অস্তিত্বের বিষাদসিন্ধু

ভ্যান গঘ তাঁর মৃত্যু-পূর্ববর্তী চিঠিতে তাঁর অনুজা এলিজাবেথকে লিখেছিলেন, ‘লা ত্রিয়েস্তেস ডুরেরা তুজুরস’; অর্থাৎ, ‘এই দুঃখ চিরজীবী’। এই অপরিসীম, চলমান দুঃখ শিল্পীসত্তাকে ছায়ার মতো তাড়া করে বেরিয়েছে বহুবার; বহু ক্ষেত্রে এর পরিণতি হয়েছে এমন মৃত্যুঘটনা, যা পরবর্তীতে নিজেই হয়ে উঠেছে এক আর্টিস্টিক ডিসকোর্স। পাঁচের দশকের আমেরিকান তরুণী কবি সিলভিয়া প্লাথের বর্তমান স্কলারশিপ যেমন সর্বদা সচেষ্ট সিলভিয়া-র জীবনকে সিলভিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর গ্রাস থেকে আলাদা করতে; ছেলেমেয়েদের দুধ এবং পাউরুটি ঢাকা দিয়ে সিলভিয়া নিজের মাথা ওভেনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। কারণ, ওই। ব্যক্তিগত দুঃখ।

এই সর্বগ্রাসী দুঃখের অনুভব, তার কারণ যেমনই পৃথক হোক না কেন, আসলে এক ধরনের চিহ্নক। এই চিহ্নক নির্দেশ করে এমন এক মননের দিকে, যেখানে মুখ্য ভূমিকায় আছে সংবেদ। এই সংবেদী চেতনাই আবার, এই শিল্পীদের চালিত করেছে এমন সৃষ্টির দিকে, যা ব্যক্তিস্তরকে শিল্পের স্তরে উন্নীত করেছে, আবার কখনও কারণ হয়েছে তাঁদের ধ্বংসের।

যাঁর মৃত্যুর পরে এই লেখার অবতারণা, সেই মার্জানে সাত্রাপির মৃত্যুঘটনা যদিও বিস্ময়করভাবে আগে উল্লিখিত মৃত্যুগুলি থেকে আলাদা। ভ্যান গঘ, সিলভিয়া উভয়েই নিজেরাই সচেষ্ট হয়েছিলেন এই পৃথিবী থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে। তথ্যের নিরিখে তাই তাঁদের মৃত্যুকে নাম দেওয়া সহজ, ‘ক্যাটেগোরাইজ’ করা সহজ আত্মহত্যা হিসেবে। আত্মহননের যে ধারণা, তা পরোক্ষে দোষী করে মৃতকে, প্রবল বিষাদের সামনে তাঁর যুঝতে না পারার ক্ষমতাকে। তবে এই যে প্রবল বিষাদ, তা তো দোষ নয় তাঁর, যিনি এ-বিষাদ ধারণে অপারগ।

অবিবাহিত মধ্যবয়সি মহিলাও সুখী হয়? লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…

৪ জুন, ২০২৬ সালে মারজানের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার একটিই প্রতিবেদন দেন সংবাদমাধ্যমকে: ‘মারজেন ডায়েড আউট অফ স্যাডনেস।’ প্রবল বিষাদের কারণে মারজানের মৃত্য হয়েছে; অনবরত ‘সার্ভেলেন্স’-এর এই যুগে এই পরিমিত উচ্চারণ, যা কোনও বাস্তবিক বা শারীরিক কারণ-ফলাফল নির্দেশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা যেন মারজানের জীবনের মতোই প্রতিবাদী এক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। 

