লেখাটা ভেবেছিলাম খানিকটা এদোয়ার্দো গালেয়ানোর কায়দায় শুরু করব। মানে আনাড়ি, আনতাবড়ি, অশিক্ষিত, নকলবাজি করেও যেটুকু কায়দা ফলানো যায় আর কি! এমনিতে উরুগুয়ের এই ঔপন্যাসিক সাংবাদিক তথা ফুটবলের কবি-প্রেমিক মানুষটাকে নিয়ে বাঙালি পাঠকের একাংশের বেশ গদগদ আদিখ্যেতা আছে। সংগত কারণেই আছে। এমনকী, যাঁরা তাঁর অন্য লেখাপড়া নিয়ে এত উৎসাহী নন, তাঁরাও এদোয়ার্দোর লিরিক্যাল, মহাকাব্যিক, প্রায় উপন্যাসোপম ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ পড়ে কত বছর বিহ্বল হয়ে আছে। সুলেখক শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মায়াময় কলমে বইটার দুর্ধর্ষ একটা বাংলা অনুবাদও পাওয়া যায়— ‘রৌদ্রছায়ার ফুটবল’। এই গালেয়ানো মনে করেন সবুজ ঘাসের মাঠে নিরীহ-গোবেচারা ভঙ্গিতে গড়িয়ে যাওয়া বা বিভ্রান্ত মুখে ড্রপ-খাওয়া চর্মগোলকটি আসলে এক ছদ্মবেশী নারী। কেবল সাচ্চা রোম্যান্টিক কোনও ওস্তাদ প্রেমিক-ফুটবলারের পায়ের ছোঁয়াতেই সে রহস্যময়ী, চকিতা-চঞ্চলা-চপলা কিশোরীর মতো জেগে ওঠে। তারপর গোটা মাঠজুড়ে চলে প্রেমিকা ফুটবল আর তার প্রণয়ী ফুটবলারের অপূর্ব শৃঙ্গারলীলা। কখনও গ্যারিঞ্চার মতো বলের ওপর দাঁড়িয়ে অলৌকিক ড্রিবলিং! কখনও মারাদোনার মতো, দু-পায়ের কোনও গূঢ় আড়ালে অনাঘ্রাতা বলটিকে ‘ইলোপ’ করে, কড়া অভিভাবকের মতো গোলরক্ষকের শ্যেন-পাহারা এড়িয়ে, গোলপোস্টের সীমানা পেরিয়ে, নরম জালের বিছানায় গহন আদর-আশ্লেষে জড়িয়ে দেওয়া।
লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের জাদু-বাস্তবতাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, এমনকী উরুগুয়ে, কলম্বিয়া, চিলি, ইকুয়েডরের ফুটবলেও আমরা প্রায়ই খুঁজে বেড়াই। একদা পেলে, মারাদোনা, পরে রোনাল্ডিনহো, মেসিদের বল পায়ে নানা কাণ্ডকারখানায়, আমরা দেখেওছি তো, ঘাস-মাটি-কাদা-জলের ফুটবল, সৃষ্টিশীল কল্পনার উড়ানে সওয়ার হয়ে কোন রূপকথার দুনিয়ায় আমাদের পৌঁছে দিতে পারে। আর লাতিন আমেরিকার কোনও সৃজনশীল কথাকার যখন ফুটবল-সাহিত্য লেখেন, সেখানে মাঠের অন্দরে রচিত হওয়া ব্রাজিলীয় সাম্বা-র অনন্ত প্রবাহমান গতিময় ছন্দ কিংবা আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ের