লেখক দেখা, বন্ধু বাছা
‘কল টিপলে জল, দেল (দেওয়াল) টিপলে আলো’ আমার মা বিয়ের পর শহরে এসে এই বাক্যটা শিখেছিল। কালীঘাটের লোকজন বলত— একটা বই, একটা খাতা, সঙ্গী ছাতা। এই কথাটা মানে বুঝেছি অনেক পরে।
আমরা যখন হুড়দুম করে বড় হচ্ছি। যত বড় হচ্ছি, তত ভেঙে যাচ্ছি। ভাঙা মানে, ভাঙন ধরছে গ্রুপে। এখন অনেকে আমাদের দেখলে সরে যায়। লুকিয়ে পড়ে। আমরাও অনেককে দেখলে সিঁটকে থাকে, ও যদি এসে কথা বলে— তাহলে আমাদের জাতকৌলীন্য যাবে।
কিন্তু আমাদের সবার মাঝে সেতু হয়ে গিয়েছিল চিন্টু। চিন্টু আমাদের যেমন ক্যাপ্টেন, ওদের তেমনই ইয়ার-দোস্ত। চিন্টু কি বেশ্যাসক্ত হয়ে পড়েছিল, রুমির ভেড়ুয়া হয়ে পড়েছিল? সেই ছোটবেলায় শুনেছিলাম, কামরূপ-কামাখ্যার তন্ত্র জানা মেয়েরা পছন্দের পুরুষকে ভেড়া বানিয়ে রাখে। এই নিয়ে পরশুরামের একটা দুর্দান্ত মজার গল্প আছে। ‘কামরূপিনী’। প্রয়োজনে তারা নাকি সেই ভেড়াকে কেটে সাতরকম রান্না করেও খাওয়াতে পারে।
কীভাবে কালীঘাট থেকে গড়িয়াহাটে চলে এল বাজার? পড়ুন ‘অলিগলির কালীঘাট’ পর্ব ৮…
কিন্তু গলির মেয়েরা উল্টো, তাদের প্রেমে পড়ে যারা এখানে এসে আশ্রয় নেয়, তারা শেষ হয় নিজেদের দোষে। মদ, নেশায়, হতাশায়। অনেকেই আছে একটা সময় রোজগার করে মেয়েদের সঙ্গে ফুর্তি করেছে। পরে তারা বেরোজগার হয়ে মেয়েদের গলায় ঝুলেছে। আর এই মেয়েরা কিন্তু তাদের শেষ পর্যন্ত বুক দিয়ে আগলে রাখে। এমন বেশ কয়েকজনকে আমি চিনি।
খুব ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পাশে মানামামার বাড়ি তৈরি হল। এই বাড়ির কথা আমার খুব মনে আছে, কারণ বাড়ি তৈরির সময় মাটির তলা থেকে অনেক জালা বেরিয়েছিল। একটা যদি মোহরভরা ঘড়া বের হয় সেই প্রতীক্ষায় আমরা ছোটরা সবাই হাঁ করে বসে থাকতাম। কিন্তু সব জালা ঘড়াই ছিল ঢুঁ-ঢুঁ। কোনওদিন কোনও ফুটো পয়সাও বের হয়নি।
তবে ফুটো পয়সা আমি দেখেছি। কীভাবে দেখেছি? না, শুধু জমানো নয়। অন্য একটা ব্যবহারও দেখেছি। পরিবারের কেউ মারা গেলে, খইয়ের সঙ্গে এক নয়া পয়সা, দু-নয়া পয়সা মিশিয়ে শবযাত্রার আগে ছড়াতে ছড়াতে শ্মশান যাত্রীরা যেতেন। এই বেশিরভাগ পয়সার সাপ্লাই আসত বাড়ির লক্ষ্মীভাঁড় ভেঙে। এই লক্ষ্মীর ভাঁড়ে ফুটো পয়সা থাকবেই থাকবে। তখন সেই পয়সার জমানা শেষ হয়ে গেছে, তবে যমের সঙ্গে ফুটো পয়সার বিনিময় চলত!
