অলীক দুনিয়ার গল্প
আমি জীবনে একজনই বাঙালি বিলিওনেয়ার দেখেছি। এবং বলা বাহুল্য, গোটা প্যাকেজটা আমার রোমহর্ষক লেগেছে। হ্যাঁ, ইচ্ছে করেই একজন মানুষ সম্পর্কে ‘প্যাকেজ’ শব্দটা ব্যবহার করলাম। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আর তার সঙ্গে জীবনযাপন, পেশাগত ও ব্যক্তিগত শোম্যানশিপ— সব মিলিয়ে কে পি সি একটা ব্র্যান্ড। তবে তাঁকে কলকাতার কে পি সি হাসপাতালে বা কোনও পার্টিতে দেখলে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। তাঁকে দেখতে হবে তাঁর ক্যালিফোর্নিয়ার সাম্রাজ্যে, যেখানে হেমেট নামের একটা আস্ত শহরের মালিক বলতে গেলে তিনি। দুধসাদা প্রাসাদে থাকেন, গ্যারাজভরা রোলস রয়েস-মার্সিডিজ-বেস্টলে, তাঁর নামে রাস্তা পর্যন্ত তৈরি করেছে মার্কিন সরকার— কে পি সি রোড। এহেন কালীপ্রদীপ চৌধুরীর পারিবারিক বৃত্তে ঢোকার কোনও কারণ আপাতদৃষ্টিতে আমার থাকার কথা নয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটা হয়ে গেছে দুটো কারণে। এক, আমার পূর্বপুরুষেরা তাঁর মতো সিলেটের (এখন বাংলাদেশ) লোক এবং দুই, আমার দিদিস্থানীয় আমেরিকা-প্রবাসী ড. নূপুর লাহিড়ি কলকাতার এন আর এস মেডিক্যাল কলেজে কে পি সি-র সহপাঠী। অতএব ড. কালীপ্রদীপ চৌধুরী ‘দাদা’ এবং তাঁর স্ত্রী সুনন্দা ‘বউদি’। লাস ভেগাসে বঙ্গ সম্মেলনে সেবার ওঁরা এসেছিলেন আর তখনই নেমন্তন্ন করে রেখেছিলেন লস এঞ্জেলসের কাছে ওঁদের বাড়ি যাওয়ার জন্য।
আরও পড়ুন: হলিউডে ছুরি হাতে তেড়ে এসেছিল এক খুনি! ‘ডেটলাইন: পর্ব ৫০’,
লিখছেন তপশ্রী গুপ্ত…
ছয়ের দশকের শেষদিকে পকেটে আট ডলার নিয়ে আমেরিকা এসে এক সদ্য-পাশ-করা বাঙালি অর্থোপেডিক সার্জন কীভাবে এমন অলীক সম্পদ ও সম্মানের অধিকারী হলেন, সেই গল্প অনেকেরই জানা। দেশে-বিদেশে বহু নামী পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে বলা হয়েছে সেসব কথা। নেট ঘাঁটলেই দেখা যাবে। আমি বলব কে পি সি সাম্রাজ্যে একটি দিন কাটানোর কথা। সকাল থেকে রাত, নিখুঁত সফরসূচি তাঁরই তৈরি। যদিও তাঁর ও বউদির সঙ্গে দেখা হবে বিকেলে, বাড়িতে। ঘন কালো রোলস রয়েসে চেপে প্রথম গন্তব্য মাউন্ট পালোমার ওয়াইনারি। লস এঞ্জেলস শহর থেকে ঘণ্টা দেড়েকের পথ। এমনিতেই ক্যালিফোর্নিয়া বিখ্যাত ওয়াইনের জন্য। এক-একটা অঞ্চলে মাইলের পর মাইল আঙুরখেত।

পালোমারে লতানে গাছে হাতের কাছে কালচে লাল আঙুরের থোকা পেয়ে যেন মনে হল স্বর্গের বাগানে এসেছি। আর কী চমৎকার সাজানো চারপাশ! মূর্তি, ফোয়ারা, বিয়ের স্টেজ পর্যন্ত ফুলের সাজে অপেক্ষায় রয়েছে। প্রচুর ট্যুরিস্ট এসেছে ওয়াইন ট্যুরে। ওয়াইন তৈরির নানা ধাপ খুব যত্ন নিয়ে বোঝালেন এক সাহেব। বিশাল গুদামে সার-সার কাঠের ব্যারেলে রাখা এক-এক কিসিমের