কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে-র ধারে ছোট-ছোট বসতবাড়ির মতো গজিয়ে উঠেছে একের পর এক মধুশালা। একতলা, দোতলা এই মধুশালাগুলো সন্ধের পর থেকেই বুকে প্রাণ পায়। ঝিকমিক আলো জ্বলে ওঠে। কালো গেঞ্জি, প্যান্ট পরা বাহুবলীরা দাঁড়িয়ে পড়ে গেটের কাছে। সারি-সারি গাড়ির ভিড় লেগে যায় মধুশালার সামনে। একতলার সিঁড়ি দিয়ে ওঠার আগেই, হিন্দিভাষী এক যুবক খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। তারপর শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে দেখল, কোনও অস্ত্র আছে কি না। তারপর মুচকি হেসে বলল, ‘ইলেকশনকা টাইম হে।’ আমিও মুচকি হেসে এগিয়ে গেলাম। ছোট করিডর দিয়ে এগিয়ে গেলেই দুটো বড়-বড় ঘর। কালো কাচ দিয়ে ঘেরা ঘরের মধ্যিখানে একটা বড় অংশ জুড়ে স্থায়ী মঞ্চ করা। কাচের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই নাকের মধ্যে অজস্র গন্ধ এসে ভিড় করল। স্কচ, হুইস্কি, রাম, বিয়ার, গ্রিলড চিকেন, বাদাম, কাঁচা পিঁয়াজ, আদা, লঙ্কা— আরও কতকিছুর। ঘরটা জুড়ে বিভিন্ন আলোর কারসাজি। মূলত নীল আলোকে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, মনে হবে ভ্যান গঘের ক্যানভাস।
টেবিলে বসতে-বসতে লক্ষ করলাম, নব্বই দশকের হিন্দি গান আর নৃত্য শুরু হয়ে গিয়েছে। সেজেগুজে, সুগন্ধি ছড়িয়ে মেয়েরা এসেছে স্থায়ী মঞ্চে। প্রত্যেকেই শাড়ি পরিহিত। মূলত নীল, লাল, কালো রঙের। সেই সঙ্গে মিল করা স্লিভলেস ব্লাউজ। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা নাচছে। কিছু উন্মত্ত জনতা তাদের দিকে টাকা ছুড়ে দিচ্ছে। তারাও হাসিমুখে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বুকের ভিতর গুঁজে রাখছে। যত রাত বাড়তে থাকে, ফুর্তি তত গাঢ় হয়। ভিড় তত বাড়তে থাকে। নব্বই দশকের গান ক্রমশ পাল্টে গিয়ে একবিংশ শতাব্দীর গানে পৌঁছে যায়। নাচের গতি বাড়ে। আরও আবেদনপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই নৃত্য।
নীলাঞ্জনাকে (নাম পরিবর্তিত) আগেও দেখেছি এই মধুশালায়। লম্বা, রোগা শ্যামলা বর্ণের মেয়েটা তিন বছর ধরে এই মধুশালায় নাচের আসর জমায়। বারাকপুর অঞ্চলে তার বাড়ি। পড়াশোনা করেছে বারো ক্লাস পর্যন্ত। পেটের দায়ে সে এখন মধুশালার রাতপরী। যদিও সেই নিয়ে তার বিন্দুমাত্র ছুঁৎমার্গ নেই। তার ভাষায়, ‘কে খাওয়াবে আমাকে? বাড়িতে বুড়ো বাপ-মা! আমার মাসে ভাল টাকায় আয় হয় বাবু। অন্তত কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।’ একটু থেমে সে আরও জানাল যে, “আমিও একটা টেলি কলিং-এ কাজ করতাম। দু’মাস কাজ করার পর সেটা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর অনেক কাজ খুঁজেছি, পাইনি। শেষে এই বারে নাচের কাজ পাই।” ওর কথার মধ্যে কোনও জড়তা নেই। ও জানে, ওর কাজটা সমাজের চোখে কলুষিত, তবুও সে পিছপা হয় না। সে জানে, দিনশেষে তার কাজ শুধু নাচ দেখিয়ে টাকা উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেটা ঘোরতর যৌনতায় পর্যবসিত হবে। কিন্তু নীলাঞ্জনার কথা থেকে একটা অদ্ভুত বিষয় জানা গেল। সে বলল, এখন সবাই আর শুধুমাত্র যৌনতার জন্য আসে না। কেউ-কেউ শুধু নিজের মনের দুঃখের কথা বলতে আসে। কেউ প্রেমের খোঁজে আসে। কারও আবার পরিবার, ভাল চাকরি সব থাকলেও সে মনের কথা বলার কাউকে পায় না। তাই সে আমার কাছে আসে। শুনতে অবাক লাগলেও, এটাই নাকি সত্যি।
