যৌনতা, দর্শন ও সাদ

Representative Image

সপ্তদশ শতাব্দীতে, র‍্যাশনালিজমের জনক রেনে দেকার্তের প্রখ্যাত উক্তি— ‘আই থিঙ্ক দেয়ারফোর, আই অ্যাম’— চিন্তনের জগতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। দেকার্ত, তাঁর ‘মাইন্ড-বডি ডুয়ালিজম’-এর তত্ত্বেও কার্যত যেন ভাবতে পারার এই ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। যদিও তিনি বলছেন, মন এবং দেহ, অস্তিত্বগতভাবেই আলাদা, কিন্তু ‘মেডিটেশন্স’ গ্রন্থে তিনি বলে বসলেন যে, দেহ একেবারেই একটি চিন্তা-অক্ষম বস্তু, এবং মনন খুব সহজেই দেহের আধার ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। সকল তত্ত্বের মতো দেকার্তের এই ‘মাইন্ড-বডি ডুয়ালিজম’ তত্ত্বও পরবর্তীকালে খণ্ডন করেছেন পরবর্তী চিন্তাবিদরা, যাঁদের বেশিরভাগই একটি বিষয়ে সহমত যে, মননের নাগাল রক্তমাংসের দেহের কাঠামো ছাড়া পাওয়াই মুশকিল। তবে দেহকে বুঝতে হলে, বুঝতে হবে, তার নিজস্ব পরিভাষার মাধ্যমেই; তা সে পরিভাষা যতই আমাদের নৈতিকতাকে বিবশ করুক না কেন। 

মার্কুইস দে সাদের দার্শনিক অবস্থান, দেকার্তের এক্কেবারে বিপরীতে। তা ভালভাবে ঠাহর করতে, অ্যাঞ্জেলা কার্টারের (যিনি পরবর্তীতে ‘সাদিয়ান ওম্যান’ নামক গ্রন্থটিও লেখেন)  উক্তি ধার করে বলতে হয় যে, সাদের উপজীব্য হল— আই ডিজায়ার, দেয়ারফোর আই অ্যাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ‘ডিজায়ার’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘দেসিদেরো’ থেকে, যার অর্থ— নক্ষত্রের মতো ধরা-ছোঁয়াহীন কোনওকিছুর জন্য অপেক্ষা। ‘ডিজায়ার’-এর এই যে মহাকাশময় পরিব্যাপ্তি, তাকে একদেহে ধারণ করতে পারা প্রায়াসম্ভব এক ব্যাপার। চিন্তনের জগতে ছক ভাঙতে চাওয়া বিপ্লবরূপে স্বীকৃতি পেলেও, দেহভিত্তিক বিপ্লবকে অনায়াসে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে, বিকৃত-কামের নিষিদ্ধ পরিসরে। মার্কুইস দে সাদ, যিনি ফ্রেঞ্চ অ্যারিস্ট্রোক্রেসির তকমা সরিয়ে তাঁর লেখক-সত্তাকে পরিচয় দিতে চেয়েছিলেন ‘সিটিজেন সাদ’ হিসেবেই, ছিলেন এই নিষেধ ভাঙার এক কারিগর।   

আরও পড়ুন: ধর্ম আর রিলিজিয়নের পার্থক্য স্পষ্ট করেছিলেন বিমলকৃষ্ণ মতিলাল! লিখছেন জয়ন্ত ভট্টাচার্য…

