কামনার আমিষ গন্ধ: পর্ব ২

মেনুতে যখন মানুষ

‘Then Jesus said unto them, Verily, verily, I say unto you, Except ye eat the flesh of the Son of man, and drink his blood, ye have no life in you.’

John 6:53 (The Bible, King James Version)

‘For my flesh is meat indeed, and my blood is drink indeed.’

—John 6:55 (The Bible, King James Version)

ঈশ্বরপুত্র যিশু তার অনুগামীদের অনুরোধ করেছিলেন তাঁর শরীরকে খাদ্য হিসেবে ভক্ষণ করতে এবং তাঁর রক্তকে সুরাজ্ঞানে পান করতে। তিনি বলেছিলেন, তাঁর শরীরকে আত্মীকরণ না করা হলে, তাঁর অনুগামীদের মধ্যে জীবনীশক্তির সঞ্চার ঘটবে না। আমরা জানি, যিশু মানবদেহ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছিলেন! তাহলে প্রশ্ন উঠছে মানবদেহ কি ভক্ষণযোগ্য? এর আগে প্রকাশিত যৌন নরখাদকতা বিষয়ক প্রবন্ধেই পাঠক দেখলেন যে মানবদেহ অন্য মানুষের খাদ্য হয়ে উঠতে পারে বিভিন্ন মানসিক চাহিদা ও পরিস্থিতির নিরিখে। কিন্তু যে যিশুর দিকে তাকিয়ে মানুষ অন্ধকার থেকে আলোর পথ হাঁটতে চেয়েছিল, সেই যিশুই যখন নিজের শরীরকে খাদ্য হিসেবে পরিবেশন করছেন তখন মনুষ্যজাতির নীতিবোধে আঘাত লাগছে না কি? একজন মানুষ কি হতে পারে অন্য একজন মানুষের খাবার?

এই প্রশ্নের সামনে যিশুর অনুগামীরা কি অসহায় দাঁড়িয়েছিলেন? অবশ্যই তাঁরা যিশুর শরীরকে খাবার হিসেবে ভক্ষণ করেননি, কিন্তু প্রায় সব খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মানুষই ‘ট্রান্সসাবস্টান্সিয়েশন’-এ বিশ্বাস করেন। অর্থাৎ, তাঁরা বিশ্বাস করেন, রুটি এবং সুরা গ্রহণ করার মাধ্যমে যিশুর শরীরের মাংস এবং রক্ত তাঁর অনুগামীদের শরীরে প্রবেশ করেছিল, যা নিঃসন্দেহে এক দৈব শক্তির সঞ্চার ঘটিয়েছে তাদের অস্তিত্বে।

দ্য লাস্ট সাপার। শিল্পী: লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি

যৌন কামনার সঙ্গে কীভাবে মিশে যায় নরখাদকতা? পড়ুন আগের পর্ব…

খাবার কী? যে-কোনও জীবেরই প্রাণধারণের জন্য প্রয়োজন হয় কিছু প্রাকৃতিক রসদ। সেই রসদের অন্যতম হল খাদ্য। যে-কোনও জীব— সে প্রাণী হোক বা উদ্ভিদ, তার জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন হয় খাদ্যের, যা থেকে জীবদেহে আত্মীকৃত হয় পুষ্টি, যা সেই জীবদেহকে দেয় বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি। কিন্তু খাবার হিসেবে কী গ্রহণ করা যায়? কোনটা খাবার এবং কোনটা নয়? বিভিন্ন জীব বিভিন্ন রকমের খাদ্যগ্রহণ করে। খাদ্যগ্রহণের এই বৈচিত্রের কারণেই কোনও জীব তৃণভোজী, কেউ মাংসাশী, আবার কোনও কোনও জীব সর্বভুক— যেমন মানুষ৷ কিন্তু মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য জীবের খাদ্যাভাসের একটি বিরাট পার্থক্য রয়েছে। অন্যান্য জীবের ক্ষেত্রে খাদ্যগ্রহণ টিকে থাকার একটি নির্বিকল্প উপায়। খাদ্য নিয়ে বাছবিচার তারা করে না৷ তারা প্রয়োজনে খায়। তাই কোনও মাংসাশী প্রাণী যখন অন্য প্রাণী শিকার করে খায়, তখন সেই খাদ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া একটি বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখার উপায় হিসেবেই গৃহীত হয়। কিন্তু মানুষের সামনে পরিবেশিত হয় নানা ধরনের খাবার। নিরামিষ-আমিষের মিশ্র খাদ্যতালিকায় মানুষের জন্য থাকে একটির বদলে অন্য খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ। তাই মানুষের খাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু শুধুমাত্র জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য একটি প্রক্রিয়া নয়। হ্যাঁ, খাদ্য ছাড়া মানুষ টিকে থাকবে না ঠিকই, কিন্তু মাংস ছাড়া মানুষ বাঁচবে না, এমনটা নয়। আবার শাকসবজি ছাড়া বাঁচবে না, তা-ও নয়। অর্থাৎ, খাদ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানুষের কাছে অনেক বেশিমাত্রায় স্বাধীনতা রয়েছে।