আরও পড়ুন: নির্বাচনী আবহে ব্রাত্য মণিপুর?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…
ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশদের সময় থেকেই ‘তবায়েফ’ বা বাঈজিদের নাচ ছিল উচ্চবিত্ত পুরুষদের বিনোদনের অংশ, যেখানে শিল্প ও শরীর দুটোই একসঙ্গে উপস্থিত থাকত। এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল কলকাতা, যেখানে চৌরঙ্গি, সোনাগাছি বা বাবু-সংস্কৃতির আড্ডায় নাচ-গানের আসর বসত, আর সেই আসর ঘিরেই গড়ে উঠত এক বিশেষ নগর-সংস্কৃতি। স্বাধীনতার পর শহরের হোটেল ও রাত্রিকালীন আসরে নাচের প্রচলন বাড়তে থাকে, যার জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন হেলেন; তবে এই আড়ম্বরের আড়ালেও সমাজের চোখে এই পেশা ছিল প্রান্তিক। আটের দশক থেকে বিশেষ করে মুম্বইয়ে নাচঘর-ভিত্তিক এক নতুন সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে, যেখানে গ্রাম ও নিম্ন-আয়ের পরিবার থেকে বহু নারী জীবিকার তাগিদে যুক্ত হন। এখানে নাচ, অর্থ ও শরীরী ইঙ্গিত মিলে এক বিশেষ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র গড়ে ওঠে। মহারাষ্ট্রে, ২০০৫ সালে, ডান্সবারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। হাজার-হাজার নারী কাজ হারিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। পরে সুপ্রিম কোর্ট এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে হস্তক্ষেপ করলেও কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আগের অবস্থায় ফেরা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সময়ে এসে এই পেশার চরিত্র আরও বদলেছে।
শুধু আবেদনপূর্ণ নাচ নয়, বরং মানুষের সঙ্গে কথা বলা, সঙ্গ দেওয়া এবং একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়াও কাজের অংশ হয়ে উঠছে। শুক্র ও শনিবার, কিংবা বিশেষ দিনে মধুশালার চেহারাগুলো বদলে যায়। উল্লাস বাড়ে। মোচ্ছব বাড়ে। পোশাকবিধি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়? সোহাগের (নাম পরিবর্তিত) কথায়, ‘সব বেদা মানুষ তো আমাকে শাড়িতেই দেখতে ভালবাসে।’ সোহাগের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখন ‘খরিদ্দার’ কমেছে। আগে বাঁধাধরা খরিদ্দের ছিল, যারা রাত হলেই যৌন উত্তেজনা প্রশমিত করতে আসত, কিন্তু এখন তার অনেক উপায় গজিয়ে উঠেছে। তাই তারা আসে না। কিছু ‘ফ্লাইং কাস্টমার’ ছাড়া এখন তেমন ব্যবসা নেই। তবে এখন আরও একধরনের মানুষ আসে, যারা মনের ব্যথা কমাতে আসে। সোহাগের কথায়, ‘এখন মানুষ প্রেম করতে আসে বাবু! চায় একটু সুখদুঃখের কথা বলি। বেদা মানুষের মনের কথা শুনি। কিন্তু মনের কথা শুনলে কি আমাদের পেট ভরবে?’

