‘দ্য ডেড ম্যান’
আমাদের ইস্কুলে সরস্বতী পুজো হত। আমি, স্কুলের সরস্বতী পুজোয় খুব একটা যুক্ত থাকতাম না, কারণ আমাদের ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের বাসায় তো সরস্বতী পুজোটা ভাল করে হত। তবু, একবার তো যেতাম বটেই। তিনতলায় একটা হলঘর ছিল, ওখানে ভাগ-ভাগ করে চারটে ক্লাস হত। কোনও পার্টিশন ছিল না। এক ক্লাসে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ, অন্য ক্লাসের ভূমিক্ষয়ের কারণের উপর চেপে যেত, কিংবা ‘ভূতের মতন চেহারা যেমন নির্বোধ অতি ঘোর’ মিশে যেত। আকবরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যতে। এতে তেমন অসুবিধা ছিল না। যে যার বিষয়, ফিল্টার করে নিতে পারত।
সরস্বতী পুজোর দিন, ওই হলঘরে সব ক্লাসগুলো এক হয়ে যেত। সব হাই বেঞ্চ-লো বেঞ্চগুলি, একসঙ্গে করা হত। খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারি, টমেটোর চাটনি এবং বোঁদে— এটাই ছিল মেনু। দু’দিন পরেও তিনতলার বাতাসে, কেমন একটা খিচুড়ি-খিচুড়ি গন্ধ থাকত।
আমাদের স্কুলে রবীন্দ্রজয়ন্তীও হত প্রতিবছর। কিছুদিন আগে থেকেই রিহার্সাল হত। ধীরেনবাবুস্যর ছিলেন, রবীন্দ্রজয়ন্তীর প্রধান কাণ্ডারী। উনি গানের রিহার্সাল করাতেন, নাটকের, আবৃত্তিরও। কখনও জীবনবাবু। স্কুলের একটা হারমোনিয়াম ছিল। ছেলেরা গান গাইলে, ধীরেনবাবু হারমোনিয়াম বাজাতেন। প্রতিবছর দু’টি করে নাটক হত। ‘হাস্যকৌতুক’ থেকে নির্বাচন করা হত। ‘রোগীর বন্ধু’, ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ ‘সূক্ষ্ম বিচার’— এইসব। আমি কোনও একটি নাটকে, বৃদ্ধ সেজেছিলাম; পাকা-পাকা গোঁফ লাগিয়েছিল আঠা দিয়ে। সেই আঠার গন্ধ, বেশ সুখকর ছিল। মাথায় সাদা পরচুলা। এই নাটকটার পর, আমাকে অনেকেই দাদু ডাকতে লাগল। এখনও এক-দু’জন দাদু ডাকার মানুষ বেঁচে আছে। আবৃত্তিও হত। আমি রবীন্দ্রনাথের ‘প্রশ্ন’ কবিতাটা আবৃত্তি করেছিলাম, ক্লাস সিক্সে। ছোটবেলায় যা মুখস্থ করতে হয়, সেটা সারাজীবন মনে থাকে। কবিতাটা আজও মনে আছে।
আমাদের স্কুলব্যাগ বলে কিছু ছিল না, বইপত্র নিতাম হাতে! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১৯…
একজনের কথা মনে পড়ল। উঁচু ক্লাসের ছেলে। ‘দেবতার গ্রাস’ আবৃত্তি করছে। শেষ কয়েকটি লাইনে গিয়ে, খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেল। ‘‘‘মাসী’ বলি ফুকারিয়া মিলালো বালক/ অনন্ত তিমির তলে;…’’ বলেই, কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে যেত। এরপর আছে, ‘…শুধু ক্ষীণ মুঠি/ বারেক ব্যাকুল বলে ঊর্ধ্ব-পানে উঠি/ আকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে…আর উঠিল না। সূর্য গেল অস্তাচলে।’
ছেলেটা এরপর মূকাভিনয় করত। হাতটা একবার উপরে ওঠাত, মানে ক্ষীণ মুঠি আকাশে আশ্রয় খুঁজছে। তারপর দুই হাতটা নাড়িয়ে দিত। মানে আর উঠিল না। টাটা। ওর চোখ সিক্ত হয়ে যেত। ধীরেনবাবু বহু চেষ্টা করেও, শেষলাইন ক’টা বলাতে পারেননি।