কালীঘাটে একটা তুক ছিল, অনেকেই এই পয়সা কুড়িয়ে বাচ্চাদের কোমরে পরাত।


একটা ঝকঝকে একতলা বাড়ি উঠল মানামামার। দু’দিকে দুটো ফ্ল্যাট। মাঝখানে সিঁড়ি। একদিকে মানামামারা থাকবে, অন্যদিকে প্রতাপদারা। প্রতাপদা রুটি খেত অদ্ভুত কায়দায়। রুটিটা হাতে নিয়ে নখ দিয়ে রুটির প্রতিটা কালো তুলে তুলে ফেলে দিয়ে তারপর রুটি খেত। তাই তার খেতে অনেক সময় লাগত। এই প্রতাপদার সঙ্গে ছোটবেলায় আমার আত্মার টান ছিল। প্রতাপদা নামী তবলিয়া। অনুপ ঘোষাল খুব আসত প্রতাপদার বাড়িতে। অনুপ ঘোষাল তখন খুবই জনপ্রিয়। গিরিজা দেবীর মতো মানুষদের সঙ্গে প্রতাপদা সঙ্গত করতেন। ছোটবেলায় আমার খুব তবলা শেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু যার সঙ্গে এত ভাব, সেই প্রতাপদা আমাকে কোনওদিন তবলার কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। অনেক অনেক পরে— একদিন দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আচ্ছা, তুমি আমাকে তবলা শেখাওনি কেন বলত? আমার বাবা তোমাকে টাকা দিতে পারবে না বলে? দাদা, অনেকক্ষণ থেমে থেকে বলেছিল, কেন শেখাইনি বলতে পারব না। তবে এখন মনে হয়, ভাল করেছি। তোর ভেতর শিল্পের খিদে তৈরি হয়েছিল। তুই সঙ্গত করবি কেন— তুই তো শব্দের সুর ধরেছিস।
মানামামা একটু গুরুগম্ভীর লোক ছিলেন। কোথাও একটা সোনার দোকান ছিল তাঁর। ওদের বাড়ি তৈরি সময় আনারচাচা হেড মিস্ত্রি ছিল, সে দক্ষিণ ২৪ পরগণা কি মুর্শিদাবাদের মানুষ। আমাদের প্রায় দিন কিমা ঘুগনি খাওয়াতে নিয়ে যেত। সে কালীঘাটের গলির একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে। পাল্লাই বলব। কারণ দেশে তার স্ত্রী, দুটো বাচ্চা ছিল। যার সঙ্গে আনারচাচার আশনাই ছিল, সে কমলা। যতদূর সম্ভব, তার নাম ছিল আনারুল। ছোট্ট একটা বোতল বের করে একবারে ঢকঢক করে মদ খেয়ে নিত। হা করে একটা আওয়াজ করত। সে বাড়িঘর ছেড়ে এই মেয়েটার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল। আমরা বেশ বড় হয়ে গিয়েছি। তখনও মানুষটাকে দেখতাম। স্থায়ী কালীঘাটের বাসিন্দা হয়ে গেছে। চিন্টুর কাছ থেকে জেনেছিলাম, আনারচাচা মাঝে-মাঝে দেশে যায়। পরে শুনেছিলাম— চাচার টিবি হয়েছে। তখন এই কমলাই ওর যাবতীয় চিকিৎসা করায়। চিন্টু বলত, আনারকে কমলা গয়না বিক্রি করে ডিম-দুধ খাইয়ে চিকিৎসা করিয়েছে। বলছে— মদের বোতলে হাত দিলে ঠ্যাং ভেঙে রাখবে। এ-ও শুনেছিলাম, আনার সুস্থ হয়ে দেশে চলে গেছে। মাঝেসাঝে দু-একদিনের জন্য কালীঘাটে আসে বেড়াতে।
কিন্তু চিন্টু সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরতে পারেনি। তবে শেষ পর্যন্ত জানি, ও মেয়েতে নয়, মদেই শেষ হয়েছে। ও সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখানো, তোয়াক্কা না করা, অথবা অন্য কোনও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পথে হাঁটতে-হাঁটতে হারিয়ে গিয়েছিল। চিন্টুর আরও কথা পরে সময় হলে বলব। আগে ওর সেই জাঠতুতো দাদার কথা বলি।

