শিথিল কামনার ভার

নারীশরীর এক বিস্ময়। নারীশরীর রহস্যের আধার, আবেদনময়, জটিল এবং নিজের ভিতরে নতুন প্রাণধারণে সক্ষম। ফলে সৃষ্টির গোড়া থেকেই নারীশরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে পুরুষতন্ত্র। তাই এই শরীরের কথা, তার ভালোলাগা, আহ্লাদ, যৌন চাহিদা, কামতাড়না, যন্ত্রণা, অপমান, আঘাত— সমস্ত কিছু প্রকাশের ভাষাসন্ধান করা আজ ভীষণরকম প্রয়োজন। যে-শরীরের আর্তি, আর্তনাদ, আশ্লেষ, আবদার— সমস্তরকম স্বরকে ইচ্ছে করে মুছে ফেলা হয়েছে, গুরুত্বহীন বলে গণ্য করা হয়েছে, সেই শরীরের সমস্ত অনুভূতির কথা দৃঢ কণ্ঠে শোনানোর দায়িত্ব আজ নারীরই। 

আদি সময় থেকেই নারীশরীরের ইচ্ছে-কামনা-আকাঙ্ক্ষাকে কীভাবে দমন করা হয়েছে গোটা পৃথিবীতে, বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্য তা বার বার প্রমাণ করেছে। বেদ-বাইবেল-কোরান ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ, প্রাচীন মহাকাব্য ও অন্যান্য সাহিত্যে দেখা যায় পাপ-পুণ্য, সামাজিক সম্মানরক্ষা ইত্যাদির দোহাই দিয়ে বার বার কেড়ে নেওয়া হয়েছে নারীদের শরীরের উপর থেকে তাদের নিজেদেরই নিয়ন্ত্রণ। মহাভারতের সভাপর্বে দুর্যোধনের সঙ্গে পাশা খেলার সময়ে যুধিষ্ঠিরের দ্রৌপদীকে বাজি ধরা থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময়ে মেয়েদের জনসমক্ষে অনায়াসে ‘স্লাটশেম’ করা— এই সবটাই সম্ভব হয়েছে নারীদের শরীর এবং শরীর-সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের হাত থেকে নির্দ্বিধায় কেড়ে নেওয়ার ফলে। 

আজ যখন চতুর্দিকে নারীদের যৌন স্বাধীনতা, শরীরী ইচ্ছে-অনিচ্ছের মর্যাদা নিয়ে আলোচনা চলছে— সেক্ষেত্রে এটিই উপযুক্ত সময়, যখন একবার আমাদের ফিরে তাকানো উচিত সাহিত্যের সেই সব নারীচরিত্রের দিকে, যাদের স্বাভাবিক যৌন-প্রবৃত্তি ও রতিকামনার ভাষাকে অসভ্যতা বা অশ্লীলতা বলে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র নারীচরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার কারণে তাদের যৌন-বাসনা এবং অভিলাষকে ছাইচাপা দিয়ে চরিত্রগুলির স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজন সম্পূর্ণ স্বাধীন মানুষ হিসেবে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠার পথকে রুদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে সাহিত্যিকরা কিছু ক্ষেত্রে সাহিত্যমহলে চূড়ান্ত সমালোচনার হাত থেকে হয়তো নিষ্কৃতি পেয়ে থাকবেন, কিন্তু এই সংযম বজায় রাখতে গিয়ে অনেক চরিত্রের সম্পূর্ণ বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

আরও পড়ুন : সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মধ্যে সেতু বেঁধেছিলেন আরনেস্ট হেমিংওয়ে! লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…

