মেঘে মেঘে বেলা: পর্ব ১৩

এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম

দুটো ছোট্ট-ছোট্ট লাল ঠোঁট অনেক কসরত করে একটা শব্দ উচ্চারণ করেছে আজ, ‘উইইইই…’। গোটা বাড়ি হইহই সাজো-সাজো রব। বাড়ির খুদে সদস্য আজ ‘উইইই…’ বলেছে। এ যেন উৎসব সমারোহের সমান। এ-উদযাপন তখন নিত্তিদিনের। খলখল, খিলখিল, ধরধর, দুম-পটাস, আয় আয় চাঁদমামা-র লম্বা সেলিব্রেশন। তার পর হাঁটি হাঁটি পা পা, ধরত রে! উৎসবের দিন। তারপর একদিন গলার ওয়াটার বটল ঝুলিয়ে ইশকুল যাবার দিন চলে আসে। তখন তাকে একটু-একটু করে জীবন শেখানোর দিন। স্কুলে কোনও দরকার হলে আন্টিকে বলবে, কেউ যদি তোমায় বুলি করে… ‘বুলি কী মা?’ কচি গলায় প্রশ্ন আসে মায়ের কাছে। মা জড়িয়ে ধরেন চাঁদের কণাকে আর কান্না পেয়ে যায়, ভাবেন একরত্তি এই মানুষটাকে কেউ বুলি করবে, কেউ বাজে কথা বলবে, কেউ ঠেলে দেবে। আর মায়ের বুকটা ফালা ফালা হয়ে যাবে।

দিন যাবে, ছেলেমেয়েরা বড় হবে। তাদের স্বাবলম্বী করার নিয়ত চেষ্টা চলবে। জুতোর ফিতে ঠিক করে বাঁধ, স্কুল ড্রেস ঠিক জায়গায় রাখ, এত ফোন দেখা কেন, কেমিস্ট্রি হোমওয়ার্ক হয়েছে কি না! গুড টাচ-ব্যাড টাচ জানো। আর বড় হওয়ার এই ওয়ান-ওয়ে ট্র্যাকের এক-একটা স্টেশনে বাচ্চাদের দিক থেকে প্রথমে তর্ক আসবে, রাগারাগি হবে, কান্নাকাটি তারপর মায়ের কাছে আদর দিয়ে পর্ব মিটবে। রাত্রিবেলায় মায়ের গা ঘেঁষে যখন অল্প-বড় ছেলে বা মেয়ে শুয়ে থাকবে নিশ্চিন্তে, তখন মায়ের গাল গড়িয়ে জল পড়বে আর বার বার নিজেকে দুষবে যে কেন ওভাবে বকতে গেলাম!

আরও পড়ুন: চশমা না পরলেই মাঝবয়স ঝাপসা? ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ১২…

এর পরের ধাপটা ভারি নিষ্ঠুর অথচ ভয়ংকর বাস্তব। আস্তে-আস্তে রাগ-তর্ক কমে আসা, এক কথায় উত্তর দেওয়া, প্রাইভেট স্পেস আগলানো আর মায়ের কাছ থেকে সরে যাওয়া। এরপর তো বড় পরীক্ষা, কেরিয়ার, চাকরিজীবনের প্রস্তুতি, পড়াশোনার বা চাকরির খাতিরে শহর ছাড়া আর মায়ের হাতে কেবল ফোন। এমনটা বলছি না যে, বাবারা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হন না, কিন্তু মায়েরা যেহেতু ছেলেমেয়ের সঙ্গে লেপটেজুপটে একটু বেশি থাকে, তাই তাদের বেদনা বড় বেশি বাজে বোধহয়। এই ফাঁকা মাঝবয়সটাকে যতই চেষ্টা করো, কিছুতেই ভরাট করা যায় না।

মায়েরা ভাবতে থাকে, ভাবতেই থাকে যে, একদিন যে-মানুষটা জুতোর ফিতে বাঁধতে পারত না, সে এখন নিজের জীবনটা এমনভাবে বেঁধে ফেলেছে যে সেখানে ফিতের কোণ ধরার প্রয়োজনেও মা নেই। কখন যেন সময়টা চলে গেল। এক সময়ে সকাল মানেই ছিল— ‘ওঠো’, ‘দাঁত মেজেছ?’, ‘টিফিনটা নিয়েছ?’, ‘ছাতাটা নাও’; তারপর স্কুল, কলেজ, পরীক্ষা, প্রজেক্ট, চাকরি, ইন্টারভিউ, প্রেম, মনখারাপ— সন্তানের জীবনটা ছিল একটা দীর্ঘ ধারাবাহিক, যার প্রতিটি এপিসোডে মায়ের অন্তত একটা সংলাপ থাকত। এখন? ‘খেয়েছিস?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘কী খেয়েছিস?’ ‘খেয়েছি তো।’ ব্যস।

কখনও-কখনও ফোনটা কেটে যাওয়ার পর মনে হয়, ফোনটা তো আর একটু লম্বা হতে পারত। কিন্তু কী নিয়ে? তার কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলবে, ‘সব ঠিক আছে।’ ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে, ‘মা, পরে বলছি।’ কোনও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে মতামত চাইলে— ‘আমি ভেবে নিয়েছি।’ এক সময়ে তার জীবনের প্রায় সব সিদ্ধান্তের আগে মা ছিল। এখন মা জানতে পারে সিদ্ধান্তটা হয়ে যাওয়ার পরে।

