সালটা ১৯৯৯। দিল্লির ছেলে আমি, মুম্বইতে আনকোরা। প্রথম রেকর্ডিং করছি ‘অব কে শাওন’ অ্যালবামের। শুভা মুদগল গাইছেন। সেটাই আমার কাছে বিরাট ব্যাপার। এই রকম থরথরানির মধ্যেই একদিন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট বিশ্বদীপ আমায় আলাপ করিয়ে দিল এমন একজন লেজেন্ডের সঙ্গে, যা আমার আরও থরথরানির কারণ হয়ে উঠল। তাঁর গান তো শুনেইছি। কিন্তু তিনি যে রক্তমাংসের মানুষ এবং অলীক নন, একথা আমার মন মানতেই চাইছিল না। আমি ভাবতাম, এসব মানুষ রূপকথার চরিত্র। মানুষটার নাম আশা ভোঁসলে।
আমার মুখ থেকে কোনও শব্দই বেরচ্ছিল না। তাও যখন উনি আমার কাজ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তখন বললাম যে আমি শুভা মুদগলকে নিয়ে একটা অ্যালবাম তৈরি করছি। আশাজি জিজ্ঞেস করলেন, অ্যালবামটা ক্লাসিক্যাল মিউজিকের কি না! বললাম, না। ফের উনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি মুম্বইতে থাকি কি না। যখন জানতে পারলেন, থাকি না এবং আমি দিল্লির ছেলে, আশাজি বলেছিলেন, ‘বম্বে তো তুমকো আনা পরেগা।’ উত্তরে বলেছিলাম, আমার খুব ভয় লাগে মুম্বইতে পাকাপাকিভাবে আসতে। এখানে কিছুই জানি না, কাউকে তেমন চিনিও না। আশাজির মুখে একটা বিরাট বিস্ময়। বললেন, ‘ভয়!’ সেই মুহূর্তে ওঁর মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল ‘ভয়’ শব্দটা ওঁর কাছে অজানা। এক লহমায় বোঝা গেল, কী অকুতোভয় মহিলা তিনি! বললেন, ‘ভয় পেলে গানবাজনা করো না।’ পরে বুঝেছি যে, ওঁর ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই ওঁকে এই শক্ত জমির মানসিকতায় পৌঁছে দিয়েছে।
এর পর আমার সঙ্গে আশাজির দেখা বহু-বহু বছর পর। ভারতীয় সিনেমার ১০০ বছর উদ্যাপনের সময়ে, নতুন একটা গান বানানোর জন্য, ‘উইচক্রাফ্ট ওয়ার্কস’-এর তরফে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল একটি প্রকল্পের জন্য, সেই প্রকল্পে আমার সুরে আশা ভোঁসলে, লতা মঙ্গেশকরের মতো সংগীতজগতের দিগ্গজ মানুষরা গেয়েছিলেন। সেই প্রথম আশা ভোঁসলে-র সঙ্গে কথা হল ফোন-কলে।
আরও পড়ুন: আশা ভোঁসলেকে দেখেছি একেবারে ঘরোয়া চেহারায়!
লিখছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত…
আমি ধরেই নিয়েছিলাম, প্রায় পনেরো বছর আগেকার ঘটনা তিনি নিশ্চয়ই মনে রাখেননি। কথা হওয়ার সময়ে বললাম, আপনি আমাকে নামে চিনবেন না, সঙ্গে-সঙ্গে বাধা দিয়ে বললেন, ‘তুম ওহি হো না? যো শুভাজিকে সাথ আব কে শাওন কিয়া থা? বোম্বাই আনা পড়া না?’ আমি শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম, কী আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি! বললেন, তোমার কাজ দেখি, খুব ভাল লাগে। ওঁকে বললাম, যোগাযোগ করার কারণ, বললেন আমি তো এভাবে গান গাই না, বোঝালাম সকলে মিলে গাইছেন, একটা ট্রিবিউট ভারতীয় সিনেমার প্রতি। শুনে লিরিক্স পাঠাতে বললেন। পরে ওঁর ছেলে জানালেন, উনি গাইবেন।

যশরাজ স্টুডিও-তে রেকর্ডিং হবে। কিন্তু সেদিন তুমুল বৃষ্টি। মুম্বইয়ের ট্রাফিক, এদিকে উনি থাকতেন শহরে। স্টুডিও অন্য প্রান্তে। যথারীতি ওঁর পৌঁছতে দেরি হল। যেটা হতেই পারে। যতদূর মনে পড়ে, একঘণ্টা কিংবা দেড়ঘণ্টা দেরি হয়েছিল। উনি এলেন, এসেই ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘আমি জীবনে খুব কম দিনই দেরি করে পৌঁছেছি। আমার জন্য কাজের জায়গায় কেউ অপেক্ষা করে থাকবে, এই বিষয়টা আমি খুব অপছন্দ করি। বিশেষ করে কম্পোজাররা অপেক্ষা করবেন, সেটা আরও অস্বস্তিকর।’ হঠাৎ বললেন, ‘তুমি বাঙালি না? তোমার জন্য আমি আগামী কাল মাছ রেঁধে পাঠাব।’ শত আপত্তিতেও বারণ শুনলেন না। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দ্বিতীয়বার যখন আমি ওঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম, উনি সম্পূর্ণ বাংলায় কথা বলছিলেন। এবং প্রায় নির্ভুল বাংলা। আমি বললাম, এটা কীভাবে সম্ভব? বললেন, ‘আমার চারপাশে অনেকেই তো বাঙালি।’ অনেক সময়ে বাড়িতে নাকি এমনও হয়েছে, আশাজি এবং লতা মঙ্গেশকর বাংলায় কথা বলছেন আর বাড়ির অন্যান্য সবাই বুঝতেই পারছেন না কী ঘটে চলেছে। হয়তো সারাদিন লতাজি রেকর্ডিং করেছেন সলিল চৌধুরীর সঙ্গে, আশাজি রেকর্ড করেছেন আরডি বর্মণের সঙ্গে। সেই রেশ বাড়িতেও চলে এসেছে এবং দুই বোন ঝরঝর করে বাংলায় কথা বলছেন।
সেদিন আমি জীবনে শিখেছিলাম নিয়মানুবর্তিতা। যখন মাইকের সামনে দাঁড়ালেন, দেখলাম মাত্র দুটো লাইন, কিন্তু তা-ও রিহার্স করা। কী অসাধারণ যত্নে গাইছেন প্রতিটা লাইন, দেখে নিচ্ছেন মাইকের উচ্চতা— সবটুকু। আজও তো প্রচুর লোক কাজের জায়গায় পৌঁছন দেরি করে, কিন্তু তাঁদের অধিকাংশের মধ্যে এই ন্যূনতম খারাপ লাগার বোধটুকুও থাকে না যে— তাঁদের দেরি করে আসার জন্য উল্টোদিকের মানুষটার কতটা অসুবিধে হল। এই স্কুলিংটাই বোধহয় শেষ, যেখানে আশা ভোঁসলে, গুলজার সাহেবরা বুঝতে পারতেন, উল্টোদিকের মানুষটা তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছেন। সর্বোপরি সময়ের মূল্যটা তাঁরা দিতে জানতেন।
পরের দিন আমার বাড়িতে একটা মাছের পদ পৌঁছে গেল। অতুলনীয় তার স্বাদ। পরে নানা মানুষের কাছে শুনেছি, অসাধারণ রাঁধতে পারতেন উনি, সেদিন সামান্য ঝলক পেয়েছিলাম মাত্র।

