সাক্ষাৎকার: আর্ট বইজু

Representative Image

বজলুর রহমান। ওরফে ‘আর্ট বইজু’। অনেক মানুষই হয়তো ‘আর্ট বইজু’ নামটার সঙ্গেই পরিচিত। কলকাতা শহরের বুকে, যে-সব বাস-লরি চলে-ফিরে বেড়ায়, তাদের রং-তুলি দিয়ে সাজিয়ে তোলেন তিনি। শুধু এখানেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়, এক সময়ে ময়দানে ফুটবল খেলেছেন; এখনও স্থানীয় ছেলেদের মাঠে ফুটবল শেখান নিয়মিত। দেশ-বিদেশ থেকে তাঁর কাছে মানুষ আসেন অক্ষর বিষয়ে জানতে। আজ বিশ্ব গণপরিবহন দিবসে, তাঁর সঙ্গে ডাকবাংলা.কম পত্রিকার কথালাপের কিছু মুহূর্ত ধরা রইল। পত্রিকার তরফে কথা বলেছেন অর্পণ ঘোষ।

উত্তর থেকে দক্ষিণ— কলকাতা শহরের রাস্তা মন দিয়ে খেয়াল করলেই, অধিকাংশ বাসের পেছনে দেখা যাবে লেখা থাকে— ‘Art Baiju’। প্রথমেই জানতে চাইব, আপনার এই কাজের জগতে আসার সূত্রপাত কীভাবে?  

আমার জীবনে খেলাই ছিল প্রথম প্রাধান্য। বরাবরের স্বপ্ন ছিল, খেলার মাধম্যেই জীবনে কিছু একটা করব। যাঁর কাছে আমি প্র্যাকটিস করতাম, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা। একধারে খেলোয়াড়, ছবি আঁকিয়ে, পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন। এরকম সৃষ্টিশীল মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কমই দেখেছি। তাঁর নাম নাজির হুসেইন, হাতিয়াড়াতে থাকেন, লোকে তাঁকে একডাকে ‘চাঁদুদা’ বলে চেনে। চাঁদুদা পাড়ার খেলা বা অন্য কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে, দেওয়াল লিখতেন, আঁকতেন; ওই দেখে আমারও শখ হল রং-তুলির। সেই আমার প্রথম আঁকার প্রতি ভাললাগা। ওঁর কাছে প্রথমে একদিন গিয়েছিলাম শেখার জন্য। বাবা বলেছিল, লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে শেষে এইসব!

তখন আপনার বয়স কত? বাড়ি থেকে মেনে নিয়েছিল?  

যতদূর মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি। বাবা ওখানে আর যেতে দিল না। নিয়ে চলে এল। সে-সময়ে আমরা হাতিয়াড়াতেই থাকতাম। কিন্তু ওই যে একবার আঁকার নেশা মনের মধ্যে ঢুকে গেল, আর সে-নেশা পিছু ছাড়ল না। পড়তে বসলে, না পড়ে খাতার ভেতরে ছবি আঁকতাম। এবং সেই নেশা থেকেই আমার রোখ চেপে গেল— আঁকা আমাকে শিখতেই হবে। সেই থেকে নিজে-নিজেই শেখার শুরু।

আপনি খেলার কথা বলছিলেন, আঁকা আর খেলার মাঝে যোগসূত্রটা হল কীভাবে?