ধীরেনবাবু বোধহয় ক্লাস ফাইভের ক্লাস টিচার ছিলেন। বাংলা আর অঙ্ক করাতেন। অঙ্ক করতে দিতেন ক্লাসে, বোর্ডে লিখে দিতেন। আমরা বলতাম, বুদ্ধির অঙ্ক। বলতেন, যে আগে পারবে, তাকে সম্মান দেওয়া হবে। যে সবার আগে স্যরের কাছে নিয়ে যেতে পারত, এবং যদি ঠিক হত, স্যর নিজের চেয়ারে, ছেলেটিকে পাশে বসাতেন, এবং ক্লাসের অন্য সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান দিত। এই ব্যাপারটা ধীরেনবাবু ছাড়া আর কারও মধ্যে পাইনি।
আরেকটু উঁচু ক্লাসে, কয়েকজন শিক্ষককে পেয়েছিলাম, যারা এখনও স্মৃতিতে লেগে রয়েছেন। একজন সচিদুলালবাবু। ইতিহাস পড়াতেন, মাইকেল এনজেলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, রেনেসাঁ… একটা ম্যাপ নিয়ে আসতেন ইতিহাস ক্লাসে। দেখাতেন, রোম সাম্রাজ্য। কী নাটকীয়ভাবে পড়াতেন, ফরাসি বিপ্লব। আরেকজন, হরিপদ কুশারি। বড় আশ্চর্য মানুষ। ভূগোল পড়াতেন। ধুতি আর ফুল শার্ট পরতেন, কখনও পাঞ্জাবি। ইস্ত্রি করা থাকত। গৌরবর্ণ, অত্যন্ত সুদর্শন। উনিও ম্যাপ নিয়ে আসতেন ক্লাসে। গঙ্গা নদীর উৎপত্তি পড়াতে-পড়াতে, জগদীশচন্দ্র বসুর— গঙ্গা তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? মহাদেবের জটা হইতে… পড়ে শোনাতেন। হিমালয়ে কেন বরফ জমে, কেন উপরের দিকে তাপমাত্রা কমে যায়, সহজকথায় বুঝিয়ে দিতেন। ক্লাস সেভেন-এইটেই, জল কীভাবে নীচের দিকে গড়ায়, জল কীভাবে নিজের পথ তৈরি করে বোঝাবার জন্য, নিয়ে যেতেন মাঠের কোণার বালির গাদায়। দেখাতেন, জলের সরু পথ। দেখাতেন, একটা জলধারা কীভাবে অন্য জলধারায় মিশে যায়। ভারতে কোথায় আখ উৎপাদন হয় পড়াতে গিয়ে বোঝাতেন, কোন আবহাওয়া আখ চাষের জন্য দরকার। তারপর, পৃথিবীর আর কোথায়-কোথায় আখ চাষ হয়। এ-প্রসঙ্গে, ত্রিনিদাদ, বারবোডোজ এইসব দ্বীপগুলির কথা উঠলে, ভারত থেকে কীভাবে কৃষিশ্রমিক চালান হত, দাস ব্যাবসা ও আফ্রিকান শ্রমিক— এসব বলতে-বলতে, কিউবা, কিউবা থেকে ফিদেল ক্রাস্ত্র, চে গুয়েভারা… ধান কোন মাটিতে ভাল হয়, কীরকম বৃষ্টিপাত দরকার বলতে-বলতে, নিরক্ষরেখা, মৌসুমীবায়ু, বার্মা, থাইল্যান্ড, লাওস, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম… ভিয়েতনাম… প্রসঙ্গ এলে হোচিমিন, সাম্রাজ্যবাদ, আমেরিকা…।

তখনও, ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল। ভিয়েতনামের গেরিলা বাহিনী বনাম আমেরিকা। কলকাতার রাস্তায়, ‘আমার নাম তোমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’ দেওয়াল লিখন তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু কুশারিবাবুস্যর, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কীভাবে ভিয়েতনাম-জাপান, ফরাসি এবং আমেরিকানদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। হোচিমিন, লেদুয়ান গিয়াপ, এঁরা নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছেন। একদিন বললেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধে, হো চি মিনের মাথা কে জানিস? কে হো চি মিনকে বুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন? আমরা কীভাবে জানব? স্যর বলেছিলেন, ‘দ্য ডেড ম্যান’। বলে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ । তারপর বললেন, সেই মৃত মানুষটি, যাকে মৃত বলে প্রচার করা হয়…
—‘কে তিনি?’