এ-প্রসঙ্গে যে-নারীচরিত্রের কথা প্রথমেই মনে পড়ছে, তিনি হলেন গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিডিস-সৃষ্ট চরিত্র ফেড্রা। ইউরিপিডিসের ‘হিপোলিটাস’ নাটকে ফেড্রা তার সৎপুত্র হিপোলিটাসের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে, কিন্তু ফেড্রা এথেন্সের রাজা থিসিয়াসের স্ত্রী। এথেন্সের রানি হিসেবে নিজের সম্মানের কথা ভেবে সে অপরাধবোধ এবং লজ্জায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। হিপোলিটাস ফেড্রার প্রতি কোনওরকম মনোযোগ না দেওয়ায়, বিষাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে ফেড্রা। একজন মায়ের তার পুত্রের প্রতি প্রেম এবং যৌন আকর্ষণ তৈরি হওয়ার মতো বিষয়কে এই অতি-আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও যেখানে চূড়ান্ত অনৈতিক এবং অযাচার বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে, সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ৪২৮ শতাব্দীতে এমন সম্পর্কের কথা তো ভাবাই যায় না! কিন্তু জুডিথ বাটলার তাঁর Antigone’s Claim প্রবন্ধে এই ধারণা দেন যে, মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে কোন সম্পর্ককে সামাজিক সম্পর্ক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং কোন সম্পর্ককে দেওয়া হবে না। তাই ফেড্রা-র সঙ্গে হিপোলিটাসের রক্তের সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও যেহেতু সামাজিকভাবে তাদের মধ্যে মা এবং পুত্রের সম্পর্ক ছিল, সেই কারণে ফেড্রা-র হিপোলিটাসের প্রতি আকর্ষণ অনৈতিক এবং লজ্জাজনক বলে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয়। এই নাটকে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং একজন নারী হয়ে পুত্রের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ফেড্রা নিজেই নিজেকে শাস্তি দেন। নাট্যকার ফেড্রা-র চাহিদা, তার কামাকাঙ্ক্ষার স্বরকে প্রচ্ছন্ন রাখেন; স্বাধীনভাবে ফেড্রাকে তার ইচ্ছেগুলি প্রকাশ করার সুযোগ দেন না। 

ফেড্রা

হোমারের ‘ইলিয়ড’-এ আমরা পাই, গ্রিসের বীর যোদ্ধা আকিলিসের সঙ্গমসঙ্গিনী ব্রাইসিসের কথা। ব্রাইসিস ছিল একটি ট্রোজান শহরের যুবতী, যাকে গ্রিকসেনারা বন্দি করে। পরে আকিলিস বাইসিসকে শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে ব্যবহার করে। ‘ইলিয়ড’-এ ব্রাইসিসিকে শুধুমাত্র একটি নারীশরীর হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে সে আকিলিসের একজন সেবাদাসীমাত্র। হোমার ব্রাইসিসের নিজস্ব ইচ্ছে-আকাঙ্ক্ষা, আকিলিসের প্রতি তার আকর্ষণ বা অনীহা কোনও কিছুই পাঠককে স্পষ্ট করে জানাননি। সেই অত্যন্ত জরুরি কাজটি করেছেন ব্রিটিশ সাহিত্যিক প্যাট বার্কার তাঁর The Silence of the Girls উপন্যাসে। এই গল্পে বার্কার ব্রাইসিসের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আকিলিসের কাহিনিকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। পাঠক শুনতে পেয়েছেন ব্রাইসিসের কয়েকশো বছর ধরে নীরব হয়ে থাকা কণ্ঠস্বর। জানতে পেরেছেন ব্রাইসিসের নিজস্ব চিন্তা, মতামত, পুরুষ সম্পর্কে তার ধারণা। সে বীর যোদ্ধা আকিলিসের কাছ থেকে অন্তত যৌন পরিতৃপ্তিটুকু পাবে বলে আশা করেছিল কিন্তু পরিবর্তে যা পেয়েছিল তা হল— ‘He fucked as quickly as he killed, and for me it was the same thing. Something in me died that night.’ ব্রাইসিসের চোখে আকিলিসের বীরত্ব পূজনীয় নয়। সে বলছে, আকিলিস তাকে যৌনসুখ দিতে অক্ষম। প্যাট তাঁর এই উপন্যাসে ব্রাইসিসের যৌন চাহিদার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। হোক তা কল্পিত কণ্ঠস্বর, তবু তো খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া ব্রাইসিস অবশেষে ২০১৮ সালে তাঁর নিজের ইচ্ছে এবং মতপ্রকাশের স্বর খুঁজে পেলেন! 

একইরকমভাবে শেক্সপিয়ারের নাটক Twelfth Night-এ আমরা ভায়োলা চরিত্রটিকে দেখি, সে যথেষ্ট দৃঢ়চেতা এবং মানসিকভাবে অদম্য হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাকে পুরুষের ছদ্মবেশ গ্রহণ করতে হয়। সমাজের চোখে নিজের সম্মান বাঁচাতে সে ডিউক অরসিনোর প্রতি নিজের আকর্ষণ এবং প্রেমের অনুভূতির কথা প্রকাশ করতে পারে না। ভায়োলা সিজারিও নামের এক যুবকের ছদ্মবেশ ধারণ করে এবং অরসিনোর রাজসভার সভাসদ হিসেবে নিযুক্ত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই সে অরসিনোর অত্যন্ত বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে ওঠে। ডিউক অলিভিয়ার প্রতি তাঁর প্রেম-নিবেদনের ব্যর্থতার কথা সিজারিওকে জানায়। অরসিনোর অন্য নারীর প্রতি আকর্ষণের কথা শুনে ভায়োলার মনে জন্ম নেয় বিষণ্ণতা। নিজের অরসিনোর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অপারগতার গ্লানি তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করতে থাকে। এখানেও একজন নারী হিসেবে ভায়োলার মনের ইচ্ছে এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা খর্ব করেছেন নাট্যকার। ভায়োলা তার অন্তরের সমস্ত সুপ্ত প্রেমাকাঙ্ক্ষাকে ঘুম পাড়িয়ে স্থৈর্য এবং ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে, যেন হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছে বিষাদকে। এই নারীচরিত্রই কাঙ্ক্ষিত, সমাজে সমাদৃত এবং সম্মানিত। কিন্তু এই সম্মান এবং সমাদরের নেপথ্যে রয়েছে ইচ্ছের অবদমন এবং নারী-কণ্ঠরোধের সুদীর্ঘ ইতিহাস। 

