১৮৪৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর শেষবার তাঁকে সুস্থ অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড শহরে তার আগে মাস তিন-চারেক ছিলেন তিনি। একটি পত্রিকা প্রকাশ করার ইচ্ছা ছিল, তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছিলেন বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে। সেসব বক্তৃতা রীতিমতো কল্পনাপ্রবণ ও ক্ষুরধার এক মনের পরিচয় দেয় বলেই জানিয়েছেন রিচমন্ডের সংবাদপত্রগুলির প্রতিবেদকরা। অন্তত তাঁর শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতার কোনও প্রমাণ সেই বক্তৃতাগুলির মধ্যে বা তাঁর সেই সময়কার আচার-আচরণে বিন্দুমাত্র পাওয়া যায়নি। কিন্তু অর্থ সংগ্রহের ফলাফল আশানুরূপ হল না। বিফল মনোরথ হয়ে তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর ফেরিবোট ধরে বাল্টিমোর হয়ে নিজের শহর নিউ ইয়র্কে ফিরে যাবেন স্থির করলেন। তার ঠিক আগেরদিন সন্ধ্যায় জ্বোরো শরীরে তিনি গিয়েছিলেন রিচমন্ড শহরের এক ডাক্তারের কাছে। রিচমন্ডে আসার আগেই তিনি কলেরায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। দৃষ্টিবিভ্রমও হচ্ছিল বারে বারে। ডাক্তারেরা কেউ বলেছিল স্নায়ুরোগ দেখা দিচ্ছে, কেউ বা বলেছিল দীর্ঘকালের পানদোষের ফসল এই দৃষ্টিবিভ্রম। তিনি নিজে যদিও জোর গলায় বলতেন যে, রীতিমতো চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গিয়ে মদ্যপান তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
যাই হোক, সেই শেষবার তাঁকে দেখা গিয়েছিল সুস্থ অবস্থায়।
এর পরের সপ্তাহখানেক যে ঠিক কী হয়েছিল, তা কেউ বলতে পারে না। তাঁর জীবন-অনুচ্ছেদের ওই কয়েকটা দিনের পাতা যেন মহাকালের বই থেকে কেউ ছিঁড়ে উড়িয়ে দিয়েছে। অক্টোবরের ৩ তারিখ সন্ধেবেলায় হঠাৎ তাঁর বিস্ময়কর আবির্ভাব হল বাল্টিমোরের ‘গানার্স হল’ সরাইখানায়। শরীরে জ্বর, দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত, প্রলাপ বকছেন। পরনের পোশাকআশাক অদ্ভুত— মাপের চেয়ে ছোট কোট ও ছেঁড়া প্যান্ট, মাথায় খড়ের টুপি, পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া জুতো, গালে কয়েকদিনের না-কামানো দাড়ি, সর্বাঙ্গে পাঁকের দাগ আর দুর্গন্ধ। মদ খেয়েছেন কি? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন: ঈশ্বরচেতনা কীভাবে এসেছে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতায়?
