পাচ্ছে হাসি, হাসছি তাই?
সৈয়দ মুজতবা আলী ‘চাচা কাহিনী’-তে একজায়গায় প্রশংসা করেছিলেন পার্সিদের রসবোধের, লেখকের ভাষায় সে ‘সূক্ষ্ম হোক স্থূল হোক’। রসবোধের ভাল-মন্দ থাকতে পারে, থাকতে পারে ‘পলিটিকালি কারেক্ট-ইনকারেক্ট’-এর তর্কও, কিন্তু দিনের শেষে তা কতটা রসিকতা হয়ে উঠছে নির্ভর করে, অনেকাংশেই, গ্রহীতার বোধের ওপর। সম্প্রতি, প্রণীত মোরে-র স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো-তে ‘ক্রাউডওয়ার্ক’ চলাকালে এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, ডেটে গিয়ে তাঁর প্রেমিকা তাঁকে শারীরিকভাবে পুরোপুরি ঘনিষ্ঠ হতে দিচ্ছিলেন না, কিন্তু তিনি মেয়েটিকে যেহেতু ৩৭০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়েছেন, অতএব তাঁকে তা উশুল করতেই হবে। ওই নির্দিষ্ট শো-তে, প্রণীত মোরে নিজে তো বটেই, ক্রাউডের বাকিরাও এই কথাটিকে বেশ সরসভাবে নিয়েছিলেন। অতএব, ধরে নিতে হবে, ওই স্থান-কাল-পাত্রে ওইটা রস হিসেবেই গ্রাহ্য হয়েছে। কিন্তু যে-মুহূর্তে এই অংশের ভিডিও ক্লিপ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করল, তখনই নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসতে লাগল তীব্র আপত্তি, যার ফলস্বরূপ, ওই মন্তব্য করা ছেলেটিকে শেষত তাঁর চাকরি থেকেই বরখাস্ত করা হল।
‘ক্রাউডওয়ার্ক’ ব্যাপারটা খায় না মাথায় দেয়? সাধারণত, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি শো-গুলিতে কমেডিয়ান তার পারফরমেন্সের শেষে বা মাঝে দর্শকের সঙ্গে কথা চালাচালির মাধ্যমে যে স্বতঃস্ফূর্ত রঙ্গরস পরিবেশন করেন, তাকেই বলা হয় ‘ক্রাউডওয়ার্ক’। উপরিউক্ত ঘটনাটি তেমনই একটি আলাপ-আলোচনার মাঝে ঘটেছে। এখন কথা হচ্ছে, দর্শকের মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানের নেই। দর্শকাসন থেকে কী বলা হবে, না-হবে, সে-বিষয়েও কোনও নির্দিষ্ট রূপরেখা তাঁর কাছে থাকার কথা নয়। কিন্তু দর্শক দুমদাম করে এমন কিছু যদি বলে বসে, যা আপত্তিকর, তখন কী প্রতিক্রিয়া দেবেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান?
জনতার ডিমন্যাস্টিক চর্চা কতটা স্বাভাবিক?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৩৪...
এবার স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, কাকে বলে আপত্তিকর? ঋত্বিক ঘটক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একবার নবারুণ ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘জীবনে হারানোর কিছু নেই, পলিটিকাল কারেক্টনেস আর রাজনৈতিক শৃঙ্খল ছাড়া।’ একথা ঠিক, কারেক্টনেসের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। বিশেষত, তার সঙ্গে যদি ভাবাবেগ জুড়ে যায়। কুণাল কামরার একটি পারফরমেন্স নিয়ে একবছর আগেই বাণিজ্যনগরী উত্তাল হয়ে গিয়েছিল, যেখানে পারফর্ম করেছিলেন কুণাল, সেখানে ভাঙচুরও চালিয়ে আসে কিছু রাজনৈতিক কর্মী। কারণ, মহারাষ্ট্রের এক মন্ত্রী ও শিবসেনার নতুন ভাগের নেতা একনাথ শিন্ডে-কে নিয়ে কুণাল রসিকতা করেছিলেন। যাই হোক, লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা থেকে ‘রেপ রেটোরিক’ অর্থাৎ ধর্ষণ-সংক্রান্ত কোনও কথা খুব সহজভাবে বলে ফেলার প্রবণতা, ভাষা-সংস্কৃতি সংক্রান্ত বিদ্বেষ— এই সমস্তকিছুর মধ্যে সংবেদনশীলতার যে ছোঁয়াচটুকু, তা বাঁচিয়ে চলাকে তো নেহাত সভ্যতা হিসেবেই গ্রাহ্য করা যায়! শাসক বা ক্ষমতাশালীকে আক্রমণ এক জিনিস, আর কারও গায়ের রং নিয়ে, তার স্থানিক পরিচয় নিয়ে মশকরা করা আলাদা। তা যদি চলনসই বলে মেনেও নেওয়া হয়, তার পরেও, সীমারেখা সূক্ষ্মভাবে কোথাও না কোথাও