উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩৪

টুকরো কোলাজ

দাদুর পায়ে খড়ম থাকত। খড়ম এখন কোনও বাড়িতেই দেখতে পাওয়া যায় না। খড়ম হচ্ছে হাওয়াই চটির পূর্বপুরুষ। পায়ের পাতার মাপে বানানো একফালি কাঠ। আর সেই কাঠের ওপর বুড়ো আঙুল রাখার জায়গাটায় একটা উজিয়ে ওঠা গোল বল্টুর মতো। যাতে বুড়ো আঙুল এবং তার পাশের আঙুলটা ঢুকিয়ে রাখা যায়। এরকম কাঠের গুটিওয়ালা খড়ম আমার বাড়িতে ছিল। কোনও কোনও আত্মীয়স্বজন এলে ওই খড়ম ব্যবহার করার জন্য দেয়া হত। ওই খড়মের সঙ্গে ভদ্রতা, মান্যতা ইত্যাদি জড়িত ছিল। তবে দাদু কাঠের ওপর ওই উজিয়ে ওঠা গুটিওয়ালা খড়ম পরতেন না। কাঠের ওপর রবারখণ্ড বা রেক্সিন বা চামড়ার পাটি থাকত, যার ভেতরে আঙুলগুলো ঢুকিয়ে রাখা যায়। 

খড়ম পায়ে হাঁটলে খটখট শব্দ হত। আগেকার দিনের বড় পরিবারে খড়মের শব্দে অন্তঃপুরিকারা বুঝতে পারতেন, পুরুষমানুষ আসছেন। এক-একজনের খড়মের খটখট এক-একরকম।‌ ওরা বুঝতেন, বড়কর্তা আসছেন না কি মেজ, না কি ছোটকর্তা। বাবার পায়ে খড়ম দেখেছি, আবার ছোটকাকুকে কখনও খড়ম পরতে দেখিনি। মহিলারা খড়ম পরত না। শুনেছি, মহিলারা জুতোও পরত না। আমার ঠাকুমা পরত, তবে ঠাকুমার কাছে শুনেছি তাঁর শাশুড়ি বা মা পরতেন না। খুব ধনী ও সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা কেউ-কেউ হয়তো খড়ম পরতেন।

রবিবাবুর গানে নাকি অশ্লীলতা দোষ আছে! স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কলমে পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৩৩…

আমার দাদুর এক বোন ছিল, পাটনায় বিয়ে হয়। পরে কলকাতায় থিতু। ভাইফোঁটার সময়ে আসতেন, কিছুদিন থেকেও যেতেন। ব্যাগে করে এক জোড়া খড়মও নিয়ে আসতেন। চামড়ার পট্টি দেওয়া খড়ম। উনি চলে গেলে, ঠাকুমা এবং ঠাকুমার কাছে আসা ‘ভইনডি’-রা দাদুর বোনের খড়ম প্রসঙ্গে হাস্য-পরিহাস করতেন। একটা ছড়া ঠাকুমার মুখে শুনেছিলাম, যেটা কোনও নারীর সাজগোজ বা লোক-দেখানো চালচলন প্রসঙ্গে বলতেন—

‘হরম বিবি খড়ম পায়ে
খটখটাইয়া হাঁইটা যায়
হাঁটতে গিয়া হরম বিবি
থাপড় কইরা আছাড় খায়।’

সম্ভবত, ১৯৬৪-’৬৫-র পর থেকে বাজারে হাওয়াই চটি আসতে শুরু করে। প্রথমে হাওয়াই চটি দেখে খুব অবাক লেগেছিল। কী নরম! আহা! পরেও খুব আরাম। প্রথমদিকে খুব কম দাম ছিল না, পরে সস্তা হতে থাকে। তবে দাদুকে হাওয়াই চটি পরতে দেখিনি কখনও। আমৃত্যু খড়ম-ই পরেছেন। বাইরে গেলে পাম্প শু। এক জোড়া রবারের, আরেক জোড়া চামড়ার।

