প্রিয় সুবিমল: পর্ব ১১

Representative Image

গদ্য-পদ্য-সখ্য

বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক ও সুভাষ ঘোষ— হাংরি আন্দোলনের গোড়ার দিকের তিন গদ্যকার। এই ত্রয়ীর মধ্যে, সমালোচকরা সাধারণত বাসুদেবকেই এগিয়ে রাখেন। সুবিমলের থেকে বছরখানেকের বড় বাসুদেব, ‘রন্ধনশালা’ গল্পটি লিখে ততদিনে সমাদৃত। তাঁদের মোলাকাত সম্পর্কে সুবিমল ‘বাসু-বাসুদেব’ শীর্ষক স্মৃতিচারণায় লিখছেন—

‘বাসুদেবের সঙ্গে আমার পরিচয় আলাপ ১৯৬৪ সালে, হাওড়ার পানিত্রাসে সে তখন একটি বিদ্যালয়ে অস্থায়ী শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে বাস করত। প্রতি শনিবার ছুটির পর কলকাতায় কফিহাউসে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ। সমবয়সীদের মাঝে তখন ‘আপনি’র চল ছিল, আমার সঙ্গে প্রথম থেকে ‘তুমি’ সম্বোধন। কফি হাউসে কিছুক্ষণ গল্প-গাছা, আলোচনা, নতুন লেখা গল্পপাঠ তারপর অবধারিতভাবে আমরা সদলবলে খালাসিটোলায় রওনা দিতাম। ট্রামে বাসে রওনা, ফেরার সময় হাঁটাপথে।’

সুবিমলের সংগ্রহে বাসুদেব দাশগুপ্তের বেশ কয়েকটি চিঠি খুঁজে পেয়েছি; সেগুলির সময়কাল ছয়ের দশক থেকে আটের দশক পর্যন্ত। কোনও-কোনও চিঠির ইঙ্গিত অন্যত্র মিললেও, নাগালে আসেনি। তবে সংগ্রহ থেকে যে-চিঠিটি প্রথম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, সেটি ১৯৬৪-র ডিসেম্বর মাসের।

‘আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, জানবেন, আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়বো!’ সুবিমল বসাককে কেন লিখেছিলেন ভাস্কর চক্রবর্তী? পড়ুন: ‘প্রিয় সুবিমল’ পর্ব ১০

প্রিয় সুবিমল,
   তোমার চিঠি পেলাম। বছরখানের আগেকার তোলা গুম্ফসহ একটি ফটো পাঠালাম। তবে তোমার চিঠি যেরকম দেরী করে এসেছে তাতে মনে হয় এ চিঠি তুমি বুধবারের আগে পাবে না। আমি এখানে একপ্রকার। মাঝে কলকাতা গিয়েছিলাম। সমীরদার সঙ্গে দেখা হয়েছে। দেবীও ছিল। তুমি কেমন? বর্তমানে আমি ছাত্রদের খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। ২৪ তারিখ কলকাতা যাচ্ছি। তখন স্কুল ‘বড়দিন উপলক্ষ্যে কিছুদিন ছুটি থাকবে। দেখা হবে নিশ্চয়ই। শুভেচ্ছা রইল। ইতি বাসুদেব। ১২.১২.৬৪

বাসুদেব তখন হাওড়ার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরে অশোকনগরে, তাঁর বাড়ির কাছের এক স্কুলে বদলি নেন। চিঠিতে যে-ছবি পাঠানোর প্রসঙ্গ উঠেছে, সেটি হিন্দি পত্রিকা ‘ধর্মযুগ’-এর জন্য। হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে সেখানে একটি নিবন্ধ লিখছিলেন সুবিমল, তার সঙ্গে ছাপা হবে আন্দোলনকারীদের ছবি। সুবিমলের ডায়েরিতে (৯.১২.৬৪) উল্লেখ— ‘ধর্মযুগে লেখাটা যাতে ২৮ তারিখের আগে ছাপে, তাহলেই ভাল। পাঠিয়ে দিয়ে লিখে দিতে হবে। তবুও শেষ ডাক দেখে বিকেলে উৎপল, সমীরদা, বাসুদেব ও মলয়কে চিঠি লিখে দিলাম। শনিবারের মধ্যে যাতে ছবি পাঠিয়ে দেয়।’ ১৬ ডিসেম্বর, ডায়েরিতে— ‘বাসুদেবের চিঠি এসেছে— সঙ্গে ছবি। দেরীতে এল। পরে পাঠাবো স্থির করেছি।’