ক’বছর পর ১৯৯০ নাগাদ, ওখান থেকে বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে আমরা লাউহাটিতে চলে এসেছিলাম। ততদিনে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া শেষ, সম্পূর্ণ খেলায় মগ্ন। নতুন করে আর স্কুলে ভরতি হলাম না, যথারীতি বাড়িতে মারও খেলাম তার জন্য। তখন তো এগারো-বারো ক্লাসেও কলেজেই যেতে হত; মনে পড়ে, কলেজের ফর্ম আনতে গিয়ে, ঢুকে গেলাম খেলার মাঠে। তখন স্পোর্টস কাউন্সিলে খেলতাম, সেখান থেক অ্যাভিনিউ ক্লাবে কিছুদিন প্র্যাকটিস করার পর, চলে এলাম মহামেডান নাইনটিনে।

মহামেডানের মতো ঐতিহ্যমণ্ডিত ক্লাবেও সুযোগ পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, নানান মাঠে তো ট্রায়াল-প্র্যাকটিস চলতেই থাকে, সেভাবেই। এর মধ্যে একদিন রেলওয়ে এফ সি-র ট্রায়াল দিতে গিয়ে হাঁটুতে চোট লাগে, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তখন আমাদের কোচ ছিলেন প্রবীর মজুমদার। ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিও করতে পারলাম না। তার দু’চার বছরের মধ্যে ময়দানের খেলার জগত থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে যাই।

কলকাতার রেডিও-ডাক্তারের ছোঁয়ায় প্রাণ পায় হারানো সুর! পড়ুন: অমিতরঞ্জন কর্মকারের সাক্ষাৎকার…

তারপর কী হল? আঁকার জগতে সরাসরি আসলেন কীভাবে?

এরম সময়ে কিছু তো একটা করে খেতে হবে! খেলার পথ বন্ধ, লেখাপড়া থেকেও দূরে; ভাগ্যের এমন পরিহাস— বাবার চাকরিটাও চলে যায়। সে-সময়ে আমাদের পরিচিত একজন পাইপ-কারখানায় আমাকে কাজে ঢুকিয়ে দেয়। রাত আটটা থেকে সকাল আটটার শিফটিং। এদিকে ময়দানে না গেলেও, খেলা পুরোপুরি থামাইনি। যেদিন আমি ভোরে প্র্যাকটিসে যেতাম, পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে আসতাম। এদিকে সারারাত জাগা। খুব সামান্যই মাইনে পেতাম, শুধুমাত্র খেলার খরচটুকু উঠত। লাউহাটিতেই ছিল কারখানাটা। ’৯৩ সালের কথা বলছি। কারখানা-খেলা সেরে বাড়ি এসে যেটুকু সময় পেতাম, ছবি আঁকতাম। লাউহাটিতে তিন-চার বছর থাকার ফলে, তখন বেশ কয়েকজন বন্ধুও হয়েছে। বন্ধুদের বলতাম,  আমি কী ধরনের ছবি আঁকি, সে-রকম কোনও কাজ থাকলে আমাকে দিতে। আমি সে-সময়ে মূলত, দেখে-দেখে নকল করেই ছবি আঁকতাম। বিভিন্ন গ্রিটিংস কার্ড-এর ছবি, নায়ক নায়িকার ছবি ঘরে বসে আঁকতাম। এই গোটা প্রক্রিয়াটায় শরীরে প্রভাব পড়ত খুব। ক্লান্ত হয়ে যেতাম। 

তখন এক বন্ধু তার মামার কাছে পাঠাল; তার নাম ছিল আমিন মণ্ডল। আমরা ডাকতাম ভোলাদা বলে। ওঁর কাছে গেলাম, শিখতে শুরু করলাম। তখন আমি অয়েল বা এই জাতীয় রঙের ব্যবহার জানতাম না। উনি এগুলো হাতে ধরে শেখাতে লাগলেন। একদিন একটা লরিতে রঙ হচ্ছিল, উনি একটা স্কেচ করে দিয়ে বললেন, এখানে রঙ করো। এরম করে ধীরে-ধীরে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ উনিই আমাকে দিতে শুরু করলেন। কিছুদিন পর বললেন, বইজু, তুমি এই লাইনের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠছ, এরপর থেকে ইনডোরে যে-সমস্ত কাজ আসবে, তুমিই করবে। বাইরের কাজগুলো করবে ওঁর ভাগ্নে।

বুঝলাম, খেলা আপনার প্রথম প্রাধান্য বলেছিলেন, ময়দানের জগতে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়নি কখনও? পাশাপাশি বাসে লেখা-আঁকার এত কাজই-বা শুরু হল কোন সময়টা থেকে?