ভারতে তো একটা সময় ছিল, যখন মেয়েদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হত সারল্য, লাজুকতা— এই বিষয়গুলিকে। তখন মেয়েরা কাজ করতেন না এমন নয়, কিন্তু আড়ালে থাকতেন। আশা ভোঁসলে, লতা মঙ্গেশকর এই ধারা থেকেই বেরিয়ে একটা নতুন পর্বের সূচনা করলেন, যেখানে প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব মিলে সম্পূর্ণ নতুন এক ধারা শুরু হল। এবং এই সবটুকু আমি সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম ওঁর চাহনির সেই নির্ভীক ঝলকানিতে। পাশাপাশি ওঁর প্রথম পর্বের সিনেমার গানগুলোর দিকে যদি নজর দেওয়া যায়, সেখানেও দেখা যাবে, সেইসব মেয়েদের কথা ছবিতে বলা হচ্ছে যাঁরা প্রথা ভাঙছেন, নতুন কিছু করছেন। ধরা যাক, কোনও ক্যাবারে ডান্সার কিংবা নাইটক্লাবের কোনও-এক মুহূর্তের গান, সেখানে এমন গায়কী তৈরি হচ্ছে, যা মানুষ কখনও আগে শোনেনি। আমার মনে হয়, আশা ভোঁসলের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব— উনি সেই সব মেয়েদের যাপনে কণ্ঠ-সুর দিয়েছেন, যাঁরা প্রথা ভেঙে মুক্তির পথে উড়ান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
ভারতের মানুষের কাছে সংগীত-কণ্ঠ বলতে সরস্বতীকে বোঝানো হত, কিন্তু এক্ষেত্রে তো তা নয়, একজন রক্তমাংসের জলজ্যান্ত মানুষ গাইছেন; বিশেষ করে মেয়েদের স্বাধীন ইচ্ছের কণ্ঠ হয়ে উঠছেন। সোজা কথায় বলতে গেলে মেয়েদের কন্ঠে কোনও আড়ষ্টতা ছাড়াই ‘সেন্সুয়াস’ ব্যাপারটাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আর বুঝিয়েছিলেন, এই অনুভূতিটা প্রকাশ করার মধ্যে কোনও লজ্জা বা সংকোচ নেই। আবার অনেক সময়ে অভিনেত্রীরাও ওঁর গায়কী অনুযায়ী নিজেদের অভিনয়কে চালিত করতেন। বিষয়টা এমন, গায়কী যদি স্পষ্ট ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ হয়, সেই প্রভাব ও বলিষ্ঠতা তো অভিনয়ে আসতে বাধ্য। এখানেই আশা ভোঁসলের শ্রেষ্ঠত্ব।
আমাদের মধ্যে, ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস মাস্টার অফ নান’— অর্থাৎ, পল্লবগ্রাহিতার একটা ব্যাপার রয়েছে। মধ্যবিত্ত মানসিকতার একটা অন্যতম প্রবণতা— যে কাজ করবে ভাল করে করো, একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে যেও না। আশা ভোঁসলে এই গণ্ডিটাও ভেঙেছিলেন। একইসঙ্গে একজন মানুষ একাধারে গজল গাইছেন, পাশাপাশি গাইছেন— ‘আজা আজা ম্যায় হু প্যায়ার তেরা’-র মতো গান। উনি যখন যেটা গাইছেন, মনে হচ্ছে যেন, সারাজীবন ধরে এটাই গেয়ে এসেছেন। এ তো বিস্ময়কর! পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে এহেন বৈচিত্রময় প্রতিভার উদাহরণ আমার কাছে অন্তত নেই বললেই চলে। গুলাম আলি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গজল-সাধক। ওঁর হারমোনিয়ামের চলন, গলার কাজ, মুড়কি— সবটাই অতুলনীয়। তাঁর সুরে আশা ভোঁসলে এমন করে গাইছেন, মনে হচ্ছে যেন, এই গজল ওঁর জন্যই তৈরি হয়েছে, তেমন করেই আশা ভোঁসলে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন সেই কম্পোজিশন। আজও যদি কেউ কেউ অন্ততপক্ষে আধা-শাস্ত্রীয় (semi-classical) গান গাইতে চান, সে কোনও প্রতিযোগিতা হোর বা কোনও অনুষ্ঠান— তাঁকে ‘মিরাজ-ই-গজল’ গাইতেই হবে। এটা প্রজন্ম-প্রজন্মান্তর পেরিয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। ‘উমরাও জান’ ছবিটির কথা ধরা যাক, সে-ছবিটিও তো সাংগীতিক। সেই ছবি বর্তমান প্রজন্মের হয়তো অনেকে দেখেননি, কিন্তু ছবিটার গান সমাজমাধ্যম-রিলের মাধ্যমে আধুনিক প্রজন্মের কাছে উদ্যাপিত।
