বিষের রাজা রাজার বিষ
মনে করুন একটি গ্রাম। গ্রামবাংলার মতো গ্রাম নয়। পাহাড়ের কোলে রোমানিয়া কিংবা ট্রান্সিলভ্যানিয়ার কোনও গ্রাম। সময়টা, ওই ধরে নিন অষ্টাদশ শতক। ছিমছাম নিরুদ্বিগ্ন গ্রাম। প্রজারা রাজ-অনুগ্রহে বেশ সুখে-শান্তিতেই ছিল। ছিল বলছি, কারণ— ইদানীং গ্রামের লোকজনের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। রাজতন্ত্রের খামখেয়ালিপনা তাঁদের চিন্তার কারণ নয়, কারণ দুশ্চিন্তায় রাজামশাইয়ের ঘুমও হচ্ছে না। রাজা থেকে প্রজা সকলের দুশ্চিন্তার কারণটা একটু অদ্ভুত, অলৌকিক। মাসখানেক আগে গ্রামের এক বুড়ো বেশ কিছুদিন ভুগে মারা গেছে। আর তার পরেই গ্রামে যেন মড়ক লেগেছে। শিশু থেকে তরতাজা যুবক— টপাটপ মরছে, কেউ-বা জীবনশক্তি হারিয়ে, বোকাভোলা হয়ে যাচ্ছে।
গ্রামের লোকজন, চার্চের ফাদারের কাছে গেছিল শলা-পরামর্শ করতে। চার্চের ফাদারও অবস্থা বিশেষ সুবিধার বুঝছেন না। তার ধারণা, এসবের পিছনে কোনও অলৌকিক অশুভ শক্তি হাত আছে। গ্রামে আগেও তো বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর তো গ্রামে এমন মড়ক লাগেনি! অতঃপর, চার্চের অভিজ্ঞ ফাদার মনে করলেন— নিশ্চয়ই ওই বুড়োর মৃত শরীরে, কোনও পিশাচ আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ, মৃত বুড়ো এখন ভ্যাম্পায়ার! সেই ভ্যাম্পায়ারই নিশুতি রাতে সারা গ্রামে চড়ে বেড়াচ্ছে, শিশু আর জোয়ানদের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে! চার্চের ফাদারের স্থির বিশ্বাস, কবর খুঁড়ে কফিনের ডালা খুললে দেখা যাবে— ও বুড়োর লাশ এখনও তরতাজা রয়েছে। জীবন্ত মানুষের থেকে জীবনশক্তি শুয়ে নিয়ে সে লাশ এখনও টাটকা থাকবে। কিন্তু এসবের তো একটা বিহিত করা দরকার! চার্চের ফাদার তার নিদানও বাতলে দিলেন। সেই মতোই গ্রামের পুরুষরা জড়ো হলেন চার্চের প্রাঙ্গনে। হাতে তাদের লাঠিসোটা, শাবল-বল্লম। যদিও দিনেরবেলায় ভ্যাম্পায়াররা নিষ্ক্রিয় থাকে, তবুও সাবধানের মার নেই।
স্বাধীন দেশে প্রথম নারীর মৃত্যুদণ্ডের কারণ ছিল আর্সেনিক? পড়ুন: বিষ-রূপ দর্শন পর্ব ৪…
আকাশ জুড়ে মেঘ। দমকা ঠান্ডা হাওয়ায় আসন্ন বৃষ্টির আমেজ। গ্রামের শেষপ্রান্তে গোরস্থান। পুরুষরা দল বেঁধে সে-দিকেই চলেছে। মিছিলের অগ্রভাগে চার্চের ফাদার আর তাঁর এক সঙ্গী। তাঁরা দু’জনে বাইবেল আওড়াচ্ছেন আর মন্ত্রপুত পবিত্রজল ছিটিয়ে চলেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দলটা এসে পড়ল গোরস্থানে। বাতাসের বেগ আরও বাড়ছে। দু’জন শক্ত-সামর্থ পুরুষ শাবলের ঘায়ে কবরের মাটি সরাতে শুরু করল। ঘণ্টাখানেক পর, ছ’ফুট অন্দরে কফিন দেখা গেল। কফিনের কাঠ এর মধ্যেই অনেকটা পচে গেছে। চার্চের ফাদার প্রবল কন্ঠে বাইবেল থেকে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন, কফিনের গায়ে ছিটিয়ে দিচ্ছেন হোলি ওয়াটার।
ফাদারের নির্দেশে চারজন পুরুষ ভয়ে-ভয়ে কফিন খোলার জন্য গর্তের ভিতর নামলেন। দু’জন ডালা খুলবেন, আর বাকি দু’জন শাবল উঁচিয়ে থাকবেন আত্মরক্ষার জন্য। কফিনের ডালা খোলা হতেই চমকে উঠল সকলে। ফাদারের অনুমানই ঠিক। বুড়ো প্রায় একমাস মরেছে, অথচ তার লাশ এখনও এতটা টাটকা, তরতাজা! পচনের বিশেষ লক্ষণ নেই। শুধু একটু যেন শুকিয়ে গেছে। তাঁদের সামনে চোখ বুজে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে কোনও মনুষ্য মৃতদেহ নয়, সাক্ষাৎ শয়তান, ভ্যাম্পায়ার! রাত হলেই সে জেগে উঠবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। ফাদারের নির্দেশে দু’জন সজোরে শাবল গেঁথে দিল বুড়োর হৃদপিণ্ড ভেদ করে। চলকে উঠল লাল টাটকা রক্ত! ভ্যাম্পায়ারকে নিকেশ করার এই একমাত্র তরিকা।
