ঘরোয়া হৃষীকেশ

Hrishikesh Mukherjee

আজ, ২৭ অগাস্ট, হৃষীকেশ মুখার্জির ২১তম মৃত্যুদিনে তাঁর বড় ছেলে প্রতীপ মুখার্জি, বড় বউমা স্বাতী মুখার্জি, নাতনি প্রিয়াঙ্কা মুখার্জি, এবং নাতজামাই নিখিল রাজপালের সঙ্গে ডাকবাংলা.কম-এর তরফে আড্ডায় বসলেন উদয়ন ঘোষচৌধুরি

মাত্র কয়েক মাস আগে আপনাদের উদ্যোগে লস এঞ্জেলসে ‘অনুপমা’-র স্পেশাল স্ক্রিনিং হল। হৃষীকেশ মুখার্জির এতগুলো সিনেমার মধ্যে এটাকেই বেছে নিলেন কেন?

প্রিয়াঙ্কা: আমি আর নিখিল প্রথমবার যখন একসঙ্গে ‘অনুপমা’ দেখেছিলাম, তখন ভেতরে-ভেতরে খুব অদ্ভুত গর্ব হয়েছিল। পুটিবাবার (ঠাকুরদা হৃষীকেশকে এই নামে ডাকেন প্রিয়াঙ্কা) অন্যান্য অনেক সিনেমা আমি ভীষণ পছন্দ করি; কিন্তু, ‘অনুপমা’-র ব্যাপারটাই অন্য। এটার কাহিনিতে প্রচুর আধুনিক চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। শোক-দুঃখ কাটিয়ে, বন্দিত্ব ছেড়ে নতুন করে ভরসা পাওয়ার আলো রয়েছে। সেইজন্যই আমি চেয়েছিলাম ১৯৬৬ সালে ভারতে তৈরি হওয়া সেই সিনেমার স্বাদ আমেরিকার মানুষরাও পাক। 

নিখিল: আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা— সবই আমেরিকায়। পুটিবাবার যেসব সিনেমা নিয়ে দর্শকরা উচ্ছ্বসিত হয়, যেমন ‘আনন্দ’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘গোলমাল’, ‘নমক হারাম’— এগুলোর থেকে ‘অনুপমা’ আলাদা। এই সিনেমাটা পুরুষকেন্দ্রিক নয়; গল্পটা ঘুরছে একজন নারীকে কেন্দ্র করে। হয়তো সেই কারণে সেই সময়ে এই ফিল্মের বক্স অফিসের অঙ্ক তত ওপরে ওঠেনি। 

আমেরিকা-টামেরিকায়, মানে পাশ্চাত্যের দিকে সাধারণত যেসব সিনেমাকে মাথায় তুলে নাচে, সেগুলো আদতে পশ্চিমের আদর্শ বা ধ্যান-ধারণাকেই অনুকরণ বা অনুসরণ করে। কিন্তু, ‘অনুপমা’ সেরকম নয়। এখানে পাশ্চাত্য থেকে চিন্তা-ভাবনা ধার করার বদলে, চিরাচরিত ভারতীয় ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই জীবনকে নতুনভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে। 

তাছাড়া, দেখুন, খুব কম হিন্দি সিনেমায় এত ভাল গান আর আবহসংগীতের ব্যবহার দেখা যায়। কীসব গান! আহা! সংলাপ বেশি নেই; কিন্তু যেখানে যেখানে কথা বলার দরকার, রাজেন্দর সিং বেদি ঠিক সেখানে একদম মেপে মেপে প্রতিটা শব্দ লিখেছেন। জয়ন্ত পাঠারের ক্যামেরা একেবারে প্রয়োজন মতো অ্যাঙ্গেল ধরে-ধরে ছবি তুলেছে। 

আরও পড়ুন: শতবর্ষেও অমলিন কলকাতা বেতারের ইতিহাস!
লিখছেন সুপ্রিয় রায়…

প্রিয়াঙ্কা: স্ক্রিনিংয়ের ব্যাপারটা খানিক জুয়া খেলাই বলতে পারেন। আমেরিকার অডিয়েন্সে বেশিরভাগই হিন্দি বোঝে না। অধিকাংশ মানুষ এখন দ্রুত গতির সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত। আমার আদৌ কোনও ধারণা ছিল না দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে!

কেমন ছিল দর্শকদের প্রতিক্রিয়া?