আমরা তো চামড়ার চটিই পরতাম। তবে হাওয়াই চটি সস্তা হয়ে যাওয়ার পর, হাওয়াই চটি-ই অবলম্বন হয়ে দাঁড়াল। হাওয়াই চটির স্ট্র্যাপের দাম ছিল পঞ্চাশ পয়সার মতো, মানে আট আনা। তলার বল্টুটা ছিঁড়ে যেত অনেক সময়ে। তখন একটা ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা আমাদের মধ্যে চালু ছিল। বল্টু ছিঁড়ে যাওয়া রবারে একটা সেফটিপিন বিঁধিয়ে দিয়ে তা আটকে দেওয়া হত। সেফটিপিন-বেঁধানো অবস্থায় আরও কিছুদিন চলত।

দাদুর নস্যি নেওয়ার শৌখিনতা ছিল। কিন্তু কোনও রূপোর ডিবে কখনও দেখিনি। পেতলের নস্যির কৌটো পাওয়া যেত বাজারে। ওরকম কৌটোই দেখেছি। দাদুর আবার শখ ছিল সুগন্ধি নস্যির। শ্যামবাজারের শ্যাম পার্কের কাছে একটা এলাকা ছিল, হেঁটে যাওয়ার সময়ে মিষ্টি-মিষ্টি একটা গন্ধ পাওয়া যেত। ওখানে সুগন্ধি নস্যি, জর্দা ইত্যাদি তৈরি হত। এগুলো সবই কিন্তু ছিল বাঙালির ব্যবসা, সব শেষ হয়ে গেছে। দাদু নিতেন পরিমল নস্যি, তবে সুগন্ধি নস্যির দাম বেশি ছিল বলে দাদু অন্য একটা কায়দা করতেন। গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ির কালির কারখানা প্রসঙ্গে সুগন্ধি লাল কালির ট্যাবলেটের কথা বলেছি। সে-সময়ের বর্মা এবং বিহার অঞ্চলের দরিদ্র মেয়েরা ঠোঁট বা পা রাঙাতে ওই বড়ি ব্যবহার করত। সেই সেন্ট দু’চার ফোঁটা নস্যির মধ্যে ফেলে একটা চ্যাপটা কিছু দিয়ে ঘষে-ঘষে সেন্টের সুবাস নস্যিগুঁড়োর মধ্যে সঞ্চারিত করতেন।

আত্মীয়স্বজন যাঁরা আসতেন, দাদুর সঙ্গে কথা বলতেন, আমি শুনতাম। তখন অনেক কথাই বুঝিনি, কিন্তু পরে মনে পড়েছে, দাদুর কাছে আসত সরোয়ার, কুদুমিঁঞারা। এরা সবাই ছিল গোলাম সরোয়ারের লোকজন, নোয়াখালির হত্যালীলার মাথারা। নোয়াখালিতে দাঙ্গা হয়নি, এক তরফা নিধন হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে, লক্ষ্মীপুজোর দিন থেকে শুরু। তিন সপ্তাহব্যাপী এই নিধনপর্ব চলেছিল। গান্ধীজি চলে গিয়েছিলেন, শুনতে পেতাম। আমাদের কোনও এক আত্মীয়, গিরিজা চক্রবর্তী, গান্ধীজির সঙ্গে-সঙ্গে ছিলেন। শুনতাম, গান্ধীজি ছাগলের দুধ খেতেন, তার ছাগলটা চুরি হয়ে যায়। তারপর সেই ছাগলের মাংস নিয়ে নাকি ফিস্ট হয়, সবই শোনা কথা। কিন্তু দাদুর একটা ব্যাপার ছিল, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ওঁর কোনও বিরূপ মনোভাব ছিল না, কখনও খারাপ বাক্য ব্যবহারও করতেন না। দাদুকে বলতে শুনেছি, দেশ ত্যাগ নানা কারণে হয়। আমাদের পূর্বপুরুষ মিথিলা বা কান্যকুব্জ থেকে এইদিকে এসেছিল দেশ ত্যাগ করেই তো। তবে ওদের কেউ তাড়ায়নি, আমাদের তাড়িয়েছে— এটাকে নিয়তি বলেই মেনে নিতে হবে। দেশভাগ ঠেকানো যেত না। সাময়িকভাবে পিছোনো যেত হয়তো। তবে দাদুর কথাবার্তায় মনে হত, নেহরুকে একদমই পছন্দ করতেন না। পাঞ্জাবও ভাগ হয়েছিল। সেখানে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। পশ্চিম পাঞ্জাব এবং পূর্ব পাঞ্জাবের মধ্যে জল-বিনিময় হয়েছিল। সেটা এধারে হল না। এধারে পুনর্বাসন দপ্তর খুলতে দেরি হলেও উদ্‌বাস্তু ত্রাণ দপ্তর ছিল। অনেক পরে ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি আসে। নেহরু-লিয়াকত চুক্তিটাই সর্বনাশ করে দিল। এসব অনেক পরে ‘জলের উপর পানি’-তে লিখেছি।

