মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৮

ভয়-ভয় বেলা

আমার এখন সবসময় ভয় করে। ঠিক কীসের ভয়, বলা কঠিন। আমার চারপাশে নানা ঘটনা ঘটে চলে, আর তার ফলাফল আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। আবার এই আশঙ্কাও ভয় পাইয়ে দেয় যে, আমার চারপাশে আরও নানা ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি কখনও মনে হয়, ঘটনাগুলো হয়তো আমার কারণেই ঘটছে। সেই অপরাধবোধও আমাকে ভয় দেখায়। মনের মধ্যে একটাই মনোলগ চলতে থাকে— সব ঘটনার কারণ যাই হোক, দোষটা নিশ্চয়ই আমারই। আমিই আমার কাজ ঠিকমতো করতে পারিনি বলেই এই সব অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে।

তাহলে? ফের ঝোড়ো, এলোমেলো, তীব্র গতির প্রশ্নগুলো আমার মনের মধ্যে আছড়ে পড়তে থাকে। আমার কি আরও বেশি অ্যাকটিভ হওয়া দরকার? তাহলে কি ছেলে স্কুলে যাওয়ার সময় সবকিছু মনে থাকবে—ওকে কী কী দিতে হবে? পরের দিন যে এক্সকারশনের ফর্মটা জমা দিতে হত, স্কুলে যার শেষ দিন ছিল, সেটা তো ভুলে গেলে চলবে না। অফিসের একটা রিপোর্ট আজ শেষ করে দেওয়ার কথা, তাহলে কেন আমি তাড়াহুড়ো করে কাল বাড়ি চলে এলাম? আজ সকালের মধ্যে যদি রিপোর্টটা শেষ করতে না পারি? আমিও যেন কেমন একটা অদ্ভুত মানুষ হয়ে গেছি। কেন যে মাথার মধ্যে কিছুই গুছিয়ে রাখতে পারি না! আমার কাণ্ড দেখ! যত বয়স হচ্ছে, তত যেন ক্যাবলা, অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছি। অযথা চিন্তা করছি। বাড়িতে বসে অফিস নিয়ে টেনশন করছি, আর অফিসে বসে বাড়ির যত ঝামেলার কথা মনে পড়ছে। কী যে করি! অথচ আমি তো এমনটা ছিলাম না। এটা কি আমার এই মাঝবয়সের বেয়াড়াপনা? না কি আমার হরমোনের অবাধ্যতা? কিন্তু কারণ যাই হোক, আমার শরীর হয়তো ঝিমিয়ে পড়তে পারে, কিন্তু আদত আমিটা তো বদলে যাওয়ার কথা নয়!

মাঝবয়সি মেয়েদের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা জবাবদিহি না করা!
পড়ুন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ৭…

তখন বুঝতে পারি, আমার সবচেয়ে বড় ভয়টা আসলে অন্য জায়গায়। আমি এত বছরের আমার বাধ্য, অনুগত ‘আমি’-টাকে আর চিনতে পারছি না। যেন আমার সবকিছু বদলে গেছে। শরীর থেকে মস্তিষ্ক, ফিটনেস থেকে অনুভূতি— সবটাই যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে। এই ভয়ংকর সত্যিটা বুঝে ফেলার পর আরও ভয় পাই। আকাশ-পাতাল চিন্তা করতে থাকি, আঁতিপাঁতি করে কারণ খুঁজতে থাকি। স্ট্রেস বাড়তে থাকে, দম আটকে আসে, বুক ধড়ফড় করতে থাকে। হঠাৎ ঘামতে শুরু করি, ঢকঢক করে জল খাই। আর ঠিক তখনই মনে পড়ে— আরে! এই বয়সে তো আমার হট ফ্ল্যাশ হওয়ারই কথা। নিজের মনকে সান্ত্বনা দিই— এটা আসলে শরীরের বদল, আমি একটু বেশিই ভাবছি। কিন্তু মন-মস্তিষ্ক এত সহজ একটা কারণ মেনে নিতে চায় না। ভাবে, ছ’মাস আগেও তো আমার এরকম হত না। তার মানে আমিই কোথাও ভুল করছি। আমি মনে হয় অলস হয়ে গেছি, আমিই মনে হয় কিছুতে মন দিচ্ছি না, আমিই মনে হয় ফাঁকি মারছি। কিন্তু বুঝতে পারি, এভাবে তো জীবন চলতে পারে না। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।