যেহেতু আমার লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছিল, ময়দান-ফুটবলের লক্ষ্য আমি ছেড়ে দিয়ে ছিলাম। কিন্তু ওই যে খেলার প্রতি ভালবাসা, সেটাই আমাকে আবার মাঠে নিয়ে গেল। কাজের মাঝে-মাঝে ওই পা নিয়েই চলে যেতাম মাঠে।

আমিন মণ্ডল ওরফে ভোলাদা আমার গুরুস্থানীয়। উনিই আমাকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন। কিন্তু ওখানে কাজ করে আমি সে-রকম পারিশ্রমিক পেতাম না। আমার পরিবারের সে-সময়ে এমন  অর্থনৈতিক অবস্থা যে— লিগামেন্ট অপারেশননের টাকা কিংবা খেলার জুতোর টাকা, কোনওটাই নেই। কিছু প্রয়োজন হলে আমার সেজদিদির কাছে হাত পাততে হত। পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রম হত প্রচুর। গাড়ি রং করে, খেলে যখন একটু বিশ্রামের জন্য বাড়িতে ফিরতাম, তখনই আবার কারখানা থেকে ডাক আসত। প্রায় চার-পাঁচ বছর এমন হয়েছে, আমি ঠিক করে দু’তিন ঘণ্টাও ঘুমাতে পারিনি।

কাজটা ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজ শুরু করলেন না কেন তখনই ? আপনাকে তো ততদিনে বেশ কিছু মানুষ চিনতে শুরু করছেন…

হ্যাঁ, আমি কাজটা ছেড়ে দেওয়ার ভাবনা-চিন্তা করতে শুরু করেছিলাম সে-সময় থেকেই। গাড়ির মালিকরাও বললেন, আমি নিজে কেন কাজ শুরু করছি না? সকলে আমাকে গাড়ি দেবেন, এ-আশ্বাসও পেলাম। কিন্তু আমি সেই কাজগুলো নিইনি, কারণ তাতে গুরুর অপমান হয়। তখন আমি ঘটকপুকুরে কাজে চলে যাই। যে-বন্ধু আমাকে আঁকার কাজ দিত, মূলত তার সূত্র ধরেই। ওখানে ওর একটা গ্যারেজ-মতো ছিল, আমাকে বলত, ওখানে চলে আসতে, সে ঠিক গাড়ি পাইয়ে দেব। লাউহাটি থেকে জায়গাটা অনেক দূরে। তাও নয়-নয় করে ২২ থেকে ২৪ কিলোমিটার। সাইকেল নিয়ে যেতাম রোজ। যাতায়াত মিলিয়ে গড়ে ৫০ কিলোমিটার হবে। যথারীতি গুরুর কাছে যাওয়া বন্ধ হল। একদিন উনি বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেন আমি যাচ্ছি না, আমি আর্থিক কারণের কথা খোলসা করে বললাম, উনি সমস্তটা বুঝে আমাকে জানালেন, প্রতি গাড়ি হিসেবে আমাকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে। আমি যথারীতি এই প্রস্তাবে রাজি হলাম, কারণ দিনের শেষে তিনিই আমার গুরু! আমি বেশি লাভের মুখ দেখেও, শুধুমাত্র নীতির কারণে সে-পথে পা বাড়ালাম না। আসলে জীবনে কারও কাছে বিন্দুমাত্র কিছু পেলে, তাঁর অবদান আমি অস্বীকার করতে পারি না। যতই অভাব জীবনে আসুক, গুরুকে মেনে চলতে হবে। এটা আমার বাবা-মা আমাকে শিখিয়েছিল। হয়তো যুগের সঙ্গে এ-কথা ঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না, কিন্তু আমি এভাবেই বিশ্বাস করি।

নতুন করে কাজ শুরু করার পর ঠিকমতো টাকা পেতেন?