অষ্টাদশ শতকের এই ফরাসি অ্যারিস্ট্রোক্র্যাট— লিবার্তাইন লেখকের জীবন— ফরাসি বিপ্লবের সময়কালের এক ফসল। তাই ফরাসি বিপ্লবের যে গনগনে আঁচ অ্যারিস্ট্রোক্রেটদের জীবনকে উত্তপ্ত করে, তার আলো এবং তাপ— দু’টিই পেতে হয়েছিল সাদকে। অষ্টাদশ শতকের ছয়ের দশকে, ভলতেয়ারের চার্চ বিরোধিতা এবং ফিলোজফার্স ক্রুসেড ক্রিস্টিয়ান মরালিটির ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এর সঙ্গেই ফ্রান্সে  ওঠে লিবার্টিনিসম-এর এক ঢেউ, যাঁরা চার্চপন্থীদের ডগমা ভেঙে এমন এক প্লেজারের সন্ধান করেন, যা ইন্দ্রিয়গত, ব্যক্তিগত, এবং দেহভিত্তিক। ধর্মীয় পরজন্মে বিশ্বাস না রাখা এই লিবার্টিনরা মনে করতেন, যা কিছু সুখ, সব এই এক জন্মেই আয়ত্ত করা সম্ভব। এমনকী, সিডাকশনকেও তাঁরা নিয়ে এলেন বৌদ্ধিক চর্চার পরিসরে।

সাদের যৌনতায় হাতে খড়ি, তাঁর লিবার্টিন পিতা জঁ ব্যাপটিস্ট সাদের কাছে, যিনি সাদের পনেরো বছর বয়স হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই, কিশোর সাদকে পরিচয় করিয়ে দেন, তাঁর প্রেমিকাদের সঙ্গে। সেভেন ইয়ার্স যুদ্ধে যাওয়ার আগ-মুহূর্ত অবধি, সাদের জীবন কাটে পিতার সঙ্গে প্রেমিকা ভাগাভাগি করে। সাদের জীবনকাহিনি পড়তে গেলে, মনে হয় তিনি বুঝি লাক্যানের পারফেক্ট একটি কেস স্টাডি, যাঁর সিম্বলিক অর্ডারের পিতা, তাঁর রিয়্যাল অর্ডারেও বিদ্যমান। অপরদিকে প্যারিসের প্রাসাদোপম হোটেল দে কন্ড-এ, মায়ের সঙ্গে কাটানো ছেলেবেলায় তিনি হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন তাঁর মায়ের একমাত্র অবজেক্ট অফ ডিজায়ার। সাদের মা বুৰ্বন হাউসের সদস্য, যা সাদকে করে তোলে ফ্রান্সের রাজপরিবারের অংশ। পরপর দুই সন্তান-হারানো মায়ের কাছে সাদ হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন একমাত্র আদরের পাত্র, কিন্তু তাঁর মা প্রিন্সেস অফ কন্ডের লেডি-ইন-ওয়েটিং-এর দায়িত্ব ছেড়ে, সাদের কৈশোরবেলায় অচিরেই যোগ দেন এক কনভেন্টে। হয়তো পরিত্যাগের এই ক্ষতই, আকার গ্রহণ করে সাদের তীব্র প্রতিষ্ঠানবিরোধী যৌন-অভিমুখিনতায়। খুবই কাকতালীয় ভাবে, সাদ ‘রেপ্রেশন’-কেও দেখেন খুব কাছ থেকে। মায়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর, তাঁর পিতা তাঁকে পাঠালেন প্রভেনসে, পিতৃব্যের সঙ্গে থাকতে যিনি ছিলেন চার্চের প্রিস্ট। অচিরেই সাদ আবিষ্কার করলেন যে, এই পিতৃব্যর পূজ্য লিবার্টিন চিন্তাধারা; শ্যাটু দে সমানের আলোআঁধারিতে, সাদ তাঁর পিতৃব্যর যৌনমগ্ন নৈশজীবনের নীরব দর্শক হয়ে উঠলেন। হয়ে উঠলেন এক ‘voyeur’। অনুমান করা যায় যে, এই মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাতই পরবর্তীকালে সাদের সাহিত্যে চরমপন্থী আত্মপ্রকাশ করে।