নোয়াখালিতে মহাত্মা গান্ধী

আমাদের দাদুদের কতগুলি গালাগালি প্রয়োগ করতে দেখেছি। যেমন, ‘কুষ্মাণ্ড’, ‘কদলী’, ‘গর্দভ’, ‘বরাহ’ ইত্যাদি। খুব রেগে গেলে ‘গর্ভস্রাব’ শব্দটা বলা হত। তবে দাদুর কতগুলি প্রিয় বকুনি ছিল, যেমন, ‘র, র, আইতাসি, ধান দিয়া কান মইল্যা দিমু’। ধান-সহযোগে কানমলাটা কেমন হতে পারে, আমার ধারণা ছিল না। কারণ, সেই আস্বাদই আমি পাইনি কখনও। একটা আশ্চর্য বকুনির কথা বলি। ‘চিকন ছিপা দিয়া আপাদমস্তক পিটামু’। এটারই আরেকটু উগ্র রূপ ছিল, ‘কড়িকাঠের লগে উলটা কইরা ঝুলাইয়া চিকন ছিপা দিয়া আপাদমস্তক পিটামু’। আরও উগ্রতর রাগে, এর সঙ্গে যোগ হত, ‘তারপর নামাইয়া প্যাটের উপর দাঁড়াইয়া চোখ দিয়া নাড়িভুড়ি বাইর কইরা দেওয়া লাগে’। বলে একটু মৃদু হাসতেন, চোখ দিয়ে নাড়িভুড়ি বের হওয়ার নৃশংস ছবিটা ওই মৃদু হাসিতেই কোমল হয়ে যেত।

দাদু দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন। আমার জীবনের প্রথম চাকরি উইমকো কোম্পানিতে। যেদিন জয়েন করি, সেইদিনই দাদু দেহত্যাগ করেন শেষরাত্রে। ১৯৭৩ সাল, ফেব্রুয়ারি মাস। শ্মশান থেকে সোজা চলে যাই অফিসে। একটা ব্যাগে করে জামা-প্যান্ট-জুতো নিয়ে গেছিলাম, সঙ্গে ছিল আমার বন্ধু শিবব্রত। কার্জন পার্কে জামা-প্যান্ট পালটাই। হাওয়াই চটি ছেড়ে জুতো পরি। তারপর রাজভবনের কাছাকাছি একটা বাড়িতে জয়েনিং লেটার নিয়ে যাই। চাকরি পেয়ে জয়েন করতে যাওয়ার আগে গুরুজনদের প্রণাম করে যাওয়ার নিয়ম ছিল। এখনও হয়তো নিয়মটা কোথাও কিছুটা টিকে আছে। আমি দাদুর মৃত শরীরে প্রণাম করেছিলাম।