পন্তু লাহা ২.০: ৬

শেষ পর্ব: ভারত আমার ভারতবর্ষ…


মূল রচনা
বের্টোল্ট ব্রেখট

বঙ্গীকরণ
নীহার ভট্টাচার্য

পরিমার্জনা ও সম্পাদিত নাট্যরূপ
অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রতীক দত্ত

পড়ুন: পর্ব ১, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫

পন্তু: এইতো সুরেন এসে গ্যাছে। হা হা হা হা… চা খাবি সুরেন?

সুরেন: না। ডাকলেন কেন?

পন্তু: কে ডেকেছে?

সুরেন: উনি তো বললেন আপনি এক্ষুনি ডেকে পাঠিয়েছেন।

পন্তু: হ্যাঁ। ডাকব না? রাধার বিয়ে হবে আর তোদের ডাকব না? তোদের চোখের সামনেই তো মা মরা মেয়েটা এত বড় হল। আজ ওর বিয়ে, আর তোরা থাকবি না?

আয়ান: থাকবে বাবা, সবাই থাকবে।

(আয়ান ও পন্তু সুরেনের পিঠে চাপড় মারে এবং দু’জনেই হেসে ওঠে)

পন্তু: কার সাথে ওর বিয়ে হবে জানিস? এই দেখ— (মতি ঢোকে) তোর প্রাণের বন্ধু, কমরেড মতি রায়।

মতি: সরকার।

পন্তু: মতি সরকার।

মতি: আজ্ঞে, কাদের সাথে লড়তে হবে কত্তা?

পন্তু: আহ্, পবিত্র বিয়ের মণ্ডপে লড়াই কেন কমরেড! লড়াই হবে পরে। বিয়ের পরে অনেক লুল্লুড়ি-লড়ালড়ি হবে। এই কে আছিস, বিয়ের মণ্ডপটা সাজিয়ে ফেল। গঙ্গা, আমায় বসতে দে— আমার হোমকুণ্ড আর কলাগাছটা নিয়ে আয়— সর্বহারা মতে বিয়ে দেব আমি। নাও মতি, ওটা পরে নাও। কমরেড মতি ওয়েডস মিস রাধা। সম্পাদন করবেন কমরেড সুরেন।

মতি: কিন্তু কত্তা—

পন্তু: আমায় অনুরোধ ক’রোনা মতি। আমি তো ক্যাপিটাল দোষে দুষ্ট। আমার পুঁজিভরা হাতের স্পর্শে এই বিয়ে সম্প্রদান হতে পারে না। আয় সুরেন, তোর সর্বহারা দু’টি হাত বাড়িয়ে দে আমার রাধার সম্প্রদানের জন্য… (আয়ানকে) গান্ডু— কী হল? জামাটা পরিয়ে দিতে পারছ না?!

(আয়ান জামা পরাতে থাকে, সুরেন লণ্ঠন হাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে)

পন্তু: এই গঙ্গা, শোন, কারও যত্ন-আত্তি-আপ্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে দেখবি। আর শোন, চাটনি-মিষ্টিটা যেন সবাই বেশি করে পায়। আর শেষপাতে আইসক্রিমটা গরম করে দিবি, নয়তো ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর একদম শেষে ভাতটা দিবি। যেন ভুল না হয়। বুঝেছিস?… হয়েছে?

আয়ান: বাবা, বর রেডি।

পন্তু: হ্যাঁ, বাহ্, এসো বাবাজীবন, জামাইবাবাজি আমার, এসো বসে পরো, বসে পরো। রাধা মা, তুইও আয়। করো, বিয়ে করো। বাঃ, খুব সুন্দর। খুব ভাল বিয়ে হচ্ছে। এ কী, মন্ত্র পড়া হচ্ছে, দোলো— আয় রাধা মা, তুইও দোল— বাঃ, কি ভালো সম্প্রদান করল সুরেন। যদিদং তদিদং… যদিদং তদিদং… বাঃ!

