ভাষা কী? কোনও এক কালে স্কুলে পড়েছিলাম যে, ভাষা হল মনের ভাব প্রকাশের জন্য তৈরি অর্থপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ধ্বনি ও চিহ্নের সমষ্টি। কবেকার সেসব পড়া, আজ কলেজ-ফেস্টে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে গেল।
লাইন এগোচ্ছে না, ফলত গুঞ্জন আর অসন্তোষ জোরালো হচ্ছে ক্রমশ। এরই মধ্যে অনতিদূরে সুবিমলদার চিৎকারের বোমা ফাটল।
—‘স্কাউন্ড্রেল, ব্লাডি বাস্টার্…’ সঙ্গে আরও কিছু গোদা বাংলার খিস্তি, মা-বোন তুলে।
আলাদা করে ‘মুখের ভাষা খারাপ’ কথাটা বোধহয় এইজন্যেই আবিষ্কার হয়েছে। আমি জানি যে এই অকথ্য, অশ্রাব্য গালিগালাজগুলি আমাদের প্রিয়তম এসএফআই নেতা সুবিমলদার প্রকৃত ভাষা বা মনের ভাবপ্রকাশের ভঙ্গী হতেই পারে না। আমি জানি যে, আজ আমরা সেকেন্ড ইয়ারের যে জনা-পঁচিশ স্টুডেন্ট আগেরবারের ফেস্টে অঞ্জন দত্তকে সামনে থেকে দেখতে পাইনি বলে এ-বছর ফেস্টে চাঁদা দিইনি, তাদেরকে সুবিমলদা অ্যানার্কিস্ট বলতে পারে, ফ্যাসিস্ট বলতে পারে, বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে পারে… কিন্তু বাল্ডি বাস্টার্ড? অর্থাৎ কিনা রক্তাক্ত বেজন্মার মতো অদ্ভুত একটা ভাষা বলতে পারে না কক্ষনো। কারণ এক, এটা শুনতে বেশ খারাপ আর দুই, এটার অর্থ হয় না কোনও। সুবিমলদার ভাষায় বললে, এ হল একপ্রকার বুর্জোয়া কর্পোরেট ভাষা, যা উচ্চারণে অর্থহীন এলিটিজম আছে, অবান্তর শ্লাঘা আছে; কিন্তু বোধ নেই, ধী নেই, ভাবপ্রকাশের পরিসর নেই কোনও।
আরও পড়ুন: কোন বাঙালির জন্য বিজ্ঞাপনের বাংলা ভাষা তৈরি হয়? লিখছেন অরিন্দম নন্দী…
এই যে না-থাকা, তা কিন্তু শব্দটা ইংরেজি বলে নয়। জগতের কত ইংরেজি, ফার্সি, পর্তুগিজ শব্দই কালক্রমে বাংলা ভাষার আঁচলের তলায় মুখ গুঁজেছে। প্রায় সব আঞ্চলিক ভাষারই অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর ভাষা দ্বারা অবলুপ্তির ভয় আছে। কোন যুগেই ডঃ শিশির কুমার দাস তাঁর ‘ভাষা জিজ্ঞাসা’ বইতে লিখে গেছেন, ‘কথাটা দাঁড়াচ্ছে এই যে পৃথিবীতে মানুষকে প্রধান আর অপ্রধান ভাষার মধ্যে পার্থক্যটা স্বীকার করে নিতে হবে। যে গোষ্ঠী একটি অপ্রধান ভাষায় কথা বলে, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণেই তাদের একটি প্রধান ভাষা লিখতে হয়।’
সেটা যেমন একটা দিক, তেমনি উল্টোদিকে এটাও সত্যি যে, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে অল্প হলেও বেশ কিছু এদেশীয় শব্দও যেহেতু ইংরেজি অভিধানে ঢুকেছে, তাই ভাষা ব্যাপারটা আদপে অনেকটা আলুলায়িত প্রেমের মতো। চার্লস ডিকেন্স, ক্যাথরিন আর ন্যালির সম্পর্কের মতো। ন্যালির জন্য কেনা ব্রেসলেট স্যাকরা ভুল করে ডেলিভারি দিয়ে গেছে ডিকেন্সের বউ ক্যাথরিনের কাছে। ক্যাথরিন বুঝেছেন, এ-বালা তার জন্য নয়। তবু ভাবেন, আমার ভালোবাসার মানুষ যাকে স্বীকৃতি দেয়, তার জন্য গড়া বালা, একেবারেই কি আমার নয়? ন্যালিকে সেই ব্রেসলেট দিতে-দিতে ক্যাথরিন তাই বলেন, একটা দীর্ঘ জীবন চার্লসের সঙ্গে কাটিয়ে আমি বুঝেছি, যে এই প্রথম দিককার দিনগুলোতে সবকিছুই শুধু তোমার। কিন্তু শীঘ্রই তোমায় জানতে হবে, যে তোমাকে তাকে ভাগ করে নিতে হবে আরও অনেকজনের সঙ্গে।
ভাষা ব্যাপারটাও যে তাই, তা আমায় শিখিয়েছিল সুবিমলদাই। বলেছিল, ভাষার ক্ষেত্রে কোনও অনুপ্রবেশকারী বা বহিরাগত হয় না। যে-ভাষা আমার জনমানসের ভাষা, সে-ভাষাই আমার মাতৃভাষা। ভাষার ক্ষেত্রে তাই একটিই মাত্র বিষয় মাথায় রাখতে হবে, যে যা বলছি, তার একটা অর্থ দাঁড়াচ্ছে তো? আর যে অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ঠিক সেটা-ই আমি বলতে চাইছি তো?
