সাহিত্যানুরাগী হাবিবুল্লাহ বাহারের প্রয়াণের বছর দুই পর তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা বাহার চৌধুরী আর লেখক শওকত ওসমান যখন হাবিবুল্লাহ বাহার স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের আয়োজন করেন, তখন প্যারিস-প্রবাসী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে তাঁরা অনুরোধ করেছিলেন একটি লেখার জন্য। হাবিবুল্লাহ বাহার ওয়ালীউল্লাহ্-র আত্মীয়ও ছিলেন। যদিও সে-লেখা তিনি লিখে উঠতে পারেননি। কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্-র মৃত্যুর প্রায় দু-দশক পরে খুঁজে পাওয়া সে-লেখায় যে-কয়েকটি জরুরি কথা লিখে রেখেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্, তা থেকে তাঁর মানস স্থানাঙ্কের খানিকটা জরিপ করতে পারা অসম্ভব নয়।
বাংলা অনুবাদে ‘বাহারদা’ নামে প্রকাশিত সেই লেখায় তিনি লিখছেন— ‘ট্রাম স্টপে ট্রাম ধরতে গিয়ে তাঁকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। একটার পর একটা ট্রাম চলে যাচ্ছে। তিনি ট্রাম ধরছেন না কারণ ট্রাম ধরতে যারা আসছে তাদের […] নিয়ে গল্পগুজব শুরু করেছেন। ট্রাম স্টপ এমন একটি জায়গা যেখানে লোকের সঙ্গে দেখা হয়ই। কে জানে, হয়তো সে-জন্যেই তিনি ট্রাম স্টপে হাজির হতেন। সত্যিই যদি কোথাও যাওয়ার ছিল তবে এমন ভাবে পাশ দিয়ে ট্রামের পর ট্রাম চলে যেতো কি? তবে যে-কথাটা বলছিলাম সেটি এই যে, তিনি অনর্গল এত কথা বলতেন নিজের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলতেন না, তিনি যে আসলে কী ভাবছেন, কোথায় তিনি হতাশ হয়েছেন, কোথায় তার আশা চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে— সে-সব কথার কোন ইঙ্গিত পাওয়া যেতো না। মনে হয়, মনের কথা বলতেন না কারণ জানতেন তাঁর মনের কথা কেউ ঠিক বুঝবে না’।
রাস্তায় ট্রামের পর ট্রাম চলে যাওয়ার চিত্রকল্প আর শিকড় থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা ওয়ালীউল্লাহ্ কি কোথাও চেতনার স্তরে একটা নৈকট্য অনুভব করছিলেন না? তাঁরও তখন সেরকমই অবস্থা নয় তো? একা-একা কথা বলা, চারপাশে ঘটে চলা ঘটনার স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া— বিচ্ছিন্ন, কেননা ততক্ষণে হয়তো তাঁর ভেতরেও শুরু হয়ে গেছে আখ্যানের নতুন কোনো প্রপাত। পাগলাঝোরার মতো আছড়ে পড়ছে অন্তরে-অন্তরে— যদিও বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই।
আরও পড়ুন: অটোমেটিক রাইটিং বলে কিছু হয় না, বিশ্বাস করতেন মতি নন্দী!
লিখছেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়…
ওয়ালীউল্লাহ্কে নিয়ে আলোচনায় আমরা বহুবার তাঁর ‘অস্তিবাদ’-কেন্দ্রিক চিন্তাচেতনার কথা বলেছি, কিয়ের্কেগার্দ থেকে হাইডেগার হয়ে জাঁ-পল সার্ত্র পর্যন্ত আমাদের গতিবিধি অবাধ। কিন্তু খুব কাছ থেকে ওয়ালীউল্লাহ্কে দেখার চেষ্টা করিনি আমরা— যেমন তাঁর তিনখানা নামজাদা উপন্যাস আর ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী’ ছাড়া আমাদের আলোচনাও খুব একটা গড়ায় না। চট্টগ্রামের ষোল শহরে ১৯২২-এর ১৫ অগাস্ট জন্মেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্। কিন্তু তাঁর বাবার বদলির চাকরির কারণে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে কেটেছে তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনরাত। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার হিসেবে ওয়ালীউল্লাহ্ ডিস্টিংশন-সহ গ্র্যাজুয়েট, ইকনোমিক্সের এমএ ক্লাসে ভরতি হয়েও লেখাপড়া ছেড়ে ১৯৪৫ সালে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ কাগজে চাকরি নেন। সে-বছরের মার্চে তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘নয়নচারা’ প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকেই। ততদিনে সঞ্জয় ভট্টাচার্য বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গেও ধীরে-ধীরে পরিচয় ঘটছে তাঁর। কিন্তু বাদ সাধল তাঁর জন্মের তারিখটাই— এক্ষেত্রে অবশ্য তাঁর জন্মের পঁচিশ বছর পর। আমাদের দেশটা স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু-টুকরো হল।

দেশভাগের পরে-পরেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় চলে যান রেডিয়ো পাকিস্তানের সহকারী বার্তা সম্পাদকের কাজ নিয়ে। কিন্তু ১৯৪৮-এ তাঁকে ঢাকা ছেড়ে করাচি যেতে হয় সেখানকার রেডিয়ো স্টেশনের বার্তা সম্পাদক হিসেবে। তারপর দিল্লির পাকিস্তান দূতাবাসে প্রেস অ্যাটাশে হয়ে ১৯৫১-য় ভারতে আসেন। সেখান থেকে পরের বছর সিডনি। ফের ১৯৫৪-য় তথ্য অফিসার হয়ে ঢাকায় ফেরা। পরের বছর আবার করাচি, সেখান থেকে ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, ইংল্যান্ড ঘুরে ১৯৬১ সাল থেকে টানা কয়েক বছর প্যারিসে থাকা। এরই মধ্যে এমব্যাসির কাজ ছেড়ে ইউনেস্কোয় একটি চুক্তিভিত্তিক চাকরি নেন। ১৯৭০-এর ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে ইউনেস্কোয় তাঁর চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হয়ে গেলে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ইসলামাবাদে ডেকে পাঠালেও তিনি প্যারিসেই রয়ে যান।
খেয়াল রাখা প্রয়োজন, ১৯৭০-এর শেষে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের (হবু বাংলাদেশ) লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ফলে ওয়ালীউল্লাহ্-র মতো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে পেনশন-গ্র্যাচুইটির লোভে পাকিস্তান যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, যদিও জীবনে অর্থকষ্টের অনর্থে তাঁকে বিপদে পড়তে হয়েছে। প্যারিসে থাকাকালীন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লাল সালু’র ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, পরে তিনি নিজেই ইংরেজিতে ‘লাল সালু’ অনুবাদ করেন। খুবই উল্লখেযোগ্য যে, দুই অনুবাদেই ‘শিকড়’ শব্দটা শিরোনামে উঠে আসে— উঠে আসে শিকড়হীনতা। ‘লাল সালু’র অনুবাদে শিকড়হীনতার কথা কীভাবে আসে, তা হয়তো আমাদের চেনা সমালোচনার