(সুরেন চলে যেতে যায়)

আয়ান: বাবা বাবা বাবা— সুরেন চলে যাচ্ছে—

পন্তু: এ কী সুরেন, তুই চলে যাচ্ছিস!

সুরেন: হ্যাঁ যাচ্ছি।

পন্তু: মুখে কিছু না দিয়েই চলে যাচ্ছিস? আজ তো আমরা একসাথে বসে খাব। না-হয় দুটো ডাল-ভাত খাব, সবাই মিলে। রান্না হয়েছে রে গঙ্গা?

গঙ্গা: হ্যাঁ, মাংসটা নামাতে হবে।

পন্তু: না না, মাংস না, ডাল-ভাত, ডাল-ভাত।

গঙ্গা: হ্যাঁ হয়ে গেছে।

পন্তু: বাঃ, চলো আমরা বসে পরি।

সুরেন: আমি খাব না, চললাম।

পন্তু: আজকের দিনে না খেয়ে গেলে ওদের অমঙ্গল হবে, সুরেন— ঠিক আছে, মাংস-ভাতই খাব।

(সুরেন কাছে এগিয়ে আসে)

সুরেন: আপনার চা বাগানের ৭৬ জন শ্রমিকের প্রায় সবারই পেটে আলসার, বাচ্চাগুলো অপুষ্টিতে ভুগছে, বড়গুলোর শরীরে রক্ত নেই। পারলে ওদের সবাইকে ডেকে খাওয়ান, ওদের মঙ্গল হবে।

পন্তু: (আয়ানকে) হাসছ কেন? এখানে কি হাসির কথা হচ্ছে? (সুরেনকে) ইশশশ… দেখেছিস! কেউ মুখ ফুটে একটা কিছু বলে না। তুই-ই বল সুরেন, আমায় কী কী করতে হবে, বল।

সুরেন: দেড় বছর ধরে আমাদের দাবি জানিয়ে এসেছি। বলে আর কিছু হবে না, বুঝে গেছি।

পন্তু: বলে আর কিছু হবে না… ছি ছি ছি— ঘেন্না হয় নিজের ওপর। এত ভুলো মন আমার! এমন একটা পবিত্র দিনে… বল, সুরেন, বল। তুই যা বলবি, যেমন বলবি, আমি রাজি।

সুরেন: থাক, আপনারা খেয়ে নিন।

পন্তু: নিকুচি করেছে খাওয়ার। উপোস করে থাকব আমি। তুই বল। একবার বলেই দেখ—

সুরেন: (চলে যেতে গিয়েও ফিরে আসে) দিনপ্রতি মজুরি ২০ টাকা করে বাড়াতে হবে।

পন্তু: ২৫ টাকা করে বাড়িয়ে দেব।

সুরেন: সামনের মাস থেকেই।

পন্তু: কাল থেকেই।

সুরেন: মজুরদের পেনশন দিতে হবে, মজুরির অর্ধেক।

পন্তু: কাল থেকেই, মজুরির সমান।

সুরেন: বয়স্ক ও মহিলা মজুরদের ৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো চলবে না।

পন্তু: কাল থেকে কেউ ৬ ঘণ্টার বেশি কাজ করবে না।

সুরেন: অসুস্থ মজুরদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিমা করে দিতে হবে।

পন্তু: পুরো পরিবারসমেত।

সুরেন: বিনা নোটিশে কোনও বাগান বন্ধ করা যাবে না— ঘোষণা করে দিতে হবে।

পন্তু: লিখিত দেব। (সুরেন চুপ) আর বল?

সুরেন: বাচ্চাদের স্কুলে পড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

পন্তু: কাল থেকেই! আমার খরচে। আর বল?

সুরেন: আগে এগুলো হোক, তারপর বলব।

পন্তু: তুই কালকেই সব লিখে নিয়ে আয়, লিখে নিয়ে আয়। আমি কালকেই উকিলকে দিয়ে সব লেখালিখি করে নিচ্ছি। অনেক দেরি হয়ে গেছে রে। মুখের কথায় আর হবে না। কালকেই সব পাকাপাকি করতে হবে। আসবি তো বাবা?

