চোখ-কান খোলা : পর্ব ৩৭

শ্রমিকের অধিকার   

ফ্রান্সে অবস্থিত ইনফোসিস-এর অফিসের কর্মীদের অফিসে উপস্থিত থাকার সময়, ফ্রান্সের শ্রম-নীতি মেনে হচ্ছে না, এমনটাই অভিযোগ এনেছে ফ্রান্সের আঞ্চলিক শ্রম কর্তৃপক্ষ DRIEETS Île-de-France (দ্রি-এতস-ইল-দ্য-ফ্রান্স)’ নামক সংস্থা। এই সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে শ্রম-নীতি অনুযায়ী একজন কর্মীকে যতক্ষণ অফিসে থাকতে হয়, আর ইনফোসিস সংস্থা এই বিষয়ে যে হিসেব দিচ্ছে, তাতে যথেষ্ট অস্বচ্ছতা রয়েছে। এই অভিযোগে ফ্রান্স প্রায় ১.৯ কোটি টাকা (১,৭৫,০০০ ইউরো) জরিমানা করেছে এই সংস্থাকে। ‘ইনফোসিস’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ,সংস্থার কর্মচারীদের অফিসে থাকার সময়-পর্বর রেকর্ডিং-ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি ছিল। বিশেষ করে ইনফোসিস-এর এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য (রিলায়েবল) নয়, পাশাপাশি রেকর্ড করা তথ্য সহজে নিরীক্ষণযোগ্য (অডিটেবল) নয়, সর্বোপরি কিছু ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজও করছিল না।

‘ইনফোসিস’ জানিয়েছে, এই জরিমানা তাদের সংস্থার কাছে বড় কিছু আর্থিক ক্ষতি নয়, তাদের শেয়ার-বাজারেও তেমন একটা প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু এই ঘটনা প্রভাব ফেলেছে সারা বিশ্বের ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’-তে। বিশেষত যে-সব কর্পোরেট সংস্থায় কর্মীদের অধিকার মালিক-পক্ষের কাছে ‘বিলাসিতা’ থুড়ি ‘ফাঁকিবাজির’ নামান্তর, যাদের কাছে অফিসের কোনও নির্দিষ্ট সময় হয় না, সারাক্ষণই নাকি ‘অফিস-যাপন’ করতে হয়, তাদের কাছে ফ্রান্স-ইনফোসিসের এই ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বোমার মতো ঝরে পড়ে কবিতা!
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৬…

ফ্রান্স কি কর্মচারীদের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য ‘ইনফোসিস’-কে জরিমানা করেছে? উত্তর, না। অফিসে কাজ করার সময়  বিভিন্ন মাপকাঠির ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত নজরদারি চালানোর জন্য ফ্রান্স এই জরিমানা করেছে, অর্থাৎ কর্মী-অধিকারের বাইরে গিয়ে ইনফোসিস এই নজরদারি চালিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের দেশগুলিতে শ্রমিক-অধিকার রক্ষার দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া শুরু করে সরকার-পক্ষ। তারপর বিশ্বায়ন-পরবর্তী সময়ে, যখন বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থাগুলি বিশ্বের নানা দেশে নিজেদের শাখা খুলতে শুরু করল, সে-সময় থেকেই আন্তর্জাতিক শ্রম আইন-সহ সেই নির্দিষ্ট দেশগুলির নিজস্ব শ্রম অধিকার আইনেও চুক্তিবদ্ধ হতে হয়েছিল সংস্থাগুলিকে। ‘ইনফোসিস’ সেই চুক্তিই লঙ্ঘন করেছে। 

ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফ্রান্সে শ্রমিকদের অধিকার অত্যন্ত শক্তিশালী। সেখানে কর্মীদের কাজের সময়, অতিরিক্ত কাজ (ওভারটাইম), সাপ্তাহিক ছুটির অধিকার এবং কাজের বাইরের ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষাকেও আইনি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নজর রাখা হয়, একজন শ্রমিকের ব্যক্তিগত জীবন যেন কখনও পেশাগত চাপে বিঘ্নিত না হয়। তাই ফ্রান্সে কর্মীদের ওপর নজরদারির বিষয় কেবলমাত্র কোন মানুষ কতক্ষণ কাজ করলেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা শ্রমিক-অধিকার রক্ষারও হাতিয়ার। এই সামগ্রিক তথ্য পরে শ্রমিকসুরক্ষা দফতরের কাছে জমা করতে হয় ফ্রান্সে কর্মরত প্রতিটি কোম্পানিকে। 

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নজরদারির ধরনও বদলেছে। আগে উপস্থিতি নথিভুক্ত হত কাগজে সই করে। পরে এল পাঞ্চিং মেশিন, বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা, স্মার্ট কার্ড। এখন সফ্‌টওয়্যার-নির্ভর ডিজিটাল টাইম ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে হাইব্রিড ও রিমোট কাজের প্রসার ঘটেছে। ফলে সংস্থাগুলি বিভিন্ন সফ্‌টওয়্যারের মাধ্যমে কর্মীদের লগ-ইন সময়, কম্পিউটার ব্যবহারের সময়, নির্দিষ্ট প্রকল্পে ব্যয়িত সময়, এমনকী কখনও-কখনও কি-বোর্ড বা মাউস ব্যবহারের তথ্যও সংগ্রহ করছে। এর উদ্দেশ্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন তুলেছে। শুধু তাই নয় কর্মী ফাঁকি দিচ্ছে কি না, তা নজর করারও এক ফন্দি এই নজরজারি। ফ্রান্সের তথ্য সুরক্ষা দফতর পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে, নিয়োগকর্তারা কর্মীদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, কিন্তু সেই পর্যবেক্ষণ অবশ্যই ‘যুক্তিসংগত’, ‘সীমিত’ এবং ‘স্বচ্ছ’ হতে হবে। কোনও কর্মীকে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত নজরদারির আওতায় রাখা যাবে না। এমনকী এমন সফ্‌টওয়্যারও (কি-লগার) গ্রহণযোগ্য নয়, যা কর্মীর প্রতিটি কি-বোর্ড মুভমেন্ট রেকর্ড করে। অথচ, সংস্থার কর্মীকে জানানোর কথা যে কর্মীর কোন কোন বিষয়ের ওপর সংস্থা নজর রাখছে। সে সুযোগ কি ইনফোসিস দিয়েছে? প্রশ্ন জাগে!

ফ্রান্সের কাছে কোনও কর্মী শুধুমাত্র ‘মানবসম্পদ’ নয়। ফ্রান্সের ‘Code du Travail (কোড দু ত্রাভাইল)’ বা শ্রম আইন পাঁচটি নীতির কথা বলে। ১) কর্মীর স্বাস্থ্য রক্ষা ২) কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য ৩) অতিরিক্ত শ্রমের সীমা নির্ধারণ ৪) নিয়োগকর্তার কর্মীদের প্রতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ৫) কর্মীর গোপনীয়তা রক্ষা। পাশাপাশি, ফ্রান্সে ২০০০ সাল থেকে ৩৫ ঘণ্টার শ্রমনীতি কার্যকর হয়। এর অর্থ এই নয় যে, কেউ ৩৫ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবেন না। ৩৫ ঘণ্টাকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে কাজের প্রয়োজনে তা ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত হতে পারে। তবে, বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দিতে হবে, ওভারটাইমেরও আইনি সীমা রয়েছে। কর্মীকে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম দিতে হবে। এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, বেকারত্ব কমানো, কাজ ভাগ করে দেওয়া, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। ঠিক এ-কারণেই ফ্রান্সে কাজের সময় পর্ব নথিবদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ, যা থেকে বোঝা যাবে কাউকে আইনের থেকে বেশি পরিমাণ কাজ করতে হচ্ছে কি না। 