প্রিয়াঙ্কা: প্রথমদিকে আমি ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। আস্তে-আস্তে দেখলাম, মজার দৃশ্যে মানুষ হাসছে; আবার, সিরিয়াস দৃশ্যে চুপ করে দেখছে। সিনেমাটা শেষ হওয়ার পর দেখলাম সকলের চোখ ভিজে গেছে। সেইজন্য প্রশ্নোত্তর পর্বের আগে তাদের সামলে ওঠার সময় দিতে হয়েছিল। এমনকী, যাদের বয়স কুড়ি বা তিরিশের কোঠায়, তারাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিনেমাটা নিয়ে আলোচনা করেছে। আগে এতবার দেখেও আমার নজরে পড়েনি, এমন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তারা কথা বলেছে।

স্বাতী: এরকম সাড়া পাওয়া যাবে, সেটা মোটেও আশা করিনি। এখানকার লোকজন বলেছে, ‘এটা আমাদের দেখা শ্রেষ্ঠ সিনেমা!’ আমার এক ছাত্র, ড্যানিয়েল, আঠাশ বছর বয়স— এখানেই জন্মেছে, বড় হয়েছে; কিন্তু, আসলে সে চিনের মানুষ— তার কথাটা আমাকে চমকে দিয়েছে। সে বলেছে, ‘অশোক (ধর্মেন্দ্র) প্রথাগত নায়কের কায়দায় নায়িকা উমাকে (শর্মিলা ঠাকুর) উদ্ধার করতে যায় না। বরং শুধুমাত্র কথা বলে তাকে ভরসা যোগায়। উমা নিজেই উপলব্ধি করে যে, নিজের ভালর জন্য নিজেকেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরতে হবে! ছয়ের দশকের নিরিখে এই চিন্তাটাই কত আধুনিক ছিল!’ 

প্রিয়াঙ্কা: আমি মনে করি, ‘অনুপমা’ দেখলে যে-কেউ আরেকটু উঠে দাঁড়ানোর কথা ভাববে; তার মনটা ভাল হয়ে যাবে… 

স্বাতী: অনেক সিনেমায় এত বেশি সংলাপ থাকে, যেমন ‘চুপকে চুপকে’— সেখানে ভাষাটা ঠিকঠাক না জানলে, শুধু সাবটাইটেল পড়ে সকলের পক্ষে বোঝা মুশকিল। কিন্তু, এখানে শর্মিলা শুধু চোখের দৃষ্টি দিয়েই যেভাবে অভিনয় করেছেন, দারুণ! কোনও সংলাপ ছাড়াই চরিত্রের মন স্পষ্ট বোঝা যায়। মনে হয়, সেটাই দর্শককে ছুঁয়েছে।

লস এঞ্জলেসে ‘অনুপমা’-র স্ক্রিনিংয়ে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতীপ মুখার্জি, স্বাতী মুখার্জি, প্রিয়াঙ্কা মুখার্জি
এবং নিখিল রাজপাল

আমেরিকাতে হৃষীকেশের সিনেমা কি এই প্রথম দেখানো হল?

প্রিয়াঙ্কা: সেটা ঠিক জানি না। মানে, আমাদের কাছে তেমন কোনও খবর নেই।

ভারতে ‘অনুপমা’ দেখানোর কোনও পরিকল্পনা করছেন?

প্রিয়াঙ্কা: ভারতের কোনও ফেস্টিভ্যালে দেখাতে পারলে খুব খুশিই হব আমরা। কিন্তু, মুশকিল হল ওখানে কেউ আমাদের চেনে না, জানে না। বহু বছর হয়ে গেল দেশে যাওয়াও হয়নি। সত্যি বলছি, প্রথমে চেয়েছিলাম ভারতেই স্ক্রিনিংটা হোক! কিন্তু, এখান থেকে ওখানে গিয়ে সবকিছু আয়োজন করার সাধ্য আমাদের নেই।

‘অনুপমা’ ছাড়া হৃষীকেশের আর কোন কোন সিনেমা আপনাদের ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় আছে?

প্রতীপ: ‘সত্যকাম’ আর ‘নমক হারাম’— এই দুটো আমার দারুণ লাগে!

প্রিয়াঙ্কা: ‘নরম গরম’, কী দুর্দান্ত কমেডি! 

স্বাতী: কমেডি বললেই ‘গোলমাল’ মনে পড়ে আমার! আর, ‘আনন্দ’ আমার ভীষণ পছন্দের… 

নিখিল: পুটিবাবার সাদা-কালো সিনেমাগুলোয় জয়ন্ত পাঠারের ক্যামেরা যেভাবে প্রতিটা ফ্রেম ধরেছে… উফ! আই জাস্ট লাভ দ্যাট! ‘মুসাফির’, ‘মঝলি দিদি’, ‘আসলি নকলি’… দুর্দান্ত লাগে!