এই জায়গাটায় এসে মায়েদের একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়। ইংরেজিতে এর একটা গালভরা নামও আছে– এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম। বাচ্চা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে অভিভাবকের ছায়া থেকে চলে যায়, তখন যা পড়ে থাকে, তারই এই নাম। আর আমাদের এখানে যদি ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেও, তাহলেও একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। তারা মেতে যায় তাদের আনকোরা জীবনকে পাটে-পাটে খুলে উপভোগ করতে, তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ অনুভব করতে। আর মায়ের হাতে পড়ে থাকে এক অদ্ভুত শূন্যতা। এর নাম দুঃখ বললে পুরোটা বলা হয় না। কারণ সন্তান তো কোনও বিপদে নেই! সে ভাল আছে। তার নিজের বন্ধু আছে, নিজের পৃথিবী আছে, নিজের পছন্দ-অপছন্দ আছে। মায়ের শেখানো জিনিসগুলোই হয়তো এখন সে নিজের মতো করে ব্যবহার করছে। তাহলে কষ্টটা কোথায়? কষ্টটা হল— মায়ের আর প্রয়োজন নেই।

আর আশ্চর্যের ব্যাপার, এতদিন যে-স্বাধীনতার জন্য মা তাকে তৈরি করেছে, সেই স্বাধীনতাই একদিন মায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে নিঃশব্দ বিচ্ছেদ হয়ে দাঁড়ায়। সন্তান ছোট থাকতে আমরা চাই সে নিজের কাজ নিজে করুক। জামা নিজে পরুক। জুতো নিজে বাঁধুক। নিজের ব্যাগ নিজে গোছাক। বড় হয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিক। আমরা গর্ব করে বলি, ‘আমার ছেলে/মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে।’ কিন্তু সে সত্যিই যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যায়, তখন কোথাও যেন মায়ের নিজের দুটো হাত একটু ফাঁকা হয়ে যায়। সেই হাতদুটো কত বছর ধরে ব্যস্ত ছিল! কখনও ভাত মেখে দিতে, কখনও কপালে হাত রাখতে, কখনও পরীক্ষার আগের রাতে জল এগিয়ে দিতে। স্কুলে যাওয়ার আগে চুল আঁচড়ে দিতে, জামার বোতাম লাগিয়ে দিতে। পায়ে জুতো পরিয়ে দিতে। আর অসুখ হলে মা যে সারা রাত জেগে থাকবে, সে তো নতুন কিছু নয়।

তারপর সেই হাতই একদিন খালি থাকে। ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। সন্তান ফোন করে। কিন্তু আগের মতো নয়। আগে ফোনের ওপারে তার পৃথিবীর সমস্ত জরুরি খবর থাকত। এখন থাকে— ‘মা, আমি একটু ব্যস্ত, পরে কথা বলব।’ সেই ‘পরে’টা অনেক সময় আর আসে না।

এখানেই বোধহয় মায়ের সবচেয়ে বড় ভুল হয়। আমরা ভাবি সন্তান দূরে চলে গেছে। আসলে সে দূরে যায়নি। তার জীবনের কেন্দ্রটা বদলে গেছে। ছোটবেলায় তার পৃথিবীর কেন্দ্র ছিল মা-বাবা। তারপর ধীরে-ধীরে সেই কেন্দ্রের চারপাশে বন্ধু, প্রেম, কাজ, সংসার, নিজের স্বপ্ন— সব কিছু জমতে থাকে। সেটাই স্বাভাবিক। সেটাই তো আমরা চেয়েছিলাম। শুধু চাওয়ার সময়ে ভাবিনি, এর একটা দামও দিতে হবে।

সন্তানকে বড় করার মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রতারণা আছে। আপনি প্রতিদিন তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে যাওয়ার জন্য তৈরি করেন, অথচ মনে-মনে চান সে যেন কোনওদিন খুব বেশি দূরে না যায়। তাকে বলেন, ‘নিজের মতো করে বাঁচো।’ মনে-মনে বলেন, ‘তবে আমাকে ভুলে যেয়ো না।’ তাকে বলেন, ‘নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নাও।’ মনে-মনে বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমার কথাটাও শুনো।’ তাকে বলেন, ‘আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না।’ আর রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবেন— আজ ফোন করল না কেন? এসব প্রশ্নের সঙ্গে এঁটে উঠতে মাঝবয়সি মায়েরা নিজেদের নতুন করে খুঁজতে শুরু করে। কিশোরের পুরনো অ্যালবাম বার বার শোনে, বন্ধুকে ফোন করে। একা সিনেমা দেখতে যায়। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবে। পুরনো শখে ফেরে। কেউ লেখে, কেউ ছবি আঁকে, কেউ চাকরি বদলায়, কেউ প্রেমে পড়ে, কেউ শুধু বিকেলবেলা এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসে থাকে।

কিন্তু এতে কি ভবি ভোলে? এতে কি ফোনে কচিবেলার ছবি স্ক্রোল করা থামে? এতে কি হঠাৎ-খুঁজে-পাওয়া ক্লাস ওয়ানের ড্রইং থেকে উৎসারিত জলপ্রপাতের তোড় কমে? কিছুই বেঠিক নেই, অথচ কিছুই ঠিক নেই। যুক্তিতে, অভিভাবকত্বে, দায়িত্বে কোথাও ভুল নেই। ছেলেমেয়ে দিব্যি বড় হয়েছে, চারপাশের লোকজন প্রশংসাও করছে, কিন্তু আমি কেন ভেতর থেকে আনন্দে উথালপাতাল হতে পারছি না! কেন এখনও বার বার মনে হচ্ছে, একটা ঝাঁঝানো গলা শুনি, ‘তুমি জান না মা, আমি পটলের তারকারি খাই না?’