‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’, ‘আমি ফিরে আসব’! আমি যেখানে ছিলাম, সেখানে আর থাকছি না— আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু ফিরে আসব এটুকু আমার চাওয়া। এই যে চেনা-চেনা পথঘাট, নিজের মতন করে সাজিয়ে নেওয়া চারপাশ, চেনা মুখ এই সবকিছু ছেড়েই আমি যাচ্ছি হয়তো ইচ্ছেয় বা ইচ্ছে না থাকার পরেও, কিন্তু মনে-মনে চাইছি, আমি ফিরে আসব। কবে, কখন জানি না। কোথায় যাচ্ছি সেটাও সবটা জানা নেই, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে ইচ্ছে নিয়েই যাচ্ছি, একদিন ফিরে আসব। কিন্তু যে-সময়ের ‘আমি’ ছেড়ে যাচ্ছি, সেই ‘আমি’ একভাবে আবার ফিরতে পারব? ফিরে হয়তো এলাম, কিন্তু সবকিছু আগের মতন আর থাকবে? চেনা-চেনা রাস্তা, বাড়ি, দুব্বোর ছটা সেই চিরকালীন জনমদুখিনীর ঘরে ফিরে আসলেও, আমার প্রতিবেশ যেন বদলে বদলে যায়। নিজের মতন করে কেউ আর অপেক্ষা করে না। তাই ফিরে আসব বললেও, ঠিক ফেরা হয়ে ওঠে না; তাই ‘আমি ফিরে আসব’ কথাটির মধ্যে তীব্র আকুতি থাকলেও, আসলে গভীর বিষাদ মিশে থাকে।
এই সিনেমার মতন, বুকের মধ্যে একখণ্ড করে অধুনা পাকিস্তানের শারগোধা আঁকড়ে রেখেছেন, আমাদের চেনা-চারপাশের অনেকেই। কেউ বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল। আবার অন্য কোথাও কেউ রেখেছে ভারত। বৃদ্ধ নাসিরুদ্দিনের মতন, অনেক দূরের দিন যাদের চোখে ফিরে আসে, ফেলে আসা জায়গার মতন, জানলার রোদ মিশে যায় কিশোরবেলার ভুট্টাক্ষেতে, আমাদের পরিচিত যারা, ’৪৭ বা ’৭১-এর সময়ে ভাগ হয়ে ছিটকে যাওয়া মানুষ ,তাদের সংখ্যা কমে আসছে। একটা সময় আসবে, যখন নিজের মুখে এই কথাগুলো বলার লোক আর থাকবে না। তখন মনে হয়— ইতিহাস বা সামগ্রিক সামাজিক মাইলফলকের বাইরে এরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা হবে, যে-কারণে নাসিরুদ্দিনের নাতি নির্ভের, লন্ডনের মতন প্রথম সারির শহরে থাকাকেও একসময়ে শিকড়হীন অন্তঃসারশূন্য বলে মনে করেছে।
আরও পড়ুন: অস্তিত্বের বিষাদসিন্ধু ও মারজানে সাত্রাপি! লিখছেন কৃষ্টি কর…
ইমতিয়াজ আলির গল্প বলার অন্যতম মুন্সিয়ানা, চরিত্রদের নিজেকে আবিষ্কার করা এবং শিকড়ের সন্ধানে ফেরার তাগিদকে অভিব্যক্তি আর মন্তাজে ফুটিয়ে তোলায়। চেনা প্রতিবেশীদের বদলে যাওয়া, আচমকা আক্রমণ, ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে আচমকাই আকাশের দিকে তাকিয়ে, শূন্য দৃষ্টি দেওয়া কিনু, অর্থাৎ যৌবনের নাসিরুদ্দিন যেন আচমকাই মিশে যান ‘কুন ফায়া’ গাওয়ার সময়ের রণবীরের সঙ্গে, সেও বিতাড়িত তার বাড়ি থেকে। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ এমন একটি গল্পের মন্তাজ বোনে, যা শুধু বিচ্ছেদ, দেশান্তর বা হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প নয়, বরং এমন এক মানবিক অনুসন্ধান, যা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ ট্র্যাজেডি— দেশভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়ে, আজও আমাদের সময়কে তাড়া করে বেড়ায়।
দেশভাগের ইতিহাসকে আমরা প্রায়শই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে স্মরণ করি। কত লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হলেন, কত হাজার মানুষ প্রাণ হারালেন, কতগুলো সীমারেখা নতুন করে আঁকা হল। কিন্তু, সংখ্যা কখনও সেই ক্ষতির প্রকৃত গভীরতাকে ধারণ করতে পারে না। কারণ দেশভাগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি, জমিজমা, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অধিকারের হারিয়ে যাওয়া ছিল না। সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল, ‘নিজের’ বলে জানার অনুভূতিটুকুর হারিয়ে যাওয়া।
