বিষয়: সত্যজিৎ
সত্যজিৎ রায়ের প্রতি সুবিমল বসাকের সম্ভ্রম ও মুগ্ধতা দীর্ঘদিনের। ১৯৬৫ সালে, উৎপলকুমার বসু-র সঙ্গে সত্যজিত-পরিচালিত ‘মহাপুরুষ’-এর আলোচনার হদিশ পাওয়া যায় ডাইরিতে। এমনকী, ‘নায়ক’ নিয়েও নিজের চিন্তাভাবনা ডাইরিতে লিখে রেখেছিলেন তিনি। সমসময়ের পরিচালক হিসেবে সত্যজিতের কাজ পছন্দ করতেন সুবিমল; মনে-মনে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছেও কি লুকিয়ে ছিল না!
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে সুবিমলের প্রথম যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয় ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে। হিন্দি কবি ও সাহিত্যিক স্বদেশ ভারতীর বাড়িতে তিনি তা জানতে পারেন। সেই দিনের ডাইরিতে লেখা (২৮.১২.৭৫)— ‘স্বদেশ জানালো, সত্যজিৎ রায় নাকি একজনকে খোঁজ করছেন, যিনি বাংলা হিন্দী ভাষা জানেন। সুনীল নাকি বলেছে। আমাকে যোগাযোগ করতে বললো।’
পরের দিন সুবিমল লিখছেন (২৯.১২)— ‘সত্যজিৎ রায়ের ব্যাপারটা ভাবলুম। ওনাকে সরাসরি Phone করা যায়। তার আগে আমি একটা চিঠি দিলুম— বাংলা হিন্দী ভাষা জানি বলে। দেখা যাক।’
কী ছিল সেই চিঠির বয়ান? খসড়াটি খুঁজে পেয়েছি আমরা—
১৮ বিবেকানন্দ নগর
ডাকঘর: বেলঘরিয়া
কলকাতা – ৫৬
২৯শে ডিসেম্বর, ১৯৭৫
শ্রী সত্যজিৎ রায়
সমীপেষু
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, আপনি একজন সহায়ক খুঁজছেন, যিনি বাংলা ও হিন্দী— দুই ভাষায় পটু।
আমি পাটনার ছেলে। হিন্দী আমার জানা। কথ্য ভাষাও। এ ছাড়া কিছু গল্প, উপন্যাস, কবিতা হিন্দী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি। রেণু, যাদব, কমলেশ্বর, অজ্ঞেয় আরও অনেকের।
আপনার কোন কাজে লাগতে পারলে গর্ব বোধ করব।
সুবিমল বসাক

দিন কুড়ি বাদে, নিজস্ব লেটারহেডে এই চিঠির জবাব দেন সত্যজিৎ রায়—
শ্রীসুবিমল বসাক সমীপেষু
সবিনয় নিবেদন,
আপনার ২৯শে ডিসেম্বরের চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আমার হিন্দি ছবি আরম্ভ হতে এখনো প্রায় এক বছর দেরি। সুতরাং সহায়কের প্রশ্ন এখনও উঠছে না। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আপনাকে জানাব।
নমস্কারান্তে
সত্যজিৎ রায়
২০/১/৭৬
সত্যজিৎ তখন মুন্সি প্রেমচন্দের গল্প অবলম্বনে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চিঠিতে উল্লিখিত ‘হিন্দি ছবি’ সেটিই। এই চিঠি সম্পর্কে ডাইরিতে সুবিমলের প্রতিক্রিয়া (২৫.১.৭৬)—
‘… বাড়ীতে এসে দেখি ১টা সুসংবাদ আছে। খামে বাংলা হাতের লেখাটা কিছুতেই ধরতে পারছিলুম না, খুলে দেখি, সত্যজিৎ রায়ের চিঠি। ৪ লাইনের, নিজেরই হাতের লেখা। জানিয়েছেন, প্রয়োজন বোধ করলে জানাবেন।