বাসুদেব বিভিন্ন পোস্টকার্ডে লেখার পাশাপাশি, রঙিন ছবিও এঁকে দিতেন। তেমনই একটি চিঠি এটি, ছবি-সহ—

প্রিয় সুবিমল, তোমার দুটো চিঠিই পেয়েছি। এরমধ্যে গত শুক্রবার কলকাতা গিয়েছিলাম। ভেবেছি তোমাদের সকলের সঙ্গেই দেখা হবে। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে কারোর সঙ্গেই দেখা করে ওঠা সম্ভব হয়নি। সোমবার সকালে। শৈলেশ্বরদের মেস-এ গিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে কফিহাউসে খানিক আড্ডা মেরেছি। আমরা যখন বের হচ্ছি তখন ম্লয় ঢুকল। আমি মঙ্গলবার হাবড়া ফিরেছি। ‘জেব্রা’ একটা কপি তোমার কাছে আছে শুনে ভয়ানক ছটফট করছি। আমাকে ওটা পাঠিয়ে দাও না? আমি কিছুদিনের মধ্যে আর কলকাতা যাচ্ছি না। সুতরাং অতি অবশ্যই একটা পাঠিয়ে দিও। ‘আনন্দবাজার’ এখনও হাতে আসেনি। মলয়ের প্রবন্ধ পড়লাম। আমার খুব ভালো লেগেছে। তবে অন্য হাংরি কবিদের নাম দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়েছি। তোমার বইটাও ভালো, তবে সুভাষের লেখা সম্পর্কে তোমার সামান্য সচেতন হওয়া উচিত। আর এজাতীয় ভাষা ব্যবহারের উদ্দেশ্য তোমার কি? আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সাক্ষাতে আরও কিছু বলবো। বাসুদেব।

অজস্র ভালোবাসা রইলো। জেব্রা পাঠাও। প্লিজ।

তারিখ লেখা না-থাকলেও, পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প দেখে বোঝা যায়, ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫-তে চিঠিটি লিখেছিলেন বাসুদেব। ‘জেব্রা’ হল মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত পত্রিকা, যেটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৬৫ সালেই। যে-বইয়ের উল্লেখ করেছেন বাসুদেব, সেটি ‘ছাতামাথা’— সুবিমলের প্রথম বই। ঢাকার কথ্যভাষা ব্যবহার করে লেখার কারণ ও উদ্দেশ্য জানতে চেয়েছিলেন বাসুদেব; তবে সুবিমলের অবস্থান ছিল স্পষ্ট— অভ্যস্ত ভাষাভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করতেই এহেন নির্বাচন তাঁর।

২৭.১০.৬৫

সুবিমল,
   ভাইফোঁটা উপলক্ষে কলকাতা গিয়েছিলুম সোমবার। সকলের সঙ্গে দেখা হলেও তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি। জেব্রা পেয়েছি, পড়েছি। তোমার লেখাটি ভীষণ ভালো লেগেছে। এই লেখা নিয়ে তুমি কিন্তু কিন্তু করছিলে? হায়, তুমি কি বোঝ না? ভীষণ ভালো, মারাত্মক। আমার মতো খুঁতখুতে মানুষ— নাঃ, কোন ত্রুটিই আমি বার করতে পারি নি। খুবই আন্তরিক বলে মনে হয়েছে আমার। যেন একেবারে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসছে। আর এই ‘আন্তরিকতা’ আমি ‘ছাতামাথা’র সর্বত্র অনুভব করতে পারিনি। এবার চালিয়ে যাও। সোজা, হৈ হৈ করে। আর মলয়ের নাটক! ওফ! সবচেয়ে ভাল লেগেছে ওটা। সকলের সঙ্গে তুলনা করে এখন নিজের লেখাটা ‘ম্যাদামারা’ মনে হচ্ছে।’