ছকে ধরা পড়বে না। মজিদ আর মাজারের সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে ভাবলে আবার খুব একটা অসুবিধেও হবে না বুঝতে। তিনি ‘লাল সালু’ লিখতে শুরু করেছিলেন ঢাকাতেই, সেখান থেকেই কমরেড প্রকাশনী (যা আবার এক অর্থে তাঁর পারিবারিক প্রকাশন সংস্থাও বটে) ১৯৪৮ সালে যখন বইটি প্রকাশ করে, ততদিনে তিনি সম্ভবত করাচিতে। আবার খেয়াল করার মতো, মজিদ যখন মহব্বতনগরে এসে হাজির হয়, তখন সেও এক অর্থে আউটসাইডার এবং গারো পাহাড় ছাড়া অন্য কোনও বাস্তব ইঙ্গিতও নেই।

এই উপন্যাস থেকেই আশ্চর্য সব প্রতীকের খোঁজে ওয়ালীউল্লাহ্-র আগ্রহ। লিনিয়ার গল্পের সোজাসাপটা ভঙ্গি তাঁর প্রায় কোনো লেখাতেই নেই। শুরুতে যেভাবে মজিদকে উপন্যাসে আনা হয়েছে, তা প্রায় কবিতার চিত্রকল্পের মতো— ‘এক সময় ঘুরতে ঘুরতে তাহেরদের নৌকা মতিগঞ্জের সড়কটার কাছে এসে পড়ে। কাদের পেছনে বসে তেমনি নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তাহেরের পানে তার আঙুলের ইশারার জন্যে। হঠাৎ এক সময়ে দেখে, তাহের সড়কের পানে চেয়ে কী দেখছে, চোখে বিস্ময়ের ভাব। সেও সেদিকে তাকায়। দেখে, মতিগঞ্জের সড়কের ওপরেই একটি অপরিচিত লোক আকাশের পানে হাত তুলে মোনাজাতের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, শীর্ণ মুখে ক-গাছি দাড়ি, চোখ নিমীলিত। মুহূর্তের পর মুহূর্ত কাটে, লোকটির চেতনা নেই। নিরাকপড়া [বায়ুশূন্য, স্তব্ধ] আকাশ যেন তাকে পাথরের মূর্তিতে রূপান্তরিত করেছে।’ তবে এই উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ চিত্রকল্পটি জমিলার মৃত্যুদৃশ্যের বর্ণনায় আছে, যখন তাঁকে মাজারে বেঁধে রেখেছিল মজিদ, শিলাবৃষ্টির পর— ‘ঝাঁপটা খুলে মজিদ দেখল লাল কাপড়ে আবৃত কবরের পাশে হাত পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে জমিলা, চোখ বোজা, বুকে কাপড় নেই। চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বলে সে-বুকটা বালকের বুকের মতো সমান মনে হয়। আর মেহেদি দেওয়া তার একটা পা কবরের গায়ের সঙ্গে লেগে আছে।’ ধর্মীয় অন্ধ অনুশাসনের বিরুদ্ধে, পীরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জমিলা জাগ্রত প্রতীক হয়ে থাকে। কিন্তু এখন মনে হয় এহ বাহ্য। হায়াৎ মামুদ ওয়ালীউল্লাহ্ সম্পর্কে আলোচনায় লিখেছিলেন— ‘বস্তুতপক্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র যাবতীয় রচনাকে দুটি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত করা চলে বলে আমার ধারণা: এক দিকে তিনি বাস্তব জগৎসংসারের অভিজ্ঞতা ছেনে তৈরি করেন দুনিয়ার প্রত্যক্ষ বাস্তবতা ও তার অন্তরালে ক্রিয়াশীল জীবনসত্যকে; অন্য দিকে তিনি ঐ অভিজ্ঞতার সারাৎসার বুনে দেন অস্বচ্ছ এক মায়াবী জগতের মাটিতে যেখানে কুসুম ফুটে ওঠে প্রতীকে ও ব্যঞ্জনায়। তাঁর কাহিনীগঠনের এক প্রান্তে যদি থাকে ‘লালসালু’, তো আরেক প্রান্তে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’। তাঁর সংসার এভাবে নির্মিত হয়ে ওঠে বাস্তব ও পরাবাস্তব মিশিয়ে; কখনো একই কাহিনীশরীরে উভয়ের সংশ্লেষণ, কখনো-বা মোটা দাগে এ-দুয়ের পৃথক অস্তিত্ব।’