এরপরেই অবশ্য সাদের প্যারিস আগমন, এবং মূল স্রোতের কুন্ঠাহীন লিবার্টিনিসমের সঙ্গে পরিচয়। যৌনতামুখর কৈশোর কাটতে না কাটতেই, দীর্ঘ নয় বছর সাদ কাটালেন কিংস আর্মিতে। অতঃপর সাদের তেইশ বছর বয়স যখন,  সাদের পিতা তাঁর বিবাহ স্থির করলেন রেনে মন্ট্রিয়ল-এর সঙ্গে। বলাই বাহুল্য, সাদের ‘হেডোনিজম’ তাঁকে বিবাহের বেড়াজালে বাঁধতে অক্ষম হয়। তাঁর যৌন অভিসার বাড়তেই থাকে এবং কালক্রমে সব নৈতিকতা ছাপিয়ে তা যৌন অপরাধে পরিণত হয়। একাধিক নির্যাতন ও ধর্ষণের মধ্যে, বিবাহের মাত্র চার মাস পরেই, রোস কেলার নাম্নী এক রমণীর প্রতি  অবর্ণনীয় যৌন নির্যাতন— সাদকে করে তোলে লিবার্টিনদের চক্ষুশূল।

সাদের এই বেহিসেবি ব্যবহারের আঁচ এসে লাগছিল লিবার্টিন দর্শনের গায়ে। রোস কেলারের নির্যাতনের শাস্তি হিসেবেই প্রথম কারাবাসের অভিজ্ঞতা সাদের। এর পর থেকে,  বারংবার একইরকম অভিযোগের কারণে, কখনও অর্জি করতে গিয়ে, আবার কখনও পরিচারকের সঙ্গে প্রকাশ্য সমকামের অপরাধে, দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতা চলে সাদের। তবে এই কারাবাস-জীবনই হয়ে ওঠে তার লেখক-সত্তার জারক। 

‘জুলিয়েট’ উপন্যাসের অর্জি অত্যাচারের দৃশ্য

তাঁর জীবনের দীর্ঘ বত্রিশ বছর সাদ কাটিয়েছেন কারাগারে। এরই মধ্যে শ্যাটু দে ভিনসেন, বাস্তিল দুর্গের কারাগার এবং মৃত্যুপূর্বে, শারেনটন ইনসেন এসাইলামে তাঁর দীর্ঘ সময় কাটে। সাদের সাহিত্য পড়ার সময়ে, তাই মাথায় রাখা প্রয়োজন যে— এই সাহিত্য তাঁর জীবন ও যাপনের প্রতিফলক বা বিবরণ নয়, বরং কারাগারের কক্ষ থেকে তাঁর বিধ্বংসী যৌনচেতনার অভিঘাত হানার প্রচেষ্টা। যেহেতু কারাবন্দি অবস্থায় যৌন অভিজ্ঞতা তলানিতে এসে ঠেকে, অভিজ্ঞতার পরিপূরক হিসেবে, সাদ সাহিত্যিক কল্পনাকেই ‘আশ্রয়’ হিসেবে বেছে নেন।

শ্যাটু দে ভিনসেনে থাকাকালীন, সাত বছরে সাদ যৌন-আত্মমগ্নতা বা auto-eroticism-এ আসক্ত হয়ে পড়েন । এই সময় থেকেই তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর স্ত্রীকেও চিঠি লিখতে শুরু করেন। এই চিঠি লেখার অভ্যেসই বোধহয় তাঁকে কাগজে-কলমে কল্পনা করতে শেখায় সেই নিষিদ্ধ জগৎকে, যা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরোটিকা ও দর্শনমূলক এই লেখনীই কালক্রমে আরও ঘনীভূত হতে থাকে সাদের কলমে। ১৭৮২ সালের ফ্রেবুয়ারি মাসে, বাস্তিলের কারাগারে স্থানান্তরিত হওয়ার পরেই তিনি লিখতে শুরু করেন— ‘ওয়ান টোয়েন্টি ডেজ অফ সোডোম’। ছোট-ছোট কাগজ জুড়ে লেখা রিরংসাময় এই উপন্যাস আকার নিয়েছিল এক বারো মিটার লম্বা স্ক্রলের, যা সাদ লুকিয়ে রাখতেন কারাগারের দেওয়ালের এক খাঁজে।