রিন্টুদা ছিল রোগা লম্বা, খাঁড়া নাক, বাঁটুল কার্টিং চুল। রিন্টুদা চিন্টুর জাঠতুতো দাদা। তখন দাদা-দিদিরা বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ হত, কেননা সিলেবাসে শরৎচন্দ্রের ‘মেজদা’ ছিল। সবাই মেজদা। রিন্টুদা আমাদের সঙ্গে কথা বলত না। আমরা ছোট, পুঁচকে, অর্বাচীন, গাধা, গরু, বলদ, নেংটি— আমাদের সঙ্গে কী কথা বলবে। ওই জাঠতুতো দাদা রিন্টুদা ছিল মহা গুলবাজ। পড়াশোনায় ভাল, কালীঘাটের কোনও দোষ পায়নি। কাগজে তামাক ভরে ঠোঁট বুলিয়ে বেশ কায়দা করে সিগারেট বানিয়ে খেত। তার আগে কাউকে অমনটি দেখিনি। রিন্টুদা আর চিন্টুর বাবা ছিলেন অসম্ভব রাগী। সারা পাড়ার লোক ওদের সমীহ করত। প্রচণ্ড জোর ছিল গলায়— একবার যদি ডাকতেন— চি-ন-টু। আমাদের সঙ্গে থাকুক, না-থাকুক, আমরা যে যার মতো ভাগলবা হয়ে যেতাম। পাড়ার এই বড়দের হাঁকডাকের জন্য, এর দোষ ওর ঘাড়ে চাপানোর জন্যই আমরা মন্দিরের দিকে চলে গেলাম। যেন পাপ থেকে পুণ্যের পথে। কালীঘাটের গলি, কালীঘাট বাজার সব যেন পাপে ঠাসা!
এই রিন্টুদা একদিন এসে আমাদের পুলিশের জেরা করে গিয়েছিল। তারপর, কেন জানি না, মাঝে-মাঝেই আমাদের গল্পের আড্ডার মাঝে এসে ভিড়ত। বিশেষত লোডশেডিং হলেই। কয়েকজনের সন্দেহ ছিল— রিন্টুদা স্পাই। চিন্টুকে ধরতে হাতেনাতে আসত। চিন্টুর গতিবিধি নিয়ে তখন আমাদের সকলের মধ্যেই একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। চিন্টু এই আছে, এই নেই। সিনেমা এলেই দেখে ফেলছে। কার সঙ্গে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।
রিন্টুদা আমাদের কাছে এসেই নানারকম গল্প শুরু করত—
সুকুদাদের বাড়ির মুখে ছোট্ট জায়গাটায় মাঝে-মাঝেই রিন্টুদার আগমন হত। এসেই অদ্ভুত কিছু একটা প্রশ্ন করত, জনে-জনে, আমরা কেউ পারতাম না। তখন হাতের সামনে যাকে পেত, নিজের ভাই ছাড়া, সবাইকেই মাথা জ্বালানো গাঁট্টা মারত। তারপর আরও অদ্ভুত করে একটা গল্প বলত। যেমন বিজ্ঞানী নিশিমারের গল্প। নিশিমার নাকি মশার লালাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছিল। মশার লালায় আর ম্যালেরিয়ার বিষ থাকবে না। এটা নাকি আবিষ্কার হয়েই যেত। ওই আবিষ্কারের আগে নিশিমার এক ডেঞ্জারাস মশার আবিষ্কার করেন। সে মশায় সাপের ছোবলের মতো বিষ ছিল। একবার হুল ফুটিয়ে দিলেই মৃত্যু। সেই মশাভরা কাচের নলটা আমেরিকার ষড়যন্ত্রে এক বাঙালি ভেঙে ফেলে। মশা কামড়ায় বিজ্ঞানী নিশিমারকে, আর মশাটাকে এক চড়ে মারে বাঙালি লোকটি।
যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় দেওয়ালে দেওয়ালে— ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’ লেখা আছে। জ্বলজ্বল করছে ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। সারা পৃথিবীর শত্রু আমেরিকা। আমেরিকা নিপাত যাক।
বাড়িতে এসে বাবাকে নিশিমার আর মশার কথাটা বললাম। অবশ্যই আমেরিকার ষড়যন্ত্রের কথাও।
বাবা শান্ত মুখে বললেন— কে বলেছে? রিন্টুদা। বাবা বললেন, ওটা রিন্টুদা হবে না, ওটা ঘনাদা হবে। বাবাকে রিন্টুদার শোনানো আরও দু-একটা ঘটনার কথা বললাম, বাবা বলল, সব ঘনাদা। চল তোকে একদিন ঘনাদাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব। আমাদের দোকানে পাঞ্জাবি বানাতে এলে— পেমেনবাবুর সঙ্গে কথা বলে রাখব।
আমার বাবা তখন নিজেদের দোকান খুইয়ে ভাসতে ভাসতে এক জ্যাঠার দোকান ছিল ভবানীপুরে, প্রমথনাথ বিজয়কৃষ্ণ অ্যান্ড কোং, সেই দোকানের ম্যানেজারি করত।
একদিন সত্যি-সত্যি বাবার সঙ্গে চলে গেলাম প্রেমেন্দ্র মিত্রর বাড়ি। আমার সঙ্গে চিন্টু ও রিন্টুদাও ছিল। রিন্টুদাকে দেখে প্রেমেন্দ্র মিত্রের মুখচাপা হাসি— এই সেই ছেলে ‘মশা’-র গল্পেও আমেরিকার ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছে!