সীমান্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় ট্যাঙ্গো নাচের মোহক-মদির কামনাময় গহন কবিতা-কুহকের পাশেই তা ঘিরে থাকবে দারিদ্র, খিদে, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, পুরনো উপনিবেশের স্মৃতি-নয়া উপনিবেশ-পুঁজিবাদের শোষণ-স্বৈরাতন্ত্র-দ্রোহ-বিপ্লবের রোজনামচাও। ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’-য় এদোয়ার্দো ফুটবলের সংস্কৃতি, দর্শকের হৃদয়-আবেগ, ফুটবলারের মন-মগজ, স্টেডিয়ামের উত্তাপ-উত্তেজনার অন্দরমহলে ঢুকে যাওয়ার পাশাপাশি ১৯৩০ থেকে ২০১০ অবধি সব ক’টা বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর সেই প্রত্যেকবারের আলোচনার শুরুয়াতটা অনেকটা ‘ওয়ান টাচ’ ফুটবলের আক্রমণ স্টাইলের মতো। ওখানে বল যেমন গোলরক্ষকের হাত বা পা ঘুরে রক্ষণ, মাঝমাঠ, দুটো উইং ছুঁয়ে দ্রুত রিলিজের মাধ্যমে বিপক্ষের ৬ গজে পৌঁছে যায়, এ-ও তেমনই।


গালেয়ানো সেই বিশ্বকাপের বছরে গোটা দুনিয়ায় সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির জগতে ঘটে-যাওয়া সমস্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা, সব সাফল্য-ব্যর্থতা-ইন্দ্রপতনের শব্দসমূহ, নিখুঁত ব্যাকহিল আর নির্ভুল স্কোয়ার পাসে এগিয়ে দিতে, বিশ্ব-রাজনীতির গোটা চেহারাটাকে স্রেফ কয়েকটা নির্বাচিত বাক্যের টার্ন আর ড্রিবল-এ ফালা-ফালা করে, শেষ অবধি বিশ্বকাপের গোলবক্সে পৌঁছে যান। ফলে ফুটবলটা তখন আর শুধুই একটা ক্রীড়া-ইভেন্ট থাকে না। বরং আফ্রিকায় দুর্ভিক্ষ, বলিভিয়ায় ভূমিকম্প, ইতালিতে দেশজোড়া শ্রমিক-ধর্মঘট, ব্রাজিলে সামরিক দু’ঘণ্টার ক্ষমতা দখল, বিটল্সদের দলে ভাঙন বা গার্সিয়া মার্কেজের নোবেল-প্রাপ্তির প্রেক্ষাপট ফুটবল তথা বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে একটা সামাজিক-সংস্কৃতিক-রাজনৈতিক ঘটনা। সেভাবেই ১৯৫৯ সালে কিউবায় বিপ্লব ও গণ-প্রজাতন্ত্রী সরকার গঠনের পরবর্তী পর্বে, প্রত্যেকটা বিশ্বকাপের এই ভূমিকা বা প্রেক্ষিত রচনায় দু’টি বাক্য ধুয়োর মতো ঘুরে-ঘুরে এসেছে। মায়ামি-র সবজান্তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ফিদেল কাস্ত্রোর পতন অনিবার্য। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা!
