We never live; we are always in the expectation of living.
— Voltaire
টুকরো কিছু দ্বীপ জুড়ে-জুড়ে তৈরি হয় একটা দেশ৷ সেই দেশ থেকে জন্ম নেয় একটা স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আর হতাশার মাঝে, আলো হয়ে জ্বলে ওঠে— ছ’ফুট দু’ইঞ্চির একটা অবয়ব। অনেকদূরে বিশ্বের নানা প্রান্তে, এ-সবের সাক্ষী থাকে ঘুমমাখা অসংখ্য চোখ৷ অথচ বিশ্বাস করতে চায় না। ভাবে রূপকথা। বারবার মিলিয়ে নেয় স্কোরলাইন। বাঙালি-সহ বহু মানুষের ফুটবল-শব্দকোষে, পাকাপাকিভাবে সংযোজিত হয় একটা নাম, ভোজিনহা।
১৫ জুন, ২০২৬। স্পেন বনাম কেপ ভার্দে। প্রথমার্ধের অন্তিম মুহূর্ত। রড্রির পাস থেকে কুকুরেলার পিনপয়েন্ট হেডেড ক্রস। ফেরান টোরেসের শট, বারে লেগে ফিরে এল। ফিরতি বলে হেড করলেন, ওয়ারজাবাল। আর আকাশে ভেসে উঠল একটা শরীর। যেন দেশের ৫১৩ বছরের পরাধীনতার ইতিহাস! নিজস্ব চল্লিশ বছরের সংগ্রাম! কোচ বুবিস্তার আজীবনের তপস্যা! তিল-তিল করে গড়ে তোলা এক অনন্য সংস্কৃতি— এই সবকিছুকে তছনছ করে দিতে, আছড়ে পড়ছিল কোনও সুনামি। ভোজিনহা তাই উড়লেন। একটা স্বর্গীয় আঙুলের স্পর্শে, তৈরি হল— মুহূর্ত-স্মৃতি-ইতিহাস।
জুন, ১৯৮৬৷ সবে বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। গোটা বিশ্ব আসক্ত হয়ে পড়েছে মারাদোনা নামক সম্মোহনে। অথচ কেপ ভার্দের তরুণ, জে পেদ্রোর মনজুড়ে, তখন শাসন করছেন জর্জ ভালদানো। ’৮৬-র ফাইনালের নায়কের জাদুকরীতে মুগ্ধ জে, নিজের সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখতে চাইলেন, ভালদানো। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল কর্তৃপক্ষ৷ তাদের আনুগত্য ব্রাজিলের প্রতি। চিরশত্রু তারকার নামে, তাই নৈব-নৈব চ৷ নিজস্ব ইচ্ছেকে মুলতুবি রেখে, জে ফিরে গেলেন ’৮৬-রই বিখ্যাত ব্রাজিলীয় নক্ষত্রের দিকে। ছেলের নাম হিসেবে নিবদ্ধিত হল— জোসিমার জোসে ইভোরা ডিয়াস। নামকরণের সময় থেকেই সে চিনে নিল ফুটবল। যুদ্ধ। লড়াই। আর তার আঁচমন্ত্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ল— ছোট্ট জোসিমারের পবিত্র আত্মার আনাচে-কানাচে।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের দেশে, আইনকানুন সর্ববেশে! লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…
মুহূর্মুহূ আক্রমণে স্পেন। অসংখ্য পাস। ক্রমাগত প্রেসিং। আকস্মিক শট। সবকিছু তাঁর হাতের সামনে এসে অবশ হয়ে যাচ্ছিল। নিজস্ব অভিজ্ঞতার ছায়াতলে আগলে রাখছিলেন সতীর্থদের৷ ছোটবেলা মনে পড়ছিল কি? কেপ ভার্দের রাস্তা৷ স্ট্রিট ফুটবল। বড়দের সঙ্গে খেলা। হার-না-মানা জেদ। তাচ্ছিল্য। সহ্য করতে না পেরে, দিদিমাকে গিয়ে নালিশ। প্রাপ্তি হিসাবে ফিরে পাওয়া টিটকিরি৷ ভোজিনহা (অর্থ রানিং গ্র্যােনি, অর্থাৎ যে বারবার দিদিমাকে নালিশ করে)। অথচ সেই নামকেই পরবর্তীকালে বেছে নেওয়া নিজস্ব পরিচিতি হিসাবে। শৈশবে অর্জিত উপেক্ষাকে ভালবাসার মোড়কে ফিরিয়ে দেওয়া সতীর্থদের প্রতি। আত্মত্যাগ? নেতৃত্ব? ‘আওয়ার বেস্ট ওয়েপেন ইজ আওয়ার ইউনিটি৷ দ্য ওয়ে উই ট্রিট আওয়ার ফ্যামিলি, ইজ আওয়ার বেস্ট স্ট্রেন্থ।’