বাসুদেব  

জেব্রার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ পেয়েছিল সুবিমল বসাকের গদ্য ‘গেরিলা আক্রোশ’, মলয় রায়চৌধুরীর নাটক ‘ইল্লোত’ ও বাসুদেব দাশগুপ্তের গল্প ‘রিপুতাড়িত’।

২৭.৭.৬৮

সুবিমল,

   তোমার চিঠি পেয়েছি। আমি হিন্দী জানি না। সোমনাথ দ্বিবেদী কে? উনি যদি আমার গল্প অনুবাদ করে কোথাও প্রকাশ করে থাকেন তাহলে তার আগে আমাকে একবার জানানো উচিত ছিল, নয়কি? অনিমাতে তুমি ‘রন্ধনশালা’ অনুবাদ করে দিয়ে এসেছো এবং শরদ দেওড়া তা ছাপাচ্ছে— এমন কথা তোমার মুখেই বহুবার শুনেছি। বহুদিন ধরে। পরে শরদ দেওড়ার সঙ্গে দেখা হোলে আমি প্রশ্ন করেছিলাম— আপনি আমার লেখা ছাপছেন না কেন? সেইসময়ও কতটা সীরিয়স্‌ ছিলাম আমি জানিনা। আজ অনিমাতে সে যদি কোন লেখা ছাপতে চায় তাহলে আরেকদফা আমার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। লিখিত।
   শৈলেশ্বরের ঠাট্টায় তুমি কিছু মনে কোরনা। ওর ঠাট্টাগুলো সত্যিই অন্যের পক্ষে মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়ায়।
   তোমার বিশ্বাস করার প্রশ্ন আসে কি?
   মলয়ের পাঠানো তোমার চিঠি— এত সহজে ভোলা যায়না। সেখানে দেখেছি তুমি নিজের কোলে ঝোল টেনে কেমন কায়দা করে যতটা সম্ভব বিকৃতভাবে আমাকে মলয়ের কাছে উপস্থাপিত করেছ। এরপর তুমি আমার কাছে কি আশা করতে পার? আমার একটা দোষ আছে। তা হোল এই যে, আমি অত্যন্ত ভদ্র ব্যবহার করি সকলের সঙ্গে। (পড়া যাচ্ছে না) পাঠাবে জেনে খুশি হলাম। মলয়ের ‘জখম’, ‘অমীমাংসিত শুভা’, তোমার ‘ছাতামাথা’ এগুলো এককপি করে পাঠাতে পারলে ভালো হয়। অনেকে আমাদের বই আলোচনা করতে চাইছে— ভবিষ্যতে দরকার হতে পারে।

ইতি বাসুদেব।

পুঃ মোহিত চট্টোপাধ্যায় ‘ক্ষুধার্ত প্রতিরোধে’ হাংরি পদ্যের উপর প্রবন্ধ লিখছে।

এই চিঠি যখন এসে পৌঁছয়, সুবিমল পাটনায়। ১১ আগস্ট ফেরেন বেলঘরিয়ায়। এসে দেখেন, ‘চিঠি এসে পড়ে আছে অনেক, তার মধ্যে বাসুদেবের ও প্রদীপের।’ প্রদীপ চৌধুরীর চিঠিটি ষষ্ঠ পর্বে আলোচিত হয়েছে। সুবিমলের ডায়েরিতে লেখা (১১ আগস্ট ১৯৬৮)— ‘বাসুদেব ও প্রদীপকে কি দেবো— তা ঠিক করে ফেলেছি এবং ভাবছি দেয়া ঠিক হবে কিনা, এভাবে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া এবং দূরত্ব বেড়ে যাবে কেবলই। অথচো, কি যে হবে জানি না, খেয়াখেয়ি চুড়ান্ত ভাবে চলেছে।’ এরই ধারাবাহিকতা চারদিন পরের এন্ট্রিতে— ‘…বাসুদেবের চিঠিটায় আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দায়ী করেছে। …বাসুদেবকে ভেবেছিলাম, কিছু লিখবো না, এখন দেখলাম লেখা আমার একান্ত দরকার।’

