কবিতার বহুস্বর

কবি অ্যান কার্সন মাত্র একজন ব্যক্তি, না কি একই নামের আড়ালে দু’জন আলাদা-আলাদা মানুষ, তা নিয়ে আমার মনে মাঝেমধ্যেই ধন্দ জাগে। একজন অ্যান কার্সন আছেন, যিনি ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক, এবং গ্রিক কাব্য ও নাটকের সুদক্ষ অনুবাদক। আরেকজন অ্যান কার্সন কবি, যিনি কবিতার ভাষা, প্রকরণ ও আঙ্গিক নিয়ে বেপরোয়া সব পরীক্ষানিরীক্ষা করে থাকেন। ধ্রুপদী ভাষা কিংবা সাহিত্যের অধ্যাপক যদি কবি বা ঔপন্যাসিক হন, তাতে আলাদা করে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কবি অ্যান কার্সনের ক্ষেত্রে মজাটা এই, যে তিনি তাঁর লেখালিখির মধ্য দিয়ে, কবিতার প্রথাগত শৈলী ও আঙ্গিককে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করতে থাকেন, এবং কবিতা, গদ্য, ছবি, নাটক ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের মধ্যবর্তী বিভাজনরেখাগুলোকে মুছে ফেলার, বা নিদেনপক্ষে অস্পষ্ট করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যান প্রতিনিয়ত। অর্থাৎ, ধ্রুপদিয়ানার ছাপ কবি অ্যান কার্সনের কবিতায় খুব একটা নেই।

যে বইটিকে অনেকেই কার্সনের ম্যাগনাম ওপাস বলে অভিহিত করে থাকেন, তা হল ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এই কেতাবটিকে আঙ্গিকের দিক থেকে কাব্যোপন্যাস বলা যেতে পারে। কিন্তু এই কাব্যোপন্যাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে অধুনাবিলুপ্ত আরেক মহাকাব্য, হোমার-পরবর্তী যুগের অন্যতম প্রধান কবি স্টেসিকোরাসের লেখা ‘গেরিয়নিস’।

বইয়ের ভূমিকায়, স্টেসিকোরাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন কার্সন, এবং জানান, কয়েকটি ছেঁড়াখোঁড়া প্যাপিরাসের টুকরে এবং সমসাময়িক অন্যান্য গ্রিক লেখকদের লেখায় উদ্ধৃত বিচ্ছিন্ন পংক্তি থেকে যতদূর বোঝা যায়, এই মহাকাব্যের নায়ক গ্রিক পুরাণের তিন মাঘাওলা দানব গেরিয়ন। হেরাক্লেসের (রোমান উচ্চারণে হারকিউলিস) দশটি কাজের মধ্যে সর্বশেষ কাজ ছিল, ইরিথিয়া দ্বীপে হানা দিয়ে, পেরিয়নের গবাদি পশু চুরি করে আনা। তীব্র লড়াইয়ের পর, অবশেষে, হেরাক্লেসের তিরে পেরিয়নের মাথা চৌচির হয়ে যায়। বিজয়ী বীর হেরাক্লেসের বদলে, স্টেসিকোরোস যে পরাজিত এই দানবকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর কাব্যের নায়ক হিসেবে, এ বড় কম আশ্চর্যের কথা নয়। এবং এই গেরিয়নকেই ফের নিজের কাব্যোপন্যাসের নায়ক হিসেবে ফিরিয়ে আনেন কার্সন, কিন্তু অন্য চেহারায়, অন্য ভূমিকায়।