লিখছেন রবীনা মিত্র…

চিরকাল ফিটফাট ধোপদুরস্ত হয়ে থাকা বিখ্যাত সাহিত্যিককে এই বেশে, এই অবস্থায় দেখার কথা ভাবতেই পারে না কেউ। তাই তাঁকে অনেকে চিনতেও পারেনি। কেউ বলে, তিনি নাকি নিজেই ভুল বকতে-বকতে এসে হাজির হয়েছিলেন সরাইখানায়। আবার কারও মতে তা নয়, তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলেন রাস্তার পাশের নর্দমায়, যেখান থেকে তাঁকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে আসা হয় পাশের সরাইতে। অবশেষে জোসেফ ওয়াকার নামের এক ভদ্রলোকের বুঝি কিছু সন্দেহ হল। তড়িঘড়ি করে বাল্টিমোরেরই এক ভদ্রলোক জোসেফ ই. স্নডগ্রাসকে চিঠি লেখেন তিনি—
‘মহাশয়—, চার নম্বর ওয়ার্ডে রায়ানের সরাইখানায় একজন উদভ্রান্ত-দর্শন লোকের দেখা মিলেছে। তার পোশাকআশাক আর ভাবগতিক দেখে অবস্থা সুবিধের মনে হয় না। লোকটি বলছে, সে নাকি আপনার পরিচিত ও নিজের নাম বলছে ই. এ. পো। আপনি সত্বর এসে কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।’
স্নডগ্রাস অকুস্থলে গিয়ে আঁতকে ওঠেন এই অদ্ভুত নাটকের মধ্যমণিটিকে দেখে। কারণ তিনি আর কেউ নন, স্বনামধন্য সাহিত্যিক ওসাহিত্য সমালোচক এডগার অ্যালান পো। সেই এডগার অ্যালান পো, যাঁর অদ্ভুত, বীভৎস আর ভয়ানক রসের গল্পগুলি পাঠকের মনে শিহরণ জাগিয়ে তোলে। মনে হয় যেন সেগুলি সাহিত্যের চেনা পথ ছেড়ে নতুনকে জাগিয়ে তোলে। মনে হয় যেন, সেগুলি সাহিত্যের চেনা রাজপথ ছেড়ে মানুষের মনের অন্ধকার রাজ্যের মধ্যে নতুন সুঁড়িপথ কাটতে লেগেছে। সমকালীন সাহিত্যিকরা ধন্ধে পড়ে একাধিকবার তাঁর রচনাগুলি সম্পর্কে বলেছেন— এ কি আদৌ সাহিত্য না কি অন্ধকারের পাঁক নিয়ে হোলিখেলা? উল্টোদিকে তাঁরা নিজেরাই ভয়ে থাকতেন পো-র সমালোচনা নিয়ে। সমকালীন সমালোচক জেমস রাসেল লোয়েল যেমন স্বীকার করেছিলেন যে, তৎকালীন আমেরিকায় এডগার পো-র মতো এমন দার্শনিক, এমন নির্ভয় ও কল্পনাপ্রসূত সাহিত্যকর্মের এমন খড়্গহস্ত সমালোচক আর একজনও নেই, তেমনই আবার খোঁচাও দিতে ছাড়েননি এই বলে যে ‘পো সমালোচনার সময় মাঝে-মাঝে কলম কালির বদলে প্রুসিক অ্যাসিডে চুবিয়ে নেন।’

আজ সারা পৃথিবী এডগার অ্যালান পো-কে গথিক ও উইয়ার্ড সাহিত্যের একজন প্রবাদপুরুষ বলে মানে। তাঁর গুণগ্রাহীদের মধ্যে ছিলেন ফরাসি আধুনিক কবিতার দিকপাল শার্ল বদলেয়ার ও স্তেফান ম্যালার্মে, তেমনই ছিলেন জনপ্রিয় সাহিত্যের দিকপাল স্যর আর্থার কনান ডয়েল আর এইচ. পি. লাভক্রাফট, কিংবা সাসপেন্স সিনেমার বাঁক ঘুরিয়ে দেওয়া পরিচালক অ্যালফ্রেড হিচকক। কিন্তু ৭ অক্টোবর, ১৮৪৯ যখন বাল্টিমোরের ওয়াশিংটন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাওয়া মন আর শরীর নিয়ে প্রলাপ বকতে-বকতে বিশ্বসাহিত্যের সেই ধূমকেতু শেষ নিঃশ্বাস ফেলছিলেন (বয়স তখন তাঁর মাত্র চল্লিশ), সেদিন তাঁর বিছানার পাশে প্রায় কেউ ছিল না বললেই চলে।