সুরেন: ঠিক আছে, আসব।

পন্তু: তুই ঠিক ন’টা নাগাদ আয়। না না, নাগাদ নয়, ঠিক ন’টায় আয়। ঠিক ন’টায়, কেমন?

সুরেন: ঠিক আছে, এখন চললাম, কানাইয়ের জ্বর।

পন্তু: হ্যাঁ! সে কী? আগে বলিসনি কেন? যা যা যা— কাল বরং ওদেরকেও আনিস। কতদিন দেখি না ওদের। আমার লিটল কমরেডস কানু আর মানু। কাল নিয়ে আসিস সাথে করে, মনে করে।

সুরেন: জ্বর না থাকলে আনব।

পন্তু: জ্বর থাকলেও আনবি। ডাক্তার দেখাতে হবে তো।

সুরেন: ডাক্তার দেখানো হয়েছে। আমি কাজে ছিলাম। গঙ্গা দেখিয়ে এনেছে।

পন্তু: স্যালুট গঙ্গা, স্যালুট। ওদের জন্য দুটো জামা এনেছিলাম। দিসনি, গঙ্গা?

সুরেন: হ্যাঁ হ্যাঁ গঙ্গা দিয়েছে।

পন্তু: স্যালুট গঙ্গা, স্যালুট। কাল ওদের ওই জামাদু’টি পরিয়ে আনিস। কেমন লাগছে দেখব। শুধু ওদেরই দেখা হয়নি। ভুলিস না কিন্তু। যা, বাড়ি চলে যা। শোন, ক্যালপল খাওয়াবি, ৬৫০। না না, ওরা বাচ্চা কমরেড তো, ৫০০টা করে খাওয়াবি।

(সুরেন চলে যায়)

পন্তু: (আয়ানকে) হাসছ কেন, এখানে হাসির কথা হচ্ছে?

আয়ান: না, বাবা।

পন্তু: হাত যতদূর যায়, ততদূর চুলকোবে। কঙ্কালের বগলে চুল থাকে না। গঙ্গা, তুই ওকে নিয়ে যা। ওকে দিয়ে সমস্ত বাসন মাজাবি। ও তোকে রান্নাঘরে অ্যাসিস্ট করবে আজ থেকে। যা। এই, যাও ওর সঙ্গে, যাও— এই শোনো, বাসন মাজবে, গা মাজবে, সমস্ত ময়লা পরিষ্কার করবে। তুমি পুরুষমানুষ তো?

আয়ান: হ্যাঁ বাবা।

পন্তু: হ্যাঁ, সেটা যেন তোমার কাজে প্রকাশ পায়। নাহলে ন্যাংটা করে লাহাপুরে ঘোরাব, মাথায় থাকে যেন। লাংটা হয়ে ঘুরতে ভাল লাগবে?

আয়ান: না বাবা।

পন্তু: তাহলে কী করতে ভাল লাগবে?

রাধা: বলো না, বলো?

আয়ান: তুমি চুপ করো। বলতে লজ্জা করছে বাবা।

পন্তু: উহুহ, বলতে লজ্জা করছে! লজ্জা করছে তো বলতে হবে না, কাজ করে দেখাও, যাও—

আয়ান: সরি রাধা—

রাধা: যাও, যাও—

(আয়ান গঙ্গাকে নিয়ে চলে যায়)

পন্তু: শোনো বাবা, মেয়ের বাপ হিসেবে তোমায় দুটো কথা বলি। আয় আয় আয়…

(ভায়োলিন বাদক ঢোকে)

