মুহূর্ত আসে। মুহূর্ত চলে যায়। অন্ধ জাতিস্মর তার কিনারা করতে পারে না। বিশ্বজুড়ে ঘটে চলা এমন মুহূর্তদের কোলাজ সাজালে, অনেকসময়েই বহু ভাবনার ওপর আলো পড়ে। বহু চেতনা বহুদিন পর ডালপালা মেলে। বিশ্বকাপ চলছে মার্কিন মুলুকে। যেখানে, দেশ ও রাষ্ট্রকে প্রায় একসুতোয় গেঁথে, দক্ষিণপন্থী নেতারা উগ্রজাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ বুনে দিতে চাইছেন মানুষের মনে।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট গঠন করে, কেবলমাত্র সন্দেহের বশে অভিবাসীদের ইললিগ্যাল ইমিগ্র্যা্ন্টস বলে দাগিয়ে দিয়ে ডিপোর্ট করছেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষদের ভিসা বাতিল করছেন। দেশকে আরও শক্ত কাঁটাতারে ঘিরতে কোনও ফন্দি-ফিকিরই বাকি রাখছেন না তিনি। মার্কিনীদের একটা বড় অংশ, বিশ্বাসও করছেন যে, উন্নত পৃথিবীর প্রথম ও প্রধান শর্তই হল— দেশ ভাবনার ওপরে রাষ্ট্রকে রেখে, জাতীয়তাবাদের প্রচার করা। যেন নিঃশব্দে বলে যাওয়া— ‘যা কাঁটাতারের ভেতর, তা-ই আমার দেশ, বাকি দুনিয়া শত্রু-শত্রু-শত্রু…’।
এ-দেশের দিকে তাকালেও, পরিস্থিতি প্রায় এক। নো ম্যানস ল্যান্ডে বসে থাকা অসহায় কিশোরীকে মানুষ ভাবার বদলে, অ-ভারতীয় ভেবে ফেলার মধ্যে যে অসংবেদনশীলতা, যে অশ্লীলতা, যা কিনা মেয়েটির কিডনি বিক্রি করে দেয়ার মতো পৈশাচিক নিদান দিয়ে দিতে পারে, তার বিরুদ্ধে আঙুল তোলার মতো মানুষ কমে আসছে। দেশ-কাঁটাতারে ঘেরা যে ভূখণ্ড, তার বাইরের যা কিছু, মানুষ কিংবা আদর্শ কিংবা দর্শন— সবকিছুকে এই যে একবগ্গা বর্জন, তার বিপ্রতীপে দাঁড়ায় এ-বিশ্বকাপ। তাকে কাবু করতে পারে না রাষ্ট্রশক্তি।
মেক্সিকো সিটিতে কলম্বিয়া-উজবেকিস্তান ম্যাচ চলছে। উজবেকরা প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপে। কলম্বিয়ার গোলের পর সমতাও ফেরায় তারা। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন কলম্বিয়া ফের এগিয়ে যায়, তখন গ্যালারিতে এক ক্ষুদে উজবেকিস্তান সমর্থক হাতে কার্ডবোর্ডের বিশ্বকাপ জড়িয়ে কাঁদছেন। মনখারাপ। তাকে ঘিরে বসেছিলেন কলম্বিয়ার সমর্থকেরা। গোলের পর স্বাভাবিকভাবেই তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। কিন্তু শিশুটিকে দেখে তারা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা কলম্বিয়া নয় বরং উজবেকিস্তানের হয়ে গলা ফাটাবে। গ্যালারির সকলে মিলে উজবেকিস্তানের হয়ে চ্যান্ট করতে থাকে৷ শিশুটি হেসে ফেলে। ওই হাসি-ই কি দেশ নয়? রবীন্দ্রনাথে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। ‘শিক্ষার মিলন’ শীর্ষক প্রবন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘পৃথিবীতে নেশন গড়ে উঠল সত্যের জোরে, কিন্তু ন্যাশনালিজম সত্য নয়, অথচ সেই জাতীয় গণ্ডি— দেবতার পূজার অনুষ্ঠান চারদিক থেকে নরবলির জোগান চলতে লাগল।’
মানুষ। মানুষ দিয়েই তো গড়ে ওঠে দেশ। মানুষের চেতনার-বিশ্বাসের সার-মাটি-জলেই দেশ পুষ্ট হয়। এ-বিশ্বকাপে সবার নজর— স্পেনের মহাতারকা ল্যামিন জামালের দিকে। জন্মসূত্রে তিনি মরোক্কান। তাঁর বাবা মরক্কোর নাগরিক। মায়ের শিকড় আবার মধ্য আফ্রিকায়। ইকোয়াটোরিয়াল গিনি। জামাল কিন্তু তাঁর দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্পেন-কে। কেন? বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন— ‘আমি স্পেনে বড় হয়েছি। স্পেন আমাকে বাঁচার সমস্ত রসদ দিয়েছে। আমি মন থেকে কাতালান। মরক্কোও আমার দেশ। আমি ভালবাসি। কিন্তু স্পেন আমার আইডেন্টিটি।’