একদিক থেকে ভেবে দেখলে এডগার অ্যালান পো-এর হয়তো এমন মৃত্যুই সাজে। যে-কোনও টম-ডিক-হ্যারির মতো নিতান্ত গড়পড়তা মৃত্যু সেই মানুষটিকে মানাত না, যাঁর সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে থেকেছে মৃত্যুই। পো জীবনে দুঃখকষ্ট কম পাননি। সেই সমস্ত ঘাত-প্রতিঘাতই তাঁর সাহিত্যকে ধীরে-ধীরে ঘুরিয়ে দিচ্ছিল জীবনের অন্ধকার দিকগুলির অভিমুখে। তারই অবধারিত অন্তিমে দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যু— ‘দ্য গ্রিম রিপার’। কিন্তু মৃত্যু তো নেহাৎই কোনও ‘শেষ কথা’ নয় পো-র কাছে। তা হলে তো আর পো-র স্মৃতির উদ্দেশ্যে আজও না তাবড় সাহিত্যিক, শিল্পী, দার্শনিকরা। ‘দ্য প্রিম্যাচিওর বারিয়াল’-এ পো লেখেন, ‘জীবন আর মৃত্যুকে আলাদা করার সীমারেখাটা আসলে বড় ছায়াময়, বড় অনির্দেশ্য। কোথায় যে একটা জগতের শেষ আর অন্যটার শুরু তা কে বলতে পারে?’ আসলে মৃত্যু আমাদের যতটা না শেষের কথা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি বলে অনুপস্থিতির কথা। পো ঠিক সেই জায়গাতেই বারবার ঘা মেরে জীবন আর মৃত্যুর ঘণ্টা বাজিয়ে চলেন। মৃত্যু তাঁর কাছে এক অস্বস্তিকর সীমারেখা, যার ওপার থেকে মৃতরা বারবার ফিরে আসে। কখনও দেহ নিয়ে, কখনও কণ্ঠস্বর হয়ে, কখনও বিবেকের ছায়া হয়ে, কখনও বা অমোচনীয় স্মৃতি হিসেবে। তাঁর সাহিত্য তাই মৃত্যুর ভয় নিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি মৃত্যুকে অস্বীকার করতে না-পারা মানুষের অসহায়তা নিয়ে।

এইখানেই পো-র সাহিত্যিক অবস্থানকে রোমান্টিক শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের বৃহত্তর ইতিহাসের মধ্যে দেখা জরুরি। সতেরো ও আঠারো শতকে ইউরোপ জুড়ে যে ‘আলোকপ্রাপ্তি’-র যুক্তিবাদী একমাত্রিকতা কায়েম হয়ে বসেছিল, তারই বিপ্রতীপে আঠারো ও উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এক খোলা হাওয়া বয়ে এনেছিল রোমান্টিসিজম। মানুষের কল্পনা, আবেগ, ব্যক্তিসত্তা, স্বপ্ন, রহস্য ও অসীমের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছিল। এই অসীমের আকাঙ্ক্ষা আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকা ‘সাব্লাইম’-এর প্রতি বিস্ময়ই ওয়ার্ডসওয়ার্থকে দিয়ে টিনটার্ন অ্যাবি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দৃশ্যের পুজো করিয়ে নিয়েছে, নাইটিঙ্গেল আর স্কাইলার্কের জাদুসংগীতে মুগ্ধ করে কিটস আর শেলিকে নিয়ে দিয়েছে মরজগৎ পেরিয়ে অমৃতজগতের স্বাদ। কিন্তু সেই অসীম বিস্ময়ের শুভ্রজ্যোতিরও যে এক অন্ধকার, রহস্যময় উলটোপিঠ থাকতে পারেস তাও কিন্তু রোমান্টিসিজম দেখিয়ে দিয়েছিল। তাই উনিশ শতকে রোমান্টিক মূলধারার সাহিত্যের পাশাপাশি জনমানসে প্রবল জায়গা করে নিচ্ছিল গথিক সাহিত্য। হোরেস ওয়ালপোল, অ্যান র্যাডক্লিফ, চার্লস ম্যাটুরিন কিংবা ম্যাথিউ লিউইসের ভূত-রহস্য-অ্যাডভেঞ্চারগন্ধী গথিক রোমান্সের চাহিদা কিছু কম ছিল না সেই সময়ে।