‘লাল সালু’তে ধর্মীয় অনুশাসন আর ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের জেমস জয়েসীয় চলন নিয়ে আমরা এতটাই আপ্লুত যে, ‘চাঁদের অমাবস্যা’ তুলনায় কম আলোচিত হয়। এই উপন্যাসটিও ‘কাঁদো নদী কাঁদো’র মতোই প্যারিস প্রবাসকালে লেখা। মনে হয় তাঁর সেরা লেখাগুলো সবই দৈবের বশে প্রবাসে বসে লেখা। ওয়ালীউল্লাহ্-র মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত কাগজপত্রের মধ্যে ‘চাঁদের অমাবস্যা’ সম্পর্কে লেখকের যে-নোটটি পাওয়া গেছে, তাও খুবই উল্লেখযোগ্য। সেখানে লেখা আছে— ‘The central theme is the knowledge of a Crime— the evil act— of which the young teacher becomes the possessor and which frightens him because of the responsibility attached with it: the evil act, as it were, passes on to the teacher as well. What I want to say is that the most important thing is not so much an evil act, nor its perpetrator but the attitude of the man outside such an act. From a coward the young teacher rises to a brave man and a martyr as well.’ নিজের লেখা সম্পর্কে এমন স্পষ্ট লিটারারি নোট আর কোনও বাঙালি লেখক লিখেছেন বলে জানি না। জীবনানন্দের লিটারারি নোটসের স্বাদ-গন্ধ আলাদা। রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা নিয়ে মন্তব্য করতে আদৌ পছন্দ করতেন না— আর যেটুকু করেছেন তাও নেহাত দায়ে পড়ে করেছেন বলেই মনে হয়।
ওয়ালীউল্লাহ্কে নিয়ে আলোচনায় আমরা তাঁকে প্রায় স্বয়ম্ভূ এবং উত্তরাধিকারহীন নির্জনতায় পৌঁছে দিই। কিন্তু তাঁর মনোজগতের খবর রাখি না। একদিকে যেমন ছিন্নমূল মানসিকতায় তিনি আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সমস্ত লেখকজীবন জুড়ে, তেমনই এ-কথা ভুললে চলে না যে, তাঁর প্রথম যৌবনে আমাদের উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা ছিল দেশভাগ। তাঁর ‘দ্য আগলি এশিয়ান’ (বাংলা অনুবাদে নাম হয়েছে ‘কদর্য এশীয়’) রচনাটির হদিশ রাখেন যাঁরা তাঁরা জানেন, এটি উইলিয়ম লেডেরার আর ইউজিন বারডিকের লেখা ‘দ্য আগলি আমেরিকান’ বইটির প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যে-মানসিকতা ওয়ালীউল্লাহ্-র ছিল, তা কি তাঁর কূটনৈতিক পেশাজীবনে তাঁকে কুরে খেত না? সম্ভবত তাই এই উপন্যাস দীর্ঘদিন ধরে একটু-একটু করে লেখা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী আন-মারির বয়ান অনুযায়ী, লেখাটি ঢাকায় থাকাকালীন শুরু হলেও সম্পূর্ণ হয়েছে তাঁর শেষ লেখা হিসেবে। ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসটির ‘সেটিং’ তৃতীয় বিশ্বের একটি কাল্পনিক শহর, আর চরিত্ররা সব ক্ষমতাবান মানুষজন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা গত শতকের তিনের দশকের শেষ থেকে আমাদের স্বাধীনতা তথা দেশভাগের সময় পর্যন্ত শিক্ষিত মুসলমান যুবক ওয়ালীউল্লাহ্-র মনেও নিশ্চয়ই রেখাপাত করেছিল।

তবে রাজনীতির গোলকধাঁধায় কিছুদিন পরেই ধর্মীয় হোমল্যান্ডের চিন্তার অসারতাও ধরা পড়েছে তাঁর চোখে। ছাত্রাবস্থায় কিছুদিনের জন্য তিনি কৃষ্ণনগরের সরকারি কলেজে ইকনোমিক্স পড়েছেন। সেখানে তাঁর নিকট বন্ধু ছিলেন হৃষীকেশ লাহিড়ী। হৃষীকেশ তাঁর পুরোনো স্মৃতি ঘেঁটে বলেছেন, তাঁদের পরিচয়ের একেবারে শুরুয়াতের সময়েই ওয়ালীউল্লাহ্ নাকি তাঁকে বলেছিলেন— ‘আমি মুসলিম লীগের একনিষ্ঠ কর্মী। আশা করি আপনি হয় কংগ্রেসকর্মী, নয় কংগ্রেস সমর্থক। এবার আপনি ঠিক করুন আমাদের আর অগ্রসর হওয়া ঠিক হবে কিনা।’ এমন স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে হৃষীকেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক ধারণার জন্য দু-জনের বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি। বরং তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন পত্রালাপ চলেছে। ১৯৪৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে ঢাকা থেকে ওয়ালীউল্লাহ্ বন্ধুকে মহম্মদ আলি জিন্নার মৃত্যুর পরে (সে-বছরই ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী খুন হন) লিখেছেন—
