সংবাদ মূলত কাব‍্য: পর্ব ৩৪

Representative Image

বহু পথ হেঁটে

খুলা জেল, অর্থাৎ উন্মুক্ত কারাগারে, যেমনটি দেখেছিলাম মুরেনা জেলার জউরায়, সেখানে দলের সাকরেদদের সঙ্গে তোফা হই-হই করে ৭/৮ বছর কাটিয়ে মুক্ত হন মালখান সিং। আত্মসমর্পণের সময়ে মালখান ওই শর্তই দিয়েছিলেন, তাঁকে এবং দলের কাউকেই প্রাণদণ্ড দেওয়া যাবে না, রাখতে হবে খুলা জেলে। পুনর্বাসনে দিতে হবে কৃষিজমি। নবাব সিং, তহশিলদার সিংদের আমল থেকেই বাগিদলগুলির আত্মসমর্পণের এইসব একই শর্ত। আটের দশকের শেষে মুক্ত, মালখান সিং গোয়ালিয়রে গিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিলেন। দু’বার বিধানসভায় প্রার্থীও হয়েছিলেন, জিততে পারেননি। ওই সময়ে অর্জূন সিং, মাধবরাও সিন্ধিয়ার ঘনিষ্ট ছিলেন মালখান। নয়ের দশকে মৃত‍্যুর আগে বিজেপিতেও যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

আমরা চম্বল থেকে ফেরার পর, মালখান সিংয়ের আত্মসমর্পণের আগেই উত্তরপ্রদেশের কানপুরের বেহমাই গ্রামে গণহত‍্যার ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়ে দিয়েছিলেন ফুলন দেবী; চম্বলের ইতিহাসে দগদগে ওই গণহত‍্যায়— সারা দেশে হই-হই পড়ে গিয়েছিল। ফুলন দেবীর নামটি ছড়িয়ে গিয়েছিল ভারতের বাইরেও।

একটা ময়ূরছানা, একটা স্টেনগান নিয়ে কলকাতা ফিরো! বলেছিলেন, চম্বলের একজন!’ পড়ুন: সংবাদ মূলত কাব্য পর্ব ৩৩…

আমরা চম্বল থেকে ফিরে আসার মাসখানেক পর, ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই বেহমাই গ্রামে ভর সন্ধ‍্যায় সদলে হানা দিয়ে ঠাকুরদের গ্রামটিতে একসারিতে গ্রামবাসীদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেছিল ফুলন ও তার দলবল। ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিল ২০ জন, পরে আরও ২ জন। এই ২২ জনের ১৭ জনই ঠাকুর। দু’বছর আগে এই বেহমাই গ্রামেই গণধর্ষিতা হয়েছিলেন ফুলনদেবী। বিক্রমের দলে বিক্রম খুন হয়েছিলেন— দলেরই শ্রীরাম ও লালারাম দুই ঠাকুর ভ্রাতৃদ্বয়ের ষড়যন্ত্রে। বিক্রমকে খুনের পর শ্রীরাম, লালারাম ঠাকুরভাইয়েরা ফুলনকে তুলে নিয়ে আসে এই ঠাকুরদের বেহমাই গ্রামে, সেখানে আটকে রেখে ফুলনের চলেছিল অত‍্যাচার। শুনেছিলাম, লালারাম, শ্রীরামের খোঁজে বেহমাই গিয়েছিল ফুলন। তারা পালিয়ে গিয়েছিল। ওই গ্রামে দু’বছর আগে যখন ফুলন গণধর্ষিতা হয়, তখন ফুলনকে বেহমাই গ্রাম থেকে উদ্ধার করে, মান সিং মাল্লা নামে এক ছোটখাটো বাগি কিশোর। নিয়ে যায় বাবা মুস্তাকিনের কাছে, গোয়ালিয়রের রাজাদের একটা ভাঙাচোরা দুর্গে ফুলনকে আশ্রয় দেন বাবা মুস্তাকিন। প্রতিহিংসার আগুনে তখন দপ-দপ করছিলেন ফুলন। বাবা মুস্তাকিনের সহযোগিতায় এরপর ফুলন গড়ে ফেলেছিলেন মস্ত দল। চম্বলে শুরু হয়ে গিয়েছিল ঠাকুর বনাম পিছড়ি বর্গের মহা টক্কর। বেহমাই হত‍্যাকাণ্ডের পরদিনই উত্তরপ্রদেশের তখনকার মুখ‍্যমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং পদত‍্যাগ করেছিলেন।