আসলে ইউরোপের অধিকাংশ দেশে, আধুনিক শ্রম আইন গড়ে উঠেছে, উনিশ ও বিশ শতকের শ্রমিক আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়নের সংগ্রাম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জন-কল্যাণমূলক রাষ্ট্র (ওয়েলফেয়ার স্টেট)-এর ধারণার উপর ভিত্তি করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করা নয়, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অবসর, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ— এই ধারণাই ইউরোপীয় শ্রম আইনের ভিত্তি। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে মানে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কার শ্রম আইন অনেকাংশেই এখনও ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোর উত্তরাধিকার । স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সংস্কার হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ। ফলে শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পোৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা হলেও, বাস্তবে উৎপাদনশীলতার স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়েছে। 

ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম দেশ, যে ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’-কে আইনি স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ, অফিসের নির্দিষ্ট সময়-পর্ব শেষ হওয়ার পর আর কোনওভাবেই অফিসের কাজ না করার অধিকার কর্মীদের রয়েছে। ভারত-সহ নানা দেশের কর্পোরেট অফিস-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, টানা আট-দশ ঘণ্টা অফিসে কাজ করেও, বাড়ি ফেরার পর যখন-তখন অফিসের ফোন আসছে। ফোন না ধরলেই ম্যানেজারের তরফ থেকে ভর্ৎসনা অথবা সরাসরি চাকরি খেয়ে নেওয়ার হুমকি! অগত্যা কর্মচারীকে সে-ফোন ধরতেই হয়। চাকরির এই সংকুচিত বাজারে, নিজস্ব সময় বা নিজস্ব অবকাশ বলে কিছুই নেই কর্মীদের, যেন তার চব্বিশটি ঘণ্টা অফিসের জন্যই নিয়োজিত। ফ্রান্স-সহ ইউরোপের নানা দেশ, কর্পোরেট সংস্কৃতির এই চেনা ছক ভেঙে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে। এই নীতি ফ্রান্সে কার্যকর হয় ২০১৭ থেকে। স্পষ্ট বলা হয়, কোনও কর্মী অফিসের নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ার পর ই-মেল, ফোন বা অফিসের অন্য কোনও নির্দেশের উত্তর দিতে বাধ্য নন। যদি অফিস বাধ্য করে, তাহলে সেই কর্মী অফিসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ঠিক এখানেই ভারতের চিত্রটা দেখা যাক। কিছু দিন আগে, ‘ইনফোসিস’-এরই অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-কর্ণধার, এন আর নারায়ণমূর্তি বলেছিলেন, সপ্তাহে অন্তত ৭০ ঘণ্টা কাজ করা বাঞ্ছনীয়। ফ্রান্সে যেখানে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার মানদণ্ড ৩৫ ঘণ্টা, সেখানে ভারতে আজও দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কর্মচারীদের কাজ করতে হয়। সপ্তাহান্তেও কাজ করতে হয়। ছুটির দিনে কাজ তো বটেই! 

সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, এই কর্পোরেট সংস্কৃতিকে ভারত-সহ উন্নয়নশীল অর্থনীতির নানা দেশে ‘প্রোমোট’ করা হয়। যেন যা হয়ে এসেছে এতকাল, তা-ই চলবে। চিরকাল মালিক-পক্ষ অধিক শ্রমের বিনিময়ে শোষণ করে এসেছে শ্রমিকদের। তবে যে-দিন শ্রমিকরা প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে, তখন মালিকপক্ষের কোনও নীতিই ধোপে টেকেনি। ফ্রান্সের এই ঘটনা, যেখানে দেশের সরকারও বেসরকারি কোম্পানির নীতিতে হস্তক্ষেপ করে শ্রমিক-অধিকার রক্ষা করতে তৎপর— আশা জাগায় সেই সব কর্মচারীদের মনে, যারা মুখ বুজে নিজেদের সবটুকু দিয়ে কাজ করতে বাধ্য হয়, কিন্তু স্বপ্ন দেখে, ‘অধিকার বুঝে নেওয়া প্রখর দাবি’-তে একদিন তারা নিজেদের পাওনাটুকু আদায় করে নেবে।