সংবাদের দাস
যখন বিশ্বকাপ হয়, বেশির ভাগ লোক বিশ্বকাপের কথা ভাবে। যখন ভোট হয়, ভোটের কথা। যখন কোনও অভিনেতা দুর্ঘটনায় মারা যান, সেই দুর্ঘটনার কথা। কী কারণে আমাদের চিন্তাবিশ্ব বহির্বিশ্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? হতেই পারে, কিছু লোক খবর দেখে বা পড়ে আলোড়িত হবে ও তা নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা তর্ক করবে; কিন্তু যে-লোকটা ভগবানের কথা ভাবছে, বা ফুটবলার হিসেবে কেরিয়ার গড়ার কথা, কিংবা যে-লোকটা আগামী দু’মাসে অমুক-অমুক বই পড়ে শেষ করবে ঠিক করেছে, যে-লোকটা দোকানে-দোকানে খুঁজছে বিশেষ নকশাদার জামা, তারা কেন অন্য দিকে মন দেবে? বোধহয় সেরকম লোক কম, এবং প্রায় কেউই মনোযোগ দিয়ে কিছু করে না। বা অন্তত, একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সূত্র ধরে এগোয় না। সাধারণত লোকের ধাঁচটা হল, স্রোত যেদিকে নিয়ে যাবে, সেদিকে যাব। সকালে অফিস করব, বা দোকান খুলব, বা ব্যাংকে দলিল জমা দেব, সন্ধেয় আইপিএল দেখে কিংবা টিভি চ্যানেল খুলে অথবা পাড়ায় আড্ডা মেরে দিনটা কাটিয়ে দেব। সেজন্যই, যে-লোক পয়সার তীব্র অভাব বা রোগের তীব্র প্রকোপে আছে, সে নিজের দুর্দশা ছাড়া অন্যদিকে মন দিতে পারবে না, কিন্তু অন্যেরা সবসময়েই সংবাদের দাস।
আরও পড়ুন: অলসরা ফাঁকিবাজিকেই কৃতিত্ব বলে মনে করে! লিখছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য…
চারপাশে কী ঘটছে, তা জানা একটা বড় গুণ বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এত কিছু ঘটে, তার মধ্যে কয়েকটা ঘটনাকে প্রধান হিসেবে বেছে গণমাধ্যম বা সামাজিকমাধ্যম সামনে উপস্থিত করে। যখন কেউ ৩৯ বলে সেঞ্চুরি করে, সে-খবরটা বড় করে পরিবেশিত হয় এবং চার বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে ঘাড় মুচড়ে জঞ্জালের ভ্যাটে ছুড়ে দেওয়ার খবরটা ছোট করে ছাপা হয়। যখন কেউ ভোটের প্রচারে আস্ফালন করেন, তাঁকে নিয়ে বহু হইহই ঘটে, কিন্তু ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ ট্যুরিস্টকে গণধোলাইয়ে খুনের ঘটনাকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। মানুষ যখন সারাদিন ধরে বহু খবর পড়ে বা দ্যাখে, তখন সে বড় হরফের হেডলাইন, বা অনেক-কমেন্ট-পাওয়া পোস্ট, বা বহুবার বলা কিংবা খুব চেঁচিয়ে বলা খবরেই আকৃষ্ট হবে, খুঁটিয়ে পড়েশুনে নিজের বোধ অনুযায়ী খবরের শ্রেণিবিন্যাস করবে না। আবার, কোনও সমাজকর্মী বা লেখিকা হয়তো বলছেন, উগ্রপন্থী হিসেবে যাঁদের জেলে পোরা হচ্ছে, প্রায় সারাদেশ উচ্চৈঃস্বরে যাঁদের ফাঁসি চাইছে, তাঁরা কোনও অনুচিত কাজ করেননি, রাষ্ট্রই বরং তাঁদের জনগোষ্ঠীর প্রতি চূড়ান্ত অবিচার করেছে— তখন সেই মতামতকে (এবং তার সমর্থনকারী খবরগুলোকে) অধিকাংশ লোক প্রচলিত দেশপ্রেমের বশে উড়িয়ে দিতে চাইবে, খুব গ্রাহ্য করবে না। আবার, পশ্চিমবঙ্গে বা আমেরিকায় কী হল, তা নিয়ে প্রবল মাথাব্যথা থাকলেও, দক্ষিণ সুদানে কী ঘটছে বা নাইজিরিয়ায় কী নিগ্রহ চলছে, তা আমাদের খুব বিদ্ধ করে না। মানে, ভৌগোলিক অন্ধতাও আমাদের আছে। এমনিতে মূলস্রোতের খবরেই আমরা ভেসে বেড়াই, নিজের মতো বিশ্লেষণ করি বটে, কিন্তু খুব দলছুট ভাবে নয়।

