খেলা আসলে রাজনৈতিক

ফিফা। অরাজনৈতিক ক্রীড়া সংগঠন। ‘ফুটবল ইউনাইটস্ দ্য ওয়ার্ল্ড’। পেজটি ঘুরে এলে মনে হয়, পৃথিবী সত্যিই নয়নাভিরাম, অনিন্দ্যসুন্দর এক বধ্যভূম। পুঁজি ও প্রচারের কী অমোঘ পরাক্রম! জাগতিক বাস্তবতাকে দিব্যি আবৃত করে বিচিত্র বিস্ময়-জাগানিয়া মায়ার চাদরে। ‘ইউনাইট ফর পিস্’। ফুটবল মাঠে সুন্দর, ক্যাম্পেইন বিজ্ঞাপনে। তাই অরাজনৈতিক ফিফার ‘শান্তি’ পুরস্কার প্রাপকের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন মুলুকেই বিশ্বকাপ। ‘পিস্’-ই সরকার! অ্যাপলিটিক্যাল ফিফার অলিখিত নির্দেশে, হাইতির জার্সি থেকে মুছে যায় ইতিহাস। প্রবেশ নিষিদ্ধ হয় সোমালিয়ান রেফারির। নিত্য শিরোনামে ইরানি হয়রানি কাহিনী। দর্শক ভিসা, অভিবাসন নীতি ইত্যাদি তো আছেই! তারপরেও, দিনশেষে ফিফা কিন্তু অরাজনৈতিক। ফুটবলে রাজনীতি মিশলে কালিমালিপ্ত হয় কিনা!

কিন্তু শুরুর সময় থেকে ফুটবল কী চেয়েছে? চামড়ার বিস্ময়গোলক কি শুধু বিনোদনের উপাংশমাত্র? সর্বস্বান্ত মানুষের ভরসার কাঁধ নয়? সেই কবে থেকেই পৃথিবীর সুন্দরতম খেলা সাম্যের সুরকার, গৃহহীন উদ্বাস্তুর শেষ আশ্রয়, লাঞ্ছিত অবদমিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পকার। তা কি এমন রাজনীতিবর্জিত, অ্যাপলিটিকাল, ‘ভদ্দরলোক’-এর খেলা হয়ে থাকতে পারে? নরম্যান্ডির রক্তাক্ত উপকূল, ফকল্যান্ড যুদ্ধ, কাতালান আবেগ, সেল্টিক উদ্বাস্তু দল সব মিথ্যে? না, ফিফা তো নিতান্তই অ্যাপলিটিকাল।

নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে মার্কিন নগরী। বিপদের চেয়েও বড় আশঙ্কা বিক্ষোভের। কেউ ভাবছে রাজবস্ত্র অতীব সূক্ষ্ম। কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক! তবু কেউ-কেউ নীরবে রেখে যায় প্রতিবাদ। ড্রেসিং রুমের লকার খুলে মেলে সাক্ষ্যপ্রমাণ। কখনও টিফো বা ব্যানারে। কেউ অক্লেশে স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ম্যাচ শেষে তুলে নেয় বন্দুক, ঠেকায় মস্তিষ্কে, প্রতীকী প্রতিবাদ। নিষিদ্ধ করে ‘অরাজনৈতিক’ ফিফা। খানিক নিশ্চিন্ত! কিন্তু এ কী! আবারও কেউ অপ্রত্যাশিত ম্যাচ জিতে তুলে ধরে পতাকা। যে পতাকাকে রাষ্ট্র ভয় পায়! যে বয়ান শুনে কানে হাত চাপা দেয় সুশীল সমাজ। তবু প্রবল অসময়ে চেপে রাখা বিরুদ্ধমতকে আশ্রয় দেয় ফুটবল। জেগে থাকে সময়ের দলিল হয়ে।

আরও পড়ুন : ইরানের নিরন্তর যুদ্ধ ছিল মাঠের বাইরেও!
লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…

অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের পর প্যালেস্টাইনের ফ্ল্যাগ হাতে হোসাম হাসান