খুবই ভালো লাগল। রেণুজীর বইটা বেরোলে আমি তাঁকে ১টা উপহার দেবো ঠিক করলুম, তাহলে উনি কিছুটা বুঝতে পারবেন।’
এর মধ্যে, ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘জন অরণ্য’ চলচ্চিত্রটি দেখেন সুবিমল। ডাইরির এন্ট্রি— ‘সত্যজিৎ রায়ের ‘জন-অরণ্য’ দেখলুম। বইটা পড়া নেই বলে কোন তুলনা করার থেকে বাঁচলুম। সত্যজিৎ রায়ের বই একটা দিগন্ত খুলে দেয়। এটা একটা demoralization এর গল্প। কি করে মানুষ demoralized হয়ে যায়। ঋত্বিকের ‘সুবর্ণরেখা’র মত অত সোচ্চার ও নির্মম নয়— তবুয়ো। তাছাড়া, তার রসবোধ এবং detail এর কাজ ছড়িয়ে আছে। ভালো লাগলো।’

কয়েক মাস পর, এপ্রিলে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে যান সুবিমল। ডাইরিতে লেখা (৪.৪.৭৬)— ‘সকালে বেরোলুম। সত্যজিৎ রায়ের ঠিকানা খুঁজে বার করা গেল। শুনলুম, আজ সকাল আটটায় দিল্লী থেকে ফিরেছেন। মনে পড়লো, গতকাল ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব বিতরণ উৎসব ছিল। এক ভদ্রলোক আমার আগে-আগে উঠছিলেন— তিনি বাধা দিলেন। ‘উনি তো এখন এসেছেন?’ পরে, চিঠি দেখাতে এবং বইদুটি দিতে, নিয়ে ঘুরে এসে বললেন— উনি তো সীটে নেই। বোঝা গেল। যাক্, বই দুটো দিয়ে আমি চলে গেলুম রাসবিহারীতে।’
এই ঘটনার ধারাবাহিকতা মেনে, জুলাই মাসে সত্যজিৎকে একটি চিঠি লেখেন সুবিমল—
১৫ই জুলাই, ১৯৭৬
শ্রী সত্যজিৎ রায় সমীপেষু
সবিনয় নিবেদন
স্মরণ থাকতে পারে, গত ডিসেম্বরে আপনার হিন্দী ছবির সহায়কের জন্য আমি চিঠি দিয়েছিলাম। তখন আপনি জানিয়েছিলেন হিন্দী ছবি আরম্ভ হতে দেরী আছে। গত ৪ঠা এপ্রিল, কোন সূচনা না দিয়ে আপনার বাড়ীতে হাজির হই, গিয়ে শুনি, আপনি সবে দিল্লী থেকে ফিরেছেন। স্বভাবতই আপনি ক্লান্ত, তাই সাক্ষাৎ করার উৎসাহ হয় না। জনৈক ভদ্রলোক, যিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর হাতে দুখানি গ্রন্থ— ফণীশ্বর নাথ রেণু’র তিসরী কসম এবং গেরিলা আক্রোশ আপনার হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য দিয়ে আসি। রেণুর গল্পগ্রন্থ হিন্দী থেকে বাংলায় অনুদিত।
আপনার ঐ হিন্দী ছবির যে কোন কাজে লাগতে পারলে আমি গর্ব বোধ করবো।
বিনীত,
সুবিমল বসাক
‘তিসরী কসম’ অনূদিত বই হলেও, ‘গেরিলা আক্রোশ’ সুবিমলের নিজেরই গদ্যগ্রন্থ। যাই হোক, শেষাবধি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে সুবিমলের সংযুক্তি ঘটেনি। প্রেমচন্দের মূল গল্পটি অনুসারে ইংরাজিতে চিত্রনাট্য লেখেন সত্যজিৎ নিজেই, আর হিন্দি ও উর্দুতে তার অনুবাদ করেন শ্যামা জায়দি। চিত্রনাট্যে অওধের স্থানীয় ভাষার ছোঁয়া আনতে শ্যামা-র সঙ্গী হন জাভেদ সিদ্দিকি।

‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র শ্যুটিং শুরু হয় ১৯৭৬-এর ডিসেম্বরে ও চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৭৭-এর অক্টোবরে। শ্যুটিং শুরুর আগে, আরেকবার সত্যজিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সুবিমল। এবার অবশ্য কারণ ভিন্ন। সেই পর্বটি ডাইরি থেকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা যাক—
১.১০.৭৬
ধর্মযুগ থেকে চিঠি এসেছে। রবীন্দ্র শ্রীবাস্তব লিখেছে, সত্যজিৎ রায়ের ইন্টারভিউ নিতে— ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ির ব্যাপারে।’ আমি ধর্মযুগকে সঙ্গে সঙ্গে চিঠি দিয়ে দিলুম, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে, আমি পাঠাচ্ছি। ধর্মযুগ লেখা schedule করে ফেলেছে। এবার সত্যজিৎ রায়কে চিঠি দিতে হবে।
৪.১০.৭৬
সত্যজিৎ রায়কে আজ চিঠি পাঠিয়ে দিলুম— আমাকে সময় দেয়ার জন্য। ‘শতরঞ্জের’ জন্য কিছু প্রশ্ন মনে-মনে ঠিক করে রেখেছি। উনি সময় দিলে তার উত্তর নিয়ে পাঠিয়ে দেবো। দেখি, কবে চিঠির জবাব আসে!
৮.১০.৭৬
অফিসে গিয়ে telephone করলুম সত্যজিৎ রায়কে। টেলিফোন উনিই ধরেছেন। বেশ গম্ভীর, ভরাট স্বর। আমি নাম বলে বললুম— ১টা চিঠি দিয়েছিলুম, শতরঞ্জ কে খিলাড়ী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ধর্মযুগ থেকে। উনি বললেন— আমি তো চলে যাচ্ছি বাইরে, ব্যস্ত আছি। আপনি 5th Nov. এর পরে যোগাযোগ করবেন। তবে বেশী সময় দিতে পারবো না— ১০/১২ মিনিট। হ্যাঁ, তাই যথেষ্ট। আমি আসলে হিন্দী film এর ওপরেই প্রশ্নটা করবো।

৫.১১.৭৬
অফিসে গিয়েই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে telephone-এ যোগাযোগ করলুম।
– এটা কি…?
– হ্যাঁ।
– মি: রায় কি ফিরেছেন?
– বলছি।
– আমি সুবিমল বসাক বলছি। আপনাকে মাসখানিক আগে টেলিফোন করেছিলুম। আজ বলেছিলেন যোগাযোগ করতে। ধর্মযুগ থেকে আপনার হিন্দী চিত্র ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবো।
– আজ সকালেই একজন টেলিফোন করেছিল। তিনি ধর্মযুগ থেকে বললেন। আমি কাল দেখা করতে বলেছি— আট মিনিট সময় দেব বলেছি।
– কিন্তু, ধর্মযুগ থেকে আমাকে নিতে বলেছেন। আপনাকে তাদের চিঠিও দিয়েছিলুম।
– তা জানি না। ভদ্রলোক অবাঙালী। তাকে সময় দিয়েছি।
– ও। তাহলে তো ঠিক আছে।
[মনে পড়ল, সুরেন্দ্র প্রতাপ সিনহা কলকাতায় এসেছেন, হতে পারে তিনি যোগাযোগ করেছেন]
– কৃত্তিবাসে অনুবাদটা পড়েছেন নাকি?
– না, এখনও পড়া হয়নি। ওটা আপনি করেছেন নাকি?