দাঁড়া দাঁড়া, বিদেশি কিছু বাজা— আমার এই বাড়িতে প্রতিদিন ২৩ জন কর্মচারী কাজ করে। আমি নিজে দেখেশুনে তাদের কাজ দিয়েছি। ওই ২৩ জনই মহিলা। তার জন্য কত কটু কথা শুনতে হয় আমায়। তবু আমি পিছিয়ে যাইনি। মেয়েরা যাতে পিছিয়ে না পরে, তার জন্য তো আমাদের এগিয়ে আসতে হবে, তাই না, মতি? আরে বাবা টাকাই সব নয় জানি, কিন্তু সবেতেই যে টাকা লাগে মতি। ওদেরকে স্বাধীনতার অর্থ বোঝাতে গেলে, আগে তো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিতে হবে, তাই না? শুধু মুখে-মুখে বললে হবে? প্রচার করলে হবে? স্বাধীনতাবোধ ওদের মধ্যে প্রসার করতে হবে। ওদের বাঁচাতে হবে। পড়াতে হবে। লাহাপুরে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় করেছি আমি। একটা আমার মায়ের নামে, একটা ওর (রাধাকে দেখিয়ে) মায়ের নামে, আরেকটা কার নামে জানো? গঙ্গার মায়ের নামে। বাড়ির কাজের লোকের নামে স্কুল কোথাও দেখেছ মতি? না, শুধু সম্মান দিলেই হবে না, ক্ষমতা দিতে হবে। আমি তো চাইনি ভোটে দাঁড়াতে। বলেছিলাম আমার বদলে কোনও মহিলা প্রার্থী দাঁড় করানো হোক। কে শোনে কার কথা! ৪০৪৯ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭১৫ জন মহিলা! কী করে হবে, মতি?

(আয়ান গঙ্গা ও ঢোকে)

পন্তু: কমরেড মতি… কমরেড মতি…

মতি: বলুন কত্তা—

পন্তু: কমরেড মতি…

মতি: বলুন কত্তা—

পন্তু: কমরেড মতি…

আয়ান :বলুন কত্তা –

পন্তু: হ্যাঁ, কী করছটা কী! তোমার নববিবাহিত বউ এখানে বসে রয়েছে, তুমি কী করছ? যাও—

আয়ান: চলো রাধা। আসছি বাবা।

পন্তু: হ্যাঁ যাও যাও— শোনো, কাল ন’টায় আসবে। না, ন’টা বাজতে দশে আসবে। যাও।

(আয়ান ও রাধা চলে যায়)

পন্তু: (মতিকে) দুরাচারী শাসকের পোশাক পরা তুমি ঔরঙ্গজেব ওরফে গান্ডু আয়ান দারোগা— চিনেছি তোমায়। এখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছ? এই ন্যাকড়াগুলো এখান থেকে সরাও— চান করে নে গঙ্গা, চান করে নিলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

(মতি ও গঙ্গা বেরিয়ে যায়)

পন্তু: (গান) রাম তেরি গঙ্গা ময়লি হো গ্যয়ি, পাপিয়ো কে পাপ ধোতে-ধোতে…

[Projection 6: বাচ্চাদের সাথে সুরেন]

(সাংসদ, কমিশনার,উকিল, পুরোহিত ঢোকে)

পন্তু: কণ্ঠে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। কোথায় একটু জল পাই বলুন তো?

উকিল: জলপাই? জলপাই এখন কোথায় পাবেন? দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া।

পন্তু: আহ ভাবো ভাবো, কাহারবা নয় দাদরা বাজাও, উল্টোপাল্টা মারছ চাঁটি। ভাবা প্র্যাকটিস করো।

সাংসদ: ভাবছি ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।

পন্তু: ভালো আর মন্দর দ্বন্দ্ব জানি না। সকল দ্বন্দ্ব-বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভাল, সেই তো আমার যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী।

পুরোহিত: তোমায় হৃদমাঝারে রাখব, ছেড়ে দেব না।

কমিশনার: ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি।

সাংসদ: দাদা আমি বাঁচতে চাই।

কমিশনার: সে আমার ছোট বোন।

পন্তু: আহ্, এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর, তবু অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে পৃথিবীতে আজ। সহসা শুনি রাতের কড়া নাড়া।

কমিশনার: (গায়) নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে… (সবাই বেরিয়ে যেতে থাকে)

পুরোহিত: রাত কত হইল?