লাতিন আমেরিকা তথা হিস্পানি ফুটবল-মানচিত্রে কিউবা কোথাও না থাকলেও, সেখানকার বিপ্লব চে গেভারা-কাস্ত্রো, নয়া সাম্রাজ্যবাদ আর কর্পোরেট পুঁজির আদর-ভালবাসায় ওষ্ঠাগত লাতিন আমেরিকার অস্তিত্বের প্রতীক, বেঁচে থাকার উত্তরাধিকার। মারাদোনার সোনার বাঁ-পায়ে তাই চে-র ট্যাটু আর হৃদয়ে ছিলেন কাস্ত্রো, গালেয়ানোও সেভাবেই মাত্র দু’টি বাক্যের তীব্র, তির্যক ব্যঙ্গ বিদ্ধ করে চলেছিলেন মার্কিন মুলুকের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রকে। আর ১৯৬২ থেকে ২০১০ অবধি বিশ্বকাপের ধারাবিবরণীতে অনেক নাছোড় ফুটবল-লড়াইয়ের সঙ্গেই সংরক্ষিত হয়ে থাকে কিউবার টিকে থাকার ইতিহাসও।

এই অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে কলকাতার যুবভারতীতে যখন লাতিন আমেরিকার দু-দুটো ফুটবল-দৈত্যের দাপাদাপি ঘিরে শহর মাতোয়ারা, তখন আরেকবার খুলে বসেছি ‘রৌদ্রছায়ার ফুটবল’। আর তার পিছনের কারণটা হল সিনে সেন্ট্রাল-এর সৌজন্যে কয়েক সপ্তাহ আগেই দেখা ব্রাজিলের একটা পুরনো সিনেমা ‘দ্য ইয়ার মাই পেরেন্টস ওয়েন্ট অন ভ্যাকেশন’। ২০০৬ সালের ছবি। মানে যে-বছরটা থেকে টানা ছ-ছটা বিশ্বকাপে ব্রাজিল ট্রফির ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি। এটাও বেশ সমাপতন যে, দু’দিনের ব্যবধানে ভারত যে-ব্রাজিল আর উরুগুয়ের মুখোমুখি হল, তারা দু-দেশ মিলে সাত-সাতটা বিশ্বকাপের মালিক। অবশ্য উরুগুয়ের শেষ বিশ্বকাপ জয় ৭৬ বছর আগে। আর এটাও আশ্চর্য সমাপতন, ওই ১৯৫০-এই ভারত প্রথম ও শেষবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার একটা পড়ে-পাওয়া-চোদ্দ-আনা গোছের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আর্থিক ও পরিকাঠামোগত সমস্যার জন্য যাওয়া হয়নি। এও হয়তো সমাপতন, যে এআইএফএফ ১৯৫০ সালে ভারতীয় ফুটবলারদের ব্রাজিল যেতে দেয়নি, তারাই এখন গাঁটের কড়ি খরচ করে সাড়ে সাত দশক আগে আমাদের না-খেলা বিশ্বকাপের দুই চ্যাম্পিয়ন আর রানার্স দেশকে ডেকে জাতীয় দলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলাচ্ছে।
এত রকমের সমাপতনের উল্লাসকালে, এএফসি-র আশিয়ান কাপে দল না পাঠিয়ে ফিফা ফ্রেন্ডলি খেলে, ভারতীয় ফুটবল কী ভ্যারেন্ডা ভাজবে বা ফেডারেশনের এই সিদ্ধান্তের পিছনে ফুটবলের কী গভীর অর্থনীতি ও রাজনীতি লুকিয়ে আছে, সেসব বিতর্কে না ঢুকে আমরা বরং আরেকবার উরুগুয়ের লেখকের বই খুলে ব্রাজিলীয় সিনেমার প্রেক্ষিতটা আরেকবার বোঝার চেষ্টা করি। ভেবে দেখলে এটাও কিছু কম সমাপতন নয়। ব্রাজিল ও উরুগুয়ের সঙ্গে ভারতের জাতীয় দলের ফুটবলাররা যখন নিজেদের ফিকা র্যাঙ্কিং-এর হীনমন্যতা ভুলে, শারীরিক ও টেকনিক্যাল সামর্থ্য পেরিয়ে লড়ে যাচ্ছেন, তখন ব্রাজিলের সিনেমা ভরে আছে সেই ১৯৭০-এর বিশ্বকাপ জয়ের নস্টালজিয়ায়। ব্রাজিলের সোনার টিম, পেলে-টোস্টাও-রিভেলিনো-জারজিনহোদের সোনালি ফুটবলে ভর করে, জুলে রিমে কাপের ‘সোনার পরী’-কে চিরকালের জন্য ব্রাজিল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ট্রফি ক্যাবিনেটে বন্দি করার লক্ষ্য নিয়ে মেক্সিকো যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এরকম একটা জায়গায় ছবিটা শুরু হচ্ছে। শুধু কাপ জেতাই নয়। ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডে, ইউরোপের তরফে ব্রাজিলের সঙ্গে যা-যা অন্যায় করা হয়েছিল, মেক্সিকোতে সেটার সুদে-আসলে বদলা নিতে হবে। এখানে দাঁড়িয়ে ১৯৭০-এর বিশ্বকাপ ব্রাজিলবাসীর কাছে শুধু নিজের দেশের সাফল্য ছিল না। ছিল ইউরোপীয় আধিপত্যবাদের থোতা মুখ ভোঁতা করার একটা প্রকল্পও।

‘দ্য ইয়ার মাই পেরেন্টস ওয়েন্ট অন ভ্যাকেশন’-এর পরিচালক কাও হ্যামবার্গার দেশজুড়ে ফুটতে থাকা এই ফুটবল-আবেগের সঙ্গেই নিঃশব্দে বুনে দিয়েছেন মিলিটারি জুন্টার শাসনে চলতে থাকা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, হঠাৎ-হঠাৎ পাড়া-মহল্লায় ঢুকে পড়া পুলিশের গাড়ি, ঘরে-ঘরে তল্লাশি, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের ধরপাকড়, চোরাগোপ্তা এনকাউন্টারের ন্যারেটিভ। ছবি দেখতে-দেখতে কারও যদি সাও পাওলোর শহরতলির তুলনায়, ১৯৭০-এর যাদবপুর, টালিগঞ্জ, সিঁথি, দমদম, কাশীপুর, বেলঘরিয়ার কথা মনে পড়ে যায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল-সাফল্য, লাল-হলুদ উন্মাদনা, বাঙাল-পরিচিতির নতুন উদযাপনের সঙ্গেই তো সেইসব দিনগুলোয় গলিতে-গলিতে ভারী বুটের শব্দ, মাঝরাত্তিরে দরজায় সিআরপি-র লাথি, ভোরবেলায় নর্দমার ধারে বা ঝোপঝাড়-পুকুরপাড়ে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ যুবকের টাটকা লাশের ছবি একাকার হয়ে যেত।
ফুটবলের গল্পকে এভাবেই বিভিন্ন দেশের ইতিহাস-রাজনীতির প্রেক্ষিতে একসঙ্গে বা আলাদা-আলাদা করে পড়া যায়। আর এদোয়ার্দো গালেয়ানোর বই ও কাও হ্যামবার্গারের সিনেমার টেক্সট তো ভূগোল-ইতিহাস-রাজনীতির খুব সহজবোধ্য অনিবার্যতাতেই একে অন্যের শরীরে মসৃণভাবে ঢুকে যাবে, এটা কোনও বলার অপেক্ষা রাখে না। কাও-এর ছবিতে রাষ্ট্রের হিংস্র মুখ বা সন্ত্রাসের নখ-দাঁত-শরীর সেভাবে প্রকাশ্য বা সশব্দ নয়। কারণ পুরো বিষয় বা সময়টাই দেখা হচ্ছে বছর বারোর এক বালক মাউরোর চোখ দিয়ে। সে যেটুকু দেখছে, বুঝছে বা নিজের মতো করে ভেবে নিচ্ছে, সেটাই ছবির কাহিনি। আসলে মাউরোর মা-বাবা দু’জনেই সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। জেনারেল মেদিচি (বা মেজিচি)-র সামরিক জমানায় তাদের জীবন বিপন্ন। গ্রীষ্ম-অবকাশে যাওয়ার নাম করে তারা আসলে কোনও গোপন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে যায়। আর যাওয়ার পথে মাউরোকে সাও পাওলোর শহরতলি এলাকার এক ইহুদি-মহল্লায় তার ঠাকুরদার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। বিশ্বকাপ শুরু হতে তখনও কিছুদিন বাকি