উপরোক্ত কাহিনিটি কল্প কাহিনি হলেও, আবহটি একদম খাঁটি। আপনি যদি মধ্যযুগ (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ) থেকে ষোড়শ-সপ্তদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের ইতিহাস ঘাঁটেন, তাহলে হবহু এমন অনেক ঘটনাই চোখে পড়বে। পরবর্তী সময়ে এমন সব ঘটনাই উঠেছে বিখ্যাত সব গথিক সাহিত্যের অনুপ্রেরণা। আধুনিক সময়ে বিজ্ঞানীরা এমন সব ঘটনার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও খুঁজছেন— গ্রামে হঠাৎ করে অমন মড়ক লাগা যে ভাইরাস কী ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব, আধুনিক যুগে তা কাউকে আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে হবে না। কিন্তু, মাসাধিক কালের বাসি লাশ কী করে অমন তরতাজা থাকে?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা নানান বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যার মধ্যে, এক বড় অংশের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর কারণ ছিল আর্সেনিক। সমাধিস্থ মৃতদেহর পচন— স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির আদ্রতা, মাটির রাসায়নিক চরিত্র, মৃতদেহ অভ্যন্তরীণ উৎসেচকদের কার্যকলাপ, অনুজীবীদের ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি নানা প্রভাবকের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বহুকাল থেকেই মনে করা হয়, আর্সেনিকের পচনরোধী গুণ আছে। আর্সেনিক, মৃতদেহের পচন-প্রক্রিয়াকে মন্দীভূত করে পচনের সময়কালকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। কীভাবে তা সম্ভব হয়, সেই প্রক্রিয়াটি বিশেষ পরিষ্কার নয়, কিন্তু আর্সেনিক আক্রান্ত মৃতদেহ সম্পর্কে এ-পর্যবেক্ষণটি নির্ভেজাল। আর্সেনিকের কারণে মৃত্যু ঘটেছে এমন ক্ষেত্রে, যখনই ফরেন্সিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে মৃতদেহ কবর থেকে তোলা হয়েছে, তখনই মৃতদেহে অমন টাটকা তরতাজা ভাব লক্ষ করা গেছে। এ শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোতেই নয়, ভারতের মতো গ্রীষ্ম-প্রধান দেশগুলোতেও একই ব্যাপার লক্ষ করা গেছে। হতে পারে, সে ব্যক্তিকে আর্সেনিক দিয়ে খুন করা হয়েছিল কিংবা আর্সেনিক অন্য কোনও স্বাভাবিক উৎস থেকে জীবদ্দশায় সেই ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করেছিল। আর তা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ভ্যাম্পায়ারের উপকথা।
১৮০৬ নাগাদ বার্লিনের ডাক্তার ওয়েলপার এই বিষয়ে দীর্ঘদিন পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন, আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মৃত কুকুরের অন্ত্র আর পেশি একবছর পরেও সতেজ থাকে! আর্সেনিকের এই পচনরোধী গুণ থাকার কারণেই এককালে মৃতদেহ সংরক্ষণকারী মিশ্রনেও (এমব্লেমিং ফ্লুইড) আর্সেনিক ব্যবহারের চল ছিল। সুতরাং আর্সেনিকের সঙ্গে তার মৃতদেহের পচনরোধী গুণটির সংযোগ স্থাপন হল, তখন এই গুণটিই হয়ে উঠল আর্সেনিক বিষক্রিয়া চিহ্নিত করণের প্রাথমিক পদক্ষেপ। কয়েক মাসের বাসি মৃতদেহে টাটকা ভাব লক্ষ করলেই, তদন্তকারীদের মনে প্রথমেই আসে আর্সেনিকের কথা।