ব্যক্তিগতভাবে ‘মুসাফির’ আমার খুব প্রিয় আর ইতিহাসের দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঋত্বিক ঘটকের স্ক্রিপ্ট এবং হৃষীকেশের প্রথম পরিচালনা… 

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, বেশ ‘ফিলোজফিক্যাল’ ফিল্ম…

নিখিল: মনে হয়, এই সিনেমাটা বানানোর সময়ে উনি বক্স অফিসের কথা ভাবেননি। সেই সময়ের দর্শকদের জন্য ওটা ছিল সম্পূর্ণ ছাঁচ-ভাঙা একটা কাজ। কিন্তু, এখন দেখুন, সেই কাজটাই ‘ক্লাসিক’ হয়ে গেছে। 

‘মুসাফির’-এ দিলীপ কুমারের নিজের কণ্ঠে একটা দুর্দান্ত গান আছে… কিন্তু, সিনেমাটা তখন একেবারেই চলেনি…

প্রতীপ: ছয়ের দশকের গোড়ায় বাবার বেশ কয়েকটা ফিল্ম চলেনি। ‘মেমদিদি’, ‘ছায়া’— এইসব পরপর ফ্লপ হয়েছিল। আমার মনে আছে, তখন উনি প্রতিদিন বাড়িতে ফিরে নিজেই নিজেকে বলতেন, ‘দিস ইজ দ্য লাস্ট চান্স!’ মানে, যদি পরের ফিল্মটা না চলে, তাহলে উনি তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে যাবেন। 

স্বাতী: উফ! কী স্ট্রেসফুল কাজ! 

তা তো বটেই!

স্বাতী: একটা ঘটনা মনে পড়ল এখন… সিনেমা রিলিজের আগে বাবা আমাদের নিয়ে ট্রায়াল শো-তে যেতেন। জানতে চাইতেন আমাদের কেমন লেগেছে। তো, যখন ‘রং বিরঙ্গি’ দেখাতে নিয়ে গেছিলেন, প্রিয়াঙ্কার বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর। ওই সিনেমায় অমল পালেকরের চরিত্রের বাড়িতে স্ত্রী রয়েছে, আবার সেক্রেটারির সঙ্গেও একটা মিষ্টি বন্ধুত্ব আছে। সেইটা দেখে প্রিয়াঙ্কার কী সাংঘাতিক চেঁচামেচি, ‘ওই বাবাটা কেন দুটো মায়ের সঙ্গে ঘুরছে!’ (হাসি)… 

বাবা আসলে আমাদের রোজকার জীবন থেকেই নানা চরিত্র বা ঘটনা তুলে সিনেমায় ঢুকিয়ে দিতেন। সেগুলো এখন দেখতে বসলে নিজেদেরই ফেলে-আসা দিনগুলোতে ফিরে যাই। 

নিখিল: পুটিবাবাকে কাছ থেকে জানলে বুঝতে পারতেন, উনি নিজেই নিজেকে নিয়ে মজা করতেন। বেশিরভাগ সিনেমায় উৎপল দত্ত যেসব চরিত্রে অভিনয় করেছেন, সেগুলো আসলে পুটিবাবা নিজেই। 

‘গোলমাল’-এ উৎপল দত্তের চরিত্রের নাম ভবানী শঙ্কর; মানে, আন্দাজ করা যায় সে উত্তর ভারতের লোক। অথচ, একটা দৃশ্যে হঠাৎ সে বলে ওঠে, ‘দাঁতক্যালানে বাঞ্ছারাম!’ যারা বাংলা বোঝে না, তাদের তো মাথা ঘুরে যাবে ওটা শুনে… 

প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ হ্যাঁ… আচ্ছা, ওই কথাটার মানে কী? (সকলের হোহো হাসি)

সংস্কৃতে ‘বাঞ্ছা’-র মূল অর্থ ইচ্ছাপূরণকারী; যা ঈশ্বরকে বোঝায়। কিন্তু, চলিত বাংলায় কথাটা খানিক তাচ্ছিল্য বা ব্যঙ্গ করতেই বলা হয়। মানে, এমন একটা লোক, যে কোনও অপরাধবোধ বা অস্বস্তি লুকনোর জন্য আমতা-আমতা করে হাসে, অতিরিক্ত বিনয় দেখায়; বা এমন কেউ, যে সবাইকে খুশি করতে চায়। বাংলায় ব্যাপারটা আসলে হালকা গালাগালিই বটে! 

স্বাতী: ভাষাতে বাবার দারুণ দখল ছিল, উনি প্রতিদিন কবিতা লিখতেন, ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে… বাংলাতে আর ইংরেজিতেও…

নিখিল: অভিনেতা, লেখক, রাজনীতিবিদ হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওঁর দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। সময় পেলেই দু’জনে একসঙ্গে সাহিত্যচর্চা করতেন।  

হরীন্দ্রনাথ আর হৃষীকেশের যুগলবন্দির ব্যাপারটা নিয়েও তেমন কথাবার্তা হয় না… আচ্ছা, কোনও সিনেমার মেকিং সম্বন্ধে আপনাদের কোনও স্মৃতি আছে?