সুরা। কত বাহারি নাম তাদের—ভারমেস্তিনো, পেতিত ভার্দো, জিনফান্দেল। আমার বিদ্যের দৌড় রেড আর হোয়াইট ওয়াইন পর্যন্ত। অতএব টেস্টিং-এর সময়ে ম্যানেজারের পছন্দের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া উপায় নেই। সত্যি বলছি, একটু ঠোঁটে না ছোঁয়ালে খারাপ দেখায়, আমার বরং দারুণ লাগল সাজিয়ে গুজিয়ে পরিবেশন করা হরেক রকম চিজ, ফল, সসেজ। আসল রোমাঞ্চ অবশ্য সেই বাঙালি ফ্যাক্টরে— এই বৈভবের বিশ্বকর্মা কলকাতার এক বাঙালি।

ক্যালিফোর্নিয়ার ছোট্ট শহর হেমেট। সেখানেই কে পি সি গ্রুপের বিশাল হাসপাতাল হেমেট গ্লোবাল মেডিক্যাল সেন্টার। দেখলাম, তাকে ঘিরেই এই শহরের অর্থনীতির চাকা গড়ায়। ব্যাঙ্ক থেকে স্কুল, হোটেল থেকে শপিং মল— সবটাই আসলে বেঁচে আছে এই হাসপাতালটা আছে বলে। লোকমুখে কে পি সি সিটি। জীবৎকালে কম মানুষকে নিয়েই মিথ তৈরি হয়, তাও আবার বিদেশের মাটিতে। সাহেবরাই বলে নানা গল্প। অথচ এই তো সেদিন কে পি সি রং সাইডে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন, এত কড়া ট্রাফিক আইন, কিন্তু যেই উনি কাচ নামিয়ে বললেন, ‘আই অ্যাম কে পি সি’, অমনি পুলিশ স্যালুট দিয়ে ছেড়ে দিল। এক প্রবাসী বাঙালি তো ওঁর বাড়ি ঘুরে এসে বলেছিল, ‘খাবার সময়ে সোনার কাঁটা চামচ দিয়েছিল।’ সুনন্দা বউদির আতিথেয়তায় ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে এলেও, এরকম বাড়াবাড়ি অবশ্য কিছু দেখিনি। নিপাট বাঙালি আপ্যায়ন। চা খেতে বলা। বাড়ির বাইরে থেকে সত্যিই মনে হয় প্রাসাদ। সেখানকার তাকলাগানো অন্দরসজ্জা নিয়ে বলার জায়গা এটা নয়। কিন্তু বিশাল সোনালি ঈগলের কথা না বলে পারছি না। এই মূর্তিটা নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই সাজিয়ে রেখেছেন কে পি সি। আমেরিকার জাতীয় পাখি শুধু নয়, ঈগল সে-দেশে মুক্তি-শৌর্য-শক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে সরকারি সিলমোহরে।

রাত হয়ে আসছে। সময়ের অভাবে আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা কে পি সি গ্রুপের অফিসে। অবশ্য অফিস বুঝতে সময় লাগবে, কারণ ঢোকার সময়ে মনে হবে স্টার হোটেলে ঢুকছি। ঝাড়লন্ঠন আর বনেদি আসবাবে সাজানো। বিশাল কাচের জানালায় সিল্কের পর্দা। আদৌ কর্পোরেট লুক না, বরং প্রাচ্যের জাঁকজমকের ছোঁয়া। দারুণ চিনে খাবার যত্ন করে খাওয়ালেন এক আমেরিকান মহিলা, কে পি সি-র ব্যক্তিগত সচিব। এত বড় ডাইনিং টেবিল কোনও অফিসে থাকে, দেখিনি আগে। এবার ফেরার পালা। বাইরে পা রেখেই দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশ। দূরে-দূরে আলো জ্বলছে। আমেরিকার ছোট শহরগুলো এরকমই। লোকজন কাজ থেকে ফিরলেই নিঝুম হয়ে যায়। উইক এন্ড বাদ দিলে রেস্তরাঁ, পাব, গেম পার্লারে হাতে-গোনা ক’জন লোক দেখবেন। হেডলাইটের আলোয় স্পষ্ট একটা জিনিস দেখে আরও একবার রোমাঞ্চিত হলাম। অফিসের সামনের ছোট্ট রাস্তাটার নাম খোদাই করা কাঠের তিরচিহ্নের গায়ে— কে পি সি লেন। ঢোকার সময়ে খেয়াল করিনি।