পো সেই রোমান্টিক অন্তর্জগতেরই এক অভাবনীয় অন্ধকার বাঁক। রোমান্টিক কবির কাছে কল্পনা যেখানে মুক্তির পথ, পো-র কাছে সেই কল্পনাই কখনও হয়ে ওঠে আতঙ্কের গোলকধাঁধা, যেখানে প্রেম আত্মার পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। তাঁর কাছে প্রেম প্রায়শই মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও শোকের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। তিনি রোমান্টিসিজমেরই স্বপ্নময় আলোকে এমন এক অন্ধকার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে মানুষের নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা আকাঙ্ক্ষা আর ভয় যেন আলাদা সত্তা হয়ে গিলে খেতে আসে মানুষটিকে। এই অর্থে পো-কে ‘ডার্ক রোমান্টিসিজম’-এর অন্যতম প্রধান শিল্পী বলা যায়। তাঁর লেখায় অপরাধ, উন্মাদনা, আত্মপরিচয়ের সংকট এবং মৃত্যুভয় মিলে এমন এক মানসিক ভূগোল তৈরি করে, যেখানে মানুষ নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে ওঠে। গথিক অন্ধকার তাঁর উপাদান বটে, কিন্তু মানুষের মন তাঁর প্রকৃত ভূতুড়ে বাড়ি। আজও তিনি পাঠকদের তাদের নিজের অন্ধকার দিকগুলিকে চিনিয়ে দিচ্ছেন।
এই মৃত্যুচেতনার সবচেয়ে চরম রূপ দেখা যায় ‘দ্য ফ্যাক্টস ইন দ্য কেস অফ মসিয়েঁ ভালদেমার’ গল্পে। মৃত্যুপথযাত্রী ভালদেমারকে মেসমারিজমের মাধ্যমে মৃত্যুর মুহূর্তে স্থির করে রাখা হয়। সে মৃত, অথচ তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে হাড় হিম করে দেওয়া বাক্য— ‘আমি মরে গিয়েছি’। জীবিত ও মৃতর মাঝখানে তার এই ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলে থাকা পো-র মৃত্যু নিয়ে একটি অবস্থানকে স্পষ্ট করে। মৃত্যু তাঁর কাছে কোনও নির্দিষ্ট মুহূর্ত নয়, বরং এক ভয়াবহ ‘নো-ম্যান্স ল্যান্ড’। ভালদেমার যেন মৃত্যুর ওপার থেকে কিছুক্ষণের জন্য ফিরে এসে জীবিতদের জানিয়ে দেয় যে, মৃত্যু সম্পর্কে মানুষের সমস্ত জ্ঞানই অসম্পূর্ণ। তাকে জাগিয়ে তোলার মুহূর্তে তার শরীরের আকস্মিক পচন তাই কেবল বিশুদ্ধ হরর নয়। এ যেন ‘মৃত্যু’ নামের কার্পেটে ঢেকে রাখা সত্যের এক বিস্ফোরণ।

‘দ্য ব্ল্যাক ক্যাট’-এ মৃতের প্রত্যাবর্তন আরও রহস্যময়। স্ত্রী-র হত্যাকারী গল্পকথক তার প্রিয় কালো বিড়াল প্লুটোকে হত্যা করেও তার উপস্থিতি থেকে মুক্তি পায় না। দ্বিতীয় বিড়ালের শরীরে যেন প্রথমটির ছায়াই ফিরে আসে। শেষে নিজের হাতে নির্মিত দেওয়ালের ভেতর থেকে মৃত স্ত্রী-র দেহের সঙ্গে বিড়ালের আর্তনাদ জেগে ওঠে। এখানে মৃত প্রাণীটি সত্যিই ফিরে এসেছে কিনা, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এই যে, হত্যাকারী তাকে কখনও নিজের চেতনা থেকে নির্বাসিত করতে পারেনি। এখানে খেয়াল রাখতে হবে আরও একটি কথা। পুরাণের একনিষ্ঠ পাঠক বিড়ালটির নাম রেখেছেন ‘প্লুটো’, যিনি গ্রেকো-রোমান পুরাণ অনুসারে প্রেতলোকের রাজা। কাজেই মৃত্যুলোকের অধিপতি স্বয়ং অলৌকিক ক্ষমতাধর কালো বিড়ালের বেশ ধরে এসে অনপনেয় হত্যা-অপরাধের শাস্তি দিয়ে গেলেন, এমনটাই কি পাঠককে ভাবাতে