কী জবাব দিয়েছিলেন সুবিমল? খসড়া চিঠিটি খুঁজে পেয়েছি আমরা—

১৪/৮/৬৮

বাসুদেব,

ফিরে এসে তোমার কার্ড পেয়েছি। সোমনাথ দ্বিবেদী কে ও ব্যাপারে সরাসরি লিখতে পারো। ও আমাদের লেখার উৎসাহী পাঠক ও অনুবাদক। সুভাষ ও শৈলেশ্বরের সঙ্গে আলাপ আছে, একদিন ওদের মেসে নিয়ে গেছিলাম। ভবিষ্যতে কোন চিঠি এলে, তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবো।
   বিশ্বাস করার ব্যাপারটা চিঠি সম্পর্কে— যখন আমরা নিয়তই নিজেদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস করি— তখন কি আর ঐ প্রশ্ন ওঠে! আমার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে বন্ধুরা তা ঠাট্টা বলে চালিয়ে দেয়, প্রতিবাদে আমার ঠাট্টাকেও সিরিয়াসলি নিয়ে থাকে। ক্ষু. কিং ও খা.টো. জীবনানন্দের জন্মদিন রিপোর্তাজ লেখার পরও, আশ্চর্য আমার ‘কোলে ঝোল টানার কথা’ ওঠে। তোমার চিঠিও তো পড়া হলো। নিতান্ত পক্ষপাতিত্ব না-দেখালে, তুমিও সহজে বুঝতে পারবে ‘ভারতীয় কবি সম্মেলনের ইস্তাহার’ বা ‘ক্ষুধার্ত খবর’ কি মলয়কে এমব্যারাসড্ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়? না, কারো কাছে কোন আশা নয়, কি বা থাকতে পারে— কেবল নিজের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করা ছাড়া।
   মলয়ের কাছেও তো আমার বিরুদ্ধে অনেকেই চিঠি লিখেছে— সেই প্রথম থেকে অর্থাৎ ১৯৬৩/৬৪ থেকে। কিন্তু কখনোই মনে হয়নি, বাসুদেব মলয়কে ইনজেক্ট করলে মলয় শৈলেশ্বরের বিরুদ্ধাচরণ করবে। এমন ভেবে থাকলে, সহজেই চারপাতার দীর্ঘ চিঠি লিখে নিজের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারো।
   আমার কিছু কমপ্লেক্স আছে— গোঁয়ারপনা, সাজিয়ে গুছিয়ে কথা না বলতে পারা, মনে যখন যা হয় তাই বলে ফেলা, কারো লেখা ভাল না লাগলে মুখের উপর বলে ফেলা— এগুলোই আমার পক্ষে মর্মান্তিক।
   ফালগুনীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ত্রিদিবের কাছ থেকে কিছু বই নিয়ে এসেছে, তোমার সঙ্গে দেখা হলে চেয়ে নিও।

সুবিমল।

বাসুদেবের শেষ যে-চিঠির উল্লেখ করে আলোচনার ইতি টানব, সেটি ঠিক চিঠি নয়, বিয়ের কার্ড। তার ভেতরে হাতে লেখা—

সুবিমল, ২৯ শে জুলাই আমার বিয়ে। কলকাতায় দিদির বাড়িতে সব হচ্ছে। ঠিকানা ১৪এ, শ্যামাচরণ মুখার্জি ষ্ট্রীট, কলকাতা – ২। টালা পোষ্টাপিসের সামনে। সব অনুষ্ঠানই হচ্ছে, ফলে বিশৃঙ্খলাও হচ্ছে প্রচুর। কাজের লোকের অভাব। তোমাকে চিঠি দিতে দেরী হোল, সেজন্য মার্জনা চাইছি। অবশ্যই এসো। ৩১ শে জুলাই বৌভাত। এ চিঠি তার আগে নিশ্চয়ই পাবে। এসো, এসো, অবশ্যই এসো। বিনীত বাসুদেব দাশগুপ্ত। ২৪.৭.৭০।