‘ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান সাউন্ড’ নামে একটা তথ্যচিত্র রয়েছে, যেখানে একজন অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি— বিভিন্ন দেশে যান, সেখানে গিয়ে সে-দেশের বিভিন্ন গানের একটা কিংবা দুটো করে লাইন রেকর্ড করছেন তাঁরা জঙ্গলে যাচ্ছেন, পাহাড়ে যাচ্ছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানা জনজাতির গানও রেকর্ড করছেন। তাঁরা যোগাযোগ করেছিলেন আশা ভোঁসলের সঙ্গেও। রেকর্ড করেছিলেন তাঁর কণ্ঠ। এমনই বিশ্বময় আবেদন ছিল ওঁর গানের।
আর একটা আশ্চর্য জিনিস, আমার মনে হয় আরডি বর্মণের সুরে আর আশা ভোঁসলের কণ্ঠে গীত গান সবচেয়ে বেশি রিমিক্সড হয়েছে। সারা বিশ্বর নানা জায়গায় আমি ঘুরেছি, নাইটক্লাব, পাব— সেখানে নানা গানের মাঝে হঠাৎ করেই বেজে উঠত পঞ্চম-আশা জুটির গান। এমন বৈচিত্র আর কোথায় পাব! এককণ্ঠে গজল, ক্যাবারে হয়ে ওপি নাইয়ারের সুর-সম্মিলন। একইভাবে জেন-জি প্রজন্মের কাছেও সমান আবেদন নিয়ে এসেছে তাঁর গান।
ভারতের মানুষের কাছে সংগীত-কণ্ঠ বলতে সরস্বতীকে বোঝানো হত, কিন্তু এক্ষেত্রে তো তা নয়, একজন রক্তমাংসের জলজ্যান্ত মানুষ গাইছেন; বিশেষ করে মেয়েদের স্বাধীন ইচ্ছের কণ্ঠ হয়ে উঠছেন। সোজা কথায় বলতে গেলে মেয়েদের কন্ঠে কোনও আড়ষ্টতা ছাড়াই ‘সেন্সুয়াস’ ব্যাপারটাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। আর বুঝিয়েছিলেন, এই অনুভূতিটা প্রকাশ করার মধ্যে কোনও লজ্জা বা সংকোচ নেই। আবার অনেক সময়ে অভিনেত্রীরাও ওঁর গায়কী অনুযায়ী নিজেদের অভিনয়কে চালিত করতেন। বিষয়টা এমন, গায়কী যদি স্পষ্ট ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ হয়, সেই প্রভাব ও বলিষ্ঠতা তো অভিনয়ে আসতে বাধ্য। এখানেই আশা ভোঁসলের শ্রেষ্ঠত্ব।
একটা মজার ঘটনা বলি, আমার এক বন্ধু ওঁর নাতনিকে ফ্রেঞ্চ শেখাতেন। বন্ধু আগে বুঝতে পারেননি যে, আশা ভোঁসলের বাড়িতে শেখাতে যাচ্ছেন, উনি নাকি বারবার আমার বন্ধুকে বলতেন, ফরাসি ভাষা শেখানোর জন্য। কারণটা কী! আশাজি ফরাসি ভাষায় গান গাইতে চান। একটা মানুষের কী পরিমাণ খিদে হতে পারে— ৮০ বছর পেরিয়েও তিনি সম্পূর্ণ নতুন ভাষা শিখতে চাইছেন এবং সেই ভাষায় গান গাইতে চাইছেন। ব্লটিং পেপারের মতো মন, যখনই সুযোগ হবে শিখবেন।
আজকে আমাদের কাছে প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা খুব সহজেই গলা মডিফাই করে ফেড-ইন কিংবা ফেড-আউট করতে পারি, কিন্তু আশা ভোঁসলে কোনও এক আশ্চর্য ক্ষমতায়— মাইক্রোফোনের সামনে এমন এক ভঙ্গিমায় গাইতেন, কোনও প্রযুক্তি দিয়ে কণ্ঠের তীব্রতার পরিবর্তন ছাড়াই গলা মোলায়েম হয়ে যেতে পারত। এই জন্য অনেক তীব্র গ্র্যাঞ্জারের মাঝেও ওঁর কণ্ঠ ও গায়কীর স্বাতন্ত্র্য থেকে যেত নিজ-মহিমায়।
আশা ভোঁসলে ক্ষণজন্মা। একযুগে একজনই আসেন এমন প্রতিভা নিয়ে।