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বাইরে একমাত্র যে দেশটিতে বহু আগে থেকে এই খেলার চল ছিল, তা হল মিশর। ১৯২০-তে পিরামিডের দেশ প্রথম আফ্রিকান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ হিসাবে অলিম্পিকে অংশ নেয়। সর্বাধিক ‘আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস’ বা অ্যাফকন জয়ের রেকর্ডও তাদের ঝুলিতে। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে তাদের প্রথম কিক-অফ। তারপর নেই তেমন উল্লেখ্য কৃতিত্ব। আবার প্রত্যাবর্তন ৫০ বছরেরও বেশি সময় বাদে, ১৯৯০-তে। আদতে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও খানিক অশান্ত হয়েছে বারে-বারে। দীর্ঘ বিবর্তন দেখেছে হায়রোগ্লিফিক্সের দেশ। প্রাচীন ফারাওদের শাসন, ইসলামি খেলাফতের উত্থান, ঔপনিবেশিক দখল, রাজতন্ত্র, সামরিক বিপ্লব, আধুনিক প্রজাতন্ত্র; প্রতিটি অধ্যায়ই দেশটির রাজনৈতিক পরিচয়কে নতুনভাবে ভেঙেছে এবং গড়েছে। অস্থিরতা এসেছে বারবার, আবার ঝাপ্টা সামলে উঠে দাঁড়িয়েছে মাথা তুলে। অধীনস্থ হয়েছে পারস্যের, কখনও রোমান উপনিবেশ, কখনও বা দীর্ঘ অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস। তবু থামেনি ফুটবল। লা আলবিসেলেস্তে-র বিরুদ্ধে মায়াকাব্য লিখতে গিয়েও যারা হেরে গেল একদিন, একদিন স্কোরবোর্ড ভুলে যাবে যাদের, ইতিহাসের ক্যানভাসে অমোচনীয় চিরজাগরুক আঁচড় থেকে যাক তাদের। বিশ্বকাপ নামক নোটবইয়ের পাতায় ক্ষুদ্র চিহ্নাঙ্ক।

আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন ক্লাব গেজিরা এফসির অবস্থান কায়রো। ২০০৬-’১০ মিশরীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ। কোচ হাসান শেহাতার অধীনস্থ দল টানা তিনবার অ্যাফকন জেতে। আইভোরি কোস্ট, ক্যামেরুন, ঘানার মতো দলকে পরাজিত করে। সেই দেশেরই তারকা হোসাম হাসান। আর্জেন্টিনা ম্যাচে ইতস্তত ঘুরছেন সাইডলাইনে। মিশরীয় প্রিমিয়ার লীগের শীর্ষ গোলদাতা। খানিক ক্ষ্যাপাটে। সমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও সম্পর্ক তিক্ত। কোচিং কেরিয়ারেও কোথাও-ই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি। বারবার বদল করেছেন চাকরি। মাঠেও মেজাজ হারাতেন। কখনও জড়িয়েছেন উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে। খামখেয়ালি, খিটখিটে, ইম্পারফেক্ট।

তবু ৬৯টা গোল করে ফারাওদের সর্বকালের টপ গোল স্কোরার হোসাম হাসান। কোচের হটসিটে বসে দেশকে পৌঁছে দিয়েছেন রাউন্ড অফ সিক্সটিনে। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নাকানিচোবানি খাইয়েছেন। আটকে রেখেছেন ৭৯ মিনিট অবধি। ভাই ইব্রাহিম সবসময়ের সঙ্গী। আলোচনা করে সাজিয়ে নেন ফর্মেশন। কোচিংয়েও নিজের পছন্দের লোকদের নিয়েই কাজ করতে ভালবাসেন। তবু দিনশেষে মিশর দলটিকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। একবিংশ শতকের প্রথম দশকের মতোই এই অধ্যায়কেও বলা হচ্ছে মিশরীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ। নীরব কারিগর হোসাম হাসান। এহেন হোসাম সাহেবই জনতার কাছে খলনায়ক হয়ে যান যখন দেশের স্বৈরাচারী শাসকের ভূয়সী প্রশংসা করেন। রাষ্ট্রপতি জেনারেল আল-সিসিকে অভ্যর্থনায় ভরিয়ে দেন, মিশরীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়নের কান্ডারি অভিধায় অলংকৃত করেন। বহু কটাক্ষেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরেন না।