থেকেই যায়। লিঙ্গসাম্যজনিত সচেতনতার এই যুগে পলিটিকাল কারেক্টনেসের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে— এই জাতীয় মন্তব্য মাঝেমধ্যেই ভেসে আসে বটে, কিন্তু ডেটে গিয়ে সঙ্গিনীর থেকে শারীরিক সান্নিধ্য, খানিক জোর করেই, ৩৭০ টাকার বিরিয়ানির বিনিময়ে ‘উশুল’ করে নেব, একথা প্রকাশ্যে বলার স্বাধীনতাও কি গলার শির ফুলিয়ে দাবি করা যায়? এই প্রণীত মোরের ক্রাউডওয়ার্কেই এক মহিলা চিকিৎসক বলে বসেছেন, অ্যানাটমি ট্রেনিংয়ের সময় পুরুষদের যৌনাঙ্গের মাপ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করে মেডিক্যাল স্টুডেন্টরা আমোদ পায়। এই কথা নিয়েও সরাসরি কোনও আপত্তি প্রণীত মোরে নিজে করেননি।
কুণাল কামরা খানিক শ্লেষাত্মকভাবেই ধরিয়ে দিয়েছেন, প্রণীত মোরের নিজের শো-এ এই মন্তব্যগুলি ভেসে উঠেছে যেহেতু, তাঁর শুকনো ক্ষমা চাওয়াতেই দায় স্বীকারের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। এই ধরনের ক্রাউডওয়ার্ক হয়-ই মূলত ইনস্টাগ্রামের রিলের মাপে ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির জন্য। ভাইরালের লোভে পড়ে এই ধরনের মন্তব্যগুলি চালান করে দেওয়া, এবং তারপর প্রতিক্রিয়া বুঝে ক্ষমা চাওয়ার আগে, কমেডিয়ানের নিজের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাঁর ক্রাউডওয়ার্ক থেকে ভেসে আসা এই মন্তব্যগুলো শুনে প্রণীত মোরেও দন্তবিকশিত করে হাসাহাসি করেছেন। এতে এইজাতীয় বদ রসিকতাকে তিনিই খানিক উসকানি দিয়ে দেননি কি? অন্যায় রসিকতা যে করে, এবং সেই রসিকতায় যে হাসে, ভাইরাল হলে উভয়েই ফাঁসে— এখানে কারও কিছু করার নেই।
তাই আঙুল প্রণীত মোরের দিকেও উঠবে সমানভাবে। তার ওই হাসির অর্থ কী? দু’রকম অর্থ হতে পারে। এক, এতে বেশ রগরগে একটা হিড়িক উঠবে। তাতে তাঁর নাম ও তাঁর শো-এর দাম— দুই-ই খানিক বাড়বে। দুই, তিনি সততই অসংবেদনশীল। সত্যিই এই বীভৎস রসে ওঁর হাসি পেয়েছিল। তাই তিনি হেসেছেন। অতএব, যে-কোনওভাবেই তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য। ‘আমি তো এমনটাই ডিজার্ভ করি’ জাতীয় ছোটখাটো বাক্য আওড়ে নীতির আদালত থেকে তিনি ছুটি পাবেন না। সত্যিই তিনি মনে করেন, ৩৭০ টাকার বিরিয়ানি দিয়ে একটি মেয়ের সম্মতি কিনে নেওয়া যায়, সহজ-সরলভাবে বলা ওই মন্তব্যের মধ্যে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক শিকড়টা নিয়ে তিনি আদৌ ততটা ভাবিতই নন। তিনি মনে করেন, হবু চিকিৎসকরা পুংলিঙ্গের মাপ নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করলে তাতে বিশেষ অন্যায় কিছু নেই। তিনি মনে করেন, মজাচ্ছলে, সামাজিক সংকটগুলিকে লঘুভাবে মান্যতা দিলে খুব একটা ক্ষতি হয় না। অথবা, এসব কিছুই তিনি মনে করেন না, কিন্তু কেবল ভাইরাল হওয়ার ওই অপরিসীম লোভেই তিনি সামান্য প্রতিবাদটুকুও করেননি এইসব মন্তব্যর। তাতে ওঁর অন্যায়ের পাল্লা ভারীই হয়, হালকা বিশেষ হয় না। তাই আইনি যেসব অভিযোগের তির তাঁর দিকে উঠছে, যেসব এফআইআর ইত্যাদি পেশ হচ্ছে, তাই নিয়ে আইনি ভাষায় তর্ক চলতে পারে, কিন্তু নীতির প্রশ্নে তাঁকে কোথাও ছাড় দেওয়া যায় না।
এই ঘটনায় মুম্বইয়ের মেয়র আবার বেমালুম বলে বসেছেন, স্ট্যান্ড আপ কমেডি ব্যাপারটাকেই লাটে তুলে দেওয়া উচিত। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ যদিও কিঞ্চিৎ নরম সুরে দায়িত্ব স্মরণ করিয়েছেন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের। নবারুণ ভট্টাচার্যর সুরে সুর মিলিয়ে এক্ষেত্রে বলা যায়, চরমপন্থা ছাড়াও আমাদের হারানোর কিছু নেই, সে রসবোধে হোক, বা আমাদের প্রতিক্রিয়ায়।