আমার প্রথম লেখক দেখা। তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্র। মনে আছে আমাদের সবাইকে উনি রসগোল্লা খাইয়েছিলেন। দোতলা বাড়ি। আমরা ছাড়াও রবিবার সকালে অনেক লোক ছিলেন।
পরের দিকে আমি আর গৌতম একবার শ্মশান পেরিয়ে বিমল মিত্রর বাড়িও দেখে এসেছি। তখন ঘরে-ঘরে বিমল মিত্র। তিনিই কিনা থাকেন কালীঘাট ছুঁয়ে! বেশ রোমাঞ্চ হত। আর এক লেখকের বাড়ি গিয়েছিলাম, কিছুতেই তাঁর নাম মনে করতে পারছি না। তিনি থাকতেন রাসবিহারী অ্যাভেনিউর যে গুরদোয়ারা আছে, তার উল্টোদিকের কোথাও একটা। আমার বড়জামাইবাবুর বন্ধুর স্ত্রীর বাড়ি। সুকুমার সমাজপতির বাড়ি ছিল নকুলেশ্বরতলার দিকে। রবি ঘোষের বাড়ি আমাদের বাড়ির পিছনে।



তাহলে এতগুলো মহা মহা লেখক কালীঘাটের চারদিকে থাকতে কী করে — ‘একটা বই, একটা খাতা, সঙ্গী ছাতা’ হয়?
আসলে আমরা বড় হতে হতে অনেকই বন্ধুবান্ধব পাঁজি নিয়ে বসে গেছে কালীমন্দিরের লাগোয়া কোথাও। বাদবাকি বন্ধুরা লেখাপড়ার পাট তুলে বাবার ব্যবসায় জুড়ে গেছে। তাদের হাতে খেরোর খাতা। আর আমাদের বাবারা যারা কাজ করত, চাকরি বাকরি— তাদের বগলে থাকত ছাতা! চাকুরিজীবীর লক্ষণ!
মাধ্যমিক পাশ করার পরই সবাই ভাবতে শুরু করেছি, লেখাপড়া শেষে বগলে একটা ছাতার স্বাদ পাওয়া। কী পড়ব? চাকরি চাই। কী খেলব? চাকরি চাই। সে এক অদ্ভুত সময়। আমাদের মধ্যে তখন একান্তে কাজের কথা হতো।
আমাদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে রাতারাতি দেখলাম— ফুলপ্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গিকেই সঙ্গী করে নিল। তার নাম কালটা। কালটা, সবসময় লুঙ্গি পরিস কেন? আরে, পানের কারবার করি। পানের কষ প্যান্টে লাগলে উঠবে? কালটার কাছেই শুনলাম, পান পচে গেলে যেখানে-সেখানে ফেললে হবে না। গঙ্গায় ফেলতে হবে। সঙ্গে এক নয়া পয়সাও দিতে হবে। সেই পয়সায় মা গঙ্গা চুনসুপারি কিনে খাবে।
এক বন্ধু পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিল। দেবব্রত। অভাবে বসে গেল মামার বিড়ির দোকানে। অবসর সময়ে সারা দুপুর বিড়ি বানাত, বাড়তি রোজগারের জন্য। ওকে দেখতাম সর্বক্ষণ ওর হাত যেন নড়ছে, মাথা যেন কাঁপছে।
রিন্টুদা ছিল রোগা লম্বা, খাঁড়া নাক, বাঁটুল কার্টিং চুল। রিন্টুদা চিন্টুর জাঠতুতো দাদা। তখন দাদা-দিদিরা বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ হত, কেননা সিলেবাসে শরৎচন্দ্রের ‘মেজদা’ ছিল। সবাই মেজদা। রিন্টুদা আমাদের সঙ্গে কথা বলত না। আমরা ছোট, পুঁচকে, অর্বাচীন, গাধা, গরু, বলদ, নেংটি— আমাদের সঙ্গে কী কথা বলবে। ওই জাঠতুতো দাদা রিন্টুদা ছিল মহা গুলবাজ। পড়াশোনায় ভাল, কালীঘাটের কোনও দোষ পায়নি। কাগজে তামাক ভরে ঠোঁট বুলিয়ে বেশ কায়দা করে সিগারেট বানিয়ে খেত। তার আগে কাউকে অমনটি দেখিনি।
আমার থেকে ছোট, তবু বন্ধু, স্বপন। তার বাবার মোদি কাটরায় দোকান ছিল। মোদি কাটরা তোলার জন্য আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার বাবা কিছুদিন পরে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলেন। সেই বন্ধুটি তার বাবার দোকানে বসল। সেলাই শিখল। ওকে বসে বসে দেখতাম, অদ্ভুতভাবে পা নাড়াতে। সেলাই মেশিন। হয়তো আমার চোখের ভুল। হয়তো সেটা আমার মনের দেখা। ভুল, ভুল ছিল নির্ঘাত!