স্বাতী: আমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। তখন ‘গোলমাল’-এর শুটিং চলছিল। আর, আমাদের বাড়ির নানা ঘরেই বিভিন্ন সেট তৈরি হয়েছিল। মানে, হয়তো সেটা আসলে বসার ঘর, কিন্তু সিনেমায় দেখানো হয়েছে অন্য কোনও ঘর। মাঝেমাঝেই বাবা হাঁক দিয়ে বলতেন, ‘স্বাতী, নিচে এসো!’ হয়তো কেউ এসেছে, গিয়ে সদর দরজা খুলতে হবে আর কী! 

নিজের বাড়িতেই সেট তৈরি করার ফলে উনি আসলে প্রোডিউসারের টাকা বাঁচিয়ে দিতেন। ‘কিসি সে না কেহনা’-র শুটিং হয়েছিল আমাদেরই বাগানে। সকাল থেকে আর্টিস্ট আর টেকনিশিয়ানরা এসে সারা বাড়িময় হুলুস্থুল কাণ্ড বাধিয়ে দিত! কিন্তু, তাতে আমার মজাই হত! আমি তো মনের আনন্দে যা-খুশি খাবার অর্ডার করতে পারতাম! (হাসি)

‘জুরমানা’-র সেটে অমিতাভ বচ্চন ও বিনোদ মেহরার সঙ্গে হৃষীকেশ মুখার্জি

প্রতীপবাবু, আপনার কখনও ইচ্ছে হয়েছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসার?

প্রতীপ: এক্কেবারেই না! কক্ষনও না!… আমার ভাইয়ের ইচ্ছে ছিল বটে; কিন্তু, খুবই অল্প বয়সে মারা গেল সে। একটা সিনেমার কাজও শুরু করেছিল… 

স্বাতী: সেটার নাম ছিল ‘লাঠি’, ধর্মেন্দ্র আর মন্দাকিনীকে নিয়ে… আমরা মহরতে গেছিলাম, বাবাও গিয়েছিলেন… 

প্রিয়াঙ্কা: আমার বাবা কিন্তু পারতপক্ষে কোনও শুটিংয়ের চৌহদ্দিতে থাকত না… (হাসি)

স্বাতী: হ্যাঁ, প্রতীপ আগে কাজ করত ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে। তখন শুটিং থাকলেই তাড়াহুড়ো করে সক্কাল-সক্কাল বেরিয়ে যেত। কিন্তু, টাটা-য় জয়েন করার পর জানা গেল ওর বস রেখার বিরাট ফ্যান! মানে, রেখার জাস্ট নাম শুনলেই পাগল টাইপ অবস্থা! তো, তিনি আমাকে বলে রেখেছিলেন রেখা কখনও বাড়িতে এলে যেন খবর দিই। 

‘ঝুঠি’-র শিডিউলের সময়ে আমি তাঁকে জানালাম যে, রেখা এসেছেন আমাদের বাড়িতে। সেদিন বোধহয় অফিসের কোনও জরুরি মিটিং চলছিল। কিন্তু, রেখাকে একবার চাক্ষুস করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে প্রতীপকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অফিস ছেড়ে! যদিও যতক্ষণে তিনি পৌঁছেছিলেন, ততক্ষণে সেদিনের মতো প্যাক-আপ হয়ে গিয়েছে। উফ! রেখাকে না দেখতে পেয়ে তখন তাঁর সে কী আফসোস! 

প্রতীপ: বাবা আসলে পরিবার আর কাজ— দুটো জায়গা আলাদা রাখতেন। আমার একবারও মনে পড়ে না উনি কখনও সিনেমা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন… 

স্বাতী: বাবা একবার একজন সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘আপনারা আমার কাছে কেন আসেন? আমার কথাবার্তা কেন ছাপেন? আমি শুধু নাচ-গান দেখিয়ে কিছু মজার গল্প বুনে মানুষকে হাসাই বা কাঁদাই, এর মধ্যে মস্ত কোনও বাহাদুরি নেই। আপনারা আমার ছেলের ইন্টারভিউ নিন! সে বিজ্ঞানের চর্চা করে, মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করে!’

নিখিল: প্রিয়াঙ্কার দিক থেকে পুরো পরিবারে সবাই বিজ্ঞানের চর্চা করতেন বা করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম বোধহয় পুটিবাবা… 

প্রতীপ: উঁহু, উনিও আসলে কেমিস্ট হতে চেয়েছিলেন। সেইজন্যই নিউ থিয়েটার্সের কাজে ঢুকেছিলেন। সেইসময়ে সিনেমা বানানোর কথা ওঁর মাথায় ছিল না… 

তরুণ হৃষীকেশ মুখার্জি

সেই শুরুর দিনগুলো, কলকাতার জীবন সম্বন্ধে কিছু বলুন, প্লিজ!