আরও পড়ুন: এলিফ শাফাকের প্রেমের দ্বীপ! লিখছেন রবীনা মিত্র…

অ্যান কার্সন

বইয়ের শুরুতে যে-গেরিয়নের সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হয়, সে এক মুখচোরা, বিষম মাতৃভক্ত মার্কিন বালক। আটলান্টিক মহাসাগরের কোনও এক দ্বীপে তার বাড়ি, এবং আর পাঁচটা মানুষের সঙ্গে তার পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, তার গায়ের রং লাল (যে কারণে তার ডাকনাম রেড), এবং পিঠে তার একজোড়া ডানাও রয়েছে। রোজ সে নিয়ম করে ইশকুলে যায়, আর রাত্তিরবেলা দাদা-র হাতে যৌন-নিগ্রহের শিকার হওয়ার পর থেকে, ডায়রিতে নিজের জীবনকাহিনি লিখতে আরম্ভ করে। যে-কোনও অনুভূতিপ্রবণ এবং বস্তুত একাকী মানুষের মতোই, গেরিয়নের শিল্পীসত্তার বিকাশ ছিল অবশ্যম্ভাবী। যে আশ্চর্য অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে ডিডালাসের ক্রমবিবর্তনকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন জেমস জয়েস, ‘আ পোর্ট্রেইট অফ দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়ং ম্যান’ উপন্যাসে, গেরিয়নের ব্যক্তি ও শিল্পীসত্তার বিকাশকেও ঠিক ততটাই যত্নে এবং শুদ্ধ আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন কার্সন। গেরিয়নের শৈশব-সারল্য, তার একাকিত্বের যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তার ভীতি, মায়ের প্রতি তার অব্যক্ত ভালবাসা, বয়ঃসন্ধির অস্পষ্ট যৌনচেতনা— এমন হাজারও অনুভূতির প্রকাশে বারবার বদলে যেতে থাকে কার্সনের কবিতার ভাষা, কখনও তা ঝলমল করে ওঠে বুদ্ধিদীপ্ত সরসতায়, কখনও তাদের সারল্য ও মর্মস্পর্শী মেদুরতা শ্বাসরোধ করে পাঠকের, কখনও আবার তা গভীর ইঙ্গিতময় এবং লিরিকাল। এক জায়গায়, মা-র প্রতি গেরিয়নের প্রগাঢ় নির্ভরতা ও বিশ্বাসের বোধটিকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে, কার্সন লেখেন,

‘Geryon stared in amazement.
She looked so brave. He could look at her forever. But now she was at the door and then she was gone.
Geryon felt the walls of the kitchen contract as most of the air in the room
swirled after her.
He could not breathe. He knew he must not cry. And he knew the sound
of the door closing
had to be kept out of him. Geryon turned all attention to his inside world.’

এহেন গেরিয়ন, কৈশোরের উপান্তে এসে, প্রেমে পড়ে যুবক হেরাক্লেসের। কিন্তু তাদের সমলিঙ্গ প্রেম শেষ অবধি কোনও পরিণতি পায় না, কেননা গেরিয়নের মানসিকতা ও তার শিল্পীসত্তাকে বুঝে ওঠা শরীরসর্বস্ব হেরাক্লেসের পক্ষে একরকম অসম্ভব ছিল। পৌরাণিক গেরিয়নের মস্তক চূর্ণ হয়েছিল হেরাক্লেসের বাণে, আর আধুনিক গেরিয়নের হৃদয়, হেরাক্লেসের প্রতি বিফল প্রেমে, শতধাবিদীর্ণ হয়। কাব্যের শেষ অংশে, ফের হেরাক্লেসের সঙ্গে দেখা হয় গেরিয়নের, সুদূর পেরুর এক ছোট্ট শহরে, যেখানে আগ্নেয়গিরি-র আভায় লাল হয়ে থাকে সন্ধ্যার আকাশ।

‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’-এর ভূমিকায়, কার্সন লিখেছিলেন, স্টেসিকোরাস যখন তাঁর কবিতায়, বিশেষ্য আর বিশেষণের প্রথাগত সম্বন্ধগুলোকে উলটে দিতে থাকেন, তখনই জন্ম হয় লিরিক-কবিতার। কেননা বিশেষ্য আর ক্রিয়া, চরিত্রগতভাবে ব্যস্তবধর্মী— আমাদের চারপাশে যা আছে, বা যা ঘটছে, তাকেই প্রকাশ করে তারা। কিন্তু বিশেষণের অপ্রত্যাশিত ব্যবহার, বিশেষ্য ও ক্রিয়া, তথ্য বস্তু ও ঘটনার চরিএকে আমূল বদলে দিতে থাকে, গভীর ও বহুস্তরীয় তাৎপর্যে অন্বিত করে তাদের। বইয়ের এই ভূমিকাটি, এক-অর্থে, কার্সনের নিজস্ব শিল্পভাবনার ম্যানিফেস্টো হয়ে ওঠে, যেখানে সমকালীনতার আয়নায় বারবার প্রতিফলিত হয় ধ্রুপদী চালচলন, দৈনন্দিনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনায় লেগে থাকে পুরাণের আভা, আর স্টেসিকোরাস থেকে গারট্রুড স্টাইন অবধি এক ধারাবাহিক পরম্পরাকে নিজের লেখায় আগ্রহ করতে থাকেন কার্সন।

পরে, ২০১৩ সালে, এই বইয়ের একটি দ্বিতীয় খণ্ড বা সিক্যুয়েল লিখবেন কার্সন, যার নাম ‘রেড ডক>’। বইয়ের এই অদ্ভুত নামকরণের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, কম্পিউটারে লেখার ফাইলটি তিনি এই নামে সেভ করেছিলেন, আর বই হিসেবে প্রকাশের সময়ে, ফাইলের নামটাকেই তিনি বইয়ের নাম হিসেবে ব্যবহার করেন। শুধু নামকরণ নয়, এই বইয়ের সজ্জা ও পংক্তিবিন্যাসও বেশ ব্যতিক্রমী। এবং, ‘অটোবায়োগ্রাফি…’-র মতো সোজাসাপটা গল্পের বদলে, টুকরো-টুকরো ঘটনা, চরিত্র যার অনেকটাই প্রতীকী এবং বিমূর্ত জুড়ে-জুড়ে ক্রমশ একটা আখ্যানের আদল তৈরি হয়।

কবি-হিসেবে, অ্যান কার্সনের চরিত্র প্রায় বহুরূপীর মতো— তাঁর প্রতিটি বইয়ের ঘরানা ও প্রকরণ পূর্বপ্রকাশিত সমস্ত বইয়ের থেকে আলাদা। ২০০১ সালে বেরয় ‘বিউটি অফ আ হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোজ’। বইয়ের জমকালো শিরোনামটাই পাঠককে ধাঁধায় ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রবন্ধ কি কখনও কাল্পনিক হতে পারে? যদি বা হয়, তাহলে কি আদৌ প্রবন্ধ বলা চলে তাকে? ট্যাঙ্গো নাচের সঙ্গেই বা কী সম্পর্ক প্রবন্ধের আঙ্গিকের? শিরোনামের ধাঁধা কাটিয়ে, বইটি পড়তে শুরু করার পর, পাঠক আবিষ্কার করেন, বইয়ের ২৯টি কবিতায় একটু-একটু করে ফুটে উঠছে এক ফ্যাকাশে, রক্তহীন, ভবিতব্যহীন বিবাহের ছবি, মুখ্যত স্ত্রী-র জবানিতে। কৈশোরের ভাল লাগা থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিবাহ, বিবাহ থেকে যৌন ঈর্ষা ও অবিশ্বাস, এবং শেষ অবধি বিচ্ছেদ— এই গোটা যাত্রাপথটাকে ২৯টা কবিতায় ধরে রাখতে চান কার্সন, ছোট-ছোট অনুষঙ্গে আর প্রতীকে, তাদের যাবতীয় সৌন্দর্য, বিবমিষা, আশ্বাস, আর বিশ্বাসভঙ্গের অনুপুঙ্খসমেত। কিন্তু, কবিতার ভাষায় ও ভঙ্গিতে, বিষাদ বা বেদনার চিহ্ন ৩৩টা নেই, যতটা রয়েছে শ্লেষ আর বুদ্ধিদীপ্ত সরসতার ছোঁয়া। অতি-দীর্ঘ আর অতি-হ্রস্ব পংক্তির একান্তর বিন্যাসে, পাঠকের মনে পড়ে যেতে পারে ট্যাঙ্গো-নাচের ছন্দ আর চাল। কিন্তু সেই সঙ্গে, এটাও মনে রাখা দরকার যে, একা-একা ট্যাঙ্গো নাচা যায় না, প্রয়োজন হয় দু’জন নাচিয়ের। কিন্তু, এই ২৯টি ট্যাঙ্গোর কুশীলব মাত্র একজন কবিতার কথক, স্বামীর সঙ্গে যার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বছরতিনেক আগে। আর এখন, যেন এক অনুপস্থিত ছায়ার সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে নেচে চলেছেন তিনি।