তাই নিজের পক্ষে একটা উত্তর খুঁজতে ইন্টারনেট খুলে বসি। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, পেরিমেনোপজ ও মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন-সহ বিভিন্ন হরমোনের ওঠানামা শুধু ঋতুচক্র নয়, ঘুম, মেজাজ, মনোযোগ এবং স্মৃতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ‘The Menopause Society’-র মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এই সময়ে অনেক মেয়ে ‘ব্রেন ফগ’, মনোযোগের ঘাটতি, উদ্বেগ, আবেগের ওঠানামা এবং বিষণ্ণতার মতো উপসর্গ অনুভব করেন। নিজের মনে একটু শান্তি এলেও বাইরের দুনিয়া ছেড়ে কথা বলে না। বিরক্তির পুঁটলি খুলে বসে অনবরত বলতে থাকে— ‘এই বয়সে পৌঁছে তো দেখা যাচ্ছে কিছুই আর পেরে উঠছ না! কী হল? দেখো বাবা, সব কিছুর দোষ হরমোনের ঘাড়ে চাপিও না। নিজেকে একটু সামলাও। অন্য কিছুর ওপর দোষ দেওয়া সহজ, নিজেকে শুধরে নেওয়া কঠিন।’

দোষ? অন্য কিছুকে?

এই মোক্ষম দোষারোপ আরও ভেঙে দেয় তলানির আত্মবিশ্বাসটুকু। মনে হতে থাকে, হয়তো বাইরের পৃথিবী যা বলছে, সেটাই ঠিক। আমি-ই বোধহয় একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছি। যে মেয়ে নিজেই বুঝতে পারছে না, তার ভেতরে কী হচ্ছে, তাকে বলা হচ্ছে— ‘নিজেকে সামলাও।’

কিন্তু কীভাবে?

কেউ যদি পা ভেঙে ফেলে, আমরা বলি না, ‘মনের জোর বাড়াও, ঠিক হয়ে যাবে।’ কেউ যদি মাইগ্রেনে ভোগে, তাকে বলি না, ‘হাসিখুশি থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু মাঝবয়সি একটা মেয়ের মন যখন অস্থির হয়ে ওঠে, আমরা অবলীলায় ধরে নিই, এটা তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা। আর এই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বড় অন্যায়। কারণ সে শুধু শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে লড়ছে না, লড়ছে নিজের অপরাধবোধের সঙ্গেও।

আজ সে একটু ভুলে গেছে। আজ সে রান্না করতে চায়নি। আজ সে ছেলেমেয়েকে একটু বেশি বকাবকি করেছে। আজ সে অফিসে মন দিতে পারেনি। আর রাতে শুয়ে সে নিজেকেই বিচার করছে— ‘আমার জন্যই সবাই বিরক্ত হচ্ছে।’

শরীরের পরিবর্তনের দায়ও যেন চরিত্রের ওপর বর্তায়। এই আত্মদোষারোপ নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয়, সংসারে কিছু ভুল হলে আগে নিজের দিকে তাকাও। সম্পর্ক ভাঙলে ভাবো, তুমি কোথায় কম দিলে। বাচ্চার মনখারাপ করলে ভাবো, তুমি কি যথেষ্ট মা হতে পারলে? এতদিন ধরে নিজের দিকে আঙুল তুলতে-তুলতে একসময় শরীরের বিরুদ্ধেও সেই আঙুল ওঠে।

অথচ তার কোনও দোষ নেই— এই কথাটা তাকে খুব কম মানুষই বলে।

মাঝবয়সি মেয়েদের নিয়ে আমরা খুব সহজে রসিকতা করি। ‘আজকাল খুব ভুলে যায়’, ‘কথায় কথায় কাঁদে’, ‘মেজাজটা একদম সহ্য হয় না’— এইসব মন্তব্যে আমরা হেসে উঠি। কিন্তু কেউ ভাবি না, যে ভুলে যাচ্ছে, তার ভয়টা কতটা গভীর। কারণ সে জানে, এতদিন এই স্মৃতির ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল গোটা সংসার। কার ওষুধ কখন, কার টিফিন, কার পরীক্ষার তারিখ, কার জন্মদিন— সব তার মাথায় ছিল। আজ সে যদি নিজের চশমাটাই খুঁজে না পায়, তাহলে তার মনে হয়, সে কি ধীরে-ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে?

