পূজারিণী প্রধান এবং…

আমরা যা পারিনি, কিন্তু করতে চেয়েছি, তা পূজারিণী প্রধান করে ফেলেছে।

গ্রামের মেয়ে, রিল বানায়, রিলের বিষয় হবে নাচ, গান, মাটির বাড়ি পোক্ত করার উপায়, সারাদিনের রান্নাবান্না, অক্লান্ত পরিশ্রম, মাঠে কাজে যাওয়া, তুলসীতলার সেবা, স্বামী ও সংসারের প্রতি একাগ্রতা। তা না করে এ কোন মেয়ে এসেছে বিশ্বসিনেমার রিভিউ করতে! মেয়েটি ইংরেজিতে কথা বলে, শহরের তত্ত্বসর্বস্ব চিন্তায় আঘাত আনে। স্বামীকে নিয়ে আদিখ্যেতা নেই, সন্তান নিয়ে বাড়বাড়ন্ত নেই, নতুন রেসিপি শেখায় না। এসে বই, সিনেমা, নারীবাদ, জাত-পাতের ব্যবস্থা নিয়ে ভণিতাহীনভাবে কথা বলে চলেছে। অন্যদিকে এক খেত-মজুরি করা ছেলে, কবিতা পড়ে খেতের পাশে বসে। আরও একটা ছেলে আছে, এমন ভাল আকাশ চেনে আর অঙ্ক জানে যে, আবহাওয়া দপ্তরের আগে পূর্বাভাস জানিয়ে দেয়। কিন্তু এসব তো আমাদের করার কথা ছিল। পয়সা খরচ করে পড়াশোনা করেছি কি আজকের এই দিনটা দেখব বলে!

আমরা চিত্রনাট্য লিখতে চেয়েছি, সিনেমা বানাতে চেয়েছি, আমাদের ছিলও ক্যামেরা, দামি ফোন। গল্প বলতে চেয়েছি, উপন্যাসও লিখতে চেয়েছি। সারাদিন বই পড়তে চেয়েছি। বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই ছিল, কিন্তু বহু চেষ্টা করেও জুত করে ওঠা হয়নি। আমরা মতামত দিতে চেয়েছি, অন্যকে ধুয়ে দিয়ে নিজেকে সবার মধ্যে আলাদা প্রমাণ করতে চেয়েছি। আড্ডায় সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষটাও হতে চেয়েছি! দু’-চারটে পুরস্কার পাওয়ারও ইচ্ছে ছিল! আমরা চেয়েছি এই ভাঙা সময়ের ‘মেসিয়া’ হতে, আমরা চেয়েছি শিল্পীর তকমা পেতে, আমরা চেয়েছি কালোত্তীর্ণ হতে। কিন্তু আমরা দেখছি গ্রামের ছাপা শাড়ি পরা এক মেয়েকে, যে ইংরেজি ভাষায়, স্পষ্ট বক্তব্যে জানায় তার স্বাধীন হওয়ার তীব্র অথচ সামান্য আকাঙ্ক্ষার কথা।

আরও পড়ুন : তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার কেড়ে নিতেই কি নতুন আইন?
লিখছেন দেবত্রী ঘোষ…