এই পর্বে ঠিক করেছি শুধুই অলীক দুনিয়ার গল্প বলব— রিচ অ্যান্ড ফেমাস। আমাদের এই কান্না-ঘাম-রক্তের দিনযাপনের গ্লানি যাদের ছোঁয় না। সান্টা বারবারা সেরকমই এক সব-পেয়েছির দেশ। লস এঞ্জেলস থেকে ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তা। একটা সময়ে প্রশান্ত মহাসাগর আপনার সঙ্গী হবে, গাড়ির পাশে-পাশে দৌড়বে সফেন ঢেউ। সান্টা বারবারায় প্রাইভেট টিলায় বাংলো বানিয়ে থাকেন সেরার সেরা সেলেব্রিটিরা। হলিউড তারকা বা টেক বিলিওনেয়ার ছাড়া আর কারও ক্ষমতা নেই সেখানে ভিলা কেনার। তবে সামনে দিয়ে হাজারবার ঘোরাফেরা করলেও এক চিলতে কিছু দেখতে পাবেন না। টিলার নীচে লোহার গেটে তালা মারা। দু-চারটে নাম বললেই বুঝবেন, ‘ভিনদেশি তারা তোমার অন্য পাড়ায় বাড়ি’। রাজপুত্তুর হ্যারি ও মেগান, স্টিভেন স্পিলবার্গ, কেভিন কস্টনার, ওপরা উইনফ্রে, কেটি পেরি, অরল্যান্ডো ব্লুম। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর নিক জোনাসের বাড়ি নেই বটে এখানে, তবে তাঁরা এতবার আসেন ছুটি কাটাতে যে সান্টা বারবারা নিজেরই মনে করে তাঁদের।

আবার সেই কে পি সি অধ্যায়ের মতো এখানেও প্রশ্ন উঠতে পারে, আমি কী করতে গেলাম সান্টা বারবারায়? তারকা দেখতে যাইনি, সেটা নিশ্চিত। গেছিলাম এক দু-কূল ভাসানো নীল নির্জনের টানে। সত্যিই অন্য যে-কোনও সৈকত শহরের থেকে একদম আলাদা আর নিরিবিলি এই দ্বীপ। যেখানে এই একুশ শতকেও লোকে বিশ্বাস করে মানুষের ডলফিন হয়ে যাওয়ার মিথ। আসলে ১৩,০০০ বছর আগে এখানে বাস করত চুমাশ উপজাতি। তাদের তৈরি মাছ ধরার জাল, অস্ত্রশস্ত্র, পুঁতির মালা দেখলাম মিউজিয়ামে। তাদের দেবী হুতাশ আজও পৃথিবীকে রক্ষা করেন, গভীর প্রত্যয়ে জানিয়েছিলেন এক ক্যাব ড্রাইভার। তিনিই বললেন গল্পটা। এক সময়ে যখন সান্টা বারবারায় লোক খুব বেড়ে গেল, চারপাশে বেজায় কোলাহল, হুতাশ বিরক্ত হয়ে ঠিক করলেন কিছু লোককে পাঠিয়ে দেবেন সমুদ্রের ওপারে। রামধনু দিয়ে সেতু বাঁধলেন তিনি। কিন্তু রক্তমাংসের মানুষ কি আর রামধনু বেয়ে কোথাও পৌঁছতে পারে? তাই অনেকেই সমুদ্রে পড়ে গেল। তা বলে কি তাদের মরতে দিতে পারেন হুতাশ? তাদের তিনি ডলফিন বানিয়ে দিলেন। আজও নাকি তাদের সন্তান-সন্ততিরা ফিরে ফিরে আসে সান্টা বারবারা উপকূলে। ডলফিনের বিশাল মূর্তি আছে সাগরতীরে। সত্যি ডলফিনও দেখা যায় জলের ওপর বোর্ডে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে।