ঠিক যেমন ঘটেছিল ১৮৪০ নাগাদ। সে-বছর সেন্ট হেলেনায় সম্রাট নেপোলিয়নের মৃতদেহ, মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর বাদে কবর খুঁড়ে তোলা হল ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনার জন্য। কফিন খুলতেই সবাই তাজ্জব বনে গেলেন। সম্রাটের দেহ তখনও প্রায় অবিকৃত রয়েছে! মৃত্যুর কুড়ি বছর বাদেও! সে-সময়েও অনেকে আর্সেনিকের ব্যাপারেই সন্দেহ করেছিলেন। এমনকী পরবর্তী সময়ে সম্রাটের মৃত্যুর সঙ্গে আর্সেনিকের প্রত্যক্ষ সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা না গেলেও, নেপোলিয়নের মাথার চুল পরীক্ষা করে আর্সেনিকের অস্তিত্ব মেলে। কিন্তু মৃতদেহ সম্পর্কে এই পর্যবেক্ষণ তো আর আদালত গ্রাহ্য প্রমাণ নয়, আলদাত চায় মৃতদেহে বিষের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
বিভিন্ন ধাতু নিষ্কাশন করতে গিয়ে আর্সেনিকের অক্সাইড জন্ম নিল, সেই আর্সেনিকের অক্সাইডের যখন দহন করা হল, তখন রসুনের মতো ঝাঁঝালো গন্ধ বেরল। আর্সেনিক চিহ্নিতকরণের এই ছিল প্রথম রাসায়নিক প্রক্রিয়া। কিন্তু অমন রসুনের গন্ধ তো আরও অন্য কোনও জৈব-অজৈব পদার্থেরও থাকতে পারে। তাই ওটি ঠিক আর্সেনিকের উপস্থিতির নির্ভযোগ্য প্রমাণ নয়। এর পরে প্রায় দু’শতাব্দী ধরে দুনিয়ার রসায়নবিদরা আর্সেনিক চিহ্নিতকরণের জন্য নানা রাসায়নিক বিক্রিয়া আবিষ্কার করলেন।
কার্ল উইলিয়াম শিলি, আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইডের সঙ্গে, জিঙ্ক আর নাইট্রিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া ঘটালেন। তাতে উৎপন্ন হল রসুনের গন্ধ যুক্ত আর্সাইন গ্যাস। শিলি আরও একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, যেখানে আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইড, সোডিয়াম কার্বনেট অর্থাৎ কাপড় কাচার সোডা আর তুঁতে বা কপার সালফেটের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কপার ও আর্সেনিকের এক উজ্জ্বল সবুজ রঙের যৌগ তৈরি করল। আর্সেনিক চিহ্নিতকরণ ছাড়াও, এই বিক্রিয়াজাত সবুজ রঙের পদার্থটি সে-সময়ে শিল্পরঞ্জক হিসেবেও ব্যবহৃত হত। জার্মান চিকিৎসক মেৎস্যগার একটা বিক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন। সেখানে, আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইড উত্তপ্ত চারকোল বা কার্বনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, ধূসর রঙের ধাতব আর্সেনিক উৎপন্ন করে।
হোমিওপ্যাথির জনক স্যামুয়েল হ্যানিম্যানও একটা বিক্রিয়া আবিস্কার করেছিলেন, যেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের উপস্থিতিতে আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইড বিক্রিয়া করে হলুদ রঙের অধঃক্ষেপ উৎপন্ন হয়। এসব বিক্রিয়া আর্সেনিক চিহ্নিতকরণে কিছু ক্ষেত্রে আদালতে ফরেন্সিক বিজ্ঞানীদের সাফল্য এনে দিলেও, বাস্তবিক ক্ষেত্রে এসব বিক্রিয়ার দুর্বলতাগুলোও ক্রমে পরিস্ফুট হচ্ছিল।
প্রথমত, আর্সেনিকের সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলে এসব বিক্রিয়াজাত রঙবেরঙের যৌগগুলো খুব দুস্থিত। আদালতে পেশ করার আগেই ক্রমে বিবর্ণ হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আর্সেনিক বাদেও রসায়নের দুনিয়ায় অনেক পদার্থই একই রঙের বিক্রিয়াজাত যৌগ উৎপন্ন করতে পারে। সুতরাং, বিক্রিয়াজাত যৌগের রঙ ভিত্তিক আর্সেনিকের চিহ্নিত করণের অভিপ্রায় অনেক সময়েই আদালতে হোঁচট খেত। আর বিচারকেরা তো রসায়ন বোঝেন না , তারা আর্সেনিকের উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে এসব রঙবেরঙের বিক্রিয়াকে গুরুত্ব দিতেন না। ঠিক এমনই এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেবার পড়েছিলেন জন মার্স।