সেটা যেমন একটা দিক, তেমনি উল্টোদিকে এটাও সত্যি যে, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে অল্প হলেও বেশ কিছু এদেশীয় শব্দও যেহেতু ইংরেজি অভিধানে ঢুকেছে, তাই ভাষা ব্যাপারটা আদপে অনেকটা আলুলায়িত প্রেমের মতো। চার্লস ডিকেন্স, ক্যাথরিন আর ন্যালির সম্পর্কের মতো।
বাংলা অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট সুবিমলদা; তোমার কখনও এমবিএ করার কথা ছিল না। কারণ তুমি কোনওদিন কর্পোরেট চাকরি করবে না। তুমি তো মাস্টার হবে। গাওদিয়ার শশী ডাক্তার যেমন ওষুধের বাক্স নিয়ে রোগী দেখতে যায়, ঠিক তেমনি করে তুমি এরুর, গোঘাট, আচুরি কিংবা ঢালডাঙার গ্রামে ছাত্র পড়াতে যাবে। হাতে থাকবে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাংলা ভাষা ও উপভাষা’, সুকুমার সেনের ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’, মুনীর চৌধুরী-মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’। এসব কথা তুমি শেষ যেবার বলেছিলে, সেদিন ছিল ১৫-ই সেপ্টেম্বর; ২০০৮।
সেদিন লেম্যান ব্রাদার্স ধ্বংস হয়ে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ধ্বস নেমেছিল। সেদিন সবার চোখে ভয়, সবার মাথায় চিন্তা। শুধু তুমি খুব হেসেছিলে। বলেছিলে, বুদবুদ…শুধুই বুদবুদ; টাকার বুদবুদ, কথার বুদবদ, ভাষার বুদবুদ। বুদবুদের কর্পোরেট ফানুস, এতগুলো বছর যে চলল, এ জন্যে লোকে আজ কোথায় শ্যাম্পেন খুলবে, তা-নয়, কেঁদে ভাসাচ্ছে।
— তুমি মদ খাও সুবিমলদা? বিদেশি শ্যাম্পেন?
সেসব জানার জন্য আরও দশটা বছর আমায় অপেক্ষা করতে হল। তোমার ব্যাঙ্গালোরের কোরামঙ্গলার বাংলোতে যেদিন গেছিলাম, পারমিতাদি সেদিন ছিল না। ওয়েলকাম করতে গিয়ে প্রথমেই তুমি বলেছিলে— আয়। সিঙ্গেল মল্ট নিবি না স্মার্নফ? না কি এখনও শুধু লিকার চা-ই চলে?
আর আমি বুঝেছিলাম যে তোমার ভাষা পাল্টে গেছে। তুমি আর আমার পদাবলি সাহিত্য পড়ানো থার্ড ইয়ারের সিনিয়র সুবিমলদা নেই। হয়তো সে-জন্যই তোমার এমবিএ হয়েছে, কর্পোরেট চাকরি হয়েছে, মোটা সিটিসি হয়েছে, বাংলো-গাড়ি,-আর্দালি-বাবুর্চি হয়েছে, ইংলিশে এমএ বউ হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়া ছেলে হয়েছে, হিংসে করার মতো সংসার হয়েছে। অথবা এগুলো সব হয়েছে বলেই তুমি আজকের তুমি হয়েছ। উল্টোদিকে আমায় দেখো। তোমায় না পেয়ে, আর কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলার ভাষা খুঁজে পাইনি; আর আজ তোমায় দেখা ইস্তক সব ভাষা হারিয়ে গেছে।
তোমার বাড়ির নাম, যা কিনা হওয়ার কথা ছিল মুক্তধারা; ঢোকার সময়ে দেখলাম তার নাম হয়েছে সরকারস রেসিডেন্স। তোমার পোষা কুকুর, যার নাম হওয়ার কথা ছিল হালুয়া, একটু আগে তুমি তাকে ডগি বলে আলাপ করালে। তোমার বাবুর্চি, যার হওয়া-না হওয়ার কথা কোনওদিন হয়নি, হলই যখন তার তো নাম রাখতে পারতে ভজহরি মান্না; ডাকতে ভজাদা বা মান্নাদা বলে। অথচ তাকে তুমি ডাকো কুক বলে। ভেবে দেখ সুবিমলদা তোমার বাড়ির নাম বাড়ি, কুকুরের নাম কুকুর, তোমার বাবুর্চির নাম বাবুর্চি আর নিজের নাম সুবিমল সরকার বদলে হয়েছে এস এস। অথচ এই তুমিই একদিন সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে উপন্যাসের নাম ভুলে কেবল নম্বর মনে রাখা ৪৫ নম্বর কয়েদির সমব্যথায় নিজের নাম রেখেছিলে পঁয়তাল্লিশ। এই তুমিই না আমায় চোখের বালি পড়াতে গিয়ে আশালতা কেন বিনোদিনীর নাম বিনোদ কিংবা বিনী না রেখে চোখের বালি দিল বুঝিয়েছিলে। আর সেই তুমিই আজ মাল্টিন্যাশনাল গাড়ি কোম্পানির ব্র্যান্ড ম্যানেজার হয়ে এইভাবে কর্পোরেটের কড়ি-বরগার ভাষায় হারিয়ে গেলে সুবিমলদা?