আমাদের নির্বাক প্রশ্ন।
তিনি বলতেন, ‘সুভাষচন্দ্র বসু’।
আমরা তখন ক্লাস সেভেন। আমরা কয়েকজন কুশারিবাবুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। নানা অছিলায় ওঁর কাছে যেতাম। উনি ছুটির পরে, আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে গল্প করতেন। ফিসফিস করে বলতেন, নেতাজির সঙ্গে, ওঁর যোগাযোগ আছে। এই গোপন কথা যেন কেউ না জানে। ফাঁস হয়ে গেলে, তোদের কুশারিবাবু খুন হয়ে যাবে। আমরা শিহরিত হতাম! জিজ্ঞাসা করতাম, ‘উনি কোথায় আছেন স্যর?’ উনি ঠোঁটে আঙুল চাপতেন। আমরা স্যরকে বিশ্বাস করতাম। যে-স্যার এত ভাল পড়ান, বাগবাজার স্ট্রিটে পটলার দোকানে নিয়ে গিয়ে, লড়াইয়ের চপ খাওয়ান, উনি মিথ্যে কথা বলতে পারেন না। একদিন বললেন, খুব খারাপ খবর। ‘দ্য ডেড ম্যান’ খুব চোট পেয়েছেন। একেবারে স্পটে গিয়েছিলেন কিনা… একটা আমেরিকান প্লেনকে গুলি করে নামাতে গিয়ে…
তখনও, ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল। ভিয়েতনামের গেরিলা বাহিনী বনাম আমেরিকা। কলকাতার রাস্তায়, ‘আমার নাম তোমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’ দেওয়াল লিখন তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু কুশারিবাবুস্যর, ভিয়েতনাম যুদ্ধের পটভূমি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কীভাবে ভিয়েতনাম-জাপান, ফরাসি এবং আমেরিকানদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে।
ক্লাস এইটে কাশিমবাজার স্কুল ছাড়ি। হেয়ার স্কুলে ভর্তি হই। কুশারিবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে যায়। বড় হতে থাকি। একবার শুনলাম, উনি খুবই অসুস্থ। স্যরের বাড়ি একজন চিনত। নিয়ে গেল হাতিবাগান অঞ্চলের একটা গলিতে। শুয়ে আছেন। উনি অকৃতদার ছিলেন, কেউ নেই। বিছানার পাশে, একটা আধখাওয়া কমলালেবু। বললেন বাঁচবো না রে… তোরা এলি, খুব খুশি হলাম রে… আমার তো কেউ নেই। শুধু ডেড ম্যান ছিল, আমি মরে গেলে আমার ডেড ম্যানও…
অনেকদিন পরে, আকাশবাণীর চাকরিতে, মহাশ্বেতা দেবীর ইন্টারভিউ নিচ্ছি, জানতাম, উনি গণনাট্যের গানও করতেন একটা গান গাইতে বলেছিলাম। গান গাইলেন মহাশ্বেতাদি। জানালেন গানটি হরিপদ কুশারির রচনা। গণনাট্যে ছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, চিনতেন আপনি? উনি বলেছিলেন, বাগবাজারের একটা স্কুলে ভূগোল পড়ায় তো। পার্টিটা ছেড়ে দিয়েছিল। স্যরের কেউ ছিল না, শুধু ‘ডেডম্যান’ ছিল। ‘ডেডম্যান’কে নিয়েই, জীবনটা কাটিয়ে দিলেন স্যর।