পন্তু: এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে রাতের কল্লোল শুধু বলে যায়, আমি স্বেচ্ছাচারী, আমায় টাচ্ করবে না। কমরেড মতি… কমরেড মতি…

আয়ান: বলুন কত্তা—

পন্তু: তুমি কে? দুরাচারী শাসকের জাঙিয়াপরা তুমি ঔরঙ্গজেব ওরফে আয়ান দারোগা— যাও, যা করছি করো, যাও— শোনো, কাল ন’টা বাজতে দশে আসবে, মনে আছে?

আয়ান: হ্যাঁ বাবা।

পন্তু: যাও, গেট আউট— কমরেড মতি…

মতি: আজ্ঞে কত্তা?

পন্তু: মতি, চলো মুতি— ইহ এদিকটায় এত গন্ধ কেন মতি?

মতি: এদিকটা শ্মশান কত্তা, অনেকগুলো মরা পুড়ছে, তারই গন্ধ।

পন্তু: আর ওদিকটা?

মতি: ওদিকটা বাগান, কত্তা।

পন্তু: গুড মতি, চলো মুতি।

[Projection 7: ayan kills suren ]

(Tap dance)

পন্তু: চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উথলে ওঠে আলো— ‘ইইইই… মতি ওগুলো কী?

মতি: দড়ি, কত্তা।

পন্তু: দড়ি! কীসের জন্য?

মতি: আজ্ঞে কত্তা, গলায় দিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য।

পন্তু: কীইইইই! লাহাপুরে আত্মহত্যা? এই না না না, যাঃ, পালা পালা যত দড়ি সব পালা বলছি— পালালি? হ্যাঁ, পালিয়ে গেছে! মতি— দ্যাখো, কী জ্যোৎস্নামাখা রাত!
(গান) ওগো মায়াভরা চাঁদ… এই চাঁদটা কোথায় গেল?

মতি: আছে, কত্তা… কোথাও একটা…

পন্তু: না, আছে বললে তো হবে না। চাঁদকে তো আসতে হবে। কোথায় চাঁদ? এই, পর্দা খোলো, পর্দা খোলো—

[Projection 8: Moon to gunman]

পন্তু: এই চাঁদ… আরে এই চাঁদের বাচ্চা— এএইই… এগুলো কী! সরো সরো— ইশ! আরে চাঁদি নয় রে চোদনা, চাঁদ। হ্যাঁ… এই তো দেখেছ মতি? আইএসআই-এর ছাপ্পা দেওয়া খাঁটি চাঁদ। কপিরাইট আছে, কিছু বলা যাবে না। (গান) ওগো মায়াভরা চাঁদ, ওগো… ওই যে, ওই যে আমার বাড়িটা দেখতে পাচ্ছ মতি?

মতি: পাচ্ছি, আলো জ্বলছে।

পন্তু: ঠিক বলেছ। তার পাশ দিয়ে ৩ নম্বর চা বাগিচাটা?

মতি: চা বাগান?

পন্তু: পাচ্ছ না? দাঁড়াও। উঁচুতে ওঠো, ওঠো— পাচ্ছ?

মতি: হ্যাঁ পাচ্ছি কত্তা।

পন্তু: হুমমম। এইপাশে আমার ছোট স্বচ্ছ নীল জলের পুকুরটা? ওই যে জ্যোৎস্নার আলো ঝিকিমিকি করছে জলে? কত মাছ খেলা করছে… দেখতে পাচ্ছ না?

মতি: হ্যাঁ কত্তা।

পন্তু: আরে আমি দেখতে পাচ্ছি না, তুমি পাচ্ছ? মিথ্যে কথা। দাঁড়াও। খুব উঁচু থেকে দেখতে হবে। নাহ, মতি, চলো আমরা হিমালয়ে যাই। ওখান থেকে সবটা দেখা যাবে।

মতি: হিমালয়! সে তো অনেক দূরে কত্তা! যেতে অনেক সময় লেগে যাবে?