এইখানে এসে যাচ্ছে খাদ্য হিসেবে কী গ্রহণ করা যায়, সেই সংক্রান্ত কিছু নীতিগত প্রশ্ন। একটি বাঘ অথবা সিংহ যখন কোনও প্রাণী শিকার করে তার মাংস ভক্ষণ করে, তখন সেটা শিকারি প্রাণীটির প্রাণ টিকিয়ে রাখার উপায়, কারণ জন্মসূত্রে এরা মাংসাশী প্রাণী। ঘাস-পাতা খেয়ে এরা প্রাণধারণ করতে পারবে না। কিন্তু প্রয়োজন নেই অথচ একজন মানুষ যখন অন্য প্রাণীর দেহকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেখানে উঁকি দেয় নীতিবোধ, উচিত-অনুচিত, ঠিক-বেঠিকের জটিল সমীকরণ। বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদে প্রাণীহত্যাকে চূড়ান্ত অমানবিক এবং নীতিবিরোধী কাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিজের জীবন রক্ষা করার জন্য অন্য প্রাণীর জীবনাবসানের কারণ হওয়া— বিভিন্ন ধর্মমতে আসলে আধ্যাত্মিকতার বিপ্রতীপে অবস্থান করা৷ সাধারণত আমরা কোনও মাংসাশী প্রাণীকেও দেখি না নিজেদের দলের সদস্যদের ভক্ষণ করতে। একটি বাঘ অন্য একটি বাঘের মাংস ভক্ষণ করে না। সেখানে যখন প্রশ্ন ওঠে মানুষ, অন্য মানুষের দেহাংশ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে কি না, সেখানে শুধুমাত্র নীতিগত নয়, তৈরি হয় এক গভীরতর দার্শনিক সংকটও! এই সংকট আরও গুরুতর রূপ নেয় যখন আমরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি মেলে ধরি।

আজ থেকে আট লক্ষ বছর পূর্বে প্যালিওলিথিক মানুষদের প্রস্তরীভূত দেহাবশেষ থেকে নরখাদকদের অস্তিত্বের নিদর্শন পাওয়া যায়। বর্তমান স্পেনের আতাপুয়ের্কার গ্রান দোলিনা এমন একটি প্রত্নস্থল, যেখানে হোমো অ্যান্টেসেজারদের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছে। ওই দেহগুলিকে নরমাংস ভক্ষণের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেহগুলি থেকে মাংস অপসারণের, ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেহাংশ বিচ্ছিন্ন করার, দেহ থেকে হাড় বের করে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেড় লক্ষ বছর আগে ইংল্যান্ডের গফস কেভেও মানুষের দেহাবশেষ থেকে নরমাংস ভক্ষণের চিহ্ন পাওয়া যায়। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কিছু নৃতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে জানা যায় ‘এন্ডোক্যানিবালিজম’-এর কথা অর্থাৎ অ্যামাজন অঞ্চলের ইয়ানোমামি, পাপুয়া নিউগিনির ফোর, ব্রাজিলের ওয়ারি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একরকম রীতি প্রচলিত ছিল যে, তাদের সম্প্রদায়ের কোনও মানুষের জীবনাবসান হলে গোষ্ঠীর অন্য সদস্যরা মৃত ব্যক্তিকে নিজেদের মধ্যে অনন্তকাল ধারণ করার উদ্দেশে সেই ব্যক্তির দেহাংশ ভক্ষণ করবে। এই আচারের লক্ষ্য ছিল, প্রয়াত ব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন, শোক প্রকাশ এবং তার সঙ্গে একটি নিবিড় আত্মিক বন্ধন তৈরি করা। আবার পূর্ববিবৃত এই রীতির একেবারে বিপরীতে অবস্থান করে ‘এক্সোক্যানিবালিজম’। এক্ষেত্রে মানুষ নিজের সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষকে শত্রুজ্ঞানে হত্যা করত এবং তাদের দেহ ভক্ষণ করত। ব্রাজিলের টুপিনাম্বা, নিউজিল্যান্ডের মাওরি, আমাজন অঞ্চলের কিছু আদিবাসী জনজাতি তাদের যুদ্ধবন্দিদের হত্যা করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত বলে জানা যায় বিভিন্ন ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণ এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষণাপত্র থেকে। এইসব জনগোষ্ঠীর মানুষরা বিশ্বাস করত যে, শত্রুদের দেহাংশ ভক্ষণ করলে তাদের সাহসিকতা এবং ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করা এবং শত্রুপক্ষকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করা সম্ভব।