এই বিয়ের বিষয়ে, মলয় রায়চৌধুরী বাসুদেব-সংক্রান্ত এক স্মৃতিচারণে পরবর্তীতে লেখেন— ‘১৯৭০ সালে বাসুদেবের বিয়ের সময় সুভাষ ঘোষ আর ফাল্গুনী রায় বিয়ের মণ্ডপে এতো বেশি মাতলামি করছিল যে বাসুদেব ওদের দুজনকে তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কোনো কথা শুনছিল না সুভাষ। ফাল্গুনীও সুভাষের পাল্লায় পড়ে অপমানিত হয়েছিল। এই তথ্য অবনী ধরের কাছে পাওয়া।’ মলয় আরও লিখেছেন, আরও কয়েকজন হাংরির সঙ্গে তাঁকে ও সুবিমলকেও বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেননি বাসুদেব। মলয় তখন চাকরিসূত্রে প্রবাসী। কিন্তু সুবিমল যে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, তার প্রমাণ ওপরের চিঠিই। গিয়েছিলেন কি? সে-বছরের ডাইরি না-পাওয়ায়, জানা গেল না।

এর পরে যাঁর চিঠি আলোচিত হবে, তিনি কবি ও গদ্যকার মৃদুল দাশগুপ্ত। সুবিমলের মৃত্যুর পর, ‘কবিসম্মেলন’ পত্রিকায় একটি নাতিদীর্ঘ স্মৃতিচারণা লেখেন মৃদুল। সেখান থেকে জানা যায়, সাতের দশকের গোড়াতেই আলাপ তাঁদের। মৃদুল লিখছেন—

‘আমার সঙ্গে সুবিমলদার দেখা হল পঁচিশে বৈশাখের ভোরবেলা জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্র জন্মদিনে। …ধূর্জটিদা আলাপ করিয়ে দিলেন সুবিমলদার সঙ্গে, তিনিও বেলঘরিয়ায় থাকতেন। হাংরি লেখক রবীন্দ্রজয়ন্তীতে! আশ্চর্য হলাম। ওই বয়সে আমি ছিলাম একটু খচরা টাইপের, সুবিমলদাকে শুধিয়ে বসলাম, আপনি এখানে কেন? সুঠাম, যুবাপুরুষ, সুবিমলদা হো হো হাসলেন। বললেন, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমাদের তো কোনও বিরোধ নেই। আমরা হাংরিরা তো মান্য করি রবীন্দ্রনাথকে।
   সেই থেকে সুবিমলদার সঙ্গে আমার অগ্রজানুজ সখ্য, যোগাযোগ।…’

সুবিমলের সংগ্রহে মৃদুল দাশগুপ্তের ছ’টি চিঠি খুঁজে পেয়েছি। প্রথমটি, ১৯৭৫ সালের—

২৭/ডি ডাক্তার বাগান লেন
শ্রীরামপুর, হুগলী

প্রিয় সুবিমলদা,

   আবহর জন্যে আপনাকে দুটি পদ্য পাঠালাম। ইচ্ছেমতো দুটোই/যে কোনো একটি ছাপতে/না ছাপতে পারেন।
   ২৫ শে গানটানের শেষে তো আপনাদের খুঁজে পাওয়া গ্যালো না।
   কেলিয়ে পড়া বাংলাদেশে মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক (?) রাজনৈতিক সব দিকেই জঘন্য অবস্থায় আছি।
   এবং এ ফনি আচার্যর আলোচনা হাস্যকর, যুক্তিহীন ও হাতীমার্কা।
   ভালো থাকুন।
   এই ইনল্যান্ডটির প্রাপ্তিস্বীকার করুন।