– হ্যাঁ।
– অবশ্য বাংলা হয়েছে বুক ট্রাস্ট থেকে।
– NBT একটা collection বার করেছেন। তাতে এই গল্পটা নেই।
– আছে।
– বেরিয়েছে বই। আমার দেখা হয়নি, নেই বোধ হয়।
– আছে। ‘শেষ কিস্তি’ নামে।
– দেখবো তাহলে। নমস্কার।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে, সুবিমল আবার সত্যজিৎকে চিঠি দেন ১৯৮০ সালে। মুন্সি প্রেমচন্দের পুত্র শ্রীপত রায়ের সঙ্গে সুবিমলের পত্রালাপ দীর্ঘদিনের। তাঁরই এক জিজ্ঞাসার সুবাদে এই চিঠি।
১২/৪/৮০
শ্রী সত্যজিৎ রায় সমীপেষু
সবিনয় নিবেদন,
প্রেমচন্দের জেষ্ঠপুত্র শ্রী শ্রীপত রায়ের একটি চিঠি পেয়েছি। তিনি ‘শতরঞ্চ-কে-খিলাড়ী’র প্রড্যুসার শ্রী সুরেশ জিন্দল-এর ঠিকানা জানতে চেয়েছেন। তাঁর প্রয়োজন।
আপনি যদি দয়া করে পাঠান, আমি তাঁকে পাঠিয়ে জানিয়ে দিতে পারি।
শুভেচ্ছা সহ
বিনীত
সুবিমল বসাক
সত্যজিতের জবাব—
শ্রীসুবিমল বসাক
সবিনয় নিবেদন,
সুরেশ জিন্দলের ঠিকানা—
L-3 Eden Hall
Dr. Annie Beaant Road
Wali
Bombay 400018
নমস্কারান্তে
সত্যজিৎ রায়
১৮/৪/৮০

এর দু-বছর পর, সুবিমলের ডাইরিতে সত্যজিৎ-পরিচালিত ‘সদ্গতি’র উল্লেখ (২৫.৪.৮২)—
‘আজ সদ্গতি দেখানো হবে TV তে। খবরের কাগজে প্রচার করেছে— সম্ভবত লোড শেডিং হবে না। খবরের কাগজে এও বলছে যে দর্শকদের মনঃক্ষুণ্ণর কারণ ঘটবে না।
ইন্টারভিয়ু ছিল— শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় নিলেন সত্যজিৎ রায়কে। ঘরটা তাঁর বাড়ীর। সাক্ষাৎকারে আগ্রহ ছিল— তাই শোনা। সাদা-কালোয় দেখানো হলো। দিল্লী-বোম্বাইতে রঙীন TV তে দেখানো হবে। এর সঙ্গে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী অবশ্য দেখানো হবে।’
সুবিমল সত্যজিৎকে শেষ চিঠিটি লেখেন ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে। সত্যজিৎ তখন অসুস্থ, তবে বাড়িতেই। কী লিখেছিলেন সুবিমল? খসড়া থেকে জানা যায় তার বয়ান—
কলকাতা – ৫৬
১৭ই জানুয়ারী ১৯৯২
শ্রী সত্যজিৎ রায় সমীপেষু
সবিনয় নিবেদন,
আপনার অস্কার পুরস্কার প্রাপ্তি সংবাদে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।
সম্প্রতি সাহিত্য আকাদমী আয়োজীত ‘ন্যাশনাল ওয়ার্কশপ অন লিটেরারী ট্রান্সলেশন’এ মারাঠী অনুবাদক শ্রী বিলাস গিত্যের সঙ্গে আলাপ হলো দিল্লীতে। সৌভাগ্যক্রমে, আমরা দুজনে একই ঘরে ছিলাম। সঙ্গে করে এনেছিলেন আপনার তিনটি গ্রন্থের অনুবাদ গ্রন্থ। ছাপা বাঁধাই পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন। তবে ‘বিষয়-চলচ্চিত্র’ প্রচ্ছদ আরও সুন্দর হতে পারত। তিনি এও জানালেন, আপনার ছেলেবেলা’র অনুবাদ একটি সাময়িক পত্রিকায় ধারাবাহিক বার