পন্তু: ধুর বোকা, কীসের দূর? এক্ষুনি চাঁদ এনে দিলাম, হিমালয় আনতে পারব না? এই, নিয়ে আয়—

শাকিল: ইয়েস পন্তু বাবু।

পন্তু: হিমালয়… নিয়ে আয়—

শাকিল: থ্যাঙ্ক ইউ পন্তুবাবু।

পন্তু: না না, হিমালয়, হিমালয়। নিয়ে আয়… নিয়ে আয়।

শাকিল: বহুত বড়িয়া পন্তুবাবু।

পন্তু: আরে গন্ধমাদনের মতো মাথায় করে হিমালয় পাহাড় নিয়ে আয়… যা যা—

শাকিল: ইয়েস পন্তুবাবু— মিঠুনজি চলিয়ে—

(হিমালয় বানানো হয়)

পন্তু: বাঃ, এই দ্যাখো… বানাও বানাও, হিমালয় বানাও। ঠিক করে বানাবে, যাতে মানুষ উঠতে পারে, হ্যাঁ? সিঁড়ি দিবি, দড়ি না। এমন হিমালয়ে কী লাভ, যদি ওঠাই না যায়? হল? হ্যাঁ…

শাকিল: পন্তুবাবু, দ্য হিমালায়া—

পন্তু: তুমি এবার যায়া..

(শাকিল ও মিঠুন বেরিয়ে যায়)

পন্তু: উউউউহহ্ কী ঠান্ডা, জমে যাচ্ছি একেবারে। ঘ্যাচ্— এই রে, পা-টা ঢুকে গেল, না কি? না না… আহাআহাআহা, অনেকদিন পরে এলাম। আরে এটা কী বানিয়েছে! এটা নিচু তো! এই মতি— এটাকে একটু উঁচু করে দাও তো… অ্যা অ্যা আহ্… এইত্তো। উহহ্.. কী কষ্ট! ইশশ… কত বদলে গেছে। চেনাই যাচ্ছে না। কত নীল-নীল নদী ছিল, সবুজ-সবুজ গাছ ছিল, কতরকম রং ছিল… কী দেখছ মতি?

মতি: আমাদের দেশ কত্তা।

পন্তু: দেখো দেখো— গোটা দেশটা একসাথে দেখতে ভাল লাগছে না?

মতি: খুব ভাল লাগছে কত্তা। কত বড় দেশ আমাদের!

পন্তু: এবার আমার ছোট পুকুরটা দেখতে পাচ্ছ মতি?

মতি: এবার পাচ্ছি কত্তা।

পন্তু: পুকুরের মাছ?

মতি: পাচ্ছি।

পন্তু: তার পাশে চা বাগান?

মতি: পাচ্ছি।

পন্তু: তার পাশে ধানক্ষেত?

মতি: পাচ্ছি।

পন্তু: তার পাশে ফাঁকা জমি?

মতি: পাচ্ছি।

পন্তু: আর কী দেখতে পাচ্ছ মতি?

মতি: তার পাশে আরও অনেক পুকুর, আরও অনেক ধানক্ষেত, আরও অনেক ফাঁকা জমি দেখতে পাচ্ছি।

পন্তু: ওগুলো সব আমার। তুমি যা দেখতে পাচ্ছ, তোমার দেশকে যত দূর দেখতে পাচ্ছ, সবটাই আমার মতি। মনটা জুড়িয়ে গেল না?

মতি: গেল কত্তা। মন জুড়িয়ে গেল আপনার দেশ দেখে।

পন্তু: তাহলে গলা ছেড়ে গান গাও—

মতি: গান?

পন্তু: হ্যাঁ। এ কী! প্রাণে গান আসছে না তোমার? দাঁড়াও। এই, তোমরা কোথায় গেলে?