একটি গ্রাম, হঠাৎ অন্য দেশের হয়ে গেল, একটি উঠোন, অচেনা হয়ে গেল, একটি নদী, মানচিত্রে রয়ে গেল বটে, কিন্তু তাকে ছুঁয়ে দেখার অধিকার হারিয়ে গেল। দেশ রইল, কিন্তু দেশ আর ‘নিজের’ রইল না। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ এই সত্যটিকে গভীর সংবেদনশীলতায় উপলব্ধি করে। চলচ্চিত্রটি বুঝতে পারে, ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা আসলে কোনও ভৌগোলিক ইচ্ছা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। নায়কের প্রত্যাবর্তনের বাসনা কেবল একটি স্থানে ফিরে যাওয়ার বাসনা নয়, বরং সেই মানুষটিকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা, যিনি ইতিহাসের নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপের আগে ছিলেন। ফলে প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া সত্তার সন্ধান।

এই অর্থে, ছবিটি বিশ্ব-চলচ্চিত্রের এক বৃহত্তর ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। থিও অ্যাঞ্জেলোপোলসের ‘দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অব দ্য স্টর্ক’-এর কথা মনে পড়ে, যেখানে সীমান্তরেখা একইসঙ্গে হাস্যকর এবং ভয়ঙ্কর। একটি কাল্পনিক রেখা, মানুষের জীবনকে কীভাবে বিভক্ত করে দিতে পারে, অ্যাঞ্জেলোপোলস তা দেখিয়েছিলেন। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-তেও সীমান্ত কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং এক মানসিক ক্ষত। এখানে দূরত্ব কিলোমিটারে মাপা যায় না; তা মাপা যায় স্মৃতির গভীরতায়। চলচ্চিত্রটির ভেতরে, ‘সিনেমা প্যারাডিসো’-র প্রতিধ্বনিও শোনা যায়। জিউসেপে তোরনাতোরের সেই কালজয়ী ছবিতে, নায়ক ফিরে আসে তার শৈশবের শহরে, কিন্তু আবিষ্কার করে যে, আসলে ফিরে আসা সম্ভব নয়। সময় ইতোমধ্যে সবকিছু বদলে দিয়েছে। যা বেঁচে থাকে তা স্থান নয়, স্থানটির স্মৃতি। ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ও যেন একই কথা বলে। রিফিউজি হিসেবে পঞ্জাবে আসার বছর ছয়েক পর, আবার ফিরে গিয়ে— চেনা সবকিছুর বদলে যাওয়ার গল্প জেনে, অস্বস্তি নিয়েই ফের ফিরে এসেছিলেন সেই পঞ্জাবেই। আমাদের অন্তরের দেশ, কখনও-কখনও বাস্তব দেশের চেয়েও বেশি সত্য হয়ে ওঠে। স্মৃতি নিজের মতো করে একটি দেশ নির্মাণ করে, যেখানে পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না।

সম্ভবত এই কারণেই ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু রাজনীতি নয়। রাজনীতি এখানে পটভূমিতে অবস্থান করে, আর মানুষের সম্পর্কগুলি উঠে আসে সম্মুখভাগে। এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশভাগ মূলত রাষ্ট্রের ইতিহাস নয়; এটি সাধারণ মানুষের ইতিহাস। একটি খালি বাড়ি, একটি পরিত্যক্ত ক্ষেত, একটি চিঠি যা কখনও পৌঁছায় না, একটি প্রতিশ্রুতি যা অপূর্ণ থেকে যায়—এইসবের মধ্য দিয়েই ইতিহাস তার উপস্থিতি জানান দেয়। সেই অর্থে ইতিহাস আসলে ‘না থাকা’ কেই আরেকবার স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করে।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-তেও সীমান্ত কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, বরং এক মানসিক ক্ষত। এখানে দূরত্ব কিলোমিটারে মাপা যায় না; তা মাপা যায় স্মৃতির গভীরতায়। চলচ্চিত্রটির ভেতরে, ‘সিনেমা প্যারাডিসো’-র প্রতিধ্বনিও শোনা যায়। জিউসেপে তোরনাতোরের সেই কালজয়ী ছবিতে, নায়ক ফিরে আসে তার শৈশবের শহরে, কিন্তু আবিষ্কার করে যে, আসলে ফিরে আসা সম্ভব নয়। সময় ইতোমধ্যে সবকিছু বদলে দিয়েছে। যা বেঁচে থাকে তা স্থান নয়, স্থানটির স্মৃতি।
এই প্রসঙ্গে ‘দ্য কাইট রানার’-এর কথাও মনে পড়ে, যেখানে আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়া মানে, স্মৃতি এবং অপরাধবোধের মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’, একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আলাদা। এখানে প্রত্যাবর্তনের চালিকাশক্তি অনুশোচনা নয়, ভালবাসা। মানুষ ফিরে যেতে চায়, কারণ সে এখনও ভালবাসে। বহু দশক পরেও তার আবেগগত সম্পর্ক, সেই মাটির সঙ্গে অটুট থেকে যায়। এইখানেই সিনেমাটির সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য। এটি আমাদের জানায় যে, মানুষ আসলে দেশের অন্তর্গত নয়; বরং দেশ মানুষের স্মৃতির অন্তর্গত। রাষ্ট্র সীমান্ত তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভালবাসা কখনও সেই সীমান্তকে মেনে নিতে শেখে না। শরীর যেখানে যেতে পারে না, হৃদয় বারবার সেখানেই ফিরে যায়। সেখানে ‘ধুরন্ধর’ হয়ে সীমানা পেরোনোর থেকেও, ভালবাসায় অবিচল থেকে, অনেক পরের প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করা যায়, ভালবাসতে। অসমাপ্ত বার্তার বাহক করে সীমানার ওপারে পাঠাতে।