গবেষণা বলছে, এই সময়ে সাময়িক স্মৃতি ও মনোযোগের সমস্যা অস্বাভাবিক নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ঘুমের ব্যাঘাত, হরমোনগত পরিবর্তন ও মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু তথ্য জানলেই ভয় চলে যায় না। কারণ ভয়টা তথ্যের নয়, পরিচয়ের।

একজন মানুষ যখন নিজের ওপর ভরসা হারাতে শুরু করে, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমাধান নয়, আশ্বাস। আমাদের সমাজ আশ্বাস দিতে খুব কৃপণ। উপদেশ দিতে উদার। ‘যোগব্যায়াম কর, মেডিটেশন কর, নিজেকে ব্যস্ত রাখ, কম ভাব।’—এসব কথা ভুল নয়। কিন্তু এই কথাগুলোর আগে একটা বাক্য থাকা দরকার ছিল— ‘আমি বিশ্বাস করি, তুমি ইচ্ছে করে এমন হচ্ছ না।’

বিশ্বাস— এই শব্দটাই মাঝবয়সি মেয়েরা সবচেয়ে কম পায়। তার আবেগকে বিশ্বাস করা হয় না। তার ক্লান্তিকে বিশ্বাস করা হয় না। তার বিভ্রান্তিকেও বিশ্বাস করা হয় না। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, একসময় তারা নিজেরাও নিজেদের বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়।

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ (WHO) বারবার বলেছে, মেনোপজকে শুধু প্রজননক্ষমতার সমাপ্তি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুস্থ বার্ধক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে শারীরিক ও মানসিক— দুই ধরনের সহায়তাই প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের পরিবারে মেনোপজ এখনও একটি ফিসফিস করে উচ্চারিত শব্দ। ঋতুস্রাব নিয়ে যেমন একসময় কথা বলা হত না, মেনোপজ নিয়েও এখনও তেমনই নীরবতা।

অথচ বিশ্বজুড়ে লক্ষ-লক্ষ মেয়ে এই একই সেতু পার হচ্ছে। ‘The Lancet’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মেনোপজ মেয়েদের জীবনের একটি জৈবিক পরিবর্তন হলেও এর প্রভাব কর্মজীবন, সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক অংশগ্রহণ পর্যন্ত বিস্তৃত। তবু এই অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

সে চুপ করে যায়। চুপ করে গিয়ে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে। অফিসে হাসে। বাড়ি ফিরে রান্না করে। সবার খোঁজ রাখে। আর গভীর রাতে নিজের সঙ্গে একা দেখা হলে বুঝতে পারে, সারাদিন সে নিজের সবচেয়ে বড় কষ্টটাকে লুকিয়ে রেখেছিল। আমরা এই অভিনয়ের নাম দিই ‘শক্ত মেয়ে’। আসলে এটা অনেক সময় সাহায্য না পাওয়ার দীর্ঘ অনুশীলন।

আসলে মাঝবয়সের সবচেয়ে বড় সংকট শরীরের নয়, ভাষার। একটা মেয়ে বলতে চায়— ‘আজ আমার খুব অদ্ভুত লাগছে।’ কিন্তু সে ভয় পায়, তাকে দুর্বল ভাবা হবে। সে বলতে চায়— ‘আজ আমি ক্লান্ত।’ কিন্তু ভাবে, সবাই বলবে সে কাজ এড়াতে চাইছে। সে বলতে চায়— ‘আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো।’ কিন্তু তার বদলে শোনে— ‘এত সেনসিটিভ হলে চলে?’

তাই সে চুপ করে যায়। চুপ করে গিয়ে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে। অফিসে হাসে। বাড়ি ফিরে রান্না করে। সবার খোঁজ রাখে। আর গভীর রাতে নিজের সঙ্গে একা দেখা হলে বুঝতে পারে, সারাদিন সে নিজের সবচেয়ে বড় কষ্টটাকে লুকিয়ে রেখেছিল। আমরা এই অভিনয়ের নাম দিই ‘শক্ত মেয়ে’। আসলে এটা অনেক সময় সাহায্য না পাওয়ার দীর্ঘ অনুশীলন।

একজন মাঝবয়সি মেয়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন কোনও উপদেশ নয়। প্রয়োজন এমন কয়েকজন মানুষ, যাদের সামনে সে নিঃসংকোচে বলতে পারবে— ‘আমি আজ আগের মতো নেই।’

আর উত্তরে যদি কেউ শুধু বলে, ‘তাতে কী হয়েছে? আমি আছি’— তাহলেই হয়তো শুশ্রুষার অর্ধেক কাজ সেখানেই শেষ হয়ে যায়। কারণ মেনোপজ কোনও চরিত্রদোষ নয়। কোনও ব্যর্থতাও নয়।

এটি জীবনের এমন একটি অধ্যায়, যেখানে শরীর নতুন ব্যাকরণ শেখে, আর মন নতুন করে নিজেকে চিনতে শেখে। এই ব্যাকরণ শেখার সময় একজন মেয়ের সবচেয়ে বেশি দরকার বিচার নয়, ব্যাখ্যা নয়, উপদেশও নয়। দরকার একটু বিশ্বাস। একটু ধৈর্য। আর এই আশ্বাস— সে ভেঙে পড়ছে না, সে বদলে যাচ্ছে না।