(শাকিল ও মিঠুন ঢোকে)

শাকিল: ইয়েস পন্তুবাবু…

পন্তু: আয় আয়। একটা ভাল দেখে গান ধর তো—

শাকিল: (গান) উউউ… এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা—

পন্তু: আরে লেড়কি নয়?! ম্যাগীবাজ… পেট-ট্রিয়টিক গান গাও।

শাকিল: ও আচ্ছা, দেশকা গান? ঠিক হ্যায়। (গান) ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…

পন্তু: বাঃ, বাঃ। নাও, মতি, গাও।

মতি: আজ্ঞে কত্তা, এই গানটা তো আমার মুখস্থ নেই—

পন্তু: জানো না? কোনও সমস্যা নেই। ওরা তুলিয়ে দেবে। এই, তোলাও—

(মতি শাকিলের সাথে গায়)

শাকিল: (গান) ভারত আমার ভারতবর্ষ থোড়া স্কেল মিলাকে… (গান) ভারত আমার ভারতবর্ষ… বহুত বড়িয়া।

মতি: ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…

পন্তু: খুব ভাল, খুব ভাল। মতি, তুমি একটু এখানে দাঁড়াও। আমি চট্ করে আমার দেশটাকে একটু দেখে আসি, হ্যাঁ? উফ বাবা, এত উঁচু থেকে… আআআ… হুম।

(পন্তু বেরিয়ে যায়। পেছনে পুরোহিত-এম.এল.এ-উকিল-কমিশনার-রাধা ‘দেশ দেখব’ বলতে-বলতে যায়)

পুরোহিত: পন্তুবাবু, আমায় সাথে করে নিয়ে যান। আমার অনেক পুজো-আচ্চা বাকি আছে— ওম জবা কুসুম সংকাশন…

এমএলএ: পন্তুবাবু, পন্তুবাবু দাঁড়ান… আমিও যাব। পন্তুবাবু…

উকিল: পন্তুবাবু দাঁড়ান। ল’ইয়ার ছাড়া দেশ দেখতে যাবেন না। ফর গড’স সেক—

কমিশনার: পন্তুবাবু দাঁড়ান, আমিও দেশ দেখতে যাব— (ভেঁপু)

রাধা: বাবা— আমাকে ফেলে রেখে তুমি দেশ দেখতে চলে যাচ্ছ? আমি কত করে বললাম দেশ দেখতে যাবার সময় আমায় নিয়ে যাবে, আমি দেখব?! এখানে আছেই বা কী…

(গঙ্গা ঢোকে, পিঠে আর হাতে একটা করে ব্যাগ)

গঙ্গা: তোমার ব্যাগটাও নিয়ে এসেচি। পালিয়ে যাবে?

মতি: কত দূরে যাবে?

গঙ্গা: যত দূর পারি।

মতি: তারপর?

গঙ্গা: একসাথে থাকব!

মতি: খাব কী? উপোস করে থাকব?

গঙ্গা: খেটে খাব। দু’জনে একসাথে থাকলে সব জোগাড় হয়ে যাবে। তুমি আমায় ভালবাসো তো?

মতি: দাও, ব্যাগটা দাও। চলো।… তুমি আমায় ভালবাসো?

গঙ্গা: নাও, ব্যাগটা নাও। এবার চলো।

মতি: তিনসত্যি করে বলো—

গঙ্গা: ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি। এবার তুমি বলো—

মতি: পরে বলব। এখন চলো। সারা লাহাপুরে বাবুর লোকেরা পাহারা দিচ্ছে, জানো তো?

গঙ্গা: তাহলে কী হবে?

মতি: কী হবে? আরে আমি আছি তো, কোনও চিন্তা ক’রো না। শোনো, একটা গান শিখিয়ে দিচ্ছি, এইটা গাইতে থাকলে আর কিছু হবে না। করো— ভারত আমার ভারতবর্ষ… ধন্য গো—

গঙ্গা: আমি তো এই গানটা জানি না।

মতি: পারবে পারবে। আমার পরে পরে গাও।

(মতির পরে পরে গঙ্গা গাইতে থাকে)

মতি: হয়েছে?

গঙ্গা: আমি তো গানটা মুখস্থ করতে পারছি না।

মতি :উফ, আচ্ছা ঠিকাছে, আমার সাথে-সাথে গাইতে-গাইতে চলো— (বেরিয়ে যায়)

(দুটো গুলির শব্দ)

[Projection 9: End Credit]