মারজানে সাত্রাপি

মারজানেকে যে কাজের জন্য আমরা সবচেয়ে বেশি জানি, তা হলো দু’খণ্ডে (ফরাসিতে চার) লেখা আত্মজীবনীমূলক ‘কমিক’ (গ্রাফিক নভেলের পরিবর্তে এই নামই মারজানে বেছে নিয়েছিলেন)— ‘পার্সেপোলিস’। প্রথম পার্সিয়ান রাজত্বের রাজধানী এই প্রাচীন শহরই বর্তমানের ইরান, যা মারজানের বাসভূমি। ১৯৮০ সালের ইরানের কালচারাল রেভোলিউশনের প্রেক্ষাপটে ‘পার্সেপোলিস’-এ বেড়ে ওঠা কিশোরী মার্জির চোখ দিয়ে মারজানে প্রত্যক্ষ করেন রাষ্ট্রীয় নজরদারি, মৌলবাদী আগ্রাসন, ইরাক-ইরান যুদ্ধের সহিংসতা, এবং তার ফলস্বরূপ মারজানের ইউরোপিয়ান অভিবাসনের একাকিত্ব। সাধারণ কালো কালিতে শৈশবের ছবির রেখাময়তা সমন্বিত এই ‘কমিক’ তার পাঠককে মারজির চোখ দিয়ে, মারজির একের পর এক অভিজ্ঞতাকে দেখায় কোনও মেকি কথকতা আরোপ না করে। ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং কমিক্স’ গ্রন্থে স্কট মাক্লাউড কমিকের এই অ্যাবস্ট্রাক্ট, সরলীকৃত ধারণাকেই বলছেন একধরনের ‘মুখোশ’, যা পাঠক অনায়াসে পরে (এবং পড়ে) নিয়ে কিছু সময়ের জন্য হয়ে উঠতে পারে সেই কাহিনির প্রোটাগোনিস্ট।

কার্যত, ‘পার্সেপোলিস’ পড়ার সময়ে মারজির যে জীবনে আমরা, পাঠকরা অনায়াসে ঢুকে পড়ি, তার সরলতা আর পাঁচটা কিশোরীজীবনের মতোই। আর পাঁচটা কিশোরীর মতোই মারজি ভালবাসে ‘আয়রন মেডেন’, ভালবাসে তার স্নিকার্স জোড়া, এবং ‘পাঙ্ক’ পরিচ্ছদ। তবে মারজির এই ‘সাধারণ’ জীবনের অবস্থান যে বৃহত্তর রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক পরিসরের মধ্যে, তা ইরানের রাষ্ট্রজীবনে মোড় ঘোরায়, যখন দীর্ঘ আড়াই হাজার বছর ধরে চলা ‘শাহ’-কে অপসারিত করে ইরানের মানুষ, যার মধ্যে কিনা মারজির মা-বাবাও সহমত, নিয়ে আসে এক নতুন শাসনব্যবস্থা। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা, তবে ফল হয় তার উল্টোই।

এই নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা নতুন মোড়কে ইরানে ফিরিয়ে আনে ধর্মীয় মৌলবাদের চোখরাঙানি, যা অসংখ্য মারজিদের ওপর চাপিয়ে দেয় ‘না’-এর এক সম্ভার। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হতে থাকা রাজনীতি এবং শিক্ষায় আলোকিত মারজির কাছে এই চোখরাঙানি হয়ে ওঠে দুর্বিষহ, বিষাদময়। এই শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র অভিঘাত হানতে থাকে মার্জি; তার একার অস্বস্তিই আমরা ‘পার্সেপোলিস’-এ দেখতে পাই, কিন্তু মারজির এই একক অস্বস্তি ওরফে গোটা পার্সেপোলিসের সামগ্রিক অস্বস্তির প্রতিফলক হয়ে ওঠে। এরপর ইরাক-ইরান যুদ্ধ বাধলে ক্রমশ আমরা মারজিকে অনুসরণ করি তাঁর ভিয়েনা যাত্রায়। পার্সেপোলিসের প্রতিটি বাঁকই অর্থবহ। প্রথম খণ্ডের শেষে মারজি যখন ইরান ছেড়ে ভিয়েনা অভিমুখে যাত্রা করছে, তখন তাঁর মা জ্ঞান হারান মার্জিকে হারানোর বেদনায়। মারজি, পার্সেপোলিসে যার আরেক নাম নির্ভীকতা, ইরান ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে যেন ইরান তাঁর চেতনা হারিয়ে মিশে যায় অন্ধকার এক অচেতনতায়। প্রথম খণ্ড, বা শৈশবের গল্পের শেষ দৃশ্য যেন কার্যতই মারজির এই ‘লস অফ ইনোসেন্স’-এর সূচক।