একজন অঙ্ক-স্যরকে পেয়েছিলাম। দেবকিঙ্করবাবু। অঙ্ক স্যরেরা কেন জানি না— কাব্যে উপেক্ষিত। বাংলা গল্পটল্পতে, সংস্কৃত স্যর, বা পণ্ডিত স্যারদের নিয়ে প্রচুর মাতামাতি। কতরকম ভাবে, পণ্ডিত স্যারেরা এসেছেন, শিবরাম, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়রা লিখেছেন। সতীনাথ ভাদুড়ীর বিখ্যাত গল্প, ‘বৈয়াকরণ’ তো অসামান্য। নারায়ন সান্যালের ‘প্যারাবোলা স্যার’ ছাড়া, আর কারও লেখায়, অঙ্ক-স্যর পাইনি। ছয়ের দশকে, পণ্ডিত স্যরদের দেখলেই চেনা যেত। চুল ছোট, কারও মাথার পিছনে একটা ছোট টিকি থাকত। ওঁরা বলতেন, শিখা। ধুতি, ছোট-পাঞ্জাবি বা চাদর, হাতে কাপড়ের ব্যাগ, একটা নস্যির ডিবে। পণ্ডিত স্যরেরা, আটের দশক থেকেই ‘সানস্ক্রিট স্যর’ হয়ে গেলেন। ফুলপ্যান্টে শার্ট গুঁজলেও কোনও ব্যাপার নয়। অঙ্কের স্যারদের দেখলেও, মোটামুটি আঁচ করা যেত। একটু আলভোলা টাইপের মানুষ, মাথারচুল প্রায়শই আঁচড়ানো থাকে না, হয়তো বোতাম লাগানো হয়নি জামায়, প্যান্টের বেল্টটা লেজ এলিয়ে ঝুলছে…

নীচু ক্লাসে একজন স্যার ছিলেন, পঞ্চান্ন না বলে পাঁচপান্ন বলতেন। এক গার্জিয়ান নাকি বলেছিলেন, পাঁচপান্ন শেখান কেন, পঞ্চান্ন বলতে পারেন না? স্যর বলেছিলেন, পাঁচপান্নরে পঞ্চান্ন বলিলে কি আপনার পুত্র লাটসাহেব হইবে?
একটি ছেলে ছিল আমাদের ক্লাসে, অজয়। ওরা কাকা ছিল, সে নাকি অঙ্ক-কবি। কবিতায় অঙ্ক শেখাত। আরও ছোটবেলায়, এক পুরোহিতমশাই, কামাখ্যা পুরোহিত, পিশেমশাইদের পুজোআচ্চা করতেন। সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মীপূজা করতেন। উনি অঙ্কের ধাঁধা দিতেন। যেমন— একদিন তিন বুড়ি আহারে বসিয়া, বয়স গণনা করে হাসিয়া-হাসিয়া। প্রথম বুড়িটি বলে, আমি তোমা হতে দ্বাদশ বৎসর বড় হই বয়সেতে। শুনিয়া দ্বিতীয় কহে, তোর স্বামী হতে মুই, ছোট হই বয়সেতে মাত্র দুই… এইভাবে কার বয়স কত, বলতে হত। অঙ্ককাকুর অঙ্কও ছিল— ৩০ টাকায় কিনলি খাসি, লোক জুটেছে ১৮০ সবাই বলে খাবে খাবে সমান সমান জাগায় নেবে। ২৭ সের ওজন ধরো, কে কত দেবে হিসাব করো। এটা তো একটা গুণ-ভাগের অঙ্ক। লসাগু-গসাগুর অঙ্কও ছড়ায় ছড়াত। একটা নল-চৌবাচ্চার অঙ্ক এরকম— চৌবাচ্চা ছিল এক প্রকাণ্ড বিশাল, দুই নলে, আসে জল সকাল-বিকাল। এক নলে পূর্ণ হতে বিশ মিনিট লাগে, অন্য নলে পূর্ণ হয় তার অর্ধ আগে। চৌবাচ্চা পূরণের সময় করগো নির্ণয়, দুই নল খুলে দিলে, লাগে কতক্ষণ?