চাইছেন পো? কারণ তাঁর কাছেও অপরাধের মৃত্যু নেই। মানুষ দেহ লুকোতে পারে, স্মৃতি নয়। এই সূত্রেই আরও গভীর অর্থ পায় ‘দ্য টেল-টেল হার্ট’ গল্পটি। বৃদ্ধকে হত্যা করে তার দেহ মেঝের তলায় পুঁতে ফেলার পরও হত্যাকারী ক্রমাগত শুনতে পায় মৃতের হৃদস্পন্দন। হৃদস্পন্দনটি বাস্তব, না অপরাধবোধের শ্রাব্য রূপ, পো তা বলেন না। এই অনিশ্চয়তাই গল্পটিকে চালিয়ে নিয়ে যায়, পাঠককে ধরে রাখে। মৃত মানুষটি আর ফিরে আসেন না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু হত্যাকারীর মনের ভেতর ফিরে-ফিরে ঘটে। সে বারবার ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে, মরতে থাকে নিজের মনে-মনে। অবশেষে গল্পের আকারে পাঠকের কাছে তার অপরাধের খতিয়ান তুলে ধরতে বাধ্য হয়। মৃত্যু তাই এখানে বাহ্যিক কোনও ঘটনা নয়, এক অন্তহীন মানসিক অভিজ্ঞতা।
‘উইলিয়াম উইলসন’-এ মৃত্যুর ওপার থেকে এই ফিরে আসার রূপ একেবারে আলাদা। পো এখানে বহুল-প্রচলিত জার্মান ডপেলগ্যাঙ্গার মোটিফটিকে কাজে লাগিয়েছেন। দ্বিতীয় উইলসন যেন নায়কেরই অন্য সত্তা— তারই বিবেক, নৈতিক প্রতিচ্ছবি, অথবা দমিয়ে রাখা আত্মপরিচয়। তাকে হত্যা করার পর নায়ক যখন আয়নায় নিজেরই প্রতিবিম্ব দেখতে পায়, তখন বোঝা যায় যে, সে আসলে অন্য কাউকে হত্যা করেনি, বরং নিজের আত্মারই একটি অংশকে হত্যা করতে চেয়েছে। কিন্তু সেই অংশের মৃত্যু অসম্ভব। পো-র এই ধারণা রোমান্টিসিজমের অন্তর্জগতেরই এক অন্ধকার রূপ। মানুষ যত গভীরে নিজের মধ্যে প্রবেশ করে, ততই সে এমন এক ‘অন্য আমি’-র মুখোমুখি হয়, যাকে সে অস্বীকার করতে পারে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না।
পো-র মৃত্যুভাবনার সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশগুলির একটি হল, ‘দ্য ফল অফ দ্য হাউজ অফ আশার’ গল্পে মাদেলিনের সমাধি থেকে প্রত্যাবর্তন। জীবন্ত অবস্থায় কবর দেওয়া মাদেলিন যেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে দেহের শেষ বিদ্রোহের মূর্ত প্রকাশরূপে ফিরে আসে। কিন্তু এই ফিরে আসাকে শুধু একটি ‘গথিক শক’ ভাবলে ভুল হবে। মাদেলিন আর রডেরিক আসলে একই ভগ্ন অস্তিত্বের দুই অর্ধাংশ। ফলে মাদেলিনের সমাধি থেকে উঠে আসা যেন রডেরিকের নিজের দমিত, মৃত্যুভীত সত্তার প্রত্যাবর্তন। শেষ পর্যন্ত ভাই-বোনের পতনের সঙ্গে-সঙ্গে আশারদের বাড়িও ধ্বসে পড়ে— যেন এক প্রাচীন বংশ শুধু নয়, এক বিশেষ মনোজগতও একই সঙ্গে মৃত্যুবরণ করছে। আর এই ব্যক্তিগত মৃত্যুচেতনাকেই পো সামাজিক ও অস্তিত্বের স্তরে নিয়ে যান ‘দ্য মাস্ক অফ দ্য রেড ডেথ’ গল্পে। প্রিন্স প্রস্পেরো মনে করেন, দুর্গের দরজা বন্ধ করে মহামারীকে বাইরে রাখা যায়। কিন্তু মুখোশের উৎসবের মধ্যে যে রহস্যময় রক্তাক্ত অবয়ব প্রবেশ করে, সে কোনও ব্যক্তি নয়, সে স্বয়ং মৃত্যু। মানুষ সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা উৎসব দিয়ে মৃত্যুকে নির্বাসিত করতে পারে না। সাতটি ঘর অতিক্রম করে ঘড়ির শেষ ঘণ্টা বাজে, মুখোশ খুলে যায়। হতচকিত, ভীত মানুষ আবিষ্কার করে যে, যাকে বাইরে রেখে এসেছিল বলে মনে করেছিল, সে আসলে তাদের মধ্যেই ছিল।