১৭৮৭-তে কারাবাসের সময়েই তিনি, ‘জাস্টিন’ উপন্যাসের প্রাথমিক এক সংস্করণও লেখেন। তবে ‘ওয়ান টোয়েন্টি ডেজ’ সাদের হাতছাড়া হয়ে পড়ে, যখন বাস্তিল দুর্গ পতনের কিছুদিন আগে, সাদকে পুনরায় স্থানান্তরিত করা হয় স্যারেন্টন অ্যাসাইলামে। সাদ ভাবেন, এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট খোয়া-ই গেছে, এবং সাদের জীবদ্দশায় এটি প্রকাশ পায় না। নেক্রোফিলিয়া, কপ্রোফিলিয়া, ইনসেস্ট ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ অসমাপ্ত এই উপন্যাস সংগ্রাহকদের  হাত ঘুরে প্রকাশিত হয় ১৯০৪ সালে এক জার্মান মনোবিজ্ঞানীর, ‘ড. ইউজিন ডারেন’ ছদ্মনামের আড়ালে। 

প্রকৃত সাহিত্যিকের মতোই সাদ লিখেছেন, কেবলমাত্র সেইসব অভিজ্ঞতার কথা, যা তিনি নিজে বেঁচেছেন। তাই তাঁর লেখায় যৌনতা এমন এক রূপক হিসেবে দেখা যায়, যা সম্পর্কে সাদ অস্থিমজ্জায় অবগত। সোদমের কাহিনির নির্যাতকেরা লিবার্টিন নীতিশূন্যতা ও যৌন অত্যাচারের ভাষায় সড়গড় হলেও, ব্ল্যাক ফরেস্টের হৃদয়ে ঘটে যাওয়া এই দীর্ঘ নির্যাতনের ঘটনাবলি, কার্যত পূর্বতন শাসনব্যবস্থার সীমাহীন ক্ষমতার অপপ্রয়োগকে রূপায়িত করে লিবার্টিনদের চেনা যৌন পরিভাষায়।

হালফিলের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি যাঁরা করেন, তাঁরা প্রত্যেকেই ‘সাদিজম’ শব্দটির সঙ্গে কমবেশি পরিচিত। ‘সাদিজম’ বা ‘স্যাডিজম’, অর্থাৎ অন্যের যন্ত্ৰণা থেকে যৌন আনন্দ উপভোগের যে এই ধারণা, তা এসেছে সাদের নাম থেকেই। ক্ষমতার চিরচেনা এই রূপ, পরবর্তীতে পিয়ের পাসোলিনি, ফ্যাসিস্ট ইতালির প্রেক্ষাপটে তাঁর চলচ্চিত্র ‘সালঁ: ওয়ান টোয়েন্টি ডেজ অফ সোডোম’-এ তুলে আনেন, যার মূল ছক নেওয়া সাদের উপন্যাস থেকে। 

কারাজীবন, যে লেখক সাদকে তৈরি করে, ১৭৯০-তে ছাড়া পাওয়ার পর সেই সত্তাকেই বাঁচিয়ে রাখেন সাদ। নাট্যকার রূপে, একের-পর-এক নাটক তিনি কমেডি-ফ্রাঁসোয়াকে দিতে থাকেন। ওই নয়ের দশকেই তিনি লিখলেন, তাঁর বিখ্যাত দুই উপন্যাস ‘জাস্টিন’ এবং ‘জুলিয়েট’। রেভোলিউশনের প্রবক্তা হওয়া সত্ত্বেও, ‘মোডারাতিজম’-এর, বা সমঝোতাবাদের ভুয়া অভিযোগ তাঁর ঘাড়ে এসে পড়ে, তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান গিলোটিনের হাত থেকে। তবে সাদ ছিলেন নেপোলিয়নের চক্ষুশূল।