‘She sat like Patience on a monument,
Smiling at grief.’ (Act 2, Scene 4)

শেক্সপিয়ারের ট্র‍্যাজেডি Hamlet এবং Othello-র দুই নারীচরিত্র ডেসডিমোনা এবং ওফেলিয়ার ক্ষেত্রেও একইভাবে তাদের অনুভূতি প্রকাশের স্বরকে রুদ্ধ করা হয়েছে। তাদের ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা কোনওভাবেই গুরুত্ব পায়নি এবং শুধুমাত্র নিজেদের মনের কথা সাবলীলভাবে প্রকাশ না করতে পারার ফলে দুজনকেই অকালে ঢলে পড়তে হয় মৃত্যুর কোলে। মার্কিন প্রাবন্ধিক সুজান সনটাগ তাঁর The Aesthetics of Silence প্রবন্ধে বলছেন, ‘Silence remains, inescapably, a form of speech.’ নৈশঃব্দ্য একটি ধ্বনি। যা বলা হচ্ছে, তার ভিতরের যে না-বলা, তা ভীষণভাবেই বাঙ্ময়। যা লেখা হয়েছে, অর্থাৎ যাকে বলা হয় ‘টেক্সট’, সেই লেখার মধ্যে যে-শূন্যস্থান, তারও রয়েছে নিজস্ব স্বর। যাকে বলা হয় সাবটেক্সট। এই সাবটেক্সট থেকে তৈরি হয় নতুন কাহিনি। কথার মাঝের নীরবতা সাহিত্যকে দেয় নতুন-নতুন অর্থ। 

ওফেলিয়া

এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে, ১৮৪৭ সালে শার্লট ব্রন্টের উপন্যাস Jane Eyre-এর এক স্মরণীয় নারীচরিত্র বার্থা মেসনের কথা, যিনি ছিলেন রচেস্টারের প্রথম স্ত্রী। মানসিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে তাকে চিলেকোঠার ঘরে আটকে রাখে রচেস্টার। জেনের সঙ্গে রচেস্টারের বিয়ের ঠিক আগে বার্থার কথা জানাজানি হয়। এখানে লেখক বার্থার নিজস্ব কণ্ঠস্বরকে উঠে আসতে দেন না, ফলে নারী হিসেবে স্বামীর কাছ থেকে তার চাহিদা, তার প্রেমাকাঙ্ক্ষা কিছুই পাঠক জানতে পারে না। বার্থার মানসিক বিকার আসলে তাকে দিয়ে কথা বলিয়ে নিতে চায়, যার জন্য তাকে চিলেকোঠার ঘরে আটকে রাখার প্রয়োজন পড়ে। এই চিলেকোঠা আসলে সমাজ-কারাগার। ব্রিটেনে ভিক্টোরিয়ার শাসনকালে নারীদের অনেক বিষয়ে মুখ বন্ধ করে সহ্য করতে হত সামাজিক বঞ্চনা, অপমান এবং অত্যাচার। বার্থা সেইসব কথা বলতে চাইলে তাকে উন্মাদ বলে থর্নফিল্ড হলের চিলেকোঠায় বন্দি করে রাখা হয়। এবং এই বার্থা চরিত্রটিকে অবশেষে কণ্ঠস্বর দেন জঁ রিস, Jane Eyre প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ১২০ বছর পর তাঁর উপন্যাস Wide Sargasso Sea উপন্যাসে। তিনি বার্থার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখান কাহিনির ঘটনাক্রম। উপন্যাসে আন্তোনিয়েত্তে কসওয়ে নামক এক মহিলার উপর বার্থা নামটি আরোপ করা হয়। আমরা গোটা উপন্যাস জুড়ে এই মহিলাকে নিজের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে যেতে দেখি এবং উপন্যাসের শেষে দেখা যায় সে এই আরোপিত পরিচয়কে শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে পারেনি। সে শেষপর্যন্ত সমস্ত মানসিক বাধা অতিক্রম করে নিজের ইচ্ছেকে, নিজের অস্তিত্বের নীরব সন্ধানকে প্রাধান্য দেয় এবং নিজের উপর অন্যদের আরোপ করা পরিচয় ধ্বংস করতে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। এই উপন্যাসকে অনেকেই Jane Eyre-এর প্রিক্যুয়েল বা পূর্বকাহিনি হিসেবে দেখেন। 