ঘটনাটা ঘটে ১৮৩২ নাগাদ। কোর্টে একটা কেস উঠেছে। অভিযোগ— অভিযুক্ত জন বডেল, তার দাদুকে সম্পত্তির লোভে খাবারে আর্সেনিক মিশিয়ে খুন করেছে। দোষী সাব্যস্ত করার আগে তো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তো উপযুক্ত ফরেনসিক প্রমাণ প্রয়োজন। তাই মৃতের দেহাংশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হল, উলউইচের রয়্যাল মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে। তার মাথায় তখন বিখ্যাত রসায়নবিদ, মরা ব্যাঙের ঠ্যাং নাচানো বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে। ফ্যারাডে মহা ব্যস্ত মানুষ, তাঁর এসব খুন-খারাপির কেসে মাথা ঘামানোর সময় নেই। তিনি তাঁরই এক অধঃস্তন বিজ্ঞানী জেমস মার্সকে দায়িত্ব দিলেন।
মার্স তিরিশঊর্ধ্ব তরুণ বিজ্ঞানী। তিনি হ্যানিম্যানের প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী, মৃতের দেহাংশ পরীক্ষা করে আর্সেনিক ট্রাই সালফাইডের হলুদ অধঃক্ষেপ পেলেন। অর্থাৎ, প্রমাণিত হল— মৃতর শরীরে আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু মার্স যখন রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল আদালতে দাখিল করলেন, ততদিনে সেই হলুদ অধঃক্ষেপ বিবর্ণ হয়ে গেছে। বিচারক এই ফরেনসিক প্রমাণকে গ্রাহ্য করলেন না। উপযুক্ত ফরেনসিক প্রমাণের অভাবে অন্যান্য তথ্য প্রমাণ আসামীর বিরুদ্ধে থাকলেও, আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে গেল। পরোক্ষভাবে সমস্ত দায় এসে পড়ল মার্সের উপর। আসামীও মার্সের দিকে অবজ্ঞার হাসি হাসলেন। পরাজিত মার্স, অফিসে ফিরে এলেন। কিন্তু রোখ চেপে গেল মার্সের। কয়েক বছরের অক্লান্ত গবেষণায় মার্স আবিস্কার করলেন আর্সেনিক চিহ্নিতকরণের অভিনব এক পদ্ধতি। যা সহজ-সরল, অথচ দুর্দান্ত উপযোগী।
মার্স একটি পাত্রে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড নিলেন (সালফিউরিক বা নাইট্রিক অ্যাসিডও চলতে পারে)। তার মধ্যে পরীক্ষিত দ্রব্যকে রাখলেন। এবার সেই দ্রবণে ফেলে দিলেন একটি জিঙ্কের টুকরো। জিঙ্কের সঙ্গে অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা একটি নলের মাধ্যমে বেরোতে থাকে। পরীক্ষিত দ্রব্যটির মধ্যে যদি আর্সেনিক থাকে, তা ওই হাইড্রোজেন গ্যাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আর্সাইন গ্যাস হিসেবে, নল দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এবার ওই নলের মুখে জ্বলন্ত দেশলাই ধরলে, আর্সাইনে অতিরিক্ত হাইড্রোজেনের উপস্থিতির জন্য আর্সাইন হাল্কা শিখায় জ্বলতে থাকে। এবার একটি ঠান্ডা সাদা রঙের পোর্সেলিনের প্লেট ওই শিখার সামনে একটু কাত করে ধরলে, আর্সাইনের অসম্পূর্ণ দহনের ফলে, ধূসর মৌল আর্সেনিক ফোঁটা-ফোঁটা করে পোর্সেলিনের গায়ে জমতে-জমতে উজ্জ্বল ধূসর আর্সেনিক মৌলের ফিল্ম তৈরি হয়। আবার এই উজ্জ্বল শিখাকে একটি দু’মুখ খোলা কাঁচের নলের মধ্যে প্রবেশ করালে, আর্সাইন গ্যাসের সম্পূর্ণ দহনের ফলে আর্সেনিক অক্সাইডের সাদা গুঁড়ো কাচের নলের গায়ে জমা হয়, সেই সঙ্গে মৃদু ঝাঁঝালো রসুনের গন্ধও টের পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মার্সের এই বিক্রিয়ায় পরীক্ষিত দ্রব্যে আর্সেনিকের উপস্থিতি চিহ্নিতকরণের জন্য, আর্সেনিককে কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রঙবেরঙের বিক্রিয়াজাত যৌগে পরিণত করার প্রয়োজন পড়ল না। বরং এ-বিক্রিয়া পরীক্ষিত দ্রব্যে আর্সেনিক থাকলে, তাকে সরাসরি তার আদি মৌল রূপে টেনে বের করার ক্ষমতা রাখে।
