনি ছাড়া হবে, আলুর চপের পর; গরম আলুর চপ পাবেন…’ কচুরির গায়ে দু-আঙুলের টোকা দিলে, হিং-গন্ধ মাখা ধোঁয়া উঠত, সঙ্গে আলু-কুমড়োর তরকারি। আলুর খোসা ছাড়ানো হত না, আমরা নিজেরা দু-আঙুলের খেলায় খোসা ছাড়ালে, আলুসুন্দরীর মসৃণ গাত্রবর্ণ দেখতাম। কুমড়োর তরকারি-সহ কচুরি খেয়েছিলাম, বিডন স্ট্রিটের দোকানে। আর কোথাও নয়। সঙ্গে চাটনি দেওয়া হত। বেগুনি, আলুর চপ, খাস্তা কচুরি, ফুলুরি, হিং-কচুরি এবং ঘুগনি ছিল আইটেম। পেঁয়াজি হত না, কারণ এটা ছিল নিরামিষ তেলেভাজার দোকান। বিধবাগণও এই দোকানের খাবার খেতেন। অনেকে একাদশী সারতেন এই দোকানের কচুরিতে।  ঘুগনিও নিরামিষ, কিন্তু কী সুস্বাদু! নারকোলখকুচি থাকত, আর কী গোপন কথা ওর মধ্যে থেকে যেত জানি না, রামগোপালের দোকান সকাল-বিকেল দু’বেলাই খোলা থাকত। সকালে কচুরি নয়, লুচি হত এবং হালুয়া তরকারিও থাকত। রামগোপালবাবুর মৃত্যুর পর, তার পুত্রদের মধ্যে মনান্তরে এই অনন্য দোকানটা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর কিছুটা এগোলেই পণ্ডিত গৌরীনাথ শাস্ত্রীর বাড়ি, যুগান্তরের গলি, তারপরই পটলার তেলেভাজার দোকান। দোকানে কোনও সাইনবোর্ড ছিল না, আজও নেই। পটলার দোকানে সকালবেলায় ছোট-ছোট কচুরি পাওয়া যেত। গুটে কচুরি নামে বিখ্যাত ছিল। সকালের জলখাবার হিসেবে, বাগবাজারের গেরস্থ বাড়িতে শালপাতার চ্যাঙারি ঢুকত। পটলা, যিনি এই প্রতিষ্ঠানের জন্মদাতা, তিনি নেই অনেকদিন। তার পরবর্তী প্রজন্মের কেউ এখন এই দোকানে বসেন। তাঁর মুখে কোনও হাসি নেই, সদা গম্ভীর। শোকেসে রয়েছে ধোকা-ফুলুরি-আলুরচপ-কচুরি-লড়াইয়ের চপ, শীতকালে ফুলকপির বড়া। লড়াইয়ের চপ মানে, ভেজিটেবল চপ। কেন এমন নামে বিখ্যাত হল জানি না, হতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এই চপটি প্রথম এসেছিল।

খদ্দের বসলে, বয় এসে অর্ডার নিত। ধরুন, আমি বললাম, ‘একটা বেগুনি, দুটো কচুরি’। বয় বলল, ‘কচুরি খান আগে, বেগুনি ছাড়া হবে, আলুর চপের পর; গরম আলুর চপ পাবেন…’ কচুরির গায়ে দু-আঙুলের টোকা দিলে, হিং-গন্ধ মাখা ধোঁয়া উঠত, সঙ্গে আলু-কুমড়োর তরকারি। আলুর খোসা ছাড়ানো হত না, আমরা নিজেরা দু-আঙুলের খেলায় খোসা ছাড়ালে, আলুসুন্দরীর মসৃণ গাত্রবর্ণ দেখতাম।

এমনিতে তেলেভাজা বলতে, বেগুনি, আলুর চপ ফুলুরি পেঁয়াজি বোঝায়। ভেজিটেবল চপ অনেক পরে এসেছে। ভেজিটেবল চপে, বিস্কুটের গুঁড়োর প্রলেপ থাকে। এই প্রলেপিত ভাজাভুজি রেস্টুরেন্টের সামগ্রী। তেলেভাজায় বেসনের প্রলেপ থাকে শুধু। কড়কড়ে করার জন্য হয়তো চালের গুঁড়িও। বিস্কুটগুঁড়ো মাখানো চপ তেলেভাজার দোকানে এসেছে  অনেক পরে। মোচার চপেও বিস্কুট গুঁড়ো থাকে।

এখনও পটলার দোকানে তেলেভাজার মান খুব ভাল। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, কোনটা গরম হবে? কোনও জবাব পাবেন না, অন্তর্গত অর্থ হল— ‘আপনি কিছু জানেন না’ এখানে অল্প করেই ভাজা হয়, বারবার ভাজা হয়। সুতরাং সবই গরম পাবেন। আরেকটা দোকান আছে গিরিশ মঞ্চের উল্টোদিকে। এটা ওড়িয়া দোকান। একটা সময়ে বাগবাজার অঞ্চলে, প্রচুর উড়িষ্যার লোক থাকতেন। বেশ কয়েকটি সস্তার হোটেল ছিল, যেখানে ধোকা, ডালমা এবং দইবড়া পাওয়া যেত। ডালমা একটি ওড়িয়া পদ, ডাল এবং নানা রকম সবজি দিয়ে তৈরি।

এছাড়াও, আরও কয়েকটি ছোট তেলেভাজার দোকান ছিল, এখনও আছে কলকাতার বহু জায়গায় তেলেভাজার ভাল দোকান প্রায় উঠে গেছে। সেখানে রোল, চাউ— ইত্যাদির দোকান হয়ে গেছে। রামগোপালের তেলেভাজার দোকানটাইতো দুটো ভাগ হয়ে, এইসব চাউ-টাউ হয়েছে। আমি ছোটবেলায় নন্দলাল বসু লেনের একটা কেবিনে, মাঝে-মাঝে পাউরুটি ডুবিয়ে আলুর দম খেয়েছি, আহা! আর জীবনে দু’বার মাংসর কোরমা, এক পিস মাত্র মটন। এখন বাগবাজার স্ট্রিট কী করে যেন ফুডহাব হয়ে গেছে। নন্দলাল বসুর গলি থেকে শুরু করে, পর-পর নানাবিধ খাদ্যসম্ভার। মাছের কচুরি, কাবাব, কুলফি, তেলেভাজা, ক্ষীর, দই খাজাগজা, লবঙ্গলতিকা, বিভিন্ন মিঠাই ইত্যাদি পরপর…