কার্সন বইটি উৎসর্গ করেছেন কিটস-কে, এবং কিটসের প্রসঙ্গ ও উদ্ধৃতি বারবার ফিরে ফিরে আসে, যেহেতু কিটস বলেছিলেন, ‘বিউটি ইজ ট্রুথ’। কিন্তু, স্বামী-র সৌন্দর্যের উপরিতলটিকে সরিয়ে, যদি আমরা ব্যক্তিসম্পর্কের এবং বিবাহ-নামক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করি, তাহলে তার কতটা সত্য, আর কতটা নিছক মোহ আর মিথ্যার ওপর বানিয়ে তোলা হাওয়া-মহল, সেই প্রশ্ন কার্সনকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এবং সেই অনুসন্ধানের সূত্র ধরে, এই বইটি ক্রমশ এক সন্দর্ভের চেহারা নেয়।

বস্তুত, কবিতার সঙ্গে কাহিনি, সন্দর্ভ আর নাটকের অনায়াস মেলবন্ধন অ্যান কার্সনের লেখালিখির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর ‘ডিক্রিয়েশন’ (২০০৫) কিংবা ‘রং নর্মা’ (২০২৪) বইতে, কবিতার সঙ্গে মিশে যায় ব্যক্তিগত গদ্য এবং প্রবন্ধ, কখনও কবিতাই হয়ে ওঠে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যম। ধ্রুপদী কাব্য, পুরাণ, মিথ এবং সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের নানান উল্লেখ ছড়িয়ে থাকে তাঁর কবিতায়, জিগস’ পাজলের মতো, এবং তাদের জুড়ে-জুড়ে, লেখকের চিন্তার আদলটিকে আবিষ্কার করার দায়িত্ব তিনি ছেড়ে দেন পাঠকের হাতে। যে কারণে, কার্সনের মুগ্ধ পাঠকদের মধ্যে শুধু কবিতা-পিপাসুরাই নন, রয়েছেন ধ্রুপদী ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র, এবং দর্শন আর নন্দনতত্ত্বে আগ্রহী মানুষজনও।

পরীক্ষানিরীক্ষাই একটি শিল্পমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে পুনরুজ্জীবিত করে, এবং বারবার প্রাসঙ্গিক করে তোলে। কবিতার ক্ষেত্রেও, সারা পৃথিবী জুড়ে, নিরীক্ষার কোনও অন্ত নেই‌। কেউ লিখছেন ইকো পোয়েট্রি, কেউ মৌমাছি চাষ করছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকেই একটা কবিতা-প্রজেক্টের চেহারা দিচ্ছেন, কেউ আবার কেলাসের গঠনকে তুলে আনছেন কবিতার বুনটে। অ্যান কার্সন এই পরীক্ষামূলক কবিতার অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক— শুধু বহিরঙ্গের চটকে নয়, কাব্যভাষা আর বিষয়বস্তুর গভীরতার দিক থেকেও তিনি সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি। ২০২৬ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি, অতএব, কবিতা সংক্রান্ত যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা এবং কবিতার বহু-স্বর ও বহুতর সম্ভাবনাকেই আবার নতুন করে স্বীকৃতি দিল।