২০০৭, বাত্কিউ ফুটবল ক্লাব। প্রথম প্রফেশনাল ফুটবলে প্রবেশ৷ তারপর মিন্দেলেন্স। ওখান থেকে অ্যাঙ্গোলা। প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গা। সেখানেই সমনামের খেলোয়াড় থাকায়, জোসিমার থেকে ভোজিনহা রূপে আত্মপ্রকাশ৷ এরপর মল্ডোভার জিম্রু চিসিনাও, পর্তুগালের গিল ভিসেন্তে, সাইপ্রাসের এইএল লিমাসোল, স্লোভাকিয়ার এএস ট্রেন্সিন হয়ে, বর্তমানে আবারও পর্তুগালের চাভেস-এ যোগদান। এই এত দেশে, এত ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপিয়েও, দেশের জার্সিতে নিজেকে প্রমাণ করে দেখানোর আগুন ক্রমাগত জ্বলে গেছে তার ভিতর৷
৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২৷ ‘আফ্রিকা কাপ অফ নেশান্স’ কোয়ালিফায়ার্স৷ দেশের জার্সি গায়ে অভিষেক। বিপক্ষে শক্তিশালী ক্যামেরুন। প্রথম লেগে দুর্ভেদ্য পাঁচিল হয়ে উঠলেন, ভোজিনহা৷ ক্যামেরুনের সমস্ত আক্রমণকে নতজানু করলেন, নিজস্ব অতিমানবিক দক্ষতায়৷ ১৪ অক্টোবর। দ্বিতীয় লেগ। ক্যামেরুন ঘুরে দাঁড়ালেও, তাদের থেকে শেষ হাসি কেড়ে নিলেন৷ কামেরুন ২-১ জিতলেও, দু-লেগ মিলিয়ে মূল পর্বের যোগ্যতা অর্জন করল কেপ ভার্দে৷ ২৬ বছর বয়সে, নিজের অভিষেকে, দেশকে প্রথম মেজর টুর্নামেন্টে পৌঁছে, আন্তর্জাতিক ফুটবল যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। আর সেইদিনই বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নের বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল— তার হৃদয়ে।

মাঝে কেটে গেল চোদ্দোটা বছর৷ ২০১৩ থেকে ২০২৩, প্রতিটি ‘আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্স’-এ তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেন। অথচ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন রয়ে গেল অধরা৷ অবশেষে ২০২৬৷ শেষমেশ যখন দেশ বিশ্বকাপের মূল পর্বের যোগ্যতা অর্জন করল, বাধা হয়ে দাঁড়াল বয়স৷ তখন তিনি ৪০-এর গোড়ায়। সরে দাঁড়াতে চাইলেন৷ কিন্তু কোচ বুবিস্তা-সহ, বাকি সহযাত্রীরা রাজি হলেন না৷ অধিনায়ককে তাঁদের পাশে চাই!
কেপ ভার্দের অধিকাংশ মানুষ দেশের বাইরে থাকেন। খেলোয়াড়েরা ছড়িয়ে ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তরে। কোচ এবং কর্মকর্তারা শুরু করলেন অ্যাভেঞ্জার্স অ্যাসেম্বেলের কাজ৷ বিন্দু-বিন্দু করে গড়ে তুললেন— বিশ্বকাপের টিম। রবার্ট পিকো লোপেজকে রাজি করালেন, লিংকডিনে যোগাযোগের মাধ্যমে। আর তৈরি হল ইতিহাস। গোটা দল নিজেদের উজাড় করে দিল। ’৮৮ মিনিটে অবিশ্বাস্য ডিফেন্ডিং প্রদর্শন করে, রবার্ট পিকো লোপেজ অমর হয়ে গেলেন। মাত্র পাঁচলক্ষের জনসংখ্যার একটা দেশ, সারা বিশ্বে জন্ম দিয়ে গেল ভিনদেশী আত্মীয়দের। নেপথ্যে রইল সেই ফুটবল। দ্যা বিউটিফুল গেম।
ম্যাচ শেষের পর, চোখের বাঁধ ভেঙে উপচে পড়ছিল জল। ভেসে উঠছিল, স্মৃতির ছেলেবেলা৷ বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে৷ দেখাসাক্ষাৎ প্রায় হত না। মা আনাকে, সংসারের দায়িত্ব সামলাতে, করতে হত অপরিসীম পরিশ্রম। ছোট্ট জোসিমারকে সামলাতেন দাদু-দিদিমা। আগলে রাখতেন আদরে। দু’বছর হল সেই আদর থেকে তিনি বঞ্চিত। তাঁরা বঞ্চিত হলেন পৌত্রের শ্রেষ্ঠ কৃতিত্বের সাক্ষ্য হওয়া থেকে। নিজের সঙ্গে কি তিনি তাঁদের হয়েও কাঁদছিলেন? ভাগ করে নিচ্ছিলেন আনন্দাশ্রুর দায়িত্ব?