তবে কমিকের দ্বিতীয় খণ্ডের কথা আলোচনা না করলে বোঝা যাবে না, কেন মারজি এবং মারজেনের গল্প বারে বারে সমার্থক হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় খণ্ড গল্প বলে মারজির অভিবাসনের। ভিয়েনায় মারজির স্কুলজীবন হয়ে ওঠে তার অভিবাসন-পরবর্তী দ্বৈতসত্তার দ্যোতক, যেখানে নতুন শহরে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বারবার তাকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত এক দূরত্বের সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে মারজি, যার ক্ষুদ্রসত্তার সিকিভাগই ছিল বিপ্লব, নতুন দেশে তার সহপাঠীরা সেই সত্তাকে চিনে নেওয়ার ধার ধারে না, বরং ইরানের যে রাজনৈতিক সত্তা, সেই রাষ্ট্রীয় সত্তার নিরিখেই মারজিকে অনুধাবন করে তার ইউরোপিয়ান জীবনের মানুষেরা। দীর্ঘ কয়েকমাস এই এলিয়েনেশনের জ্বরে বিস্রস্ত মারজি গৃহহীন হয়ে কাটায় ভিয়েনাতে, তারপর সে ফিরেও যায় তার নিজের দেশ ইরানে। তবে ইরানে গিয়েও মানিয়ে নিতে পারে না মারজি; তার গায়ে লেগেছে সাদা চামড়ার মানুষের তকমা— ফ্রানৎস ফানোঁর ‘ব্ল্যাক স্কিন হোয়াট মাস্কস’ গ্রন্থে ফানোঁ উপনিবেশায়িত মানুষের প্রসঙ্গে বলেছেন যে, তারা শাসকের ভাষায় সড়গড় হতে গিয়ে হারিয়ে ফেলে নিজস্ব ভাষাভঙ্গি, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় তারা নিজের শ্রেণিসত্তা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কলোনাইজেশনের ধারণা অতিক্রম করেও বর্তমান পৃথিবীতে দেশ থেকে দেশান্তরে অভিবাসনের ক্ষেত্রে এই ধারণা যে কতটা প্রযোজ্য, ‘পার্সেপোলিস’-এ মারজির সত্তার এই এলিয়েনেশন তাই-ই প্রমাণ করে। এই বিচ্ছিন্নতা, ইরানের সামগ্রিক সামাজিক চিত্র, এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে বর্ণিত করতেই মারজি লেখে ‘পার্সেপোলিস’, এবং মারজেন লেখেন ‘পার্সেপোলিস’। মারজি উচ্চবিত্ত, আলোকিত পরিবারের কন্যা, তার পিতামাতা রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের মধ্যেও বাড়িতে বন্ধুদের সঙ্গে মদ্যপানের আসর বসাতেন, আলোচনা করতেন মার্ক্স এবং এঙ্গেলস নিয়ে। চকিতে মনে হতে পারে, এক্ষেত্রে মারজির অভিজ্ঞতার সাব্জেক্টিভিজম তাকে কথক হিসেবে বাকি ইরানের থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু আদপেই আধুনিক ইরানের চিত্র ঠিক এরকমই। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, মারজেনেরই সমসাময়িক আরেক ইরানিয়ান নারীবাদী নির্ভীক লেখিকা আজহার নাফিসির কথা; পর্দাপ্রথার বিরোধী এই অধ্যাপিকা তাঁর ছাত্রীদের নিয়ে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তৈরি করেছিলেন এক পশ্চিমি সাহিত্য-পাঠচক্র, যেখানে তাঁরা একত্র হয়ে নাবোকভের ‘লোলিতা’-র মতো ‘অবসিন’ এবং নিষিদ্ধ গ্রন্থপাঠ ও আলোচনা করতেন।