প্রতীপ: তখন তো আমি জন্মাইনি, এদিক-সেদিক থেকে যেটুকু শুনেছি আর কী! একদিন বিমল রায়ের টিমের একজন এডিটর কাজে আসতে পারেনি, বোধহয় শরীর খারাপ হয়েছিল। তো, বিমল রায় বাবাকে ডেকে নিয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘আমি তো কিছুই জানি না এডিটিংয়ের!’ উনি বলেছিলেন, ‘শুরু করে দাও, সব শিখে যাবে।’ 

প্রিয়াঙ্কা: বাবা নিশ্চয়ই বম্বের প্রথমদিকের কথা কিছু বলতে পারবে… ওই যে স্টুডিওটা ছিল, কী নাম?

প্রতীপ: মোহন স্টুডিও। ওটার ঠিক পাশের বাড়িতেই ভাড়ায় থাকতাম আমরা। তো, সেই স্টুডিওর পাঁচিলের একটা জায়গায় বেশ বড়সড় ফাটল বা গর্ত মতন ছিল। ছোটবেলায় আমরা মাঝেসাঝে ওই ফাটল দিয়ে গলে স্টুডিওতে ঢুকে পড়তাম। আর, রাত্রিবেলায় বাবাও কখনও কখনও ওখান দিয়েই শর্ট-কাট করে ফিরতেন। 

এটা মোটামুটি কবেকার কথা?

প্রতীপ: কার্টার রোডের বাড়িটা কেনা হয়েছিল ১৯৬০ সালে। আমার যতদূর মনে পড়ছে, ১৯৫৪ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত আমরা মোহন স্টুডিওর পাশে ভাড়া নিয়ে থাকতাম। 

১৯৫৯-এ মস্কোর ভারতীয় ডেলিগেশনে নার্গিস, নিরূপা রায়, সলিল চৌধুরীর সঙ্গে বিমল রায় (সামনে) ও হৃষীকেশ মুখার্জি (পাশে বাঁ-দিকে)

বিমল রায়ের কথা কিছু মনে পড়ে?

প্রতীপ: হ্যাঁ, ছোটবেলায় প্রতি রবিবার ওঁদের বাড়িতে যেতাম। ওটা একেবারে বাঁধাধরা নিয়ম ছিল। মানে, যেতেই হবে! রবিবারের ব্রেকফাস্টটা ওখানেই খাওয়া হত। পশ্চিম বান্দ্রায় মাউন্ট মেরি চার্চের কাছে বিশাল বাড়ি ছিল ওঁদের। সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম রবিবারে কখন ওখানে যাব!

অল্প বয়সে ওই বাড়িতে যাওয়াটাই একটা বেড়ানো ছিল। একটা জায়গায় ছোট জলাশয় মতন ছিল। সেটার ওপরে ব্রিজ বানানো, সেই ব্রিজটায় উঠে এপার-ওপার করতাম। ওঁদের খাওয়ার জায়গাটা ছিল ওই জলাশয়ের ওপারে। একজন খানসামা উর্দি পরে খাবার পরিবেশন করত। মাথায় পাগড়ি-টাগরি বেঁধে একটা লোক আমাদের খাবার দিয়ে যাচ্ছে, সেটা দেখতেই খুব মজা লাগত! 

কিন্তু, বিমল রায়ের ধারেকাছে খবরদার যেতাম না! ভীষণ ভয় পেতাম ওঁকে! সাংঘাতিক গম্ভীর মানুষ ছিলেন! কথাবার্তা প্রায় বলতেনই না! ওঁর একটা ছোট অফিস-ঘর ছিল বাড়ির সামনের দিকে। তো, আমরা ছোটরা খেলতে-খেলতে যদি বলটা ওই ঘরের দিকে চলে যেত, তাহলে একজন আরেকজনকে ঠেলাঠেলি করতাম, ‘যা, তুই নিয়ে আয় বলটা!’ ‘না না, তুই গিয়ে বল নিয়ে আয়!’ কারও সাহস হত না ওঁর সামনে যাওয়ার… 

এখন ওঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?

স্বাতী: একটা সময় পর্যন্ত রিঙ্কিদি’র (বিমল রায়ের বড় মেয়ে, রিঙ্কি রায় ভট্টাচার্য) সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এখন প্রায় নেই বললেই চলে। বম্বেতে একসময়ে আমাদের বাড়ি থেকে তিনটে বাড়ি পরে ‘তাজ ভিলা’-য় রিঙ্কিদি আর ওঁর স্বামী, বাসুদা (ভট্টাচার্য) থাকত। প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে বড়মাকে (বিমল রায়ের স্ত্রী, মনোবীণা রায়) শাড়ি দিতে যেতাম আমরা… ওঁদের ছেলে, জয় প্রায়ই আসত আমাদের বাড়িতে… 

হৃষীকেশের সিনেমায় সংগীতের ব্যবহার, বলা বাহুল্য, অনবদ্য। তাঁর ফিল্মে গান তৈরি করার কোনও কথা মনে পড়ে?