ভারতে বার-নর্তকীদের ঘিরে যে রাতের অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল, তার পরিধি একসময় বিস্ময়করভাবে বড় ছিল। মহারাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি নারী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এবং সারা দেশে এই সংখ্যা সহজেই দেড় থেকে দুই লক্ষ ছুঁয়ে যায় বলে বিভিন্ন সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু মুম্বই ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রায় দেড় হাজারের বেশি ডান্সবার সক্রিয় ছিল, যাদের দৈনিক লেনদেন কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করত। সব মিলিয়ে এই শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার কয়েকশো কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিন লক্ষেরও বেশি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে সারা ভারতে এই পেশায় যুক্ত নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, এবং গড় মাসিক আয়ও অনেক ক্ষেত্রে দশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, যেমন, বারাকপুর, মধ্যমগ্রাম, কিংবা কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে-র ধারে ছোট-বড় মধুশালা বা বারকে কেন্দ্র করে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু দৃশ্যমান অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন, কারণ এই শিল্পের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক ও নথিবিহীন। তবুও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও ক্ষেত্রসমীক্ষা বলছে, কলকাতা ও শহরতলি মিলিয়ে কয়েক হাজার নারী এই পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত, এবং তাদের ঘিরে আরও বহু মানুষের জীবিকা নির্ভর করে, যেমন বাউন্সার, পরিবেশনকারী, গাড়িচালক, আলোকসজ্জা কর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় সরবরাহকারীরা পর্যন্ত। আয়ের দিক থেকেও এখানে বৈচিত্র্য রয়েছে। কেউ মাসে দশ-পনেরো হাজার টাকায় কাজ চালান, আবার কেউ অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে পঞ্চাশ হাজার বা তার বেশি আয় করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অর্থনীতির চরিত্র বদলাচ্ছে। শুধুমাত্র নাচ বা শরীরী বিনোদনের ওপর নির্ভর না করে, ক্রমশ সময়ের সঙ্গ, মনের কথা শোনা এবং একাকিত্ব ভাগ করে নেওয়ার মতো অদৃশ্য পরিষেবাও এই পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনটিকে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে স্পষ্ট হয়, এটি মূলত মানুষের অপূর্ণ চাহিদার বহিঃপ্রকাশ। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা, স্বীকৃতি এবং সংযোগ। এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক শহুরে জীবনে এই চাহিদাগুলো বারবার অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপন এবং সম্পর্কের অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে একধরনের ক্রমাগত একাকীত্ব ও মানসিক শূন্যতা তৈরি করছে। ফলে মানুষ এমন জায়গা খুঁজছে, যেখানে সে বিচারহীনভাবে নিজের কথা বলতে পারে এবং অন্তত সাময়িকভাবে শোনা হচ্ছে এই অনুভূতিটুকু পেতে পারে।