মৃদুল দাশগুপ্ত

পোস্ট অফিসের ছাপ দেখে বোঝা যায়, চিঠিটি ১৩ মে তারিখের। ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন সুবিমল। ডাইরিতে ওদিন লেখা— ‘দেখা হল, মৃদুলের সঙ্গে। ও নেপাল বেড়িয়ে এসেছে। জানালো, এলা বলে না— এইলা বলে। আমি বললুম, কোথাও কেন, আবার কোথাও ক্যান।’

ওই পোস্টকার্ডেই দুটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন মৃদুল— ‘নার্সিসাস’ ও ‘কাঁচের পাত্রে ভ্রমর’। দুটি কবিতাই পরে তাঁর ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়; অবশ্য সেখানে প্রথম কবিতাটি নাম বদলে ‘উইপোকা’।

১/১১

সুবিমলদা,

   আবহ পেয়েছি। ওঃ কি বাজে লাগছে আপনাকে গদ্য পাঠাতে পারিনি, ধূর্জটিদাকে সমরেন্দ্রদাকেও পদ্য পাঠানোর কথা ছিলো আপনারা সকলেই নিশ্চয়ই খুব অসন্তুষ্ট হয়েছেন আমার ওপর।
   জানেন, সত্যি, আমার কোনো উপায় ছিল না। গত তিন মাস আমি এমন একটা মারখাব্বা অস্থির, খুব… খুবই খারাপ অবস্থায় ছিলাম। দ্যাখা হোলে বলবো কিভাবে খচ্চরেরা আমাকে use করতে চেয়েছিলো। দোহাই আপনি কাউকে সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকুন।
   শুনুন আমি একটা গদ্য লিখছি, আপনাকে অবশ্যই পাঠাবো মাসখানেকের মধ্যে।
   আপনার স্নেহ আমাকে স্বাভাবিক রাখে।

ভালোবাসা
মৃদুল

১৯৭৫ সালেরই এই চিঠি সম্পর্কে সুবিমলের ডায়েরিতে (১০ নভেম্বর)— ‘মৃদুলের চিঠি পেয়েছি। আগেই হয়তো এসেছিল, পড়ে ছিল কোথাও— কাল পেয়েছি। জবাব দিলুম।’

পরের চিঠিটি ২৪ মার্চ ১৯৭৭-এর, ছোট্ট কিন্তু আন্তরিক। ২৭ মার্চ চৌরঙ্গীর ‘গ্যালারি-এ’তে মৃদুল দাশগুপ্তের একক কবিতাপাঠ, তার আমন্ত্রণ। মৃদুল লিখছেন— ‘আপনি না এলে ভালো লাগবে না, অতএব আসবেন।’ অপর পিঠে ঠিকানার পাশাপাশি আবার লেখা— ‘আপনি না এলে মৃদুল ও মৃদুলের বন্ধুরা কষ্ট পাবেন, সুতরাং…’

পেরিয়ে যাওয়া যাক প্রায় দেড় দশক। ১৯৯১ সাল। মৃদুল দাশগুপ্ত লিখছেন—

১৯ নভেম্বর ১৯৯১
শ্রীরামপুর

শ্রদ্ধেয় সুবিমলদা,

   অনেকদিন আপনার সঙ্গে দেখা নেই। আপনার একটা চিঠি, যা আমার জন্য অগ্রজের উদ্বেগভরা পেয়েছিলাম। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তৎক্ষণাৎ আপনাকে উত্তর দেওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু ভেবেছিলাম ঐ রকম আন্তরিক চিঠি পেয়ে একদিন চলেই যাবো আপনার বাড়ি। শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। বেলঘরিয়ার দিকে যেতাম ঠিকই কিন্তু, গত জানুয়ারিতে আমি ‘আজকাল’-এ যোগ দেবার পর সময় সুযোগ যথেষ্টই কমে গিয়েছে। এখানে কাজ করতে চমৎকার লাগছে, তবে কাজের সময়টা বিকেল থেকে ঢের রাত। ফলে দিনের দিকে কোথাও যাওয়া হয় না। আপনি কি কলেজস্ট্রিটের দিকে একেবারেই আসেন না?
   দেখি, একদিন আপনার বাড়ি চলে যাবো। চিঠি দেবেন। আপনি বৌদি সকলে ভালো আছেন নিশ্চয়ই।