কার্ল উইলিয়াম শিলি, আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইডের সঙ্গে, জিঙ্ক আর নাইট্রিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া ঘটালেন। তাতে উৎপন্ন হল রসুনের গন্ধ যুক্ত আর্সাইন গ্যাস। শিলি আরও একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, যেখানে আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইড, সোডিয়াম কার্বনেট অর্থাৎ কাপড় কাচার সোডা আর তুঁতে বা কপার সালফেটের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কপার ও আর্সেনিকের এক উজ্জ্বল সবুজ রঙের যৌগ তৈরি করল। আর্সেনিক চিহ্নিতকরণ ছাড়াও, এই বিক্রিয়াজাত সবুজ রঙের পদার্থটি সে-সময়ে শিল্পরঞ্জক হিসেবেও ব্যবহৃত হত।
উপরন্তু এই প্রক্রিয়ায় আর্সেনিককে মৌল, অক্সাইডের যৌগ এবং আর্সাইন গ্যাস— এই তিন রূপেই পাওয়া সম্ভব। তাই যে-বিচারকের রসায়ন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞানও নেই, তাকেও এই পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে আর্সেনিকের উপস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব। মার্সের এই বিক্রিয়া এতটাই সংবেদনশীল যে, ফাউলারের সলিউশন, যাতে দ্রবীভূত আর্সেনিকের পরিমাণ মোট দ্রবণের মাত্র এক শতাংশ, তার এক ফোঁটা থেকেও মার্সের এই পরীক্ষা আর্সেনিক শনাক্তকরণের ক্ষমতা রাখে।
১৮৩৬ নাগাদ এডিনবরা ফিলোজফিকাল জার্নালে মার্স তাঁর এই আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করলেন। মার্স ছিলেন সামান্য এক কর্মচারী। তাই, তাঁর এই নতুন আবিষ্কারের জন্য তিনি পুরস্কার, চেনা-পরিচিতের পিঠ চাপড়ানি পেলেও, তাঁর আবিষ্কৃত এই পদ্ধতি ফরেনসিকের দুনিয়ায় তেমন গ্রহণযোগ্যতা তখনও পেল না। দু’একটি আর্সেনিক-ঘটিত কেসে তার পরীক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করে সাফল্য মিললেও, আদালত তখনও এই পরীক্ষা পদ্ধতির নির্ভুলতা নিয়ে বেশ সন্দিহান। বিজ্ঞানী মহলের কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের দরাজ প্রশংসাই একমাত্র ফরেনসিক মহলে মার্স টেস্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। তা ঘটলও অচিরেই, ইংল্যান্ডের গণ্ডি পেরিয়ে ফরাসি দেশে।
সে-সময়ে ফ্রান্সের বিখ্যাত রসায়নবিদ ছিলেন ওঁরফিলা। ওঁরফিলা ছিলেন সে-কালের ফরেন্সিক টক্সিকোলজির গডফাদার। সারা দুনিয়া জুড়ে তাঁর নাম-ডাক। ফ্রান্সের রাজপরিবারের সঙ্গেও ওঁরফিলার ঘনিষ্ঠতা। মাথার উপর রাজ অনুগ্রহের ছত্রছায়া থাকায় সামাজিক প্রতিপত্তিও কম ছিল না তাঁর। আর, দেশ-কাল নির্বিশেষে শাসক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্বরাই বুদ্ধিবৃত্তি মহলে চিন্তা-ভাবনার অভিমুখ নির্ধারণ করে দেয়। ওঁরফিলাও তাই হয়ে উঠলেন ফ্রান্সের ফরেন্সিক টক্সিকোলজির দুনিয়ার একচ্ছত্র সম্রাট। ফরেন্সিক টক্সিকোলজিতে তাঁর নির্ণীত হাইপোথিসিসের অনেক বিরুদ্ধমত থাকলেও, আদালতের সামনে সে-সব বিশেষ পাত্তা পেত না, ওঁরফিলাও তার প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানীদের মতামত বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। আদালতে কোনও জটিল কেস উঠলে, ওঁরফিলার টক্সিকোলজি সংক্রান্ত মতামতের উপর ভিত্তি করেই বিচারকরা রায় দিতেন। ফ্রান্স জুড়ে তখন তাঁর যা প্রতিপত্তি, তার মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে রায় দেবেন, এমন বুকেরপাটা ক’জন বিচারকের আছে!