পো-র মৃত্যুচেতনা আরও বিষণ্ণ, আরও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠে তুঙ্গে পৌঁছয় তাঁর কবিতা ‘দ্য র্যাভেন’-এ। কথকের মৃতা প্রেমিকা লেনোর এখানে শারীরিকভাবে ফিরে আসে না, কিন্তু বারবার ফিরে আসে স্মৃতিতে। বস্তুত সে যে কোনওদিনই কথককে ছেড়ে যায়নি, তা বোঝা যায়। তারই বার্তাবহ হয়ে যেন পরপার থেকে ডানা মেলে উড়ে আসে সেই রহস্যময় দাঁড়কাক। সেই দাঁড়কাক, যাকে নর্স পুরাণ একই সঙ্গে সর্বজ্ঞানী ও মৃত্যুদূত বলে অভিহিত করেছে। বাইরে ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যা, জানলার খড়খড়িতে শব্দ, ঈষৎ আলোকিত ঘরে দাঁড়কাকের আবির্ভাব যেন জীবনের মধ্যেই মৃত্যুর পদক্ষেপের পরিচায়ক হয়ে ওঠে। কথকের সব প্রশ্নের উত্তরেই তার একমাত্র বক্তব্য, ‘Nevermore’ মৃত্যুর চূড়ান্ততার প্রতীক হয়ে ওঠে। কথক অধৈর্য হয়ে ওঠে, পাগলে হয়ে ওঠে উত্তেজনায়— কিন্তু মৃত্যুরূপী দাঁড়কাকটি তার উত্তরের স্থৈর্যে নির্বিকার। লেনোর আর কোনওদিনই ফিরবে না। কিন্তু আশ্চর্য হল, লেনোর অনুপস্থিত হয়েও কবিতাটির সবচেয়ে উপস্থিত চরিত্র। তাঁর অনুপস্থিতিই বক্তার চেতনাকে অধিকার করে রাখে। ‘দ্য র্যাভেন’-এ তাই মৃতের প্রত্যাবর্তন শারীরিক নয়, মানসিক। পো দেখান, মৃত্যু মানুষকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তার স্মৃতিকে পারে না। শোক নিজেই তখন এক ধরনের ‘হন্টিং’। কবিতার শেষ স্তবকে বিদ্যুতের ঝলক লাগে আমাদের মগজে, যখন আমরা আবিষ্কার করি যে, এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে কথা বলে যাওয়া, আমাদের নিজের যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে যাওয়া এই কবি-কথক আসলে মৃত। আমরা আসলে এক প্রেতের সঙ্গে কথোপকথন চালাচ্ছিলাম। সেই দাঁড়কাকের ডানায় ভর দিয়ে তার আত্মাও এবারে মৃত্যুসাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবে তার মৃতা প্রেয়সী লেনোরের কাছে। পড়ে থাকবে শুধু তার শরীরটা।
এই গল্পগুলি আর ‘দ্য র্যাভেন’ কবিতাটিকে পাশাপাশি রাখলে একটি আশ্চর্য নকশা চোখে পড়ে। ‘ভালদেমার’-এ মৃত মানুষ কথা বলে, ‘আশার’-এ মৃত ফিরে আসে, ‘ব্ল্যাক ক্যাট’-এ অপরাধের স্মৃতি জীবিত হয়ে ওঠে, ‘টেল-টেল হার্ট’-এ মৃতের হৃদয় হত্যাকারীর ভেতরে ধুকপুক করে, ‘উইলিয়াম উইলসন’-এ মৃত প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়, আর ‘দ্য র্যাভেন’-এ মৃত প্রেমিকা যন্ত্রণাময় স্মৃতির ভেতর অনন্তকাল বেঁচে থাকেন। সবশেষে ‘দ্য মাস্ক অফ রেড ডেথ’ ব্যক্তিগত আতঙ্ককে সার্বজনীন সত্যে পরিণত করে, জানিয়ে দেয় সেই অপ্রিয় সত্য— মৃত্যু সর্বগ্রাসী। এখানেই পো-র রোমান্টিসিজমের অন্ধকার বাঁকটি সবচেয়ে স্পষ্ট। রোমান্টিক কল্পনা মানুষের চোখকে দৃশ্যমান জগতের সীমার বাইরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। পো সেই কল্পনাকে নিয়ে গেলেন মৃত্যুর সীমান্তে। রোমান্টিসিজমের প্রেম তাঁর কাছে হয়ে উঠল শোকের স্মৃতি, কল্পনা হয়ে উঠল ভয়, আত্মসন্ধান হয়ে উঠল আত্মবিভাজন, আর অসীমের আকাঙ্ক্ষা গিয়ে ঠেকল মৃত্যুর অনন্ত অন্ধকারে। তাঁর ‘ডার্ক রোমান্টিসিজম’ তাই রোমান্টিসিজমকে অস্বীকার করা নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার এক চরম পরিণতি।
এই কারণেই এডগার অ্যালান পো-কে রোমান্টিক আন্দোলনের বাইরে দাঁড় করালে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব ধরা পড়ে না। তিনি রোমান্টিসিজমেরই এক গভীর, অন্ধকার, প্রায় অতিলৌকিক আত্মসমীক্ষা, যেখানে স্বপ্নের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যু। পো-র সাহিত্য শেষ পর্যন্ত আমাদের এই কথাটিই বলে যে, মৃত্যু জীবনের বিপরীত নয়। মৃত্যু হল জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা তার অন্ধকারতম প্রতিচ্ছবি। পো-র কাছে ভয়াবহতার আসল রহস্য ভূত নয়, বরং এই উপলব্ধি যে, মানুষ মৃত্যুকে পেরিয়ে যেতে পারে না, আবার মৃত্যুকেও এড়িয়েও যেতে পারে না। তাঁর মৃতরা ফিরে আসে, কারণ জীবিতরা তাদের থেকে মুক্ত হতে পারে না। কখনও তারা কবর ভেঙে ওঠে, কখনও দেওয়ালের ভেতর থেকে কথা বলে, কখনও হৃদয়ের শব্দ হয়ে বাজে, কখনও আয়নায় নিজের মুখ হয়ে দাঁড়ায়, কখনও একটি কালো পাখির একটিমাত্র শব্দে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। পো নিজেও তো তেমনই বারবার ফিরে এসেছেন বিশ্বের কাছে, নতুন-নতুন রূপে।

৭ অক্টোবর, ১৯৪৯। মৃত্যু অবশেষে এডগার অ্যালান পো-র কাছে এসে দাঁড়াল। কী হয়েছিল তাঁর মৃত্যুর আগে? আজও জানা যায় না। তাঁর শেষ চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব নথিপত্র, মায় তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটটিও, খুঁজে পাওয়া যায় না। লোকে বলে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে নাকি লেখা হয়েছিল ‘মস্তিষ্কে অত্যধিক রক্তক্ষরণ’। কিন্তু সেটা হল কীভাবে, তা কেউ জানে না। কেউ বলে, অত্যধিক মদ্যপানই নাকি এই অবস্থার কারণ। আবার কেউ বলে, না, পো গিয়ে পড়েছিলেন একদল নির্বাচনী গুণ্ডার খপ্পরে। বাল্টিমোরে তার আগের দিন নির্বাচন ছিল। অনেক সময় নির্বাচনের দিন একই মানুষকে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে একাধিকবার ভোট দিয়ে আসতে বাধ্য করত গুণ্ডারা। এবং মানুষটি তা করতে রাজি না হলে তাকে উত্তম-মধ্যম দিত, এমনকী, জোর করে মদও খাইয়ে দিত। শেষ অবস্থায় পো-র অপরিচ্ছন্ন পোশাকআশাক ও শারীরিক অবস্থা দেখে তিনিও যে এমনই কোনও গুণ্ডাদের শিকার হয়েছিলেন, এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক নয়। মৃত্যুর আগে প্রলাপের ঘোরে প্রবল আতঙ্কে নাকি বারকয়েক তিনি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন ‘রেনল্ডস! রেনল্ডস’ বলে। কে এই রেনল্ডস? গবেষকরা বহু আন্দাজ করেন, কিন্তু সঠিকভাবে কারও দিকেই আঙুল তুলতে পারেননি আজও। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর শেষ কথা না কি ছিল, ‘ঈশ্বর আমার আত্মাকে বাঁচান।’