খানিক গোঁয়াড়, উগ্র, অবাধ্য হাসান বারবার বলেন, ফুটবল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক নেতৃত্বের থেকেও যাকে তিনি অবিচ্ছেদ্যভাবে লালন করতে পারেন, কাছে টানতে পারেন, ভালবাসতে পারেন। আবার তিনিই ক্রীড়ামন্ত্রী আসরাফ সোবহির সঙ্গে বিতর্কে জড়ান, বিদেশি কোচ নিয়োগকে কেন্দ্র করে। ক্লাসিক্যাল ৪-৪-২ ছেড়ে বেড়িয়েছেন গতকাল, ৪-২-৩-১ ফরম্যাটে খেলিয়েছেন ইজিপ্টকে। পেয়েছেন সাফল্যও। পরিবর্তন করেছেন দলের রণকৌশল। মহম্মদ সালাহকে শুধুমাত্র ডানপ্রান্তে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঝখানে এনেছেন। দিয়েছেন একজন প্লে-মেকারের ভূমিকা। সাবেক নাম্বার ১০ পজিশনকে কাজে লাগিয়ে স্ট্রাইকার ওমর মারমুশকে বল সাপ্লাই করার টেকনিককে উন্নত করেছেন। হাসেইম হাসানকে ডানদিক ধরে এগোতে দেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসিস্ট। সঙ্গে মজবুত করেছেন রক্ষণ। করিম হাফেইজ, রামি রাবেয়া, মহম্মদ হ্যানি। গতিতে পরিবর্তন এনে দ্রুত আক্রমণে যাওয়াকে আত্মস্থ করিয়েছেন দলের ডিএনএ-তে।

তবু খামখেয়ালি পাগলাটে মানুষরা মাঠের চৌকো সীমানায় আবদ্ধ থাকেন না কখনও। বারবার ভুল করেন, হলুদ কার্ড দেখেন, রক্তাক্ত হন, তর্ক করেন, তবু অবাধ্য, অনড় থাকেন নিজের বিশ্বাসে। অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ শেষে তাঁকে দেখা যায় মাঠের মাঝখানে। একা এগোচ্ছেন সাইডলাইন পেরিয়ে। হাতে প্যালেস্তাইন পতাকা। গত ছ’মাসে কুড়িহাজারেরও বেশি শিশু মারা গেছে গাজায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল মুখ ঘুরিয়েছে সেসব থেকে। রাজনীতি নিয়ে তাদের কর্তাব্যক্তিরা মাথা ঘামান না বিশেষ। তবু এক বদমেজাজি বুড়ো সেটুকু তো করলেন। সব জিতে আসা অর্জন ও ভাল থাকাটুকু উপহার শিশুদের। যে শিশু মৃত, যে শিশু আতস রোশনাই ভেবে বিশ্বাস করেছিল মানুষকে, যে শিশু হাসি মুখে তাকিয়েছিল ছাই হয়ে যাওয়া মানবতার ধ্বংসাবশেষের দিকে। নিজের প্রেস কনফারেন্সে কঠোর কণ্ঠে নিন্দা। ইজরায়েল মানবজাতির শত্রু। প্রবল-পরাক্রমী মার্কিন মুলুকে ওড়ালেন নিষিদ্ধ পতাকা।

আদতে ফুটবল বোধহয় এসব বারণবিধিকে বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেয় না কোনওকালেই। সে ছুটে চলে আপন গতিতে, শিশুর ছন্দে। বিস্মিত হয়, বিভ্রম জাগায়। স্থান দেয় তারই মতো ক্ষ্যাপাটে, উন্মাদদের। বারবার ক্ষমতার জাল ছিঁড়ে রগচটা চিত্তে যারা প্রশ্ন করে বলিষ্ঠ ক্ষমতাবানদের। এটাই ফুটবলের আদিম প্রকৃতি। অদ্ভুত, সম্মোহনী, স্নিগ্ধ, বিস্ময়কর!