মেক্সিকো সিটিতে কলম্বিয়া-উজবেকিস্তান ম্যাচ চলছে। উজবেকরা প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপে। কলম্বিয়ার গোলের পর সমতাও ফেরায় তারা। কিন্তু দ্বিতীয়বার যখন কলম্বিয়া ফের এগিয়ে যায়, তখন গ্যালারিতে এক ক্ষুদে উজবেকিস্তান সমর্থক হাতে কার্ডবোর্ডের বিশ্বকাপ জড়িয়ে কাঁদছেন। মনখারাপ। তাকে ঘিরে বসেছিলেন কলম্বিয়ার সমর্থকেরা। গোলের পর স্বাভাবিকভাবেই তারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। কিন্তু শিশুটিকে দেখে তারা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা কলম্বিয়া নয় বরং উজবেকিস্তানের হয়ে গলা ফাটাবে।
স্পেন-মরক্কোর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস আমাদের কারও অজানা নয়। ইমিগ্রেশন ইশ্যু, জিব্রালটার প্রণালীতে ফিশিং রাইটস নিয়ে ঝামেলা— দু’দেশের এই অম্লমধুর সম্পর্কের মাঝে, লামিন অবলীলায় বলতে পারেন, নিজের ‘চয়েস’-এর কথা। তাঁর মনের ভেতর গড়ে ওঠা দেশচেতনাই হয়ে ওঠে তাঁর আইডেন্টিটি। আলজিরিয়ান রিফিউজি, জিনেদিন জিদান ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি। অথচ, এ-বিশ্বকাপে তাঁর ছেলে নিকো জিদান খেলছেন, তাঁদের মাতৃভূমি আলজিরিয়ার হয়ে। ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলার পর, নিজের দেশের হয়েই খেলার ইচ্ছে প্রকাশ করেন নিকো। হতে পারে ফ্রান্সের হয়ে তিনি যে-সুযোগ পেতেন, তার চেয়ে বেশি সুযোগের আশাতেই এমন সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু, একজন ফরাসি তারকার ছেলে, অন্য দেশের হয়ে খেলছে— এই বিষয়টি মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে-আন্তর্জাতিক মনন প্রয়োজন তা কি আমাদের আছে? আজ শচিন তেণ্ডুলকরের পুত্র ভারতের দলে সুযোগ না পেয়ে যদি পাকিস্তানের হয়ে খেলার ইচ্ছে প্রকাশ করতেন, এ-দেশের নীতিপুলিশেরা তাঁর কী অবস্থা করত তা সহজেই অনুমেয়।

হাইতির খেলোয়াড়রা যখন মাঠে নামছেন, সকলে বুকে হাত রেখে জাতীয় সংগীত গাইছেন। এদের এগারোজনের মধ্যে দশজনই হাইতিতে থাকেন না। হাইতির কোনও ক্লাবে খেলেনও না। খেলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু তাঁদের মনের ভেতরে থেকে যায় তাঁদের দেশ-হাইতি। তাই ফিরে আসেন দেশের টানে। খেলেন দেশের হয়ে। লামিন জামাল, নিকো জিদান কিংবা হাইতি-কঙ্গো-মরক্কোর ফুটবলারদের উদাহরণ আমাদের দেখায়, দেশচেতনা কোনও স্থানু পাথর নয়, যাকে আঁকড়ে থাকতে হয়। দেশচেতনা মানুষের সচেতন অথচ স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। দেশভাবনা কোনও মানুষের ভিতর যে-কোনওভাবে গড়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থে যেমনটা বলছেন, যে-জাতীয়তাবাদের নামে অন্য রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ প্রচার নয়, বরং শুধু নিজ দেশগণ্ডি ভেদ করে, বিশ্বের সঙ্গে মিলনের গানই আসলে দেশচেতনা। তিনি লিখছেন— ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো/ সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।’। ‘ন্যাশনালিজম’ বইটি একসময়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল পাশ্চাত্যের তাবড় চিন্তাবিদদের। রোমা রোলাঁর উদ্যোগে, বইটির ফরাসি অনুবাদও প্রকাশিত হয়। বিশ্বের জনপ্রিয়তম নেতা লেনিনেরও প্রিয় হয়ে ওঠে বইটি। এই বইয়ের যে সত্য, যে সত্যের ওপর দেশের গড়ে ওঠা দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিশ্বকাপের অসংখ্য মুহূর্ত গড়ে তুলছে সে সত্যের ভিত্তি।
‘বাই নিড’ কিংবা ‘বাই চয়েস’— দেশচেতনা গড়ে উঠতে পারে মানুষের মনে। সেই দেশচেতনার সঙ্গে জুড়ে থাকতে হবে, বিশ্বচেতনা-বিশ্বমানবতা। জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতায় আসলে দুয়োরাণী হয়ে যায় মানুষই। বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের এই বিশ্বের সঙ্গে যোগটি দৃশ্যমান করে দিচ্ছে রোজ।