মাঝে কেটে গেল চোদ্দোটা বছর৷ ২০১৩ থেকে ২০২৩, প্রতিটি আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সে তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেন। অথচ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন রয়ে গেল অধরা৷ অবশেষে ২০২৬৷ শেষমেশ যখন দেশ বিশ্বকাপের মূল পর্বের যোগ্যতা অর্জন করল, বাধা হয়ে দাঁড়ালো বয়স৷ তখন তিনি চল্লিশের গোড়ায়। সরে দাঁড়াতে চাইলেন৷ কিন্তু কোচ বুবিস্তা-সহ, বাকি সহযাত্রীরা রাজি হলেন না৷ অধিনায়ককে তাঁদের পাশে চাই!
ইরফানকে মনে পড়ে। মা চলে গেলেন। দেখতে যেতে পারেননি। দু’দিন পর নিজেও। একটা ঐতিহাসিক আত্মীয়যোগ সম্পন্ন হয়েছিলো যেন। সেই বিচ্ছেদ ও মিলনের অতিলৌকিক অনুভূতি ফিরিয়ে আনলেন ভোজিনহা। বেশকিছু দেশের মানুষদের জন্য, ভিসা-ফি-সহ ফেরতযোগ্য অতিরিক্ত ১৫,০০০ মার্কিন ডলারের বন্ডের ঘোষণা করেছে আমেরিকা। তালিকায় উল্লেখযোগ্য হিসাবে সংযোজিত হয়েছে, কেপ ভার্দের নাম। সেই অর্থের চাহিদা পূরণ করতে না পারায়, মাকে নিজের সঙ্গে আনতে পারেননি ভোজিনহা৷ সুদূরে দেশে বসে, টিভির পর্দায়, ছেলের হাতে বিশ্বকাপের নতুন অধ্যায় লেখা দেখলেন আনা। দেখলেন স্প্যানিশ আর্মাডার বিধ্বংসী শক্তিকে— দু’হাত দিয়ে দমিয়ে দিচ্ছে তাঁর সন্তান। আছড়ে পড়া সমস্ত গোলা-বারুদকে নিমেষে করে দিচ্ছে নিষ্ক্রিয়। আর ভোজিনহা তখনও কাঁদছেন৷ পাগলের মতো কাঁদছেন। আশ্রুর আলেয়ার পর্দায় একে-একে ভেসে উঠছে— দিদিমার হাসি, মায়ের পরিশ্রম, দাদুর স্নেহের ছবি৷ স্মৃতি। আকাশের কোণ থেকে ধীরে-ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে আলো।
আমরা বাঁচি না, বাঁচার প্রত্যাশা পূরণ করি শুধু৷ অথচ, তার বছর ৪০-এর জীবনে ভলতেয়ারকে মানেননি ভোজিনহা৷ তিনি বেঁচেছেন৷ বাঁচিয়েওছেন৷ বাঁচার প্রত্যাশা পূরণ করেছেন প্রাণভরে। সেই প্রাণশক্তি আজ ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকার আনাচে-কানাচে৷ কংগ্রেসম্যান হাকিম জেফ্রিস জানিয়েছেন, আমেরিকান স্টেট সমস্ত ব্যবস্থা সেরে ফেলার চেষ্টা করছে, যাতে আনা, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে তার ছেলের খেলা মাঠে বসে দেখতে পারেন। চূড়ান্ত হিংস্রতার পটভূমিতে ভালবাসার এরচেয়ে বড় স্বাক্ষর আর কীই-বা হতে পারত?