মোটেল সিক্স। সম্ভবত সান্টা বারবারার সবচেয়ে সস্তা ঠিকানা। সকালে কফি-বিস্কুট ছাড়া আর কোনও খাওয়া-দাওয়ার গল্পই নেই। আমি আর আমার কন্যা যাকে বলে পাঁড় পর্যটক। দেশে-বিদেশে কোনও পরিস্থিতিতেই আমাদের কুছ পরোয়া নেই। লাঞ্চ তো সারাদিনে চলার পথে যত্রতত্র, কিন্তু ব্রেকফাস্ট আর ডিনারটা হোটেলের কাছাকাছি না হলে সমস্যা। আমরা আবিষ্কার করলাম, রাস্তার ঠিক উলটোদিকে সেভেন ইলেভেন স্টোরে দু’ডলারে দুটো ইয়া লম্বা সসেজ পাওয়া যায়। তার থেকেও দামি কথা হল, হট ট্রে থেকে ওই দুটো বার করামাত্র নীচের আর একটা চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসে হাতে গরম বান, ফ্রি। অতএব সমস্যা সমাধান। একদিন অবশ্য শখ করে ব্রাঞ্চ করলাম সি-ফুড প্ল্যাটার আর তরমুজের শরবত দিয়ে। বিলের দিকে না তাকিয়ে রেস্তরাঁর তাক-লাগানো ইন্টিরিয়র মন দিয়ে দেখলে পয়সা কিছুটা উসুল হতে পারে। আমাদের হোটেলের সামনে বাসস্টপ। সেখানে বোর্ডে লেখা, কত নম্বর বাস কোথায় যায়। এই ছোট্ট শহরে ট্যুরিস্টের যাওয়ার জায়গা দুটো— সমুদ্রের ধার আর শপিং এরিয়া। কোনও একটা পয়েন্টে নেমে হেঁটেই ঘোরে সবাই দিনভর। রাত নামলে বাস কমে যায়, তখন ক্যাব ভরসা, যার ভাড়া চমকে দেওয়ার মতো। আর একটা দারুণ জিনিস দেখলাম পথের ধারে, ফ্রি লাইব্রেরি। ছোট কাচের বাক্সে বই, ম্যাগাজিন রাখা, ইচ্ছে হলে নিয়ে যান। ‘পড়ার পরে ফেরত দেবেন’, এই কথাটা লেখা শুধু এদেশে বাহুল্য মনে হল।

সান্টা বারবারার শরীর জুড়ে পুরনো গন্ধ— স্প্যানিশ উপনিবেশের। লাল টালির সাদা বাড়ি, লতানে ফুলের আর্চ দেওয়া গেট, রেলস্টেশন, এল প্যাসো ওপেন এয়ার শপিং আর্কেড— সময় যেন থমকে আছে দুশো বছর আগে। সদ্য জুন মাস শেষ হয়েছে, প্রাইড মাস্থ সেলের তলানি পড়ে আছে দোকানে। এলজিবিটিকিউ-রা কতটা কেনে জানি না, ট্যুরিস্টরা সস্তার সুযোগ নেয়। আমরাও এলোমেলো ঘুরতে-ঘুরতে এরকম একটা দোকান থেকে হাফ ডজন প্লেট কিনলাম। রামধনুর সাত রঙের একটা রং বাদ বলে মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল। সাগরকে ডান পাশে রেখে এরকম হাঁটতে-হাঁটতেই কী যে মধুর একটা দৃশ্যের সাক্ষী হলাম! হঠাৎ নজরে পড়ল, এক মধ্যবয়সি মহিলা খুব যত্ন করে রক্তগোলাপ, মোমবাতি আর উপহার সাজাচ্ছেন বালির উপর। খুব কৌতূহল হল, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার জন্য?’ মিষ্টি হেসে জবাব দিলেন, ‘ফর মাই সুইট হার্ট ফর লং থার্টি ইয়ার্স। বিবাহবার্ষিকীতে চমকে দেব। অফিসের পর এখানে আসতে বলেছি। এই সমুদ্র আমাদের প্রেম-অপ্রেমের সাক্ষী কি না!’ মনে হল, এই প্রেমবার্ষিকীর বয়স আসলে হাজার বছর, সেই যে নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘এমন কিছু সময় আছে/যারা ঘড়ির বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়।’
ছবি সৌজন্য: লেখক