না, একই জিনিস আবার শুরু হল, কাজ করছি কিন্তু টাকা পাচ্ছি না। বাড়িতেও অশান্তি শুরু হল এ-নিয়ে, অন্তত কিছু খেয়ে-পড়ে তো বাঁচতে হবে। আবার ওঁর কাছে গিয়ে টাকা চাইলাম, কিন্তু দিলেন না, পরে বলেছিললেন, যদি টাকা হাতে পেয়ে পালিয়ে যাই, সে-কারণে নাকি টাকা দেননি। কাজ ছেড়ে দিলাম বাধ্য হয়েই, পেট তো আর নীতি মানে না। এলাকায়  নানান মানুষ তখন এ-কাজেরই সূত্র ধরে দিল, কিন্তু যেহেতু গুরু এটা দিয়ে করে খান, তাই নিজের এলাকায় অন্তত কাজটা করতে অস্বীকার করেছিলাম প্রথমে। আজও সেই গুরুকে দেখলে সম্মান করি।


নতুন করে শুরুটা কীভাবে হল?

এরপর একজন রং-মিস্ত্রি গোপালদা, (গোপাল বসু) আমাকে রাজারহাটে নিয়ে আসেন, একজন গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করান। সে আমাকে যথারীতি কাজ দিতে অস্বীকার করে। কেনই-বা দেবে! আমাকে চেনে না, জানে না…গোপালদাই ওই গাড়ির মালিককে অনুরোধ করে বললেন, আমি যেন সামনের অংশটুকু রং করি, যদি পছন্দ না হয়, টাকা লাগবে না। নতুন করে আবার বিনামূল্যে রং করে দেওয়া হবে। আমি রং করলাম, ওঁর পছন্দ হল খুব। এখান থেকে আরেক রং-মিস্ত্রির সঙ্গে পরিচিত হলাম, বাবলুদা। ওঁর বাড়ি নারানপুরে। ওঁর সূত্র ধরেই ২১৭ নম্বর রুটের বাসে রং করেছিলাম। আজও মনে আছে সে-গাড়িটার নম্বর ছিল, ২৯৭৬। ওই গাড়ির মালিকরাও প্রথমে রং করতে দিতে চাইছিলেন না, কিন্তু বাবলুদার ভরসাতেই রং করতে দিলেন, আমি সামনের একটা বোর্ড বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম, বিভিন্ন টাইপ-ফন্ট নিয়ে নিরীক্ষা করে আঁকলাম। ওঁদের তা খুব পছন্দও হল। এই গাড়িটার কাজ হওয়ার পরেই— সারা কলকাতার বুকে আমার কাজের পরিধি ছড়িয়ে যেতে শুরু করল। কোথাও বাসে লেখার কোনও কাজ হলেই, লোকে বলত— আগে বইজুকে খবর দিবি।

এত বাসে ‘Art Baiju’ লেখা থাকতে দেখি,  এ-সবই কি আপনার করা? কেউ সাহায্য করে না?

এখন রুটে যত জায়গায় বাস-লরিতে ‘Art Baiju’ লেখা দেখেন, সেগুলোর অধিকাংশই আমার কাছে যারা কাজ শিখেছে, সেই ছেলেগুলোর লেখা। আমি নিজে কাজ কমিয়ে দিয়েছি, আমার কাজ করতে এখন একটু সময় লাগে, কাজ করলে খুব ধরে-ধরে সময় নিয়ে করি। একটা সময়ে, এই কাজ যখন শিখছিলাম, তখন খুব লড়াই করেছি, আমার একটা প্রতিজ্ঞা, আমার কাছে যারা কাজ শিখেছে, আমার সঙ্গে যারা কাজ করছে, তারা যেন এই অসুবিধের মধ্যে না পড়ে। এমনও হয়েছে, আমার নিজের রোজগার ঠিক মতো আসে না, কিন্তু আমার ওদের টাকাটা ঠিক মতো দিয়ে যাই। একটি ছেলে আমার কাছে কাজ করে, যে মাস গেলে ৩০,০০০ টাকা মাইনে নেয়।

বলেন কী! ৩০,০০০!