প্রতীপ: খুব ছোটবেলার একটা আবছা স্মৃতি আছে। একবার রবিশঙ্করকে আমাদের বাড়িতে দেখেছিলাম। উনি কোনও সুর বাজিয়ে শোনাচ্ছিলেন; সঙ্গে একজন গান গাইছিলেন। আর, বাবা বলছিলেন, ‘না, না, এটা ভাল লাগছে না!’

সিনেমায় গান নিয়ে বাবার একটা ব্যাপার বলি। যে-কোনও গানের শুটিংয়ের আগে বোধহয় এক সপ্তাহ ধরে সেই গানটা উনি সারাদিন বাজাতেন। সাতদিন ধরে বারবার একই গান চলতে থাকত। ছোটবেলায় সে আমাদের অতিষ্ঠ অবস্থা মনে হত। খালি ভাবতাম, উফ! কখন থামবে! (হাসি)   

সলিল চৌধুরীর সম্বন্ধে কিছু মনে আছে?

প্রতীপ: আমাদের কার্টার রোডের বাড়ির ঠিক পিছনের রাস্তায় ওঁর বাড়ি ছিল, ওঁর বাড়িতেও প্রায়ই যেতাম… 

স্বাতী: মাঝেমধ্যেই উনি আমাদের বাড়িতে দুপুরে খেতে আসতেন… 

প্রতীপ: একবার ফোন করে বললেন, ‘কাল ঘুম-চোখে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গেছে! রাত্তিরে বাথরুমে যেতে গিয়ে গুলিয়ে গেছিল ডানদিকে যাব, না বাঁদিকে!’ সে এক বিশ্রী অবস্থা!

শচীন দেববর্মণ আর রাহুল দেববর্মণ…

প্রতীপ: শচীন দেববর্মণকে বহুবার আমাদের বাড়িতে দেখেছি। কিন্তু, ছোটদের সঙ্গে সেভাবে ওঁর কোনও কথাবার্তা হয়নি। আমরা, বাড়ির লোকেরা সেই অর্থে সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না…

স্বাতী: শচীন ভৌমিক প্রায়ই আসতেন, বাবার বেশ কয়েকটা ফিল্ম ওঁর লেখা… 

অবসর সময়ে হৃষীকেশ নিজে কোন ধরনের সংগীত শুনতে পছন্দ করতেন?

প্রতীপ: বাবা তো নিজেই সেতার বাজাতেন। কলকাতায় একসময়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বাজিয়েছেন। ছোটবেলায় দেখেছি, নিজের সিনেমার বাইরে ক্লাসিক্যাল ছাড়া অন্য কিছু শুনতেন না। বিলায়েত খাঁ, রবিশঙ্কর, বড়ে গুলাম আলি— এঁদের সংগীত খুব পছন্দ করতেন। 

আমি ওঁকে শুজাত খাঁর সংগীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। প্রথমে তো শুজাত খাঁ শুনতে রাজিই ছিলেন না। আমি একটু জোর দিয়েই বলেছিলাম শুনতে। তারপর ওঁর এত ভাল লেগেছিল শুনে… তখন ওঁর ডায়ালিসিস চলছিল, সেখানে একটা ক্যাসেট নিয়ে যেতেন… ডায়ালিসিস চলার সময়ে চোখ বন্ধ করে শুজাত খাঁ শুনতেন… 

প্রিয়াঙ্কা: যখন বাড়ি ফিরতেন, ওই প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যে বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি গান চালিয়ে দাও! তাড়াতাড়ি!’ শেষদিকে ওঁর ওষুধের মতো হয়ে গেছিলেন শুজাত খাঁ… মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে শুনতে থাকতেন…  

পরিচালক-অভিনেতা যুগলবন্দি

অমিতাভ বচ্চনের কেরিয়ারে এখন পর্যন্ত সবথেকে বেশি কাজ খুব সম্ভবত হৃষীকেশের পরিচালনায়— আটটা ফিল্ম। এটা একটা রেকর্ড বলা যায়। 

স্বাতী: ওঁদের মধ্যে বন্ধনটা, মনে হয়, ‘আনন্দ’-এর কারণে হয়েছিল। ডা: ভাস্কর ব্যানার্জির চরিত্রটা করার পরেই অমিতাভ জনপ্রিয় হতে শুরু করেন; মানুষ ওঁকে চিনতে শুরু করে। 

অমিতাভ আর হৃষীকেশ— এই বিষয়েই একটা গোটা বই হতে পারে। অধিকাংশ ফিল্মে অমিতাভের যে জনপ্রিয় ‘অ্যাংরি’ ইমেজ, হৃষীকেশের সিনেমায় সেই রাগের বহিঃপ্রকাশ হয়তো মারামারি বা রক্তারক্তি নয়; কিন্তু, সেখানে রাগটা অনেক গভীর, অনেক সূক্ষ্ম…

প্রিয়াঙ্কা: ওঁর সব সিনেমার মধ্যে ‘মিলি’ আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমার মতে, শুধু ওই চরিত্রটা আর মিলি… উফ! জাস্ট এনাফ! 