এখানেই বার-নর্তকীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে ‘ইমোশনাল লেবার’ বা আবেগিক শ্রমের একটি বিশেষ রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থের বিনিময়ে শুধু শারীরিক উপস্থিতি নয়, বরং সহানুভূতি, মনোযোগ এবং কৃত্রিম অন্তরঙ্গতা প্রদান করা, এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একটি মানসিক পরিষেবায় পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি ‘প্যারাসোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন’-এর মতো, যেখানে একপক্ষ বাস্তব আবেগে জড়ায়, কিন্তু সম্পর্কটি আসলে নিয়ন্ত্রিত ও একমুখী। এই কাঠামোর মধ্যে ক্রেতা তার ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা বা অপূর্ণ প্রেমের কথা উজাড় করে বলতে পারে, কারণ সেখানে সামাজিক বিচার বা দায়বদ্ধতার ভয় নেই। আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই প্রবণতার সঙ্গে ‘এস্কেপিজম’ বা বাস্তবতা থেকে সাময়িক পলায়নের মনস্তত্ত্বও জড়িয়ে আছে। মানুষ যখন নিজের জীবনের চাপ, ব্যর্থতা বা উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে চায়, তখন সে এমন এক পরিবেশ বেছে নেয়, যেখানে কিছুক্ষণের জন্য একটি বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করা সম্ভব। মধুশালার আলোক-আঁধারি, সংগীত, এবং কৃত্রিম অন্তরঙ্গতা সেই বিকল্প বাস্তবতাকে নির্মাণ করে দেয়। একই সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে আবেগ প্রকাশের সীমাবদ্ধতা পুরুষদের এই ধরনের পরিসরের দিকে আরও বেশি ঠেলে দেয়, কারণ এখানে তারা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে তুলনামূলকভাবে নির্ভয়ে। ফলে বিষয়টি আর শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা সামাজিক নয়; এটি মানুষের গভীর মানসিক কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত। বার-ডান্সারদের ভূমিকা তাই আজ কেবল বিনোদনদাতা নয়, বরং একধরনের ‘আবেগিক শ্রোতা’, যারা অর্থের বিনিময়ে হলেও মানুষের একাকীত্ব, হতাশা এবং অপূর্ণতার ভার কিছুক্ষণের জন্য ভাগ করে নেয়।
২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৬০% মানুষ নিয়মিত একাকিত্ব অনুভব করেন, এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৩৫–৪০% জানিয়েছেন যে, ব্যক্তিগত সমস্যা বা মানসিক কষ্ট ভাগ করার মতো কেউ তাদের জীবনে নেই। একই সঙ্গে ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ওপর করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৫% ব্যবহারকারী দায়বদ্ধতাহীন আবেগিক সংযোগ খোঁজেন, যা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। এই প্রবণতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে রাতের বিনোদন-অর্থনীতিতেও। কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো শহরে বার বা মধুশালাভিত্তিক সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৩০–৫০% খরিদ্দার এখন শুধুমাত্র শারীরিক বিনোদনের জন্য নয়, বরং কথা বলা, সময় কাটানো বা মানসিক স্বস্তি পাওয়ার জন্য আসে। বার-নর্তকীদের মধ্যেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। একটি ক্ষেত্রসমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৬৫% নৃত্যশিল্পী জানিয়েছেন যে, তাদের কাজের বড় অংশ এখন কাস্টমারের কথা শোনা বা সঙ্গ দেওয়া যা আগের দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। আগে যেখানে আয়ের প্রায় ৭০–৮০% আসত নাচ ও টিপস থেকে, এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৪০–৫০% আয় নির্ভর করছে ব্যক্তিগত সময় দেওয়া, আলাদা বসে কথা বলা বা দীর্ঘসময় সঙ্গ দেওয়ার ওপর। অর্থাৎ, শরীরভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে একধরনের পরিষেবা-অর্থনীতি।