১৮০১ সালে পুনরায় তাঁকে স্যারেন্টন অ্যাসাইলামে পাঠানো হয়, এবং বারংবার আবেদন সত্ত্বেও নেপোলিয়ন নিশ্চিত করেন যে, সাদ কারাবন্দিই থাকবেন। তবে তা সাদকে আটকাতে পারেনি। অ্যাসাইলামের সদস্যদের নিয়েই তিনি নাট্যচর্চা চালাতে থাকেন। সাদের শেষ জীবন কাটে এই অ্যাসাইলামেই। দশ খণ্ডের উপন্যাস ‘দ্য ডেজ অফ ফ্লোরবেল’-এর দুই খণ্ড লেখার পর পরেই তাঁর জীবনাবসান হয়। সাদের পুত্র পিতার অন্যান্য পাণ্ডুলিপির সঙ্গে এই শেষ সৃষ্টিও পুড়িয়ে ফেলেন। 

আধুনিক সাইকোঅ্যানালিসিসে ‘ডিজায়ার’ তার যথাযোগ্য তত্ত্বগত মর্যাদা পেয়েছে, কিন্তু ফ্রয়েডের একশো বছর পূর্বে  সাদিয়ান সাহিত্য, তত্ত্বের আড়ালহীন এমনই এক জায়মান  অবস্থায় প্রকাশিত হয় যে, তার অগ্রপশ্চাৎ, ঠিক-ভুল, ও নৈতিকতার বিচার চলতে থাকে তার মৃত্যুরও বেশ কয়েকশো বছর পর অবধি। বারংবার যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাঁর ব্যক্তিজীবন, তাঁর বিস্ময়কর যৌন বিবরণ ও দীর্ঘ কারাবাস তাঁকে যেন তাঁর সাহিত্যেরই অংশ করে তুলেছে। এমন এক সাহিত্য, যেখানে সাদ নিজেই একজন আনরিলায়েবল ন্যারেটর! অ্যাঞ্জেলা কার্টার তাঁর গ্রন্থ ‘সাদিয়ান উওমেন’-এ বলছেন যে, সাদের মহিলা চরিত্র আদপেই বাস্তবিক নয়, বরং নারীর সামাজিক রূপচিত্রের চিহ্নক। সাদের প্রায় পর্নোগ্রাফিক এবং নির্যাতন-বিবরণে পরিপূর্ণ গ্রন্থ— ‘জাস্টিন: অর দ্য মিসফরচুন অফ ভার্চু’-র দ্বাদশবর্ষীয়া জাস্টিন, যে অমানবিক যৌন অত্যাচার সহ্য করছে, কার্টারের মতে সে একজন পারফেক্ট ‘ভিকটিম’। জাস্টিনের এই নিরুচ্চার, মেনে নেওয়া শহিদ সত্তা, যেন নারীর অবস্থানগত অসাম্যকে তুলে ধরছে; অপরদিকে সাদের নিজস্ব লেখনীতেই জাস্টিনের ভগিনী জুলিয়েট আবার চারিত্রিকভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত; জাস্টিন যতই নির্যাতনের অনুগত, জুলিয়েট ঠিক ততটাই সরব এবং যৌনতামুখর। তবে কি সাদের বাস্তবিক নারী অবস্থান করে, ক্ষমতার এই দুই চরম মেরুকৃত রূপের মাঝবরাবর কোথাও? এই উত্তর সাদের জীবনে খুঁজতে গেলে পাঠক বিমর্ষই হবেন।