এই নরমাংস ভক্ষণ বা ক্যানিবালিজম অত্যন্ত শক্তিশালী মোটিফ হিসেবে বারবার আদি থেকে আধুনিক সাহিত্যে ঘুরেফিরে এসেছে। সপ্তম থেকে অষ্টম খ্রিস্টপূর্বাব্দে হেসিওড রচিত ‘থিওগনি’-তে দেখা যায় দেবতা ইউরেনাস এবং দেবী গিয়ার সন্তান ক্রোনাস, তাঁর নিজের পুত্রদের ভক্ষণ করেন, যাতে ভবিষ্যতে সন্তানরা তাঁর হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে না পারে। অর্থাৎ, এটি একটি এমন এন্ডোক্যানিবালিজমের দৃষ্টান্ত, যেখানে পিতা তাঁর নিজেরই সন্তানদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছেন— তাদের সঙ্গে কোনও নিবিড় আত্মিক যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য নয়, বরং আগামী দিনে নিজের সন্তানদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয় থেকে।

দ্য ইনফার্নো, দান্তে অ্যালিঘেরি

‘Great Cronos swallowed them all, as each one emerged from their mother’s womb…’

—Hesiod, Theogony, lines 459–460

(Myths of the Greek and Roman Gods, TMU Pressbooks)

হেসিওডের রচনায় পাওয়া যায়, স্ত্রী রিয়ার গর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রোনাস তাদের ভক্ষণ করতে থাকেন। যেহেতু এই সন্তানরা ক্রোনাসেরই দেহজাত, সেই মর্মে ক্রোনাস প্রকৃতপক্ষে আত্মভুক। তিনি আসলে নিজেই নিজেকে ভক্ষণ করছেন, যেভাবে কারও হৃদয়সঞ্জাত ঈর্ষা, ক্ষমতার লোভ, স্বার্থপরতা সেই ব্যক্তিকেই ভক্ষণ করতে থাকে, ধ্বংস করতে থাকে।

শেক্সপিয়ারের ‘টাইটাস এন্ড্রোনিকাস’-এ নরমাংসকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত আসে প্রতারণা এবং প্রতিশোধের রূপ নিয়ে। এই নাটকে টাইটাস যখন জানতে পারেন যে, টামোরার দুই পুত্র তাঁর কন্যাকে ধর্ষণ করেছে তখন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিনি টামোরার পুত্রদের হত্যা করেন। এরপর তাদের মাংস দিয়ে একটি মিট-পাই প্রস্তুত করে টাইটাস, টামোরাকে সেই খাবার পরিবেশন করেন। অজান্তেই মা হয়ে তিনি নিজের সন্তানদের দেহাংশ ভক্ষণ করেন। সন্তানরা গর্ভে থাকাকালীন মায়ের শরীর থেকেই পুষ্টি সংগ্রহ করে বেড়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ঠিক উল্টো ঘটনাটি ঘটে— মা সন্তানদের শরীর ভক্ষণ করে পুষ্টি আহরণ করেন, যতই তা হোক অজান্তে এবং অনভিপ্রেত উপায়ে। টাইটাস তার মেয়ের অপমানের প্রতিশোধ নেন এমন এক গূঢ় প্রতারণার মধ্য দিয়ে, যা টামোরার কাছে হয়ে ওঠে মৃত্যুর চেয়েও নারকীয় শাস্তি। টামোরার দুই পুত্রের প্রসঙ্গে টাইটাস বলেন— ‘Why, I have made them meat….And these two were the two sons of Tamora.’