হ্যাঁ, প্রায় ২৪ বছর ধরে ছেলেটা আমার কাছে কাজ করছে। যেদিন আবার কাজ বেশি হয়, কাজ অনুযায়ী টাকা বাড়িয়ে দিই। এখন কাজের বাজারটা মন্দা যাচ্ছে, আমি যতটা পারি, ওদের দিয়ে দিই।

আপনার চলে কীভাবে?

চলে খুবই কষ্টে। আমাকে বাইরে থেকে দেখে সেভাবে বোঝার উপায় নেই, লোককে বুঝতে দিই না। তারউপরে বাড়িতে পথকুকুরদের আশ্রয় দিই। যে-হাঁড়িতে আমাদের ভাত রান্না হয়, সে-হাঁড়িতেই ওদেরও রান্না হয়। এত লোকের কথা ভেবছি, এমনও হয়েছে নিজের বাড়িতে চাল নেই, কেউ একজন অভাবের কথা জানিয়েছে, তাকে সেদিনের রোজগারের গোটা টাকাটা দিয়ে এসেছি। আমার এক পুরনো ছাত্র ছিল, তার বাবার ক্যানসার হয়েছিল। সে আমার কাছে এসে সাহায্য চায়, আমি তাকে সে-সময়ে যথাসম্ভব সাহায্য করেছিলাম। সে বর্তমানে পুলিশে চাকরি করে, দিন কয়েক আগে, রাস্তায় দেখা হতেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম! এগুলোই আসলে প্রাপ্তি, সম্পদ।

আঁকা আর খেলা একসঙ্গে চালিয়ে নিয়ে গেলেন কীভাবে?

যেহেতু একটা সময়ে ফুটবল জগতে পরিচিতি ছিল, পাড়ার বহু প্রতিভাধর ছেলে আমার কাছে এসে খেলার কথা বলত, আমি ওদের ময়দানে নিয়ে গিয়ে আমার পূর্ব পরিচিত ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলাম। এই সূত্র ধরেই আবার ময়দানে যাতায়াত শুরু হল। আমার ছেলেবেলার আর-একজন কোচ খোকাদা, আমাকে বললেন, মাঠে রেফারির কাজ করতে। সে-থেকেই আবার ফুটবলে পা ছোঁয়ালাম। ছেলেগুলিও সিলেকটেড হল। সে-সূত্র ধরেই সেকেন্ড ডিভিশনে কোচিং করারও সুযোগ পেলাম। যদিও ময়দানের অভ্যন্তরীণ কিছু রাজনীতির জন্য টিম শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি। তবে একটা কথা আপশোসের সঙ্গে বলতেই হবে, যারা ফুটবলের ‘ফ’-ও বোঝে না, তাদের অনেকেই আমাদের বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে, আজও তাই আমাদের ফুটবলের দুরবস্থা ঘুচল না। এরই মাঝে বাড়িতে স্ত্রী অসুস্থ হল, বড় অপারেশন করাতে হল। আমি ময়দান ছাড়লাম আবারও। এখন বাড়ির কাছের মাঠেই শেখাই। ২০১৬ সালে কোচিং লাইসেন্সও করে নিয়েছিলাম।

আচ্ছা, বাসে তো অনেক সময়ে অনেকরকম কথা লেখা থাকে, সেগুলি কি আপনারাই বেছে নেন?