আধুনিক সাইকোঅ্যানালিসিসে ‘ডিজায়ার’ তার যথাযোগ্য তত্ত্বগত মর্যাদা পেয়েছে, কিন্তু ফ্রয়েডের একশো বছর পূর্বে  সাদিয়ান সাহিত্য, তত্ত্বের আড়ালহীন এমনই এক জায়মান  অবস্থায় প্রকাশিত হয় যে, তার অগ্রপশ্চাৎ, ঠিক-ভুল, ও নৈতিকতার বিচার চলতে থাকে তার মৃত্যুরও বেশ কয়েকশো বছর পর অবধি। বারংবার যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাঁর ব্যক্তিজীবন, তাঁর বিস্ময়কর যৌন বিবরণ ও দীর্ঘ কারাবাস তাঁকে যেন তাঁর সাহিত্যেরই অংশ করে তুলেছে।

একদিকে বর্ণিল লাগামহীন জীবন ও অন্যদিকে কারারুদ্ধ থাকার যন্ত্রণা— এই দুই কন্টুরের সীমারেখার মধ্যেই, সাদের সাহিত্যকে বোঝার চাবিকাঠি লুকিয়ে। জীবদ্দশায় ও তার পরেও বারবার পর্নোগ্রাফিক, নির্মম তকমায় আখ্যায়িত হলেও, সাদিয়ান সাহিত্য যৌনতাকে যে দর্শনের স্তরে উত্তীর্ণ করতে পেরেছে, এর সপক্ষে পরবর্তী চিন্তাবিদরা সক্রিয়ভাবে সওয়াল করেন। সিমন দে বুভোয়া ‘মাস্ট উই বার্ন সাদ’ গ্রন্থে বলেন যে, সাদিয়ান যৌনতা স্বাধীনতার চরম এক রূপক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে তিনি এও বলেন যে, সাদের এই স্বাধীনতার যুক্তি, শেষ অবধি ধোপে টেকে না, কারণ যে-স্বাধীনতা অন্যের স্বাধীনতাকে খর্ব করে, তা নিজের অস্তিত্বকেই নাকচ করে দেয়। ইতিহাসের পাতায় সহিংসতা যেভাবে ক্ষমতার স্থূল প্রতীক হিসেবে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, সাদ যৌনতাকেও তার পাশাপাশি মূলধারার দর্শনে প্রতীকী রূপ প্রদান করেন। মিশেল ফুকোও তাঁর ‘হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়ালিটি’ গ্রন্থে স্বীকার করেন, সাদের এই অবদানের কথা। সাদের সাহিত্যে ‘সেক্স’ শুধু শরীরী খেলার বর্ণনা নয়, বরং স্বতন্ত্র এক ডিসকোর্স, যার নিজস্ব এক স্ট্রাকচার আছে, আছে বিভাগ, এবং আছে ক্ষমতার সূক্ষ্ম সমীকরণ।

সাদের সাহিত্য পড়ার সময়ে তাই মনে রাখা জরুরি যে, এগুলি তাঁর জীবনের সরল প্রতিফলন নয়, বরং কারাবন্দি মানুষের কল্পনাপ্রসূত, চরম এক দার্শনিক নির্মাণ। নিয়মভাঙা এই সাহিত্যের স্বাদ কেমন করে নেবেন, তা পাঠক নিজেই ঠিক করবেন। তবে যা করা অসম্ভব, তা হল সাদকে অগ্রাহ্য। সেই দায় থেকেই সাদের জন্মদিনে এই প্রবন্ধে, সাদের এক অনুরোধ ভাঙার অপরাধ আমাদের করতে হল; মৃত্যুর আগে উইলে সাদ লিখে গিয়েছিলেন, যাতে তাঁর অবশেষের লেশমাত্র এই পৃথিবীতে না থাকে, যাতে কেউ-ই তাঁকে মনে না রাখে। তবু আধুনিকতাকে বুঝতে হলে সাদের উপস্থিতি এখনও অপরিহার্য।