অর্থাৎ, একজন মায়ের সন্তানদের খাদ্যোপযোগী মাংসে পরিণত করবার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি অন্যায়ের ন্যায়বিচার করতে গিয়ে টাইটাস যে হিংস্রতার আশ্রয় নেন, তাকে কতটা ন্যায়পরায়ণতা বলা যেতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। একটি অবিচারের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এক্ষেত্রে কী উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি আরও ঘৃণ্য এবং অমানবিক অবিচারের পথ?

দান্তের ‘ইনফার্নো’-তে আর্চবিশপ রুজ্জেরি কাউন্ট উগোলিনো এবং তাঁর সন্তানদের একটি মিনারে বন্দি করে রেখেছিলেন। তাদের দিনের পর দিন অভুক্ত রাখা হয়। যখন কাউন্টের সন্তানরা বুঝতে পারে যে, তাদের মৃত্যু আসন্ন তখন তারা পিতার প্রতি এক অভাবনীয় আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত তৈরি করে। তারা বলে—

‘Father, we would suffer less/ if you would feed on us: you clothed us/ in this wretched flesh— now strip it off.’

—(Dante, Inferno, Canto XXXIII, 61-63, Princeton Dante Project)

উগোলিনো শেষ পর্যন্ত তাঁর সন্তানদের ভক্ষণ করেছিলেন কি না, সে-ব্যাপারে দান্তে পাঠকদের স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত দেননি। এই অংশ শেষ হয় উগোলিনোর কাতর উক্তি দিয়ে—

‘Then hunger had more power than grief.’

—(Dante, Inferno, Canto XXXIII)

এখানে নরখাদকতা বিষয়ে একেবারে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করা যায়। দান্তে দেখিয়েছেন, ক্ষুধার তীব্রতা কোনও কোনও সময় এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়, যখন মানুষ তার সন্তানকেও ভক্ষণ করতে বাধ্য হয়। এই সূত্র ধরে মনে পড়তে পারে, একেবারে আধুনিক সাহিত্যের একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘দ্য রোড’-এর কথা। লেখক করম্যাক ম্যাকার্থি এই উপন্যাসে তৈরি করেছেন মহাপ্রলয়-পরবর্তী মানুষের বসবাস-অযোগ্য এমন এক আবহ, যেখানে জীবনরক্ষার্থে মানুষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে এবং সেই মৃতদেহগুলিকে তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে। খাবারের অভাবজনিত কারণে এবং পৃথিবীতে প্রাণ টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে মানুষের নৈতিকতা পরাজিত হচ্ছে ক্ষুধার কাছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পিতার সঙ্গে সফররত এক বালক বারবারই হয়ে উঠেছে মনুষ্য-বিবেকের উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা। সে বারবারই এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইছে যে, পরিস্থিতি যত শোচনীয়ই হোক না কেন, খিদে যত অসহ্যই হোক না কেন, তারা কখনও অন্য কোনও মানুষকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করবে না। বাচ্চা ছেলেটি তার বাবাকে প্রশ্ন করছে— ‘We wouldn’t ever eat anybody, would we?’

পিতা উত্তর দেয়, ‘No. Of course not.’

এই উত্তর পুত্রের কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় না। সে আবার প্রশ্ন করে— Even if we were starving?

অর্থাৎ, কোনও অবস্থাতেই অন্য কোনও মানুষকে ভক্ষণ করা যে অনৈতিক, তা এই শিশু যেন বারবার মনে করিয়ে দিতে চাইছে তার পিতাকে, পাঠককে। শিশুটি বারবারই বলছে যে তারা কিছুতেই কোনও মানুষকে হত্যা বা ভক্ষণ করবে না তার কারণ,

“We’re the good guys…And we are carrying the fire.”