বুঝতে পেরেছিলাম, কেন ফুলন আত্মসমর্পণে রাজি হচ্ছিলেন না। লুকিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, শান্তিপ্রয়াসে নামা সর্বোদয়ীরাও ফুলনের মতিগতি টের পাচ্ছিলেন না তখন। আমরা ফিরে এসেও যোগাযোগের কারণে জানতে পারতাম, বেহমাই গণহত‍্যার ঘটনায় বৎসর অধিককাল থমথম করেছিল চম্বল উপত‍্যকা। সর্বোদয়ীদের, প্রশাসনের শান্তিপ্রয়াসও থমকে গিয়েছিল। বেহমাই গণহত‍্যার একবছর মাসচারেক পর  ১৯৮২ সালের ১৭ জুন মধ‍্যপ্রদেশের ভিন্দে মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেন মালখান সিং। কিন্তু বেহমাই গণহত‍্যা ছিল এমনই সাংঘাতিক, যাতে উত্তরপ্রদেশ, মধ‍্যপ্রদেশ উভয় রাজ‍্যেই প্রশাসন ধাক্কা খেয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশের কানপুর জেলায় বেহমাই গ্রাম, ফুলনও উত্তরপ্রদেশের, জালাউন জেলার গোরহা পুরা গ্রামে পিছড়ে বর্গের মাল্লা পরিবারে তার বাড়ি। বেহমাই ঘটনায় প্রথমে স্তম্ভিত, পরে ক্রুদ্ধ উত্তরপ্রদেশের পুলিশ প্রশাসন ফুলনকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় ধরতে অভিযানে নামে। উত্তরপ্রদেশের ঠাকুর গোষ্ঠীও আদালত ও প্রশাসনে চাপ দিতে থাকে। এরপর মধ‍্যপ্রদেশকেও চাপ দিতে থাকে উত্তরপ্রদেশ। চম্বল সফরের সময়েই দেখেছি, বাগি দলগুলি মধ‍্যপ্রদেশেই যেন স্বাচ্ছন্দ‍্য বোধ করত। নানা কারণ আছে তার। চম্বল বেহড় মধ‍্যপ্রদেশেই গহীন ও ধাঁধালো। সর্বোদয়ীদের শান্তিপ্রয়াসের তৎপরতা মধ‍্যপ্রদেশেই বেশি। প্রশাসন নরম। আশ্চর্যের বিষয় হল, সে-সময়ে আত্মসমর্পণকারী বাগি দলগুলি মধ‍্যপ্রদেশেই আত্মসমর্পণ করত। মধ‍্যপ্রদেশেই কারাগারে থাকত। খুলা জেল বা মুক্ত কারাগারও ছিল মধ‍্যপ্রদেশের জউরায়। তবে কিনা উত্তরপ্রদেশের বেহমাই গণহত‍্যায় মধ‍্যপ্রদেশের প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছিল। প্রশাসনের অনেকেই চেয়েছিলেন, ফুলনদেবী ও তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর ব‍্যবস্থা। তবে সে-সময়ে মধ‍্যপ্রদেশের অর্জুন সিংয়ের কংগ্রেস সরকার সর্বোদয়ী নেতাদের অনুরোধ করেন শান্তিপ্রয়াস বলবৎ রাখতে। মোটর সাইকেলে ভিন্দ জেলার পুলিশ সুপার রাজেন্দ্র চতুর্বেদী চম্বল কিনার ঢুড়তে থাকেন। ছ’দিনের মাথায় ভিন্দের কাছে চম্বল বেহড়ে ফুলন দেবীর বাহিনীর কয়েকজন সশস্ত্র বাগির সামনে পৌঁছোন এসপি রাজেন্দ্র চতুর্বেদী। এর আগে মালখান সিংয়ের আত্মসমর্পণেও ভিন্দের এস পি রাজেন্দ্র চতুর্বেদীর এ-ধরনের তৎপরতা ছিল, বাগিরা তাঁকে চিনত। তিনি ফুলন দেবীকে আত্মসমর্পণে অনুরোধ করতে এসেছেন জেনে ফুলনের সাকরেদরা এসপিকে ফুলনের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়। কিন্তু ফুলন আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। অন‍্যান‍্য বাগিরা ফুলনকে নিবৃত্ত করেন।

এরপর দুবছর ধরে এস পি চতুর্বেদী বার-বার ফুলন দেবীকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে এসেছেন। ফুলনের বিশ্বাস অর্জনের জন‍্য চতুর্বেদী তাঁর স্ত্রীকেও নিয়ে এসেছেন ফুলনের কাছে। ফুলনের সঙ্গে সখ‍্যও গড়ে ওঠে শ্রীমতী চতুর্বেদীর। ওদিকে ফুলনকে ধরার ব‍্যাপারে মতভেদ, বিবাদও হয়েছে মধ‍্যপ্রদেশ সরকারের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশ সরকারের। সারেন্ডারের বিবিধ শর্ত দিয়ে শেষপর্যন্ত ফুলন এক প্রতিনিধি পাঠাতে চান মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কাছে। অকুতোভয় এক বাগি এসপি চতুর্বেদীর মোটর সাইকেলে ভূপালে এসে দেখা করেন মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সঙ্গে। উত্তরপ্রদেশে ঠাকুররা ফুঁসতে থাকে।