মৃদুল

সুবিমলের ডায়েরিতে (২৩ নভেম্বর, ১৯৯১) এই চিঠি সম্পর্কে লেখা— ‘…মৃদুল দাশগুপ্তের পোস্টকার্ড। সে ‘আজকাল’-এ join করেছে। ভালই হয়েছে। চিঠিটা পেয়ে ভালও লাগল।’

শেষ চিঠিটি আরও পাঁচ বছর পরের, ১৯৯৬-এর—

সুবিমলদা,

   প্রথমত বলি, অফিসে হাওয়া ৪৯ (যাতে রয়েছে আপনার প্রত্নবীজ উপন্যাসখানি) পেয়ে আমি উদ্বেল হয়েছি, খুশি তো বটেই।
   এরপরই কয়েকটি মধ্যরাতে আমি উপন্যাসটি পাঠ করেছি এবং এখনও এর বিভিন্ন অংশগুলি বারবার পড়ছি। আপনার এই লেখাটি আমার মনে হয়েছে পাঠককে (এক্ষেত্রে আমি) ঘোরতর এক involvement-এ নিয়ে যায়। বিহার সম্পর্কে আমি বস্তুত অজ্ঞই, লোদিপুর এলাকার লোকায়ত ভাষাও আমার অজানা। তা সত্ত্বেও যেন নিজেকে ওই অলিগলির এক ভ্রাম্যমান মনে হয়েছে।

   আমার দারুণ লেগেছে সবকিছুই। এর মধ্যে ‘তেতরি নগিনা’ মনে হলো আগে পড়েছি, আপনি বছর কয়েক আগে গল্পাকারে কোথাও লিখেছিলেন, পত্রিকাটির নাম মনে পড়ছে না। উপন্যাসটি প্রসঙ্গে আরও কথা আমার মনে হয়েছে এর বিভিন্ন অংশ থেকে উঠে আসছে আরও বিস্তার। মনে হয় ভবিষ্যতে আপনি এ লেখা আরও বাড়াবেন। আর ভাষা— আপনি আমার কুর্নিশ জানবেন।

মৃদুল

প্রত্নবীজ নামটি আমার পছন্দ হয়নি, সম্ভবত আপনার দেওয়া নয়।

১৯৯৬ সালের বইমেলায়, ‘হাওয়া ৪৯ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশ পায় সুবিমল বসাকের উপন্যাস ‘প্রত্নবীজ’। বিভিন্ন টুকরো-টুকরো গদ্যের সংযোগে একটি কাহিনি-কাঠামো টের পাওয়া যায় এই বইয়ে, যার মূল উপজীব্য পাটনার লোদিপুর এলাকার বাঙালির জীবনযাপন, মুখের বুলি ও স্থানীয়দের সঙ্গে আদানপ্রদান। এই বইয়ের ‘সংযোজন’ অংশে মলয় রায়চৌধুরী লেখেন— ‘…অন্যান্য বাঙালি লেখক, যাঁরা বিহার সম্পর্কে লিখে খ্যাতিপ্রাপ্ত, …বহিরাগতের আদল রক্ষা করেছেন। সুবিমল বসাকের এই সাবঅলটার্ণ উপন্যাসটি একজন ভেতরের লোকের বয়ান। লেখক নিজেই ঐ জীবনযাত্রার অংশভাক। বাংলা ভাষাকাঠামোতে পাটনাইয়া বুলি প্রয়োগ করে, এই উপন্যাসটিতে, উনি ভেতরের লোকের ঠাটটি বজায় রাখতে চেয়েছেন।’

এই বইয়েরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে প্রকাশ পায় আরও দুটি বই— ‘এথি’ (২০০১) ও ‘তিজোরীর ভেতর তিজোরী’ (২০০৫)।

(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য