আর-সকল মেয়ের মতোই সে স্বাধীন নয়, গ্রামের মেয়ে, ঘোমটাও দিতে হয় বাড়ি থেকে বেরলে, তবুও তার কৌতূহল ও প্রশ্ন করার ইচ্ছে থেকে সে জেনেছে, স্বাধীনতা তার প্রাপ্য ছিল। সে জেনেছে তার হাতে-পায়ে-মননে-চিন্তায় শেকল পরানো আছে, এই শেকল খুলে বাঁচা তার জন্মগত অধিকার। সে বই পড়ছে, বাংলায়-ইংরেজিতে, সিনেমা দেখছে, বিশ্বসিনেমা, সিনেমা বানাচ্ছে ছোট-ছোট, ছবি তুলছে আশপাশের। সে লিখছে, সে ক্যামেরা করছে, সে এডিট করছে। তার ক্যামেরায় উঠে আসছে সে নিজে, ও তার পরিসর। ভৌগোলিকভাবে সামান্য হলেও কী প্রকাণ্ড সে পরিসর! জানলার কাচে একটা শুকনো পাতার চলন যেন মাঝসমুদ্রের সিল মাছের চলন, বা একটা ডানাভাঙা পাখির উড়তে চাওয়া। চুন-ওঠা দেওয়ালের আয়নায় ফুটে ওঠা পূজারিনীর মুখ যেন কতকালের পুরনো, অথচ কী স্পষ্ট! ক্যামেরা জুড়ে টিনের চাল, ডানদিকের একেবারে নিচের কোণে পূজারিণীর মুখ। কানে ফুল গোঁজা। সন্ধেবেলা ঘরে আনন্দ-আয়োজনের দৃশ্য ঘরের বাইরের অন্ধকার থেকে নেওয়া। মশলা বাটতে-বাটতে সে বলে স্ট্যানলি কুব্রিক বা তারকোভস্কির কথা, আলনায় বই রেখে সে লাইব্রেরি বানানোর স্বপ্নের কথা শোনায়, ইংরেজিতে ডায়েরি লেখে রোজ, ইংরেজি ভাষাটা রপ্ত করার জন্য, মাদুরে বসে সে ক্লাসিক পড়ে, পাশে দু-বছরের সন্তান ছবির বইয়ের পাতা ওল্টায়। একঝলকে মনে পড়াতে পারে হয়তো রাসসুন্দরী দাসীর ‘আমার কথা’-র বর্ণনাও। এ বাংলার নিজস্ব দৃশ্য, বাংলা সিনেমার দৃশ্য। চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও সম্পাদনা— পূজারিণী প্রধান।

কিন্তু পূজারিণী হয়তো এসব কিছুই হতে চায়নি। আমরা শুধু এটুকু জানি, সে চেয়েছিল তার নিজস্ব উপলব্ধির কথা, পিতৃতান্ত্রিক-ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থার নিপীড়নের কথা মানুষজনকে বলতে, তার পাড়া-প্রতিবেশীরা যে কথা শুনলে কান চাপা দেয়, সেই কথাগুলো বলার লোক খুঁজেছিল। তার ভাবনার স্বচ্ছতা, তার চিন্তার বিস্তীর্ণ গতিপথে চমকে উঠেছিল শহরের বুদ্ধিজীবীরা, গবেষকরা।  

যখন তারা দেখে, তাদের সমস্ত না-পারাগুলো টিনের ছাদের তলায় বসে একটি মেয়ে করে ফেলছে, যার সোশ্যাল মিডিয়ায় সাত লক্ষ ফলোয়ার, যার প্রোফাইলে এসে কমেন্ট করে বিখ্যাত মানুষ, যাকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের সাংবাদিক প্রতিবেদন লেখে, যার খোঁজ চলেছে আন্তর্জাতিক স্তরে, তার প্রোফাইলে কোনও উসকে দেওয়া বিতর্ক নেই, ছল-চাতুরি নেই, বরং রয়েছে কৌতূহল, বিস্ময় ও সাবাশি— তখন মেয়েটির খাঁটিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলে ফেলে শহরের ‘চিন্তাশীল’ মানুষরা।