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস Of Love and Other Demons -এ সিয়ের্ভা মারিয়া, এক ১২ বছর বয়সি কিশোরী, কুকুর কামড়ানোর ফলে তার মধ্যে রেবিসের উপসর্গ দেখা দেয়। চার্চের তরফ থেকে বলা হয় যে মেয়েটির শরীরে প্রেতাত্মা ভর করেছে এবং অবিলম্বে আত্মা বিতাড়িত করার ধর্মীয় আচার পালন করতে হবে। এই ঝাড়ফুঁক করার জন্য নিয়োগ করা হয় কায়েতানো দেলাউরা নামের এক ধর্মযাজককে। দেখা যায়, এই পাদ্রি মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কায়েতারো-র সম্পর্ক গড়ে উঠলেও সিয়ের্ভা কঠোর ধর্মীয় রীতিনীতির কাঁটাতার অতিক্রম করে তার প্রেম বা দৈহিক চাহিদার কথা প্রকাশ করতে পারে না। কঠিন ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিধিবদ্ধতা মেয়েটির স্বরকে নীরব করে দেয়। এই উপন্যাস একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা পাঠককে জানায়— ‘There are no medicines for what has no cure.’

১৮৯২-তে প্রকাশিত মার্কিন সাহিত্যিক শার্লট পারকিন্স গিলবার্টের দীর্ঘকাহিনি The Yellow Wallpaper পাঠকমহলে ঝড় তোলে। এই গল্পে দেখা যায়, এক নামবিহীন মহিলাকে তার স্বামী জন সন্তানজন্মের পর একটি নির্জন গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে, যেহেতু ওই মহিলা প্রসবোত্তর বিষন্নতার শিকার ছিল। এই মহিলার স্বামী তাকে সবদিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। তাকে বিশ্রাম দেওয়ার নাম করে জন তার স্ত্রীকে বই পড়া, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা, কোনও গভীর বিষয় নিয়ে চিন্তা করা— এই সব কিছু থেকে বিরত রাখে। মহিলাকে একটি হলুদ রঙের ওয়ালপেপারে মোড়া ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়। ধীরে-ধীরে ওই ঘরে বদ্ধ অবস্থায় থাকতে-থাকতে এক সমযয়ে এই হলুদ ওয়ালপেপারের নকশার মধ্যে সে অন্য একজন মহিলাকে দেখতে শুরু করে। সে দেখে, ওই হলুদ ওয়ালপেপারের নকশা-কাটা খাঁচায় অন্য একজন মহিলাটিকে আটকে রাখা হয়েছে। এবং এক সময়ে সে আর তার কল্পিত মহিলাটির বন্দিদশা সহ্য করতে না পেরে গোটা ঘরের হলুদ ওয়ালপেপার ছিঁড়ে ফেলে। এই গল্পেও পাঠক মুখোমুখি হন একজন নারীর মানসিক এবং শারীরিক একাকিত্বের সঙ্গে। এই নারীর স্বামী একবারও জানতে চান না তার স্ত্রীর কী প্রয়োজন। হয়তো তার প্রয়োজন স্বামী-সঙ্গের, ভালোবাসার, সহমর্মিতা, কথোপকথন করার একজন মানুষের। কিন্তু এই নারীর চাহিদা বা ইচ্ছের কথা তাকে বলতে তো দেওয়া হয়ই না, উলটে তাকে বন্দী করে রাখা হয়। তাই ওই হলুদ ওয়ালপেপারের জটিল নকশার মধ্যে এই নারী নিজের বন্দিদশাকেই প্রতিফলিত হতে দেখে এবং সেই ওয়ালপেপার ছিড়ে ফেলে সে মুক্ত হতে চায় তার বদ্ধ মনের গুমোট কারাগার থেকে। 

নারীদের স্বাভাবিক চাহিদা বা যৌন ইচ্ছেকে বরাবরই সমাজে অসভ্যতা বা লজ্জাহীনতা বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারী তার কামনা বা শারীরিক চাহিদাকে প্রকাশ করলেই সেই নারীকে বলা হয়েছে কামপ্রলোভিনী, অশ্লীল কাজে লিপ্ত, পতিতা।