স্বাতী: অমিতাভ আর জয়া (বচ্চন) দু’জনেই বাবাকে প্রচণ্ড সম্মান করতেন। যখনই দেখা হত, সবসময় বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। আমি এরকম দেখেছি, একসঙ্গে শুটিংয়ে যাবেন বলে ভোর চারটের সময়ে অমিতাভ গাড়ি নিয়ে বাবাকে নিতে এসেছেন। 

হৃষীকেশের সিনেমার একটা বৈশিষ্ট্য হল কাহিনির বিষয়বস্তু যতই গুরুগম্ভীর হোক, কোথাও না কোথাও ঠিক হাসি-মজার মুহূর্ত এসে মনটাকে হালকা করে দেবে। ওঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কি এই রসবোধ ছিল?

স্বাতী: বাবার কাছে সবকিছুই হাসি-ঠাট্টা ছিল; সবকিছু নিয়েই মজা করতে পারতেন উনি। আর, সেটা একেবারে অবিরাম, অনর্গল। হয় বাড়ির লোকদের নিয়ে মজা করতেন, নয়তো এমন-এমন গল্প শোনাতেন যেটা শেষ হলে হাসি পাবেই পাবে… 

নিখিল: শেষদিকে দেখেছি, ওঁর শরীরে যতই যন্ত্রণা থাকুক বা ব্যথা-বেদনা হোক— এমনকী, হয়তো ঝুঁকে বসে আছেন, কিন্তু আশপাশের মানুষের সঙ্গে মজার-মজার কথা বলে চলেছেন…

উনি নিজে কোন ধরনের সিনেমা দেখতে ভালবাসতেন? আপনাদের কখনও কোনও সিনেমা দেখতে বলেছিলেন, এমন কিছু মনে পড়ে?

প্রিয়াঙ্কা: নাগেশ কুকুনুরের ‘ইকবাল’ দেখতে বলেছিলেন আমাকে, যেটা ক্রিকেট খেলা নিয়ে ছিল…

প্রতীপ: ‘ম্যাডাম কুরি’ খুব পছন্দ ছিল ওঁর। বারবার দেখতেন। এতবার দেখেছিলেন যে, কেউ কেউ বলত, ‘এবার তো ওটা বন্ধ করুন!’ তাছাড়া, চার্লি চ্যাপলিনের সিনেমা খুব প্রিয় ছিল।   

ব্যক্তিগত জীবনে মানুষটা কেমন ছিলেন?

স্বাতী: সম্পর্কের দিক থেকে উনি আমার শ্বশুর হলেও, আমরা যেন বাবা-মেয়ে ছিলাম। বিয়ের পর প্রথমেই বাবা বলেছিলেন, ‘তুমি এই বাড়ির মেয়ে। তোমার শাশুড়ি নেই, সুতরাং তুমিই সবকিছু সামলাবে।’ আর, আমাদের বাড়িতে নিয়ম ছিল, যে-কেউ আসুক, সে না খেয়ে যাবে না। অনেকসময় এমন হত যে, বাড়ির কেউ খেতে বসেছে, এদিকে পাশের আসনে বসে যে খাচ্ছে, তার সঙ্গে হয়তো পরিচয়ই নেই…  

প্রতীপ: বম্বের বাড়িতে লোকজনের যাওয়া-আসার কোনও কমতি ছিল না। বাবার একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল, সে আমাদের বাড়িতেই থাকত। লখনউ থেকে তার নামে রোজ একটা করে পোস্টকার্ড আসত। কোনও-কোনও দিন পোস্টকার্ড না এলে আমি মজা করে বলতাম, ‘আজ আসেনি?’ 

নিখিল: পুটিবাবা সবকিছু যত্ন করে আগলে রাখতেন। যে-কোনও জিনিস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, খুশি থাকতেন। ওঁকে কেউ কখনও কিছু দিলে বাচ্চাদের মতো আনন্দ করতেন। একবার একটা পাঁচ ডলারের বডি-স্প্রে পেয়ে সে-যে কী খুশি! সবাইকে ডেকে-ডেকে দেখাচ্ছেন! বারবার ঢাকনা খুলে গন্ধ শুঁকছেন! যেন সেই স্প্রে-টা থেকে কী না কী খুশবু আসছে!

