ঠিক এক বছর আগে আপনি আজকের দিনে এই সময়ে কী করছিলেন? এমনই কোনও একঘেয়ে লেখায় মুখ গুঁজে বসেছিলেন? না কি সময় কাটাচ্ছিলেন প্রিয় মানুষের কাঁধে মাথা রেখে? না কি ভীষণ রাগে ছটফট করছিলেন আর বাপ্-বাপান্ত করছিলেন কোনও অচেনা আগন্তুককে? আপনি বলতে পারবেন না! আমিও না। আদতে বলা সম্ভবও না। নিজের, ও খুব কাছের মানুষের জন্মদিন ও বিশেষ কিছু তারিখ ছাড়া আমাদের চড়ুইপাখি সাইজের মগজ বাদবাকি তথ্যকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। তেমনই একটা তারিখ ৬ অগাস্ট।
মৃদুমন্দ গতিতেই শুরু হচ্ছিল জাপানের একটা নতুন সকাল। যে-সকালে শিশুর কোমল হাসি ছিল, নরম রোদ ছিল, আড়মোড়া ভেঙে আলস্যে ফোটা কুঁড়ি ছিল, আর ছিল এক অদ্ভুত মাশরুম।
ঘড়ির কাঁটা আটটা পনেরো ছুঁইছুঁই। ইস্ট এশিয়া টিন ওয়ার্কার্সের ব্যস্ত দপ্তর। কর্মী তোসিকো সাসাকি নিজের বসার জায়গায় সদ্য পৌঁছে চেয়ারটা টানলেন। তারপর ঘাড় ঘোরালেন পাশের ডেস্কের তরুণীর দিকে। কিছু বলবেন বলে হাসিমুখে এগোচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, চিকিৎসক মাসাকাজু ফুজি তাঁর ব্যক্তিগত হাসপাতালের বারান্দায় পা গুটিয়ে বিশ্রামরত, হাতে তুলে নিলেন ‘ওসাকা আসাহি’ পত্রিকা। দরজি নাকামুরার বিধবা স্ত্রী হাতসুয়ো অবাক বিস্ময়ে ঠিক সেই মুহূর্তে চেয়ে আছেন জানলার বাইরে। তাঁর এক প্রতিবেশীর বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে। হাতসুয়ো জানতেন, ওই বাড়িটি বিমান হামলা-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফায়ারলেনের মধ্যে পড়ছিল। নেশন ফার্স্ট। অগত্যা ত্বরান্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পুরো নির্মাণটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ‘সোসাইটি অফ জেসাস’-এর জার্মান ধর্মযাজক, ফাদার ভিলহেলম্ ক্লাইনসোর্গে নিশ্চিন্তে গা এলালেন নিজের খাটে। মঠের তিনতলা মিশন হাউজের উপরের তলার ঘরে শুয়ে ‘স্টিমেন ডের জাইট’ নামক একটি জেসুইট পত্রিকার পাতা ওল্টাতে লাগলেন।

অন্যদিকে, শহরের নামজাদা অত্যাধুনিক হাসপাতাল ‘রেডক্রস’-এর ব্যস্ততম শল্যচিকিৎসা বিভাগ। করিডোর ধরে হেঁটে আসছিলেন এক তরুণ চিকিৎসক তেরুফুমি সাসাকি। পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা ধরা ছিল হাতে। একই সময়ে মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে পশ্চিম প্রান্তে অপেক্ষমাণ, কিয়োশি তানিমোতো নামক এক ব্যক্তি। শহরের অপেক্ষাকৃত এক ধনী ব্যক্তির বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঠেলাগাড়ি থেকে সমস্ত মালপত্র নামানোর। কোনও এক অজ্ঞাত বোমারু বিমানের ভয়ে যিনি এইসব মালপত্র সরিয়ে এনেছিলেন মূল নগরীর বাইরে। এরা কেউই একে-অপরকে চিনতেন না বিশেষ, তবু একটা বিশেষ তারিখ এঁদের মধ্যে তৈরি করে এক অদৃশ্য সেতু। বেঁধে ফেলে নিয়তির দুর্বোধ্য সূতিকায়। যে-জাল ছেড়ে তাঁরা আর কোনওদিনও বেরোতে পারেননি। এরা প্রত্যেকে এক-একজন উত্তরজীবী। কোনওক্রমে বেঁচে থাকা মৃত্যুর স্পর্শ ছুঁয়ে। ভয়াবহতার চুম্বন অগ্রাহ্য করে অনাবিল জীবনের আশ্বাস।
আরও পড়ুন: বিশ্ব জুড়ে কি পরমাণু যুদ্ধের সলতে পাকছে? লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘শ্রীকৃষ্ণের শেষ কটা দিন’ উপন্যাসে বিশ্বরূপ ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, ‘সমগ্র জীবজগৎ তুচ্ছ পতঙ্গের মত আকৃষ্ট হয়ে সেই গহ্বরে প্রবিষ্ট হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে নিমেষে। লস আলামেসে প্রথম আণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ দেখে বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠলেন, Good, God, the long-haired boys have lost control. তারপরেই গীতার ওই শেষ শ্লোকটি…’ তারপর কেটেছে আট দশক। ক্ষতের প্রলেপের চাদর ভেদ করে দগদগ করছে বিদারণ। ১২.৫ কিলো টন টিএনটির সমতুল্য শক্তি বহনকারী বোমা। তেজস্ক্রিয়তার উত্তাপে নিমেষে পুড়ে ছাই এক লক্ষ কুড়ি হাজার রক্তমাংস। এঁরা ছয়জন ওই পুড়ে যাওয়া ছাইয়ের গাদায় কোনওক্রমে ঠাঁই নেওয়া কিছু প্রাণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্ব। একটা হার-না-মানা ভূখণ্ড। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা একটা শহর গা-ঝাড়া দিচ্ছে। স্বচ্ছ পরিষ্কার আকাশ। উড়ছে চেনা-অচেনা কত পাখির ঝাঁক। সদ্য কথা বলতে শেখা একরত্তি তার বাবাকে প্রশ্ন করে, ওই পাখিগুলো কতদূর যেতে পারে? বাবা হেসে বুঝিয়ে দেয় মাইগ্রেশন তত্ত্ব। নির্মল খুশির উদযাপনে তারা খেয়াল করে না, ওই পাখির ঝাঁকে মিশে থাকা একটা ‘এনোলা গে’। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কেটে এগিয়ে চলে মার্কিন ‘বি-২৯’ বোম্বার। বুকে জমা কেজি-কেজি ইউরেনিয়াম। যার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘লিট্ল বয়’। আকাশ থেকে নেমে আসা অদ্ভুত উড়ন্ত বস্তু দেখে হয়তো হেসেই ফেলেছিল অবুঝ শিশুর দল কিংবা বিস্মিত হয়েছিল খুব। আধো-আধো স্বরে কথা বলা শিশুর মননে স্থান পায় না ম্যানহাটন প্রজেক্ট। ওসব বড়দের জটিল ব্যাপারস্যাপার। কিন্তু মননে-মগজে-মস্তিষ্কে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায় একটা ৬ অগাস্ট। যে-দাগ শঙ্কার, বিভীষিকার।
ওপেনহাইমার আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠলেন, Good, God, the long-haired boys have lost control. তারপরেই গীতার ওই শেষ শ্লোকটি…’ তারপর কেটেছে ৮ দশক। ক্ষতের প্রলেপের চাদর ভেদ করে দগদগ করছে বিদারণ। ১২.৫ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য শক্তি বহনকারী বোমা। তেজষ্ক্রিয়তার উত্তাপে নিমেষে পুড়ে ছাই এক লক্ষ কুড়ি হাজার রক্তমাংস।
সাদাকো সাসাকি, হ্যারি এস ট্রুম্যান যখন ভুরুতে একটি ভাঁজও না ফেলে নিউক্লিয়ার ওয়েপন ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি নিলেন, তখন এই শিশুটির বয়স মাত্র দু’বছর। সাদাকো ও তার পরিবারের বাস ছিল বোমা বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে কয়েক মাইল দূরে। সে হঠাৎ লক্ষ করে, তার প্ৰিয় শহরের উপর এক তীব্র সাদা আলোর ঝলকানি। একরত্তি শিশু পিতৃহারা হয় ওই বিস্ফোরণে। শহরের আরও বহু পরিবারের মতো অসুস্থতা, আর্থিক অনটন ও খাদ্যাভাবে দিনযাপন শুরু হয় তাদের পরিবারের। তবু এসব সঙ্গী করেই বড় হয় সাদাকো। একদিন স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতায় হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎ ক্লান্তি অনুভব করে। প্রচণ্ড মাথা ঘোরে তার। এমনটা এরপর প্রায়ই হতে থাকে। একদিন এমনও হয় যে, মেয়েটা আর উঠতে পারে না। অবশেষে জানা যায়, সাদাকো লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত। তৎকালীন হিরোশিমায় এর নাম ছিল ‘পারমাণবিক বোমা রোগ’। তেজস্ক্রিয় কালো বৃষ্টিতে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়। সভ্যতার ক্ষত।

তৎকালীন জাপানে এই রোগে বেঁচে থাকার হার খুব কম ছিল। তবু ছোট্ট মেয়েটা লড়ে যায়। তার প্ৰিয় বন্ধু সিজুকো তাকে হাসপাতালে দেখতে আসত। মনে জোর পেত মেয়েটা। একদিন তার প্ৰিয় বন্ধু তার জন্য অরিগ্যামি নিয়ে আসে। কাগজ ভাঁজ করে তৈরি করা এক ধরনের সারস। জাপানিরা বিশ্বাস করে, সারস পবিত্র পাখি। ওরা নাকি ১০০ বছর বাঁচে। আর যে অসুস্থ ব্যক্তি অরিগামি ভাঁজ করে ১০০০টি সারস বুনতে পারে, সে খুব দ্রুত নিরাময় লাভ করে। একইসঙ্গে প্রতিটা সারসের সঙ্গে মিশে থাকবে উজাড় করা প্রার্থনা। সাদাকো এসব বিশ্বাস করে। সাদাকো মনে করে, মানুষের উপর বিশ্বাস হারাতে নেই। তাই সে রোগের তীব্র যন্ত্রণা নিয়েও সারস ভাঁজ করে যায়। সাদাকো বাঁচেনি। তার বানানো হাজারটা সারস আকাশে ওড়ার ডানা পায়নি। তবু সে শেষ অবধি হাল ছাড়েনি। সে বিশ্বাস করত, একদিন বোমারু বিমানের ঝাঁক গতি হারাবে সাদা সারসের ভিড়ে। আর একটা শিশুও যুদ্ধের বলি হবে না নীলগ্রহে। কোনও শিশুর লাশ দেখে রক্তলোলুপ হায়নার দল সহাস্য অপলক চাহনি ছুড়ে দেবে না। একদিন সব ঝড় থেমে আকাশ শুধু পাখির আশ্রয় হবে। আর ততদিন আমাদের প্রত্যেককে মিসাইলের বিপরীতে আদি অনন্ত সারসকে ডানা জোগাতে হবে। যাতে ওরা একদিন নিশ্চিন্তে আকাশ পেরিয়ে অন্তরিক্ষে পাড়ি দিতে পারে।