আলমা কাটসু তাঁর উপন্যাস ‘দ্য হাংগার’-এ ১৮৪৬-’৪৭ সালে Donner Party Expedition-এর দলটির সিয়েরা নেভাডার তুষারাবৃত অঞ্চলে আটকে পড়ার কাহিনীকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। খাবার ক্রমশ শেষ হয়ে আসায় ওই দলের সদস্যরা তীব্র খিদের জ্বালায় হিংস্র হয়ে উঠতে থাকেন এবং মানব-মাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য হন। ওই বিশেষ অভিযান থেকে যে ক’জন বেঁচে ফিরেছিলেন তাঁরা মৃতদের দেহাংশ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

পিয়ার্স পল রিড লিখিত ‘অ্যালাইভ’ বইতে ১৯৭২ সালে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আন্দেজ পর্বতমালার অসহনীয় শীত এবং তুষারপাতের মধ্যে আটকে পড়া বিমানযাত্রীদের বেঁচে থাকার লড়াইকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রবল খাদ্যসংকটের মধ্যে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন মৃত যাত্রীদের দেহাংশ ভক্ষণ করতে। এই দুর্ঘটনা থেকে যাঁরা শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। মৃত সহযাত্রীদের দেহ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল তীব্র নৈতিক দ্বন্দ্ব। শুধুমাত্র জীবন বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে তাঁরা সেই নৈতিক সংকট পার করে নরমাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য হন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ উপন্যাসটির কথা, যেখানে একটি রেস্তোরাঁ এবং সেখানে পরিবেশিত খাবার ঘিরে তৈরি হয় নরখাদকতা-সংক্রান্ত জটিল রহস্য ও ধোঁয়াশা।

নরখাদকতা বিষয়ে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায় ড্যানিয়েল ডেফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’, হার্মান মেলভিল রচিত ‘টাইপি’, ‘ওমু’, এইচ জি ওয়েলসের ‘দ্য আইল্যান্ড অফ ডক্টর মোরোহ’ উপন্যাসগুলিতে। এই সমস্ত উপন্যাসেই পশ্চিমী বা ইউরোপীয় সভ্য সমাজের বাইরে থাকা আদিবাসী জনজাতির মানুষদের হিংস্র, বর্বর, নরমাংসভোজী পিশাচ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইউরোপীয় সভ্য মানুষরা যেহেতু অধিকাংশই ছিলেন খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত, তাই সভ্যতার ছত্রছায়ার বাইরে থাকা মানুষদের নরখাদকতা তাদের কাছে ছিল পাশবিক এবং পৈশাচিক। অন্যদিকে ফরাসি দার্শনিক মোঁতেন ১৫৮০ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘অফ ক্যানিবালস’-এ ইউরোপীয় সভ্য মানুষের ‘কলোনিয়াল গেজ’-কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে বলেছেন, ইউরোপের দেশগুলির ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের যেভাবে অবিরাম শোষণ এবং অত্যাচার করে থাকে, তা নরখাদকতার তুলনায় কিছু কম বর্বরতা প্রদর্শন নয়। তিনি তাঁর এই প্রবন্ধে আদিবাসী মানুষ অর্থেই নরখাদক, এই পশ্চিমী ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছিলেন। মোঁতেন তাঁর প্রবন্ধে লিখছেন— I think there is more barbarity in eating a man alive than in eating him dead.

সুতরাং, প্রশ্ন উঠছে নরখাদকদের বর্বর বলব, না কি সভ্যতার বলয়ের বাইরে অবস্থান করা আদিবাসী মানুষদের ওপর অকথ্য অত্যাচার করা সুশিক্ষিত, সভ্য মানুষদের বেশি বর্বর বলব? কোনটা আসলে নরখাদকতা? মানুষের দেহাংশ ভক্ষণ নাকি জীবিতাবস্থায় মানুষের অন্তঃসার সম্পূর্ণ শুষে নেওয়া? ক্লদ লেভি স্ট্রস তাঁর ‘ত্রিস্তেস ট্রপিকস’-এ লিখছেন, “There are no savage people, but only savage people.”

অর্থাৎ, তিনি বলতে চাইছেন, ক্যানিবালিজম বা নরখাদকতা শুধুমাত্র একটি খাদ্যাভ্যাস নয়। ক্যানিবালিজম বহুলাংশে প্রতীকীও বটে।

অন্যদিকে জনপ্রিয় সাহিত্যিক থমাস হ্যারিসের ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসগুলির কেন্দ্রীয় চরিত্র হ্যানিবাল লেকটার মানুষের দেহাংশ ভক্ষণ করেন ক্ষুধার কারণে নয়, বরং মানব-মাংস ভক্ষণের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ এবং আগ্রহের কারণে। হ্যানিবাল লেকটার একজন শিক্ষিত, সভ্য, রুচিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি। তিনি বর্বর নন বা আদিবাসী জনজাতির সদস্য নন। সুতরাং, এক্ষেত্রে নরমাংস খাওয়ার ব্যাপারটি হয়ে উঠছে এক শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সজ্ঞান নির্বাচন। হ্যানিবালের মুখে পাঠক শুনতে পান, ‘I ate his liver with some fava beans and a nice Chianti.’ অর্থাৎ, এখানে নরমাংসের স্বাদকে এবং তার মুখরোচকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে সমস্ত নৈতিকতার কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে।