এডিনবরা জার্নালে মার্সের লেখাটা পড়ে ওঁরফিলা চমকে উঠলেন। এ ছোকরা করেছে কী! সামান্য সব উপকরণ দিয়েই এ যে বাজিমাত করেছে! রসায়নের পরিচিত সব বিক্রিয়ার মধ্যেই যে আর্সেনিক চিহ্নিতকরণের উপায় লুকিয়ে ছিল, এ ছোকরা তা লক্ষ করেছে, অথচ দুনিয়ার তাবড়-তাবড় বিজ্ঞানীদের চোখেই তা পড়েনি! মার্সের এই পরীক্ষা পদ্ধতি যে ফরেনসিক বিজ্ঞানের জগতে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তা বিলক্ষণ বুঝেছেন ওঁরফিলা। আর সে-কারণেই, আবার তাঁর বদবুদ্ধি চাগাড় দিয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে, শুধু প্রতিভা থাকলে চলে না; আর্থিক আনুকূল্য, সামাজিক পরিচিতি এসবও প্রয়োজন। কিন্তু ছোট বৈজ্ঞানিকদের সে-সব প্রায়শই থাকে না। তাই তাঁদের কীর্তিকলাপ দু’একটি বিজ্ঞানের জার্নাল ছাড়া আর কেই-ই বা জানে! কিন্তু ওঁরফিলার বৈজ্ঞানিক প্রতিভা যেমন আছে তেমনই অর্থের জোগান, লোকবল, সামাজিক পরিচিতি কোনও কিছুরই অভাব নেই। সর্বোপরি , তার প্রতি রাজ অনুগ্রহ আছে। তাই ছোট-খাটো বৈজ্ঞানিকদের কাজকর্ম পছন্দ হলে, ওঁরফিলা সেগুলোকে নিজের মতো পরিস্ফুট করে বৈজ্ঞানিক সমাজের কাছে নিবেদন করতেন এবং সম্পূর্ণ মৌলিক বলে নিজের কৃতিত্ব দাবি করতেন। অখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের হাত কামড়ানো ছাড়া বিশেষ কিছু করার থাকত না। বুদ্ধিবৃত্তির মহলে এমন সুচতুর চৌর্যবৃত্তি হামেশাই হয়ে এসেছে। মার্সের কীর্তিও নিজের বলে বাগিয়ে নেওয়ার মতলবও সম্ভবত করছিলেন ওঁরফিলা, কিন্তু এ-সময়ে মার্স, এ-আবিস্কারের জন্য ইউরোপের কয়েকটি জনপ্রিয় বিজ্ঞান সংগঠন থেকে পুরস্কার-টুরস্কার পাওয়ায়, ওঁরফিলার আর সে দুঃসাহস হল না।
তবে, তিনি হাত গুটিয়ে বসেও থাকলেন না। মার্সের এই পরীক্ষাপদ্ধতি যে আর্সেনিককেন্দ্রিক ফরেন্সিকের অনেক জটিল ধাঁধার সমাধান করতে পারে, তা তিনি আন্দাজ করেছিলেন। তাই মার্সের এই পরীক্ষাপদ্ধতি ব্যবহার করেই সেসব ধাঁধার উত্তর খুঁজতে সচেষ্ট হলেন ওঁরফিলা। ফরেন্সিকের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মার্সের টেস্ট কতটা কার্যকরী, ওঁরফিলা তা হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখতে চান। ওঁরফিলা আর্সেনিকে মৃতব্যক্তির বমি, মল, মূত্র, পাকস্থলিতে প্রাপ্ত অপাচিত খাদ্যাংশ থেকে মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করে আর্সেনিক উদ্ধার করলেন। সেইসঙ্গে, মৃতব্যক্তির, পাকস্থলি ও অন্ত্রও পরীক্ষা করলেন মার্সের পদ্ধতি ব্যবহার করেই। তাতেও মার্সের টেস্ট উত্তীর্ণ। তবে এইসব থেকে আর্সেনিক উদ্ধার ফরেনসিকের মামুলি ব্যাপার। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মার্স টেস্টের উৎকর্ষতা যাচাই করতে চাইলেন ওঁরফিলা।
আর্সেনিক ঘটিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে অনেক সময়ই মৃতব্যক্তির বমিতে আর্সেনিক মিললেও এবং পাকস্থলি ও অন্ত্রে আর্সেনিকের ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হলেও, পাকস্থলি ও অন্ত্র থেকে বিষের টিকিটিও মেলে না। এমতাবস্থায় আদালত অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতেও মার্সের পদ্ধতি ব্যবহার করে, ভিক্টিমের শরীর থেকে কোনওভাবে আর্সেনিক উদ্ধার করা যায় কি না, ওঁরফিলা সে-চেষ্টা করলেন। আর্সেনিক খেয়ে আত্মহত্যা করেছে, এমন সব ব্যক্তির দেহ জোগাড় করে ওঁরফিলা মার্সের পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতব্যক্তির প্রায় গোটা দেহটাই পরীক্ষা করা শুরু করলেন। ওঁরফিলা যকৃৎ, অগ্ন্যাশয়, বৃক্ক, ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড, বিভিন্ন পেশি, মস্তিষ্ক, রক্ত এমনকী হাড়েও আর্সেনিকের উপস্থিতির খোঁজ পেলেন।


উইলিয়াম হার্ভের কল্যাণে, মানবদেহের রক্তসংবহন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান তখন বিজ্ঞানী মহলে রয়েছে। ওঁরফিলার তাই বুঝতে অসুবিধা হল না, মৃতব্যক্তির জীবদ্দশাতেই দেহে প্রবিষ্ট আর্সেনিক, রক্ত দ্বারা বাহিত হয়ে বিভিন্ন অঙ্গে প্রবেশ করেছে। তাঁর এই ধারণাকে বিজ্ঞানী মহলে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য, গণ্যমান্য বিজ্ঞানীদের উপস্থিতিতে ওঁরফিলা কুকুরের উপর আর্সেনিকের পরীক্ষা চালালেন। একটি সুস্থ কুকুরের দেহে আর্সেনিক প্রবেশ করালেন। স্বভাবতই কুকুরটির শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিল। কিন্তু ওঁরফিলা মুমূর্ষু কুকুরটিকে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়ার আগেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করলেন। তারপর কুকুরটির সমস্ত অভ্যন্তরীণ অঙ্গ মার্সের পরীক্ষা করে দেখলেন— শুধু পাকস্থলি, অন্ত্র কিংবা যকৃৎই নয়, দেহ অভ্যন্তরের প্রায় সব অঙ্গে আর্সেনিকের খোঁজ মিলল। সুতরাং, এতসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ওঁরফিলা বৈজ্ঞানিক সমাজের সামনে রাখলেন।