আমার ভাবনার ভাষা অনেকক্ষণ ধরে চারপাশটাকে শীতল করে রেখেছে বুঝতে পেরে ঠাট্টার স্বরে বললাম—
তাহলে সুবিমল সরকার, ব্র্যান্ড ম্যানেজার অফ স্যাঙ্কচুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল…এই তোমার কাজটা কী বলো তো?
— কাজ আর কী? সিঙ্গেল মল্টে চুমুক দিয়ে বলল সুবিমলদা। ‘ব্র্যান্ড পজিশনিং, ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি, লোগো, ট্যাগলাইন, পাঞ্চলাইন, ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস…’
— শুধু শেষেরটা বুঝেছি। খোঁটা দেওয়ার সুরে বললাম আমি। ‘ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস মানে ব্র্যান্ড সম্পর্কে সকলকে জানানো। বাদ বাকি যা বলছ সবই তো কর্পোরেট ল্যাঙ্গুয়েজ। বুঝি কী করে বলো?’
কর্পোরেট ল্যাঙ্গুয়েজ খোঁটাটা সুবিমলদা ধরতে পারল। রাগ করল কি না জানি না, কিন্তু হালকা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল এক মিনিট। তারপর সামনের টেবিলে রাখা খবরের কাগজের প্রথম পাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল— এই অ্যাডটা দেখ। দেখলেই বুঝবি। ল্যাঙ্গুয়েজ লাগবে না।
খবরের কাগজটা হাতে নিলাম। একটা লোক… না না লোক নয়, ছেলেই বলা যায়, বয়স বেশ কম, আর প্রভূত প্রোটিন-শেক খাওয়া পেশি-পেশি চেহারাখানা জ্যাকেটের ওপর থেকেও জানান দিচ্ছে। আর তার বেশ খানিকটা পেছনে একটা বাইক। সুবিমলদা বলেছিল ল্যাঙ্গুয়েজ লাগবে না, কিন্তু দেখলাম এরকম একটা ল্যাঙ্গুয়েজ আছে;
‘আমায় পরখ করো,
জীবন এক্সাইট করো।’
ঈশ্বর, আজ বাক্যহীনতাই কি আমার নিয়তি? কাগজ থেকে মুখ তুলে দেখি সুবিমলদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু একটা বলা উচিত আমার, বললাম— দারুণ। এক্সাইটিং। সুবিমলদা হাঁটুর ওপর জোড় চাপড় মারল। বলল— এগজাক্টলি, এই হল কর্পোরেট কন্সট্রাক্ট।
আমি চুপ করে রইলাম। ফেরার সময়ে সুবিমলদা দরজা অবধি এল। হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে পিঠের ওপর দুটো হালকা চাপড় মেরে— টেক কেয়ার। সি ইউ। লাভ ইউ।
কর্পোরেট ল্যাঙ্গুয়েজ সুবিমলদা। তুমি কিংবা তোমরা, বরাবর জনমানসের ভাষার চাবুক আছড়ে কর্পোরেটের ভাষাই বলতে। ইংরেজি নয়, হিন্দি নয়, বাংলা নয়, বিশ্বের অন্য কোন ভাষা নয়। অর্থহীন, বোধহীন, ভাবনাহীন যে কর্পোরেট বুদবুদ ফেনার মতো অবিরাম তোমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, তাই তোমাদের একান্ত ভাষা।
তাই সেদিনও তোমরা আমাদের ‘স্কাউন্ড্রেল’ বলোনি, আজও তুমি আমায় ‘লাভ ইউ’ বলোনি। এ-সবই ছিল কর্পোরেট ল্যাঙ্গুয়েজ। ভাষাহীন বুদবুদ। এই আছে, এই নেই।