ভারতীয় সাহিত্যিক ইসমাত চুগতাই লিখিত ছোটগল্প ‘গেঁদা’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। এই গল্পে আমরা দেখি, গেঁদা নামের এক গ্রামের গরিব ঘরের কিশোরীর বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার স্বামী মারা যায়। এরপর ওই কিশোরীকে বিধবাদের নানা সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে হয়। তার পোশাক-আশাক, আচরণ, ভবিষ্যৎ— সবই নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে অন্যদের দ্বারা। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে, মেয়েটির মধ্যে শারীরিক চাহিদা এবং যৌনতার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হতে শুরু করে। তার যৌন ইচ্ছে ও আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে সমাজ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধ। এই একই ঘটনা আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘চোখের বালি’তে। এই উপন্যাসে বিনোদিনীর চরিত্রটির ক্ষেত্রে পাঠক দেখে, সে লেখাপড়া জানা, শহুরে সভ্যতার সঙ্গে মানানসই একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শরীর নিয়ন্ত্রিত হয় সমাজ দ্বারা। স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাধীনভাবে বিনোদিনীও নিজের শরীরকে চালনা করতে পারে না; স্পষ্ট করে বলতে পারে না তার চাহিদার কথা। 

১৯৭৭-এ প্রকাশিত ভারতীয় কবি ও সাহিত্যিক কমলা দাসের A Doll for the Child Prostitute গল্পে রয়েছে একটি বাচ্চা মেয়ের করুণ পরিণতির কথা। পরিবার থেকে বিতাড়িত ছোট্ট একটি মেয়ে রুক্মিণী, পুরুষদের দ্বারা অত্যাচারিত হয় এবং অবশেষে মুম্বইয়ের একটি বেশ্যালয়ে আশ্রয় পায়। ছোট বয়সেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সমাজের উঁচু স্তরের পুরুষদের হাতে সে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হতে থাকে। এই গল্পেও আমরা একটি বাচ্চা মেয়ের শরীরকে নিয়ন্ত্রিত হতে দেখি ক্ষমতাশালী মানুষদের দ্বারা। মেয়েটির ইচ্ছে-অনিচ্ছের কথা পাঠক শুনতে পান না। আরবি সাহিত্যিক নাওয়াল এল সাদাউই লিখিত She has no place in Paradise উপন্যাসও বলে সেইসব প্রান্তিক নারীদের কথা, যাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র, পুরুষতন্ত্র এবং সমাজ। 

নারীদের স্বাভাবিক চাহিদা বা যৌন ইচ্ছেকে বরাবরই সমাজে অসভ্যতা বা লজ্জাহীনতা বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারী তার কামনা বা শারীরিক চাহিদাকে প্রকাশ করলেই সেই নারীকে বলা হয়েছে কামপ্রলোভিনী, অশ্লীল কাজে লিপ্ত, পতিতা। একজন নারীরও যে পুরুষের মতোই স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদা, যৌনতাড়না বা কামলিপ্সা থাকতে পারে এবং সেই প্রবৃত্তি প্রকাশ করার বিষয়টি যে একেবারেই সহজ এবং স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে, তা যেন পুরুষতন্ত্রের দ্বারা দীর্ঘদিনের কণ্ঠরোধ করার অভ্যাসের ফলে মানুষ ভুলতে বসেছিল। তবে বাদ সাধল কিছু ব্যতিক্রমী কণ্ঠ— যাঁরা নারীশরীর, তার কামনা-বাসনা, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, ভালোলাগা, যন্ত্রণা-সহ সমস্ত কিছুই দৃঢ়তা এবং সাবলীলতার সঙ্গে প্রকাশ করবার অধিকার দাবি করে বসল। তারা লড়াই করল, করছে, এবং আগামীদিনেও করবে। তাই প্রয়োজন পড়ছে ইতিহাসের পথ ধরে হেঁটে গিয়ে সেইসব মাটিচাপা কণ্ঠস্বর উদ্ধার করা— যারা নিজেদের কথা নিজেরা বলতে পারেনি। টনি মরিসন বলেছিলেন, ‘Freeing yourself was one thing, claiming ownership of that freed self was another.’ এই লড়াই শুধুমাত্র হৃত কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধারের লড়াই নয়, এই যুদ্ধ প্রাচীন এক যন্ত্রণাকে নারীদের সমষ্টিগত স্মৃতি হিসেবে মান্যতা দিয়ে তার অপরিসীম প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত করার যুদ্ধ।