আছে। মাউরোকে তার বাবা কথা দিয়েছিল, ফিরে এসে তারা একসঙ্গে টিভিতে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলা দেখবে। ওই ১৯৭০-এই তো প্রথমবার ব্রাজিলে বিশ্বকাপের সব ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা হয়েছিল। মা-বাবার ফিরে আসার জন্য ছোট্ট মাউরোর হাপিত্যেশ অপেক্ষা, বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাওয়া প্রথম ম্যাচ থেকেই ব্রাজিলের দুর্দান্ত পারফরমেন্স, প্রথমে মনখারাপ নিয়ে দেখতে শুরু করলেও গোটা ব্রাজিলের মতোই মাউরোরও আস্তে-আস্তে বিশ্বকাপের মৌতাতে মেতে যাওয়া, এভাবেই এগোতে-এগোতে ছবিটা ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছয়।

বিশ্বকাপের ফাইনালে পেলে-জারজিনহো-কার্লোস আলবার্তোরা যখন ইতালির কাতানাসিও রক্ষণ তথা ইউরোপের দেমাককে চূর্ণ করছে, সেদিনই মাউরোর মা ফিরে আসে একা। মাউরো মা-কে বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে। মায়ের চোখের জলের নীরবতাতেই হয়তো সেসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায়। হয়তো সবটা পায়ও না। ঘরের মধ্যে একটা টেলিভিশনের পর্দায় তখন বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের সাদা-কালো উল্লাস। আর বাইরে পটকা আর আতসবাজির রঙিন রোশনাই। ক-দিন আগেই যে পাড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হানাদারিতে ত্রস্ত-বিপন্ন ছিল, তারাই দেশের সাফল্যের জাতীয়তাবাদী আবেগ-আনন্দে পথে নেমে এসেছে।
মাউরো যেমন গোটা ছবিতেই খুব অন্তর্মুখী, অনেকটাই আত্মজৈবনিক এই সিনেমায় কাও হ্যামবার্গারও যেটুকু কথা বলেছেন, তার চেয়ে না-বলা অনেক কথাই ছড়িয়ে রেখেছেন, রূপকে, ইশারায়। শাসক কীভাবে ফুটবলকে ব্যবহার করে দেশের গণমানসকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করতে পারে, অর্থনীতির দুরবস্থা, গণতন্ত্রের সংকট, মতপ্রদানের স্বাধীনতা, মানবাধিকার হরণ ইত্যাদি সমস্ত সমস্যাকে উৎসবের কার্পেটের নীচে চালান করে দিতে পারে, ‘দ্য ইয়ার মাই পেরেন্টস ওয়েন্ট টু ভ্যাকেশন’ তারই একটা আশ্চর্য র্নৈব্যক্তিক দলিল হয়ে যাবে।
কাও-এর ছবিতে না থাকলেও এই প্রসঙ্গেই গালেয়ানোর বই থেকে ছোট্ট একটা তথ্য সংযোজন করা যাক। ১৯৭০-এর ব্রাজিল দলের জন্য বানানো টিম-সং ‘ব্রাজিল এগিয়ে চলো’-র সুর ক’দিনেই মেদিচি সরকারের সিগনেচার টিউন হয়ে উঠেছিল। আর টেলিভিশনের সরকারি কীর্তি গাথার প্রচার-বিজ্ঞাপনে পেলের একটি উড়ন্ত বাইসাইকেল কিক-এর ছবি ব্যবহার করা হত-যার ক্যাপশনে লেখা থাকত ‘অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিল’। ফুটবলের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনওদিন কোনও সংশয় নেই। স্বৈর-শাসক তাকে দিয়ে কী বার্তা বলিয়ে নেবে আতঙ্কটা তো সেখানেই। ব্রাজিল ও উরুগুয়ের সঙ্গে ভারতের ম্যাচের পরে হঠাই কথাগুলো মনে হল। সমাপতন? হয়তো!