পরের দিন, ৮ অক্টোবর হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে তাঁর শেষকৃত্য সেরে ফেলা হয় বাল্টিমোরেই। এতই কম লোকজন ছিল আর আবহাওয়া এত খারাপ ছিল যে, যাজক পুরো বক্তৃতা না দিয়েই মাত্র তিন মিনিটে পুরো অনুষ্ঠান শেষ করে দেন। তড়িঘড়ি করে বাল্টিমোরের ওয়েস্টমিনস্টার হলের পিছনে একফালি জায়গায় মাটির ভেতর নামিয়ে দেওয়া হয় তাঁর কফিনখানা। কালো, সস্তা কাঠের, হাতলবিহীন একটি কফিন। কফিনে কোনও ফুল নেই, কোনও নাম নেই, এমনকী, মৃতের মাথা রাখার কুশনও নেই। তাঁর সমাধিতে তাঁর নাম লেখা কোনও প্রস্তরফলকও ছিল না। শুধু লেখা ছিল তাঁর মৃত্যুকালীন চার্চ রেজিস্ট্রেশন নম্বর—‘৮০’।
মাটির নিচে নেমে যেতে-যেতে পো নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, তিনি যে এতটা অপাঙক্তেয়, তা তিনি বেঁচে থাকতে বোঝেননি। ঠিক ওই অবস্থায় তাঁর দেহাবশেষ রইল প্রায় পঁচিশ বছর। ১৮৭৫ সালে বাল্টিমোরের বিদ্বজ্জনদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে চাঁদা তুলে পো-র দেহাবশেষকে নতুন করে সাড়ম্বরে সমাধি দেওয়া হয় ওয়েস্টমিনস্টার চার্চেরই সামনের দিকে। সেই থেকে এখনও তাঁর জন্ম আর মৃত্যুদিনে তাঁর সমাধিতে ভিড় করেন হাজার-হাজার ভক্ত পাঠক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সেই রহস্যময় ‘পো-টোস্টার’, যিনি ১৯৪৯ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত প্রতি বছর নিয়ম করে পো-র জন্মদিন ১৯ জানুয়ারির গভীর রাতে এসে পো-র সমাধিতে রেখে যেতেন আধবোতল উৎকৃষ্ট ফরাসি সুরা। তিনি কে, কেউ জানে না। যারা তাঁকে দেখেছে, তারা বলে তিনি দীর্ঘদেহী, আপাদমস্তক কালো ওভারকোটে মোড়া, লম্বা টুপি আর মাফলারে ঢাকা তাঁর মুখ। তাঁর পরিচয় আজও কেউ জানে না। পো-র রহস্যমৃত্যু নিয়ে লেখা হয়েছে একাধিক গল্প-উপন্যাস। যেমন ফ্রিৎস লিবারের ‘পো মাস্ট ডাই’, ফ্র্যাঙ্ক লাভলকের ‘লেনোর: দ্য লাস্ট ন্যারেটিভ অফ এডগার অ্যালান পো’ কিংবাম্যাথিউ পার্লের ‘দ্য পো শ্যাডো’। তৈরি হয়েছে ‘দ্য র্যাভেন’-এর মতো থ্রিলার সিনেমা, যেখানে পো নিজের লেখা গল্পের সূত্র ধরেই ধীরে-ধীরে জড়িয়ে পড়েন ‘রেনল্ডস’ নামের এক সিরিয়াল কিলারের জালে।
মৃত্যুর পরেও রহস্যের আচ্ছাদনে নিজেকে মুড়ে রাখলেন পো। কিন্তু এখনও, তাঁর মৃত্যুর ১৭৬ বছর পরেও, তিনি আমাদের স্মৃতিকে ‘হন্ট’ করতে ছাড়েন না। বারবার যেন তাঁর নিজেরই কলমপ্রসূত দাঁড়কাকটির মতো পরপারের দূত হয়ে এসে তিনি আমাদের ভাবিয়ে যান, আতঙ্কিত করে যান, মুগ্ধ করে যান। এমনটিই তো তাঁকে মানায়। রহস্যের কুয়াশায় আবৃত থেকেও মৃত্যুর ওপার থেকে বারবার একুশ শতকের পৃথিবীর স্মৃতিতে ফিরে আসা কি যার-তার কাজ? এডগার অ্যালান পো যে মৃত্যুর সাধনায় সিদ্ধ হয়েছিলেন।