‘…আমরা, এই উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমানরা যদি জাতীয় পর্যায়ে এই [মানবিক ও যুক্তিবাদী] উপলব্ধি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে নিজেদের নিবেদিত করতাম এবং তা অর্জন করতে সক্ষম হতাম, কি [য.] সুখী আর গর্বিতই না হতে পারতাম আমরা। পাকিস্তান ও ভারত উভয়ই আজ করুণভাবে খাটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই স্থায়ী বিচ্ছেদের ভবিষ্যৎ দুঃখজনক, কিন্তু তা সত্ত্বেও জীবন রক্ষার জন্য এই অস্ত্রোপচার অনিবার্য ছিল। যদি আমরা শুধু এই অস্ত্রোপচারের জরুরি দরকারটাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারতাম।
আমরা, দুই ভগিনীতুল্য জাতি, নিজ নিজ পিতাকে হারিয়ে আজ এতিম। আমাদের অবশ্যই সুখে দুঃখে বন্ধু হিসেবে থাকা এবং সেটা চালিয়ে যাবার শপথ নিতে হবে। আমাদের মাঝখানে বাধাবিপত্তিগুলি দূর করতে হবে, কেননা এসব বাধাবিপত্তি নিঃসন্দেহে অলংঘনীয় হয়ে উঠতে চাইবে এবং আমাদের অজ্ঞতা ঘৃণা আর ভুল বোঝাবুঝির দেওয়ালের মধ্যে আমাদের বন্দী [য.] করে ফেলবে।…’

১৯৫১-র ২০ জানুয়ারির ছোট্ট চিঠিতে সামান্য খবর দেওয়া নেওয়ার মধ্যেই তিনি চমৎকার কয়েকটি কথা লিখেছিলেন হৃষীকেশ লাহিড়ীকে— ‘… জেনে অত্যন্ত প্রীত হয়েছি যে আপনি আপনার নিজের গ্রামে একটি অপূর্ব সপ্তাহ কাটিয়ে এসেছেন। কখনো, কখনো ভুলে যাবেন না সেটা আপনার গ্রাম এবং আপনি তার। মানুষ আপনাকে ভালোবাসে কারণ আপনি তাদের একজন আর যে মাটিতে আপনার শিকড় তাদের শিকড়ও সে মাটিতেই।’
এই শিকড়বাকড়ের গল্পকথাই আজীবন খুঁজে গেছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। ‘পাকিস্তান পি ই এন মিসেলেনি’র অগাস্ট ১৯৫০-এর প্রথম খণ্ডে (এতে কাজী নজরুল ইসলামের তিনটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল) ওয়ালীউল্লাহ্ ‘এসকেপ’ নাম একটি গল্প লিখেছিলেন। এই গল্পটি দেশভাগের ট্রমা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের (এখন স্বচ্ছন্দে বাংলাদেশ বলাই যায়) কোনও লেখকের প্রথম গল্প। তথ্যের খাতিরে জানিয়ে রাখি, ‘এসকেপ’ গল্পটির ‘মুক্তি’ নামে বাংলা অনুবাদ করেছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির। আর সে-গল্পে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির একটা রাস্তা খুঁজতে বার বার এসেছে আখ্যানের উপশমের কথা, যদিও বার বার গল্পের খেই হারিয়ে ফেলেছে কথক। গল্প আর এগোয় না। কিন্তু নাছোড় গল্প বলার ইচ্ছে আসলে বাচ্চা মেয়েটিকে ভয় পেতে না-দেওয়ার জন্য। এ যেন সম্মুখ সমরে আখ্যান আর বাস্তবের বিভীষিকার ট্রেনযাত্রা। কিন্তু গল্পটা আর শোনানো হয়ে ওঠে না। কিন্তু গল্পটুকু শোনানো ছাড়া আর কিছুই যে তার দেওয়ার নেই! মুশকিল হল গল্পটা তার কিছুতেই মনে পড়ে না। তীব্র যন্ত্রণায় মানুষ কি বোবা হয়ে যায় না? তবে লেখক আরও গভীরে শিকড়সন্ধানী। তিনি পৌঁছে গেছেন তাঁর ছেলেবেলায়, যখন তাঁর দাদি-আম্মার কাছে তিনি গল্প শুনতেন। কিন্তু সে-গল্পের সবটা তার এখন আর মনে পড়ে না। তবু গল্পের, শিকড়ের টান ভুলতে চান না সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্।
ঋণ:
সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদিত ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ অগ্রন্থিত রচনা’