আমাদের এক বন্ধু-দাদা, সকাল থেকে উঠে তিনটে দোকানে পাঁঠা কাটত। ছাল ছড়িয়ে দোকানের ওপর তুলে দিত। কিন্তু তার পা ছিল শিল্পীর পা, বল ধরলে ফুল ফুটত।
এরা সব আমাদের পাড়ার। চক্রবর্তী পাড়া, মহিম হালদার স্ট্রিট, নকুলেশ্বর তলা, দেবনারায়ণ ব্যানার্জি রোড…। এরা কেউ গলির নয়।
আর গলির বন্ধুরা মেয়ের দালাল, মদ বিক্রেতা, জুয়াড়ি, টিকিট ব্ল্যাকার, ছুটকো মস্তান, পুলিশের টিপার, কেউ কেউ বেহেড মাতাল। কেউ কেউ নেশা করে মৃত্যুপথযাত্রী।
এখন দূর থেকে বুঝতে পারি, এদের কাউকে-কাউকে দেখে আমরা সরে যেতাম। আবার কাউকে-কাউকে দেখলে এগিয়ে এসে বন্ধুর মতো গল্প করতাম।
এই ভাগাভাগিটা আমি আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা থেকেই বেছে নিয়েছিলাম। মেয়ের দালাল, জুয়াড়ি, মাতাল এড়িয়ে চলো। ওদের দেখলে, না দেখার ভান করো। কিন্তু টিকিট ব্ল্যাকার, ছুটকো মস্তান— আমাদের দীর্ঘ দীর্ঘ দিন বন্ধু থেকে গেছে। বন্ধুর সম্মান পেয়েছে। কারণ, আমাদের স্বার্থ। ওরা দীর্ঘদিন আমাদের স্বার্থকে পুষ্ট করেছে। কিছু হলেই চিকনা আছে, কিছু হলে দেবাকে বলে দেব।
গলির একটা ছেলে, কী নাম হবে রাজু বা রাজা। আত্মহত্যা করল। কোথায় করল জানেন? আমাদের চক্রবর্তী পাড়ার ভেতর একটা জোড়া শিবমন্দির ছিল। সেই শিবমন্দিরের গায়ে রং করার সময় বাঁশ বাঁধার ছোট ছোট গর্ত ছিল। তেমনই দুটো গর্ত রাজু নির্বাচন করেছিল। তারপর এ-মন্দির থেকে ও-মন্দিরের মধ্যে বাঁশ ঢুকিয়ে শক্ত একটা টানা দিয়ে সেখান থেকে ঝুলে পড়েছিল।
সবাই বলছিল, মরার কি জায়গা পায়নি?
পরে ভেবেছি, ও গলির ছেলে— তবু বেশ্যাবাড়ির ভেতর মরতে চায়নি। ভদ্রপাড়ার ভেতর, ঠাকুরস্থানকে মৃত্যুর জন্য বেছে নিয়েছিল। যেখানে সবাই বাঁচার প্রার্থনা করতে আসে, সেখানে ও নিখুঁত পরিকল্পনা করে মৃত্যুকে ডেকেছে।