কিন্তু আদৌ আমরা দুনিয়ায় কী হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবি কেন? সাধারণ মানুষের দিন কেটে যায় ছ্যাতরানো হৃদয় ও মস্তিষ্ক নিয়ে, তাহলে সে গণতন্ত্র সম্পর্কেই বা এতক্ষণ চিন্তাব্যয় করবে কেন, খেলা নিয়েও উত্তেজিত হবে কেন? মরশুম যা-ই বলুক, ‘জয় ডেমোক্রেসি’ বা ‘জয় রোনাল্ডো-মেসি’, সেসব পাত্তা না-দিয়ে, যদি সে পাঁচ মিনিট বৃদ্ধা মাসিমা, বারো মিনিট বৈভব সূর্যবংশী, আঠেরো মিনিট পঙ্কজ ত্রিপাঠী, সতেরো মিনিট কাপড় কাচার সাবান, বাইশ মিনিট মমতা-শুভেন্দু, আটচল্লিশ মিনিট রাস্তার ধারের গাছ ও গাছতলার পাগল, একশো আট মিনিট যৌনতা নিয়ে ভাবত, তাহলে চিন্তাগ্রাফটা তার ঠোকর-চলনের মানানসই হত। কিন্তু যখনই পৃথিবী ‘এই রে, সাংঘাতিক ঘটনা!’ হেঁকে ঝ্যাকরম্যাকর ফেস্টুন নাড়াচ্ছে, তখনই সে কোমর হাঁকড়ে নেচে উঠছে কেন? কারণ তার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হল, দলে ভিড়ে যাওয়া। যদি সবাই ভোট নিয়ে কথা বলে, বা চিন্তিত হয়ে পড়ে, তার বলার সাহসই নেই, ‘আমি তৃণমূল বা বিজেপি নয়, সারাদিন হাট্টিমাটিম নিয়ে ভাবছি’, বা, ‘আমি ভোট নিয়ে ভাবি না। কারণ যে-শাসকই আসুক, সে হবে গামবাট ও অপদার্থ। তার চেয়ে আমি ভাল ঝালমুড়ির মতো হাজার টক-ঝালের কোলাজে সাঁতরাব।’ কারণ তাহলে তাকে আর খেলায় নেওয়া হবে না। আড্ডায় বসতে গেলে, বন্ধু রাখতে গেলে, সমাজে মানানসই হিসেবে পরিচিতি পেতে গেলে, তাকে অধিকাংশের চিন্তাস্রোতকে অনুসরণ করে, তাতে অংশী হওয়ার অন্তত ভান করে চলতে হবে। আমার এক বন্ধু একবার সেলুনে চুল কাটাতে গেছিল। কিন্তু সেদিন একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল। ভারত খেলছে। এবং হারে-হারে অবস্থা। সেলুন চুল তো কাটেইনি, তাকে সেলুনের সামনে টিভি-দেখতে-ব্যস্ত জনতা প্রায় আঁচড়ে-কামড়ে তাড়ায়। তাদের সংঘবদ্ধ ও অকৃত্রিম ঘৃণার কারণ ছিল, সে এই ফাইনালটা নিয়ে ভাবিতই নয়। কে তাকে অধিকার দিয়েছে এই মুহূর্তে অন্য কিছু ভাবার?
সমাজে অনুমোদিত একটা (বা দু-তিনটে) থিম প্রায় সবসময় চলে। যেমন এখনকার থিম হচ্ছে ভোট, আইপিএল এবং গরম। এই তিনটের কোনও একটা নিয়ে কথা বলতে হবে। আচমকা শরৎচন্দ্র বা অরোরা বোরিয়ালিস নিয়ে গল্প জুড়লে হবে না। আবার আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের লাঠালাঠি যদি শুরু হয়ে যায়, তখন তেল-গ্যাস-যুদ্ধ ও শেয়ার-বাজার নিয়ে কথা বলতে হবে, করবেট গিয়ে বাঘ দেখা নিয়ে নয়। এই ‘কী বলব, কী বলতে হয়’-এর উপাদান সংগ্রহ করতে গিয়ে, লোকে তার মোহেও পড়ে যায়। যদি কেউ উদাসীন দুঃসাধ্য সিদ্ধান্তও নেয়: ভোট নিয়ে ভাবব না, তারপর যদি পাকেচক্রে আধঘণ্টা ভোটের খবর দ্যাখে, একটা ঘোর জন্মাবে, কারণ প্রকাণ্ড উতোর-চাপান চিৎকার-ঝগড়া এবং ‘এই রে, কী হবে’ সাসপেন্স নেশার মতো তাকে আচ্ছন্ন করবে, অন্যরা এ-জিনিসকে জীবন-মরণ গুরুত্ব দিচ্ছে দেখে পেল্লায় উৎসাহের সংক্রমণও ঘটবে। সেজন্যেই আমাদের শৈশবে যখন মা-মাসিমারা খেলার কিছুই বুঝতেন না, তাঁরা চা দিতে এসে টিভির সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে যেতেন, কারণ ঘরময় অ্যাত্ত উল্লাস ও উত্তেজনা গনগনিয়ে তাঁকে একটা আঁচ দিত। তাই, যখন সক্কলে অভিষেক শর্মার মার দেখছে, কিংবা পাকিস্তানের ওপর ভারতের নৈশ আক্রমণ (মিথ্যে খবর), তখন তা থেকে দূরে থাকার মধ্যে একটা প্রবল একলাপনা আছে, যা থেকে পালাবার জন্যই মানুষের সামূহিক সংগ্রাম। তাই মস্তিষ্ক তাকে বলবে, চল চল এটাই ভাবি, এতেই মোক্ষ। তাই নিউরোন থেকে নিউরোনে চিড়িক-চিড়িক অবধি স্বতোৎসারিত নয়, অনেকটাই FOMO-তাড়িত।