পূর্বা (নাম পরিবর্তত) এই কাজে অনেকদিন ধরে আছে। প্রথমে টালির বারে নাচ দেখাত, এখন ঝাঁ-চকচকে তিলতলা বারের মহামায়া। বয়স হয়েছে তার এই কাজেই। পূর্বার কথায়, ‘নাচ দেখানোটা তো চিরকালই গৌণ ছিল। আসল তো যৌনতা। কিন্তু এখন সব খরিদ্দাররা পাল্টে গিয়েছে। এই তো সেদিন একটা খরিদ্দের এসে বাংলা কবিতা শুনতে চাইল।’ একটু থেমে সে বলল, ‘বলো তো আমার শরীর না বাংলা কবিতা, কোনটা বেশি উত্তেজক?’ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোন কবির কবিতা শুনতে চেয়েছিল?’ ততক্ষণে পূর্বার পাশে এক দেহরক্ষী সাদা জামা পরে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ বেজার। সেই অশনি-সংকেত দেখে পূর্বা আবার ফিরে গেল নাচ দেখাতে। জানা হল না সেই হতভাগ্য কবির নাম।
নীলাঞ্জনা, সোহাগ, পূর্বা, শিউলি এরা একই জায়গার বিভিন্ন মধুশালার রাতপরী। একে-অন্যের কর্মজগতের প্রতিপক্ষ। কর্পোরেট জগতের মতো, সেক্টর ফাইভের ক্লান্ত বিকেলের মতো এরাও মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রাম নিতে বাইরে আসে। সিগারেট-চা খেয়ে আবার কাজে ফেরে। হয়তো একে-অন্যকে দেখে মুচকি হাসে। যেমনটা কর্পোরেট জগতেও হয়ে থাকে। কিন্তু তারা সকলে জানে, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলে ভাল পারফরমেন্স করতে হবে। নিজেদের মধ্যে এক্স ফ্যাক্টর আনতে হবে।
শিউলি (নাম পরিবর্তিত) এই পেশায় সদ্য এসেছে। তাই এই মায়াজগতের সবটা এখনও জেনে উঠতে পারেনি। অভিনেত্রী হওয়ার শখ তার। তার ইচ্ছে একদিন তার ছবি দিয়ে পোস্টার পড়বে বড়রাস্তায় ওপরে। হিন্দি গানের প্রতি তার খুব ঝোঁক। তার কথায়, ‘প্রতি রাতে এক বাবু আসে আমার কাছে গান শুনতে। সে আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। কিন্তু আমার গান শুনবে। আমার গান শুনলে নাকি তার ঘুম আসে। তাকে আর ঘুমের ওষুধ খেতে হয় না।’
নীলাঞ্জনা, সোহাগ, পূর্বা, শিউলি এরা একই জায়গার বিভিন্ন মধুশালার রাতপরী। একে-অন্যের কর্মজগতের প্রতিপক্ষ। কর্পোরেট জগতের মতো, সেক্টর ফাইভের ক্লান্ত বিকেলের মতো এরাও মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রাম নিতে বাইরে আসে। সিগারেট-চা খেয়ে আবার কাজে ফেরে। হয়তো একে-অন্যকে দেখে মুচকি হাসে। যেমনটা কর্পোরেট জগতেও হয়ে থাকে। কিন্তু তারা সকলে জানে, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গেলে ভাল পারফরমেন্স করতে হবে। নিজেদের মধ্যে এক্স ফ্যাক্টর আনতে হবে।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ মনে হয়, এই শহরে আসলে কে বেশি একা? যে মেয়েটা আলো-আঁধারির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অচেনা মানুষের কথা শোনে, না কি সেই মানুষটা, যে টাকা দিয়ে নিজের কষ্ট বলার অধিকার কিনে নেয়? বাইরে তখন রাত আরও গভীর হয়েছে, আলো জ্বলছে, গান বাজছে, নাচ চলছে, সবকিছু যেন আগের মতোই স্বাভাবিক। অথচ এই স্বাভাবিকতার আড়ালে জমে থাকে এক অদৃশ্য ক্লান্তি, এক চাপা শূন্যতা, যা কারও চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
এই মধুশালাগুলো তাই শহরের এক অদ্ভুত মানসিক মানচিত্র, যেখানে মানুষ আসে নিজের একাকিত্বটাকে একটু হলেও হালকা করতে। কিন্তু সেই একাকিত্ব আদৌ কমে কি? না কি আরও একটু গভীরে বসে যায়, সেই উত্তর অজানাই থেকে যায়। রাত শেষে দরজা বন্ধ হয়, আলো নিভে যায়, ভিড় সরে যায় অন্য কোথাও। কিন্তু মানুষের ভেতরের যে অন্ধকার, যে না-বলা কথাগুলো, সেগুলো কোথাও যায় না। সেগুলো থেকেই যায়, শহরের ভেতরেই ঘুরে বেড়ায়, আর হয়তো পরের রাতেই আবার কোনও মধুশালার দরজায় এসে দাঁড়ায়।