অনেকক্ষেত্রে আমরা নিজেরা লিখি নিজেদের মনমতো, অনেকক্ষেত্রে বাস-মালিকরা ঠিক করে দেন। ধরা যাক, মালিকপক্ষ লিখতে বলল, ‘Keep Some distance’, সেটাকেই মজা করে লিখলাম— ‘ওগো পিয়া এত কাছে নয়, আরেকটু দূরে’। অনেক সময়ে সাধারণ মানুষ তাড়া দেন বাস-ড্রাইভারকে। কেন ধীরে বাস চলছে, ঠেলাগাড়ি চালাচ্ছে নাকি ড্রাইভার! এসব বলে থাকেন। পাশাপাশি, অনেক সময়ে প্যাসেঞ্জার না থাকলেও, বাস বিনা কারণে দাঁড়িয়ে পড়ে; সেটাকেই আমি মজা করে রবীন্দ্রনাথের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে লিখলাম, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’। আমার উদ্দেশ্য, মনের ভাব-পরিস্থিতিকে, ক্ষেত্র-বিশেষে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করা মাত্র।

কোন-কোন বাসরুটে কাজ করেছেন আপনি?  

এখন 30c , 91c,  211, 44, 217, 215, 3C/ 1, বাগুইআটি মিনি— সাধারণত এই বাসগুলোর কাজ করি। ধরা যাক রুটের মধ্যে ১০টা বাস থাকলে, আটটার কাজই আমরা করে থাকি।

তাহলে বাকি আর কী রইল!

আসলে, এখন কাজ অনেক কমে গেছে, এদিকের অনেক গাড়িই নীলগঞ্জের দিকে চলে যাচ্ছে। রাজারহাট-নিউটাউন সংলগ্ন অঞ্চলের যে-জমিগুলোতে গ্যারেজ ছিল, সেখানে বড় বিল্ডিং উঠছে, ফলত অধিকাংশ গ্যারেজই সরে যাচ্ছে অন্য চত্বরে। আমার যেহেতু এটাই মূল পেশা, গ্যারেজ সরে যাওয়ার কারণে রোজগারেও ঘাটতি হয়েছে। তার উপরে পথকুকুরদের সেবার কথা তো বললামই। ওদের থাকার জন্যই বাড়ি দোতলা করে, সেখানে একটা হল ঘরে থাকার পাকাপাকি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। আর, ফুটবল-কোচিং করে যেটুকু পাই, সেটার অধিকাংশ যাদের শেখাই, সেই সব ছেলেদের খরচাতেই বেরিয়ে যায়। আমি আসলে যে-হিসেবে রোজগার করতাম, সে-হিসাবে দানও করতাম। আজও সেটাই করার চেষ্টা করি।

কখনও দেওয়াল লিখেছেন?

হ্যাঁ, আগে প্রচুর লিখেছি। ভোটের সময়ে সেই লেখাপত্র আরও বেড়ে যেত। আসলে ডিজিটাল-ফ্লেক্স এসে যাওয়ার পর আমাদের কদর খানিক কমে গেছে।

কাজ অনেক কমে গেছে বললেন, ফুটবল শেখানোর পরিধিও অতটা বিস্তৃত নয়, এক সময়ে যখন ময়দানে খেলেছেন, সে-সময়ের তুলনায় কিছু তো নয়ই, আপশোস হয় না?

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে তো সবই বদলায়, আমাদেরকেও সেভাবে নিজেদের বদলে নিতে হয়। এক সময়ে অনেক পরিশ্রম-লড়াই করে বড় হয়েছি। এখন হয়তো কিছুটা প্রতিকূল পরিস্থিতি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পরিশ্রমের বিকল্প নেই! আমি তো মানুষের কোনও ক্ষতি করিনি, যখন পেরেছি, নিজের সবটুকু দিয়ে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। অবলা প্রাণীদেরও বাদ দিইনি। আমার বিশ্বাস, নিঃস্বার্থভাবে নিজের কাজটুকু ভালবেসে করে যেতে হয়, সেটাই তো শিল্প! সেটাই তো জীবন! জীবনই ঠিক ফিরিয়ে দেবে…