প্রিয়াঙ্কা: কুকুর খুব প্রিয় ছিল ওঁর। একদিক থেকে ভাবলে, হয়তো মানুষের থেকে কুকুরদের বেশি ভালবাসতেন।

স্বাতী: বাবার কাছে সবসময় চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটা নোটবই থাকত। উনি যখন আমেরিকায় আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছিলেন, তখন যা-কিছু দেখতেন সব ওটাতে লিখে রাখতেন। এমনকী, কোন জিনিসের কত দাম, কার কার জন্য কী-কী জিনিস নিয়ে যেতে হবে বা পরেরবার আনতে হবে… আমার এক বন্ধুর জন্য সালোয়ার-কামিজ আনতে হবে, সেটাও পরিষ্কার লিখে নিয়েছিলেন…

সেই নোটবইগুলো আছে?

স্বাতী: কবিতা লেখার নোটবইটা আছে, মজার-মজার সব লেখা আছে তাতে… আর, উনি ক্রিকেটের সাংঘাতিক ফ্যান ছিলেন! ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে দেখবেনই দেখবেন! বাড়িতে সকলের জন্য ভাজাভুজি-পকোড়া বানানো হত, সেসব নিয়ে বসে ক্রিকেট খেলা দেখতেন। 

প্রতীপ: বাবার স্মৃতিশক্তি ছিল মারাত্মক! একবার আমি আর আমার ছোটোকাকা কিছু একটা আলোচনা করছিলাম। তো, একটা কথা আমার কিছুতেই মনে পড়ছিল না। ছোটকাকা বললেন, ‘আরে, চিন্তা করছিস কেন! তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর, ঠিক বলে দেবে!’

স্বাতী: এখন বাবা নেই, আর আমরা আপনার সঙ্গে বা কিছুদিন আগে ‘অনুপমা’-র স্ক্রিনিংয়ে দর্শকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময়ে অনুভব করছি উনি কত বড় ‘লিজেন্ড’ ছিলেন! বাবা মারা যাওয়ার পর বোস্টনের একটা দোকানে কিছু ফটোগ্রাফ ল্যামিনেট করাতে দিয়েছিলাম। তো, সেই দোকানদার, একটা মেয়ে, সে আমাকে বলল, ‘ইনি তো হৃষীকেশ মুখার্জি! আপনি কীভাবে চিনলেন?’ আমি পরিচয় দেওয়ার পর বলল, সে আসলে নাইজেরিয়ার মানুষ; সে-ও না কি হৃষীকেশের সিনেমা দেখতে পছন্দ করে!

অথচ, বাবা বেঁচে থাকাকালীন দেখেছি বাড়িতে লোকজন আসছে; ভিড় হয়েছে; কিন্তু, সবাই জাস্ট নিজের-নিজের কাজ করছে। উনি কখনও আমাদের বুঝতে দেননি যে, আমরা কী বিশাল সান্নিধ্যে ছিলাম! 

প্রতীপ: বুঝতে দেওয়া? সিনেমা নিয়ে আলোচনা করলে বাবা উলটে রেগে যেতেন! 

স্বাতী: বাবা আসলে চাইতেন না যে, ছেলে-মেয়েরা ফিল্মি দুনিয়ার চাকচিক্যের মধ্যে আসুক। ওঁর জীবনদর্শন ছিল ‘সিম্পল লিভিং, হাই থিঙ্কিং’। নিয়ম ছিল, রাত্রে সবাইকে একসঙ্গে বসে খেতে হবে। এবং, কঠোর নিয়ম ছিল কোনওরকমের মদ্যপান চলবে না। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে উনি যতই জনপ্রিয় হন বা ওঁর সিনেমা যতই হিট হোক, মানুষটা আসলে প্রথম গুরুত্ব দিতেন নিজের পরিবারকে; চাইতেন যাতে আমরা সকলে মাটির কাছাকাছি থাকি।

আপনাদের সকলকে অনেক-অনেক ধন্যবাদ এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য…

প্রিয়াঙ্কা: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। সত্যি বলতে, পুটিবাবাকে নিয়ে একটা পরিবার হিসেবে প্রথমবার একসঙ্গে আপনার সঙ্গে কথাবার্তা হল… তাই না, মা?

স্বাতী: হ্যাঁ। যদিও, এর আগে এখানকার স্থানীয় বন্ধু কবিতা ছিব্বারের সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু নিজেদের দেশে, তা-ও আবার বাংলায়, এর আগে কোনও কথাবার্তা হয়নি। আপনাদের পুরো টিমকে আমাদের অজস্র ধন্যবাদ। 

কৃতজ্ঞতা: অম্বরীশ রায়চৌধুরী