এক, আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মৃতব্যক্তির শরীরে আর্সেনিক শুধু পাকস্থলি, অন্ত্র বা পরিপাকতন্ত্র সম্পর্কিত যকৃতের মতো অঙ্গই নয়, পরিপাকতন্ত্র সম্পর্কিত নয়, দেহ অভ্যন্তরীণ এমন অনেক অঙ্গেও আর্সেনিক পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, আর্সেনিক থাকতে পারে মৃতব্যক্তির সমস্ত শরীর জুড়েই। দুই, অন্ত্র ও পাকস্থলিতে আর্সেনিক না মিললে, সেই ব্যক্তির মৃত্যু আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় হয়নি এমন সরলীকরণ অর্থহীন। কারণ, আর্সেনিক পাকস্থলি ও অন্ত্র দ্বারা শোষিত হয়েই মূল রক্ত স্রোতে প্রবেশ করে। তাই বহুক্ষেত্রে পাকস্থলি ও অন্ত্রে আর্সেনিক নাও মিলতে পারে। তাই এইসব পরিস্থিতিতে দেহ অভ্যন্তরীণ অন্যান্য অঙ্গে আর্সেনিক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। তিন, মৃত ব্যক্তির পাকস্থলির অপাচ্য খাদ্য ও বমিতে প্রাপ্ত আর্সেনিককেই এতদিন বিষক্রিয়ার প্রমাণ হিসেবে আদালতে পেশ করাই ছিল রীতি। ওঁরফিলা বললেন— এই রীতি বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ, একমাত্র রক্তস্রোতে প্রবিষ্ট আর্সেনিকই সেই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ। পাকস্থলির অপাচিত খাদ্যের আর্সেনিক কিংবা বমিতে প্রাপ্ত আর্সেনিক— কোনওটাই তো ওই ব্যক্তির রক্তে মেশেনি। তাই, ওই ব্যক্তির রক্তে কতটা আর্সেনিক মিশেছে, তার আন্দাজ পেতে গেলে, দেহ অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। চার, মৃত ব্যক্তির দেহে আর্সেনিকের মোট পরিমাণ জানতে গেলে, দেহ অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ পরীক্ষা একইসঙ্গে, একই পদ্ধতিতে করতে হবে।
মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতির উপর নির্ভর করেই আর্সেনিক কেন্দ্রিক ফরেন্সিক টক্সিকোলজির নতুন সব আঙ্গিক উন্মোচন করলেন ওঁরফিলা। সেই সঙ্গে নিজেও হয়ে উঠলেন মার্স পদ্ধতির একজন বিশেষজ্ঞ। আর্সেনিকঘটিত কোনও হত্যাকাণ্ডে মার্স পদ্ধতির প্রয়োগের প্রয়োজন হলেই, ডাক পড়ে ওঁরফিলার। ওঁরফিলা ব্যস্ত থাকলে, বাদী কিংবা বিবাদী পক্ষ মৃত ব্যক্তির দেহাংশ সংরক্ষণ করে খরচখরচা-সহ ওঁরফিলার ল্যাবরেটরিতেও পাঠাতে কসুর করেন না। কিন্তু ফরেন্সিকের দুনিয়ায় কিংবা আদালত কক্ষে ওঁরফিলার এসব নয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠার রাস্তাটা নিষ্কণ্টক ছিল না। ওঁরফিলার পথের কাঁটা ছিলেন ফ্রান্স নিবাসী ইতালীয় বিজ্ঞানী ফ্রান্সেসকো রগনেতা। তিনিও তখন ফরেন্সিক টক্সিকোলজির তাবড় নাম। তবে, ওঁরফিলার সঙ্গে রগনেতার বিরোধটা শুধু মাত্র বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগত ছিল না। রগনেতা ছিলেন ফরাসি রাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচক, রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। উপরন্তু, ওঁরফিলার বুদ্ধিদীপ্ত চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানী মহলে বারবার সোচ্চার হয়ে রগনেতা হয়ে উঠেছিলেন ওঁরফিলার চক্ষুশূল। তাই আদালতে একপক্ষ যদি ফরেনসিক তথ্য প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য ওঁরফিলাকে ডেকে পাঠাতেন, ওঁরফিলার ‘অ্যান্টিডোট’ হিসেবে অপরপক্ষ হাজির করতেন রগনেতাকে। তারপর, আদালতে উপস্থিত মানুষজন সাক্ষী থাকত, দুই ধুরন্ধর বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কের যুক্তি-প্রতিযুক্তির কাটাকুটি খেলার।
ওঁরফিলা যদি আদালতে মার্সের পরীক্ষা-নির্ভর সব প্রমাণ দাখিল করেন, রগনেতা মার্সের পরীক্ষার দূর্বলতা, অনিশ্চয়তা গুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে চিহ্নিত করে সেসব প্রমাণের ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে বের করেন। আদালত কক্ষে এই দুই বিজ্ঞানীর লড়াই শুধু তাই বিপ্রতীপ বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এ-লড়াই ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শগত, ব্যক্তিগত আক্রোশের সর্বোপরি ‘প্রেস্টিজ ফাইট’।
দুই বৈজ্ঞানিকের তরজা নিয়ে যখন ফ্রান্সের সংবাদপত্র গুলো সরগরম, সে-সময়ে ওঁরফিলার ল্যাবরেটরিরই অধঃস্তন বিজ্ঞানী জ্যাঁ-প্যের কুর্বি, মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করলেন। আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ঘটেনি কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে, এমনকিছু মৃতদেহের হাড় ও মাংসেও মার্সের পরীক্ষার মাধ্যমে আর্সেনিকের খোঁজ পেলেন। রীতিমতো তাজ্জব বনে গেলেন কুর্বি। এ কী করে সম্ভব!