মারজেনের লেখনীতে যা বারবার উঠে আসে, তা হল ‘পার্সপেক্টিভিজম’। গল্প বলার সঙ্গে-সঙ্গে এই গল্প কীভাবে বলা হচ্ছে, এবং কে এই সামগ্রিক ঘটনাবলি অবলোকনের পর এই গল্পকে নথিভুক্ত করছেন, তা সমান গুরুত্ব পায় মারজেনের সৃষ্টিতে। ‘পার্সেপোলিস’-এর ক্ষেত্রে এই অবলোকন শৈশব থেকে কৈশোরে উত্তীর্ণ হওয়া এক কথকের, কিন্তু ‘পার্সেপোলিস’-এর অপরিসীম সাফল্যের আলোয় মারজেনের যে গ্রন্থটি খানিক বিলীন হয়ে থাকে, তা হল ‘এম্ব্রয়ডারিস’। ‘এম্ব্রয়ডারিস’-ও মারজেনের আত্মজৈবনিক গ্রন্থায়ন, তবে এর উপজীব্য হল পর্দাপ্রথার অনুশাসনের মধ্যেও নারীদের অন্তর্গত জীবনের কাহিনি। ‘পার্সেপোলিস’-এর কাহিনি মারজেনের জীবনকে বেড় দিতে চাইলে, ‘এম্ব্রয়ডারিস’ হল কয়েকটি চায়ের আসরের গল্প। এই চায়ের আসর বসত মারজেনের মা, ঠাকুমা ও তাঁদের বন্ধুদের নিয়ে, যেখানে তাঁরা আলোচনা করতেন তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত কথা; ভালবাসার কথা, প্রেম-আদরের কথা, পুরুষের প্রতি আকর্ষণের কথা, মায় পরকীয়ার কথাও। এই ছোট্ট চায়ের আসরকে ‘মেয়েলি গল্প’ বলে আমল না দিতে চাওয়ার অবকাশ নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে, কিন্তু দ্রোহের সংজ্ঞা গড়ে ওঠে তার ‘কনটেক্সট’ থেকে। যে রাষ্ট্র নারীর পর্দাহীন বিচরণ আইন করে শাসায়, সেই রাষ্ট্রে বিপ্লব নারীদের সম্মিলিত চায়ের কাপ থেকেই তৈরি হয় বইকি। মারজেনের সৃষ্টিতে বিপ্লবের এই ‘ইন্টিমেট’ রূপায়ণ বারবার ধরা পড়েছে।

মারজেনের লেখনীতে যা বারবার উঠে আসে, তা হল ‘পার্সপেক্টিভিজম’। গল্প বলার সঙ্গে-সঙ্গে এই গল্প কীভাবে বলা হচ্ছে, এবং কে এই সামগ্রিক ঘটনাবলি অবলোকনের পর এই গল্পকে নথিভুক্ত করছেন, তা সমান গুরুত্ব পায় মারজেনের সৃষ্টিতে।

মারজির অস্তিত্বের বাইরেও মারজেনের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ইরানীয় দ্রোহের জীবনে ছিল স্পষ্ট, সরব। ২০০৯-এর নির্বাচনী অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে মুখ খোলাই হোক, বা ২০২২-এর মাশা আমিনি প্রোটেস্ট, মারজেন ছিলেন নির্ভীক বক্তা, ঠিক যেমন মারজি-ও। তবে ইরানীয় রেজিমের চরমতার হাত থেকে রেহাই পেতে মারজেনকে শেষমেশ অভিবাসনের জীবনী বেছে নিতে হয়। ফ্রান্সে মারজেন সেই আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী সুইডিশ অভিনেতা ও প্রোডিউসার মাতিয়াস রিপা-কে। তবে এই আশ্রয়ের সঙ্গেও মারজেন রাজনৈতিক সমঝোতা করেননি; ইরানীয়দের প্রতি ফ্রান্সের মনোভাব এবং ভিসা পলিসির বিরুদ্ধাচরণ করে ফরাসি দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘লিজিয়ন দে অনর’ ২০২৫ সালে ফিরিয়ে দেন তিনি। ছোট্ট মারজিকে যে সংবেদনশীলতা, যে দ্রোহের আগুন উত্তপ্ত করে রেখেছিল, মারজেন তাঁর জীবন এবং সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সেই উত্তাপ তাঁর পাঠকের প্রতি সঞ্চালিত করেছেন বারবার।