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক নরখাদকতা-সংক্রান্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথের দিকে— যেখানে মানবমাংস ভক্ষণকে দেখানো হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ বৈধ রেওয়াজ হিসেবে। স্পেনীয় সাহিত্যিক অগাস্তিনা বাজতেরিকা রচিত ডিসটোপিয়ান উপন্যাস ‘টেন্ডার ইজ দ্য ফ্লেশ’-এ নরমাংস ভক্ষণের রীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছে, কারণ গল্পের প্রেক্ষাপটে দেখানো হচ্ছে যে, একটি ভাইরাসের আক্রমণের ফলে পশুমাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। এই উপন্যাসে অদ্ভুতভাবে মানুষকে খাদ্য হিসেবে উৎপাদন করা এবং খাদ্যপণ্য হিসেবে বাজারে উপস্থিত করা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে মানবিক সত্তার এক চরম অবমূল্যায়নের সাক্ষী থাকছে পাঠক। এই উপন্যাসে নরখাদকতা পুঁজিবাদের রূপ নেয়। জোনাথন সুইফট তাঁর ‘আ মোডেস্ট প্রোপোজাল’-এ আয়ারল্যান্ডের সাধারণ মানুষের ওপর ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের ধারাবাহিকতাকে ব্যঙ্গ করতে নরখাদকতাকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি লিখছেন, আয়ারল্যান্ডের মানুষের খাদ্যসংকট দূর করতে দরিদ্র পরিবারের আইরিশ শিশুদের খাদ্যপণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি করা যেতে পারে, তাতে সমস্যার খানিকটা সুরাহা হতে পারে। একেই বলে প্রকৃত অর্থে ডার্ক স্যাটায়ার!

ভারতে, ওড়িয়া ভাষার সাহিত্যিক মনোজ দাস তাঁর ‘আ ট্রিপ ইনটু দ্য জঙ্গল’ ছোটগল্পে দেখিয়েছেন, কীভাবে একদল সভ্য মানুষ জঙ্গলে বেড়াতে যাওয়ার পর বন্য প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে এবং সবরকম সামাজিক বাধানিষেধের বাইরে এক স্বাধীন পরিবেশ পেয়ে নিজেদের আদিম, বর্বর, পৈশাচিক রূপের সম্মুখীন হয়।

তাদের মধ্যে জেগে ওঠে সমস্তরকম আদিম প্রবৃত্তি এবং চূড়ান্ত নেশার ঘোরে ওই সুরাসেবনরত পুরুষ-মহিলারা বুঝতেই পারেন না, আগের দিন রাত্রে সবাই মিলে যে মাংস তারা পুড়িয়ে খেয়েছেন, তা শিকার করে আনা শুকরের মাংস না কি পাশের ঘরে আটকে রাখা নেশায় হুঁশ-হারানো ওদের গাড়িচালক শ্যামলের আধপোড়া দেহাংশ!

সুতরাং, একথা বলাই বাহুল্য যে নরখাদকতা আসলে শুধুমাত্র নরমাংস ভক্ষণের ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই সীমিত নয়। কখনও এই পৈশাচিক কাজই হয়ে ওঠে এক অভাবনীয় মানবিক ক্রিয়া, কখনও তা হয়ে ওঠে জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পথ, আবার কোনও কোনও সময় নরখাদকতা প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের অদ্ভুত বিকৃত এক রূপ নেয়। ক্যানিবালিজম বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে গেলে বারবারই প্রশ্ন উঠে আসে, যে সমাজ মানুষকে পণ্য হিসেবে বাজারে পেশ করে, সেই সমাজে কে খাদ্য এবং কেই বা খাদক? এই সূত্রে মনে পড়ে যাওয়া আশ্চর্য নয়, মেরি শেলির একটি অতি-প্রাসঙ্গিক উক্তি— ‘Men become cannibals of their own hearts; remorse, regret, and restless impatience usurp the place of more wholesome feeling: everything seems better than that which is.’