হচ্ছে, এখন গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষা তাঁর প্রচেষ্টা দেখে আমার খুব ভাল লাগল। ওখানে অন্যান্য যে-সকল মারাঠী অংশগ্রহণকারী এসেছিলেন, কথাপ্রসঙ্গে জানা গেল— অনুবাদ খুবই সুন্দর হয়েছে। আমি অবশ্য মারাঠী ভাষা জানি না। আমার আগ্রহ হয়েছিল, লালমোহন বাবুর সংলাপ সম্পর্কে— অনুবাদে কেমন দাঁড়িয়েছে! ‘কৈলাশে কেলেঙ্কারী’ থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনালেন, ‘দা-রোগা’ শব্দটির ব্যবহার কেমন করেছেন জানালেন।
বিলাস গিত্যে কখনও কলকাতায় আসেন নি, আমার ইচ্ছে আছে। আপনার সম্পর্কে তাঁর কৌতুহল ও শ্রদ্ধা— দুইই মনোযোগ দাবী করে। বর্তমানে রবিশঙ্করের ‘রাগ-অনুরাগ’এর অনুবাদে ব্যস্ত। আমরা একদিন— ২৪শে ডিসেম্বর— বৃষ্টি মাথায় করে রবিশঙ্করের বাড়িতে হাজির হয়েছিলাম।।
আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। শ্রদ্ধান্তে
বিনীত
সুবিমল বসাক
এই চিঠি সত্যজিৎ পড়েছিলেন কিনা, জানা নেই। জবাব আসেনি কোনও। দিন দশেক বাদেই হাসপাতালে ভর্তি হন সত্যজিৎ রায়। বাড়িতে আর ফেরেননি। হাসপাতালেই ২৩ এপ্রিল প্রয়াত হন তিনি।
অন্যদিকে, ১ মে সুবিমল বসাককে একটি চিঠি লেখেন বিলাস গিত্যে। তার দিনকয়েক আগে ‘আজকাল’ পত্রিকার ‘রবিবাসর’-এ প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকারটি তাঁকে পাঠিয়েছিলেন সুবিমল, তার জন্য ধন্যবাদজ্ঞাপনের পাশাপাশি সেই সাক্ষাৎকার মারাঠি ভাষায় অনুবাদের কথা জানান। সেইসঙ্গে এ-ও জানান যে, সত্যজিৎ রায়ের ছ-টি চিঠি তাঁর কাছে আছে, একটি সুবিমলকে জেরক্স করে পাঠালেন।

সুবিমলের সংগ্রহে থাকা সেই জেরক্সকপি থেকে বোঝা যায়, সত্যজিৎ চিঠিটি বিলাসকে লিখেছিলেন ২৭.২.১৯৮৭ তারিখে, ইংরাজিতে। সত্যজিতের বই ‘যখন ছোট ছিলাম’ মারাঠি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন বিলাস; সত্যজিৎ জানান, বইটির অনুবাদ, কাঠামো ও বহিরঙ্গ যথেষ্ট ভালো হয়েছে। মাত্র দু’লাইনের ছিল সেই চিঠি।
সত্যজিৎ-প্রসঙ্গ থেকে সরে, পরবর্তী ব্যক্তির কাছে যাওয়া যাক। এই চিঠিটি অবশ্য কেজো, লেখকের প্রতি সম্পাদকের বয়ান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকার তরফে, নির্মাল্য চিঠিটি লিখেছিলেন সুবিমলকে, ‘এক্ষণ’-এর লেটারহেডে।
২৩/৩/৬৬
সবিনয় নিবেদন
আপনার সংগৃহীত ছড়াগুলি ও পত্রের জন্যে ধন্যবাদ। এই ছড়া-সংগ্রহ আমাদের ভাল লেগেছে। তবে এ-ধরনের লেখার সঙ্গে কিছুটা ভাষাগত টীকা দেওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। নইলে অন্য অঞ্চলের পাঠকের পক্ষে রসগ্রহণ অসুবিধাজনক হয়। বিশেষত নিম্নলিখিত শব্দ বা কথাগুলির অর্থা ‘নোট’ হিসেবে দেওয়া দরকার:
১) অ্যালং পাও চ্যালং পাও ২) চেরী পাও ৩) যেইতা পাইত্যা ৪) উব্লা ৫) পিব্লা) ৬) জিব্লা ৭) তাব্লায় ৮) হাপের ৯) ফান্দা ১০) বান্দরের জুলু ১১) ঢাকাৎ ১২) এউগা ১৩) নউগা ১৪) ইচা ১৫) সাত আটি পিছা ১৬) হেজহান ১৭) কারে উইঠ্যা ১৮) উড়ুম
*“কিলাম” আছে, এটা কি “কিলায়” হবে? কারণ পরের লাইনে “কিলায়” রয়েছে।
দয়া করে এগুলি জানিয়ে দিলে বাধিত হব। আমাদের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানবেন।
নির্মাল্য আচার্য

গদ্যকার ও অনুবাদক সুবিমলের তুলনায়, লোকসংস্কৃতি-সংগ্রাহক সুবিমলের পরিচয়টি একেবারেই চাপা পড়ে গেছে। তবে তাঁর দুটি বই ‘বিয়ার গীত ও ঢাকাই ছড়া’ (১৯৮৭) ও ‘কুসংস্কার’ (১৯৮৭)-এ সেসব উপাদান ধরা রয়েছে। চিঠিতে উল্লিখিত ছড়াগুলি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ‘এক্ষণ’ পত্রিকার চতুর্থ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায়, আগস্ট ১৯৬৬-তে। পত্রিকার প্রচ্ছদ সত্যজিৎ রায়ের করা। সম্পূর্ণ ছড়াগুলি এখানে তুলে ধরা সম্ভব না-হলেও, নির্মাল্য আচার্যর চিঠি অনুযায়ী শব্দগুলির যে-অর্থ সুবিমল লিখে দিয়েছিলেন টীকায়, তা সংযোজিত করা হল এখানে। একইসঙ্গে সুবিমল এও জানান যে, ঢাকার নবাবপুর থেকে ছড়াগুলি সংগৃহীত হয়েছে। সুবিমলের জন্ম পাটনায় হলেও, তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা; ফলে পরিবারসূত্রেই এগুলি সংগৃহীত— এ-অনুমান করা যায়।


শেষ যাঁর চিঠি দিয়ে এ-পর্ব শেষ করব, তিনি কবি তুষার চৌধুরী।
২২/৬/৮২
প্রিয় সুবিমলদা,
আপনার কাছে এসেছিলাম। ‘অমৃত’ পুজোসংখ্যায় প্রেমচন্দের একটি উপন্যাসের অনুবাদের জন্যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় আপনার সাথে কথা বলতে চান। আপনি ২/১ দিনের মধ্যে যোগাযোগ করলে ভালো হয়। ফোনে আগে কথা বলে নিতে পারেন। ওর বাড়ির ফোন নং 468242। অফিসেরটা Phone Guide-এ পাবেন।
উনি বাড়িতে সকালে ১টা ২টো অব্দি থাকেন।
অফিসে থাকেন সম্ভবত ৩টে থেকে ৫টা।
ব্যাপারটা seriously নেবেন।
ভালোবাসা নেবেন।
ইতি,
তুষার চৌধুরী
আপাতদৃষ্টিতে এই চিঠিটিও কেজো। তবে তুষার চৌধুরীর সঙ্গে সুবিমলের সম্পর্ক এই চিঠি দিয়ে বোঝা অসম্ভব। উভয়ে একই অফিসে কাজ করতেন, ফলে যোগাযোগ ছিল নিয়মিতই। সুবিমলের ডাইরিতেও তুষারের উল্লেখ অগুনতিবার। সত্তরের দশকের কবিদের মধ্যে, তুষার চৌধুরীকে বিশেষ পছন্দ করতেন সুবিমল। কাজেই, সুবিমলে সংগ্রহে থাকা এই একটিমাত্র চিঠিই তুষার চৌধুরী সম্পর্কে শেষ কথা নয়। অনুল্লিখিত রয়ে গেল আরও অনেক কিছু।
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য