পাটিগণিতের অঙ্কতে কত রকম প্যাঁচ কষাতে জানতেন অঙ্কওয়ালারা। যাদব চক্রবর্তী, কেশব নাগ— বাপরে বাপ! আমাদের মতো কোমলমতি শিশুদের এত কষ্ট দিতে মায়া লাগতো না একটু? কীসব অঙ্ক! একটা ট্রেন এধার থেকে ওধারে যাচ্ছে, অন্যটা ওধার থেকে এধারে, ওটা পাঁচমিনিট ফাস্ট এটা চারমিনিট স্লো। এত মাইল পথ। ওটা এতটার সময়ে ছেড়েছে, এটা এতটার সময়ে, কখন ক্রসিং হবে? আমরা সেভেন-এইটেই কি স্টেশন মাস্টার হব নাকি?
১০জন পুরুষশ্রমিক, পাঁচজন নারীশ্রমিক একটা কাজ করছে। নারীশ্রমিকের মজুরি পুরুষের অর্ধেক, এত টাকা খরচ, মোট খরচ নারীরা কত করে পেল? পুরুষ কত করে পেল? সে-সময়ে কি নারীবাদীরা ছিল না একদম? কৃষ্ণা বসু বা শাশ্বতী ঘোষরা থাকলে কি এই ধরনের অংক তৈরি করা যেত? ওই সময়ের অঙ্কে শিশুশ্রমিকও ছিল। গোয়ালারা দুধে জল মেশাত, চালে কাঁকর মেশাত এবং খাঁটি দুধে জল মিশিয়ে, কত লাভ হত— অঙ্ক কষে বের করতে হত। তার মানে, এসব তখন সামাজিকভাবে স্বীকৃতই ছিল। দুধে জল মেশানো স্বাভাবিক, মেয়েদের কম মজুরি স্বাভাবিক, শিশুরা তো কাজ করবেই। এবং ওদের পারিশ্রমিকও কম হবে।
আজ থেকে কয়েক বছর পর কি এরকম অঙ্ক আসতে পারে যে, কোন ক্ষমতাশালী মানুষ, চাকরির বিনিময়ে এত টাকা ঘুষ নেন। সেই ঘুষের টাকা থেকে, শতকরা এত এখানে, শতকরা এত ওখানে কাটমানি দিতে হয়। এতজন যদি চাকরি পায়, ক্ষমতাশালীর পকেটে কত টাকা আসবে? কিংবা, কোনও প্রকল্পের বাজেট এত, তাই থেকে অমুকের এত কমিশন, তমুকের এত; শেষঅবধি প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় কত? জানি না, এসব তো এখন হয়েই চলেছে। যারা করছে, তারা তো বুক ফুলিয়েই চলছে। এটাও কি সামাজিকভাবে বৈধ হয়ে গেল? ক্লাস সেভেনে এল অ্যালজেবরা। কে পি বসুর বই। দেবকিঙ্কর রক্ষিত নামে একজন স্যর আমাদের অ্যালজেবরা করাতেন। জগদীশচন্দ্র বসুর মতো চুল, সেই চুলে, সম্ভবত চিরুনি পড়ত কম। প্রথমদিন ক্লাসে এসেই বলেছিলেন, অ্যালজেবরা হল, একটা লুকোচুরি খেলা; আছে, কিন্তু ধরতে হবে। যাকে তুমি ধরতে চাও, তার নাম দিয়ে দাও এক্স। নাও এবার ধরো। পাটিগণিতের অঙ্ক ও অ্যালজেবরা করা শিখিয়েছিলেন। তোমার বাবার বয়স এখন তোমার বয়সের চারগুণ। ধরো তোমার এখন এক্স। তাহলে তোমার বাবা 4X। এই ধরাধরিটা খুব মুশকিলের ছিল। এখনকার ভাষায় ‘চাপের’।