কিন্তু পূজারিণীর পক্ষে এগুলো সহজ ছিল না, পুরনো বইয়ের দোকানে বই আসার অপেক্ষা করতে হয়েছে। বহুদিন ধরে টাকা জমিয়ে একটা বই-ই হয়তো কিনতে পেরেছে, ফোনের দুর্বল নেটওয়ার্ক সত্ত্বেও সিনেমা খুঁজে দেখেছে। সিনেমার রিভিউ করেছে, নতুন সিনেমার হদিশ দিয়েছে, পুরনো সিনেমা খুঁজে এনেছে। সিনেমাবিশ্বে যেখানে পৌরুষের আধিপত্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সে কারুনৈপুণ্যে হোক কি বোঝাপড়ায়, সেখানে এসবের তোয়াক্কা না করে নিজের ভাষায় সে ব্যাখ্যা করেছে সিনেমা। সে ভেঙে দিয়েছে পৌরুষের সেই চিন্তা, যেখানে বিশ্বসিনেমা-দেখা, চিন্তাশীল মেয়েরা ‘কামনা’-র বস্তু, সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসি। সেই ফ্যান্টাসিকে গুঁড়ো-গুঁড়ো করে দেয় এই মেয়ে। বিশ্বসংসারের যে রূপ তার কাছে উদ্ভাসিত হয়েছে, তা দেখেই সে জেনে ফেলেছে সমকামী মানুষের প্রেম ও বন্ধুত্ব সহজাত, সে জেনেছে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি আরোপিত। আর সে নিজের জীবনকে লক্ষ করে দেখেছে, বিয়ের পরে প্রাণ খুলে হাসতে পারা আসলে জিতে যাওয়া, স্বামী খাওয়ার আগে খেয়ে ফেলার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়, ঘোমটা ছাড়া বাড়ি থেকে বেরনোর জন্য অপরিসীম সাহস লাগে, সংসার সামলে নিজের ভাললাগাগুলোকে মর্যাদা দেওয়া নারীবাদ, সে বুঝেছে, বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। সে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে চায়, সে দয়ার টাকা নিতে অস্বীকার করে। ভারতের জাতিভেদ ব্যবস্থাকে সে প্রশ্ন করে সরাসরি, শহুরে মানুষের উদার মানসিকতার ভণ্ডামি প্রকাশ করে। সে বলে, নারীবাদকে কোনও একটা সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা যায় না। নিজের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে প্রতিটি মেয়ে চাইলে আলাদা পথ ধরে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শেকলে বাঁধা মানুষ কীভাবে শেকল খুলবে, সেকথা অন্য কেউ বলে দিতে পারে না। আমার দেশের নারীবাদের চরিত্র একটু-একটু করে স্পষ্ট হতে শুরু করে। বাড়ির কাজ সামলে, সন্তানকে বড় করতে করতে যেটুকু সে সময় পায়, বড়জোর আধঘণ্টা, এটুকু সময় তার, এই সময়টুকু সে নিজের জন্য চেয়েছে, এটুকু সময়ের জন্যই তার যাবতীয় অপেক্ষা।

তাই পূজারিণীর কাছে হার মেনে যায় ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের কলা-কুশলীরা। অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও শহুরে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্ন করে পশ্চিম মেদিনীপুরের পূজারিণীকে— মেয়েটি খাঁটি নয়, নিশ্চয়ই ওর পিছনে বড় কারও হাত আছে, তার ক্যামেরা করার, এডিট করার লোক আছে। কেউ বলে, পূজারিনীকে সকলের সামনে ইংরেজিতে কথা বলে প্রমাণ করতে হবে।

পূজারিণীকে অনেকেই বলেছিল এই বিতর্ক এড়িয়ে যেতে। পূজারিণী সরাসরি কোনও যুদ্ধে নামেওনি, কিন্তু নামেনি কি? কাউকে আক্রমণ না করে সে একটু একটু করে তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি মত নিয়ে সে ভিডিও করেছে, তুলে ধরেছে ক্যামেরার নেপথ্যটাও। কেনই বা ছেড়ে দেবে পূজারিণী! নিজের অর্জনকে ছেড়ে দেওয়ার মতো ভুল সে করবে না আর। একটা মেয়ে এককভাবে মাথা তুলে দাঁড়ালেই সমাজ-সংসার জুড়ে সন্দেহ করা হয় সে নিশ্চয়ই একা নয়, ক্যামেরার পিছন থেকে পরিচালনা করছে অন্য কেউ। তার ওপরে পূজারিণী গ্রামের মেয়ে, ভাঙা ইংরেজি, অপক্ক উচ্চারণ।