অবশেষে  সেই মধ‍্যপ্রদেশের ভিন্দে ১৯৮৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চম্বল কিনারে জনসভায় লাল কার্পেটের পথে হেঁটে এসে সামরিক পোশাক পরিহিতা মাথায় লাল ফেট্টি দেওয়া ফুলন গান্ধীজির ছবিতে প্রণাম ঠুকে, মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন। তাঁর বয়স তখন ২০। ১০ হাজার মানুষের জয়ধ্বনির ভেতরও একাংশে শোনা যায় কতিপয় ঠাকুরের গলায় হিংস্র গর্জন— ‘কাইতরানি ফুলন দেবী মুর্দাবাদ।’ ওই সভায় মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন, কোনও সামাজিক অত‍্যাচার, অবমাননার কারণে এই অঞ্চলের কোনও-কোনও মানুষ প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে ওঠেন তিনি তা জানেন, শান্তিপ্রয়াসে তাঁদের সুস্থ স্বাভাবিক পথে ফেরাতে চায় তাঁর সরকার। এনকাউন্টারে তাদের খতম করে দিলেই শান্তি ফিরবে না। সেদিন ঘনশ‍্যাম সিংয়ের নেতৃত্বাধীন আর একটি বাগি দলও আত্মসমর্পণ করে।

ফুলন দেবী

আত্মসমর্পণে যেসব শর্ত দিয়েছিলেন ফুলন, তাতে দাবি করেছিলেন, ৮ বছরের বেশি জেলে রাখা যাবে না তাঁকে। কিন্তু গোয়ালিয়র জেল থেকে মুক্তি পেলেন ১১ বছর পর ১৯৯৪ সালে, মধ‍্যপ্রদেশ সরকার ক্ষমাপ্রদর্শন করে সে-রাজ‍্যের মামলাগুলি তুলে নেওয়ায়। ফুলন নিজের রাজ‍্য উত্তরপ্রদেশে ফিরলেন। ওৎ পেতেছিলেন মুলায়ম সিং যাদব। মধ‍্যপ্রদেশে মোহর সিং, মালখান সিংরা কংগ্রেস, বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, উত্তরপ্রদেশে ফুলন দেবী যোগ দিলেন মুলায়মের সমাজবাদী পার্টিতে। ওই সময়েই শেখর কাপুরের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ব‍্যান্ডিট কুইন’ সারা দেশে হই-হই ফেলে। ছবিটি বিদেশে চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার তোড়জোড় করা হয়। এ ছবিতে সীমা বিশ্বাস অভিনয় করলেন ফুলনের চরিত্রে। দেখে, ফুলন বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, কিচ্ছুটি হয়নি। বানানো সব গল্প।

ওই সভায় মুখ‍্যমন্ত্রী অর্জুন সিং বলেন, কোনও সামাজিক অত‍্যাচার, অবমাননার কারণে এই অঞ্চলের কোনও-কোনও মানুষ প্রতিহিংসাপ্রবণ হয়ে ওঠেন তিনি তা জানেন, শান্তিপ্রয়াসে তাঁদের সুস্থ স্বাভাবিক পথে ফেরাতে চায় তাঁর সরকার। এনকাউন্টারে তাদের খতম করে দিলেই শান্তি ফিরবে না।

সমাজবাদী পার্টিতে ২৩/২৪ বছরের টগবগে দলিত নেত্রী হয়ে উঠলেন ফুলন। ১৯৯৬-এ মির্জাপুর লোকসভা কেন্দ্রে ফুলনকে দাঁড় করিয়ে দিলেন মুলায়ম। পিছড়ে বর্গ, মুসলিম আর তরুণ তরুণীদের ভোটে জিতে গেলেন ফুলন। ১৯৯৯-এ আবার ভোট। মির্জাপুরে আবার জিতলেন। রীতি-নীতি-শৃঙ্খলায় চমৎকার সাংসদ ছিলেন, তা আমি বাংলার তৎকালীন দু’এক সাংসদের কাছে শুনেছি। আমাদের দিল্লির সাংবাদিক দেবারুণও বলেছে। ওই সময়ে উমেদ সিংকে বিয়ে করেন ফুলন।

২০০১ সালের ২৫ জুলাই। সংসদ থেকে বাসভবন ফেরার পথে, বাড়ির দোরগোড়ায়  মোটর সাইকেলে এসে এক  যুবক তাঁকে একাধিক গুলি করে পালায়। মারা যান ফুলন। ঠাকুরদের বদলা! তখন ফুলনের বয়স ৩৮।

দু’দিনের মধ‍্যে ওই ঘাতক যুবকটিকে দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। নাম শের সিং রানা। ২০০৪ সালে তিহার জেল থেকে শের সিংকে আদলতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে পালিয়ে যায় শের সিং।