স্বভাবতই তিনি ওঁরফিলাকেই প্রথমে ব্যাপারটা জানালেন। ওঁরফিলা আর কুর্বি দুজনে মিলে ব্যাপারটা নিয়ে অনুসন্ধান চালানেন। ওঁরফিলাও দেখলেন, কুর্বির পর্যবেক্ষণ মিথ্যে নয়। আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়নি এমন বেশ কিছু পচনশীল মৃতদেহেও মার্সের পরীক্ষার মাধ্যমে স্বল্প পরিমাণ আর্সেনিকের খোঁজ মিলছে। সব দেখে শুনে ওঁরফিলা বড় আজব এক সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। মনে করলেন— স্বল্প পরিমাণ আর্সেনিক মানব দেহের স্বাভাবিক উপাদান। এ জন্মগত ভাবেই মানব দেহে থাকে। তাই বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়নি এমন মৃতদেহেও আর্সেনিক মিলছে। ওঁরফিলা একে বললেন— ‘ন্যাচারাল’ বা ‘নর্মাল’ আর্সেনিক। তবে তিনি এও মনে করেন— রাসায়নিক পরীক্ষার দ্বারা ন্যাচারাল আর্সেনিককে, হত্যা বা আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে দেহে-শরীরে প্রবিষ্ট আর্সেনিকের থেকে পৃথক করা যেতে পারে।
যে-আর্সেনিক বাইরে থেকে শরীরে প্রবেশ করে, রক্ত স্ত্রোতের দ্বারা বাহিত হয়ে শরীরের নানা অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে অঙ্গ থেকে পৃথক করা সহজ; জলে অনেক্ষণ ধরে ফোটালেই তা দেহাংশ থেকে পৃথক হয়ে যায়। কিন্তু যে আর্সেনিক দেহের স্বাভাবিক উপাদান, তাকে পৃথক করা খুব শ্রমসাধ্য। তা, ফুটন্ত জলে দ্রবীভূত হয় না। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে তবেই তাকে পৃথক করা সম্ভব।
ওঁরফিলা তার এই গবেষণালব্ধ পর্যবেক্ষণ প্যারিসের রয়েল অ্যাকাডেমি অফ মেডিসিনের কাছে পেশ করলেন। তবে, সম্পূর্ণ নিজের নামে, সহ বৈজ্ঞানিক জ্যাঁ-প্যের কুর্বির কৃতিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেই। অতঃপর, সংবাদপত্রে ওঁরফিলারই ভূয়সী প্রশংসা, আর কুর্বি সম্পূর্ণ বেকুব বনে মাথা চুলকালেন তবে, ওঁরফিলাকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এর নিদারুণ কর্মফল ভুগতে হয়েছিল। সে-কথা ক্রমশ প্রকাশ্য। কিন্তু ওঁরফিলার এসব দুষ্কর্ম সত্ত্বেও শুধুমাত্র তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার কল্যাণেই মার্সের পরীক্ষা পদ্ধতির গুরুত্ব ফরেনসিক দুনিয়া ক্রমে অনুভব করতে শুরু করল। তবে, তা একমেবাদ্বিতীয়ম্ হয়ে উঠতে প্রয়োজন কোনও একটি হেভি-ওয়েট মার্ডার কেস, যেখানে অভিযুক্তের দোষ নির্ধারণে তুরুপের শেষ তাস হবে মার্সের পরীক্ষার ফলাফল। একবছরের মধ্যে তেমন একটি কেসের ব্যাপারে ডাক পেলেন ওঁরফিলা।
সে-কাহিনি পরের পর্বে…