যাদের কাছে ‘গ্রামবাংলা’ আজও ‘এক্সোটিক’, তাদের কাছে পূজারিণী তো অস্বস্তিরই। সে নিজেই বলেছে, তাকে নিয়ে এত অবাক কেন শহরের মানুষরা, সেটা সে বোঝে। সে বোঝে রাণু মণ্ডল, কুম্ভমেলার মোনালিসা, বা পূজারিণী আসলে শহরের মানুষের কাছে ব্যতিক্রম। কিছুদিনের হুজুগ তুলে মিলিয়ে যায়। মজার কথা হল, পূজারিণী এটা জানে বলেই সমস্ত ক্যামেরা, প্রচার, সাক্ষাৎকার এড়িয়ে গেছে। সে হুজুগে হারিয়ে যাবে না, সে টিকে থাকতে এসেছে। সে অস্বস্তিতে ফেলতে এসেছে তাদের, যারা ব্রাহ্মণ্যবাদের সুবিধায় বুদ্ধিজীবী হতে চেয়েছে। যারা এই স্থিতাবস্থার সুবিধাভোগী, সময় বদলালে, ক্ষমতার হস্তান্তরে যাদের ভিত নড়ে যাবে, যারা নারীবাদের সমস্ত সুখ উপভোগ করেছে কোনও লড়াই ছাড়াই, যারা খোঁজার আগেই পেয়ে গেছে বিশ্বসাহিত্য, বিশ্বসিনেমার ভাণ্ডার, যারা ইংরেজি ভাষা শিখে বড় হয়েছে, যারা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতিকে ব্যক্তিগত মালিকানা ভাবে, যারা ভাবে, রাজনীতিতে একমাত্র তাদের মতামতই গ্রাহ্য হয়, যারা ভাবে, গ্রামের ‘মুখ্যুসুখ্যু’ মানুষকে ভুলিয়ে ভোট আদায় করা যায়, যাদের ভোটাধিকারের জন্য নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করতে হয়নি, যারা কৌতূহল কী জানেনি শুধুমাত্র বাপ-ঠাকুরদার অগাধ সম্পদের কারণে। এরা জেনেছে, এরাই শিল্পের অধিকারী, শিল্পের মালিকানা তাদেরই। তাই পূজারিণী ওদের কাছে আতঙ্কের। যে স্থিতাবস্থায় তারা ধনী, সেই মণ্ডপে আজ সন্ধ্যারতি হবে তো!

আমরা ভেবেছিলাম গ্রামের মানুষেরা ক্যামেরা হাতে শুধুই বোধহয় নাচের রিল বানাবে, শাক তোলার রিল বানাবে, বাগান করার নানা অজানা উপায় বলবে, কিন্তু আজিবুর যে ধান ভানতে-ভানতে জীবনানন্দ আওড়াবে, সেই আন্দাজ করতে পারিনি। বুঝতে পারিনি পূজারিণী এসে নারীবাদকে এতটা সহজ করে তুলবে, যেখানে সমানাধিকারের প্রতি লড়াইয়ের প্রতিটি বাস্তবতাই স্বীকৃত হবে। বুঝিনি ন্যান্সি আশপাশে ছড়িয়ে থাকা কাপড় দিয়ে বানিয়ে ফেলবে প্যারিস ফ্যাশন উইকের পোশাক।

যারা কোনও লড়াই ছাড়া সুবিধা পেয়েছে, তাদের একটা বিশেষ চরিত্র হল, তারা লড়াই করে শুধুমাত্র নিজের জন্য, নিজের পাওনাগণ্ডা মিটে গেলে লড়াই বন্ধ করে দেয়, সহ-নাগরিকের বা সহমর্মীর লড়াই সেই মুহূর্তে আবছা হয়ে যায় তাদের কাছে। কিন্তু নারীবাদের লড়াই ছিল আবিশ্ব মেয়ের মুক্তির লড়াই, সেই লড়াইয়ে এসে জুড়ে যাবে প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ। দু’টি দলে ভেঙে যাবে দুনিয়া, শাসক ও শোষকে। এ কথা পূজারিণী জানে। আমরা দেখি, পূজারিণী প্রাণভরে দেখছে পছন্দের পোশাক পরা মেয়েদের আত্মবিশ্বাস। সে হয়তো নিজে পরতে পারবে না কখনও সে পোশাক, তার বাস্তবতা এমন নয়, কিন্তু যে মেয়ে পেরেছে, তাকে দেখতে বড় আনন্দ হয় পূজারিণীর। এই আনন্দে আমাদের সকলের আকাঙ্ক্ষা এসে জড়ো হয়, মনে হয় এই লড়াইয়ে জিত নিশ্চিত।

সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া নিয়ে নানা লোকের নানা দুশ্চিন্তার মধ্যেই ঘটে গিয়েছিল একটা আশ্চর্য ঘটনা। সাধারণ মানুষের হাতে ক্যামেরা ফোন ও ইন্টারনেট এসে যাওয়ায় শিল্পের চরিত্র হঠাৎ বদলে যায়। আমরা ভেবেছিলাম গ্রামের মানুষেরা ক্যামেরা হাতে শুধুই বোধহয় নাচের রিল বানাবে, শাক তোলার রিল বানাবে, বাগান করার নানা অজানা উপায় বলবে, কিন্তু আজিবুর যে ধান ভানতে-ভানতে জীবনানন্দ আওড়াবে, সেই আন্দাজ করতে পারিনি। বুঝতে পারিনি পূজারিণী এসে নারীবাদকে এতটা সহজ করে তুলবে, যেখানে সমানাধিকারের প্রতি লড়াইয়ের প্রতিটি বাস্তবতাই স্বীকৃত হবে। বুঝিনি ন্যান্সি আশপাশে ছড়িয়ে থাকা কাপড় দিয়ে বানিয়ে ফেলবে প্যারিস ফ্যাশন উইকের পোশাক। শিল্পে কোনওদিনই শুধু শিল্পীদের অধিকার ছিল না। শিল্প প্রতিটি মানুষের, যে শিল্পী হয়ে ওঠেনি, তারও।

পূজারিণীও ছোটবেলা থেকে বিশ্বাস করে এসেছিল, ওর দ্বারা কিছু হবে না। বাবা-মা বলত নাচ শিখলে, আঁকা শিখলে, গান শিখলে মন চঞ্চল হয়ে যাবে, পড়াশোনায় মন বসবে না। তাই কিছু শেখা হয়ে ওঠেনি ওর। যে মেয়েরা নাচের রিল বানায়, সেই মেয়েগুলোর নামে পাড়ায় ঢি-ঢি পড়লে, পূজারিণীর শুধু মনে হয়, সে তো নাচটুকুও জানে না! যারা জানে, তাদের নামে পাড়ায় কুৎসা রটে কেন! এ জীবনে তেমন কিছুই শেখা হয়ে উঠল না।

এই মেয়েটা যখন নিজের মনের ছোট-ছোট বর্ণনা দেয়, বা কোনও এক অনুভূতির কথা আলতো করে অথচ দাপটের সঙ্গে বলে, তখন আমাদের, এপার থেকে মনে হয়, এটুকুও যদি স্পষ্টভাবে অনুভব করা যেত।

আজকাল পূজারিণীর স্বপ্নটায় বিভোর হতে ইচ্ছে করে। গোলাভরা ধান থাকবে, বাগানের টাটকা সবজি পাতে উঠবে, একটা বড় বইয়ের ঘর থাকবে, নিজস্ব সিনেমা দেখার ব্যবস্থা থাকবে, কাজের মাঝে অবসর থাকবে, বেছে নেওয়ার অধিকার থাকবে। প্রতিটি মেয়ের সেই অধিকার থাকবে, প্রতিটি মেয়ে জানবে লড়াই করে জিতে যাওয়ার আশ্চর্য কাহিনি। প্রতিটি মেয়ে, প্রতিটি নিপীড়িত মানুষ নিজেই নিজের মালিক হবে, নিজের মাটিতে বাস করবে হকের সঙ্গে।

পূজারিণীকে দেখে বুঝি, আমরা একদিন ঠিক জানব, স্বাধীনতা আসলে একটি ক্রিয়াপদ।