‘আমি ফিরে আসব’— এটি কোনও নিশ্চয়তার ঘোষণা নয়। এটি হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে মানুষের শেষ প্রতিরোধ। পৃথিবীর প্রতিটি উদ্বাস্তু, প্রতিটি নির্বাসিত, প্রতিটি দেশান্তরী মানুষ কোনও-না-কোনওভাবে এই বাক্যটিকে বহন করে চলেছেন। এমনকী যাঁরা দেশ ছাড়েননি, তাঁরাও সময়ের পরিবর্তনে যখন নিজেদের পরিচিত পৃথিবীকে অপরিচিত হতে দেখেন, তখন তাঁদের মধ্যেও এই ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। দেশভাগের পর বহু মানুষ আজীবন তাঁদের পুরনো বাড়ির চাবি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। সেই মরচেধরা চাবিগুলি হয়ে উঠেছিল আশা, শোক এবং স্মৃতির প্রতীক। তারা জানতেন হয়তো আর কোনওদিন ফেরা হবে না, তবু চাবি ফেলে দেননি। কারণ মানুষ কখনও-কখনও বাস্তবে নয়, স্মৃতিতে ফিরে আসার জন্যও প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ এই সত্যটিকেই ধারণ করে। ছবিটি আমাদের শেখায় যে, অধিকাংশ প্রত্যাবর্তন বাস্তবে ঘটে না; ঘটে স্মৃতিতে। আমরা ফিরে যাই গল্পের মধ্যে, গানের মধ্যে, পুরনো ছবির মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে। আমরা ফিরে যাই যখন কোনও বৃদ্ধ মানুষ তাঁর হারিয়ে যাওয়া গ্রামের কথা বলতে-বলতে, আবেগে ভেঙে পড়েন। আমরা ফিরে যাই, যখন একটি নতুন প্রজন্ম, তাদের পূর্বপুরুষের মুখে শোনে এমন এক ভূগোলের গল্প, যা তাঁরা কোনওদিন দেখেনি। এই চলচ্চিত্র আসলে কোথাও পৌঁছনোর গল্প নয়; এটি নিজের ভেতরে একটি দেশ বহন করে চলার গল্প। ছবিটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই যে, এটি দেশভাগকে কোনও অতীত ঘটনা হিসেবে দেখে না। বরং দেশভাগকে একটি চলমান মানসিক অবস্থায় পরিণত করে। সীমান্ত ১৯৪৭ সালে আঁকা হয়েছিল, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি আজও পরিবার, সম্পর্ক এবং স্মৃতির মধ্যে বেঁচে আছে। শোক উত্তরাধিকারসূত্রে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়েছে। আকাঙ্ক্ষাও তাই। ভালবাসাও।


শেষ পর্যন্ত, দর্শকের মনে যে-ছবি থেকে যায়, তা কোনও বিভক্ত দেশের নয়; একটি বিভক্ত হৃদয়চিত্রট মনে করিয়ে দেয়, মানুষ হয়তো দেশ হারিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু সেই দেশকে ভালবাসা বন্ধ করতে পারে না। সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসে, তবু মাটির প্রতি টান অমলিন থেকে যায়। সম্ভবত এটাই ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-র সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। কখনও-কখনও একটি দেশ, একটি গ্রাম, একটি নদী কিংবা একটি হারিয়ে যাওয়া বাড়ির প্রতি ভালবাসা, তাকে অধিকার করার ইচ্ছার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। তখন মানুষ আর মালিকানা চায় না; শুধু স্মরণ করতে চায়।
দেশভাগের ট্র্যাজেডি তাই শুধু এই নয় যে, ‘মানুষকে চলে যেতে হয়েছিল’। আসল ট্র্যাজেডি এই যে, চলে যাওয়ার পরেও তারা সেই হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডকে ভালবেসে যেতে বাধ্য হয়েছে। ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা শেষ পর্যন্ত সেই অসম্ভব ভালোবাসারই এক চলচ্চিত্র—৯৫ বছরের বৃদ্ধর মনে থেকে যায় এক কলেজ ছাত্রীর মুখ- জিয়া – যার আর বয়েস বাড়েনি। যে ভালোবাসা সীমান্তের চেয়ে বড়, রাজনীতির চেয়ে বড়, এবং হয়তো সময়ের চেয়েও বড়।