যে অনুশাসনের বিরুদ্ধে মারজেন তাঁর সত্তাকে মেলে ধরেছিলেন তাঁর যাপন ও সৃষ্টির মধ্যে, সেই অনুশাসন বর্তমান ইরানেও সমানভাবে জারি। ছোট্ট মারজির কাহিনি বর্তমানেও বহু মাৰ্জির গল্প, যারা ইরানেই থেকে যেতে বাধ্য হয়, দেশ ছেড়ে যাওয়ার উপায় যাদের নেই। সম্প্রতি ইরানীয় পরিচালক আলি আজগারি এবং আলি রেজা খাতামির চলচ্চিত্র ‘টেরেস্ট্রিয়াল ভার্সেস’ দেখতে গিয়ে মনে পড়ে যায় ছোট্ট মারজি-র কথা। মোট ন’টি ক্ষুদ্র চিত্রায়নের মাধ্যমে এই ছবিতে পরিচালকদ্বয় দেখিয়েছেন, ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রের অনধিকার প্রবেশের কিসসা। কখনও সদ্যোজাতের নামকরণের ক্ষেত্রে পিতাকে মুখোমুখি হতে হয় রাষ্ট্রের অনুমতি গ্রহণ প্রক্রিয়ায়, কখনও পর্দাহীনভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে তরুণীকে দীর্ঘ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় পুলিশ স্টেশনে, আবার কখনও রাষ্ট্রের না-পসন্দ কবিতা ট্যাটু করার দায়ে নগ্ন হতে হয় ড্রাইভিং লাইসেন্স-প্রত্যাশী তরুণকে। এরই মধ্যে একটি ছবিতে স্কুলে পড়া ছোট্ট সেলেনা মায়ের সঙ্গে এসেছে স্কুলেরই এক ইভেন্টের জন্য শপিং করতে। শপিংয়ে তার মন নেই; পশ্চিমি পরিচ্ছদে সজ্জিত, কানে গোলাপি আলো জ্বলা হেডফোনের তালে-তালে সে নেচেই যাচ্ছে। শুধু পিছনে শোনা যায় তার মা এবং পসারিণীর কথোপকথন; রাষ্ট্রের চোখে সেলেনা ‘বড়’ হয়ে উঠেছে, তাই স্কুলের ইভেন্টে তাকে এবার পড়তে হবে হিজাব, ঢেকে নিতে হবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্দার আড়ালে। একে-একে মা সেলেনাকে ‘পছন্দমতো’ পর্দায় ঢেকে দিতে বাধ্য হন। ধীর এই প্রক্রিয়ায় সেলেনার উচ্ছল শৈশব, তার সামগ্রিক ব্যক্তিসত্তা আড়াল হয়ে তাকে রাষ্ট্রের হাতের পুতুল মনে হতে থাকে। আর কিছুই ঘটে না এই ছবিতে, তবু নির্মমতার এই  ভয়াবহ চিত্র দর্শকমানসে ধরা পড়ে। তবে এই ‘ট্রায়াল’ যখন শেষ হয়ে যায়, সেলেনা তার আবায়া, তার হিজাব সত্ত্বর ছুড়ে ফেলে যায়; তার মাথার মধ্যে সঞ্চারিত হওয়া সুরের তালে পুনরায় সে নাচতে শুরু করে। ‘ওমেন, লাইফ, ফ্রিডম’-এর যে সুরে আসগারি ও খাতামির এই ছবি সিক্ত, সেই একই সুরে, একই ভাষায় মারজেন, মারজি তাঁর সমস্ত কথা আমাদের বলে দিয়েছেন।