চোখ-কান খোলা: পর্ব ২৪

Representative Image

জাতীয়তার প্রতিযোগিতা

পুরনো চাল ভাতে বাড়ে, পুরনো মন্তব্য ফুলেফেঁপে ওঠে নতুন বিতর্কে। সেই ১৯৮৯ সালে পিয়ের আদ্রেঁ বোতাং-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ‘দেবী’-র প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, এই ছবি বানানোর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ‘হিন্দুবিরোধী’ ছবি বানানোর অভিযোগ উঠেছিল। এই অভিযোগকারীদের সরাসরি ‘স্টুপিড পিপল’ তকমা দিয়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘এদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনা যায় না!’ সঙ্গে জুড়েছিলেন একটি বাক্য, ইংরেজিতে সেই বাক্যটি এখন রীতিমতো ‘ভাইরাল’, কোনও প্রেক্ষিত ছাড়াই। ‘উই হ্যাভ আ ফেয়ারলি ব্যাকওয়ার্ড অডিয়েন্স হিয়ার, ইনস্পাইট অফ দ্য ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট অ্যান্ড অল দ্যাট, ইফ ইউ কন্সিডার দ্য অডিয়েন্স অ্যাট লার্জ, ইট ইজ ব্যাকওয়ার্ড অডিয়েন্স!’ ভারতীয় দর্শক ‘ব্যাকওয়ার্ড’, একথা সত্যজিৎ রায় বলেছেন, শুধু এইটুকুই চাউর হয়ে গিয়ে মোটামুটি এই মতামত তৈরি হয়ে গেল, সত্যজিৎ ভারতীয় দর্শককুলকে অপমান করেছেন।

বাল্যবিবাহের মেঘ কি ভারতের আকাশ থেকে কখনও কাটেনি? পড়ুন: চোখ-কান খোলা পর্ব ২৩…


হঠাৎ এই বিতর্কের পরিসর উসকে উঠল আদিত্য ধরের একটি মন্তব্যের সূত্রে। আদিত্য ধর, ‘ধুরন্ধর’ এবং ‘ধুরন্ধর ২ (দ্য রিভেঞ্জ)’ বানিয়ে যে বিপুল খ্যাতি ও যশের শিখরে পৌঁছেছেন, তাতে তাঁর মুখনিঃসৃত অনেক বাণীই এখন মধুর বলে ঠেকবে অনেকের কাছে। এক্ষেত্রে ঘটেছেও তাই। সহজ-সরল, একরৈখিক একটি কথা বলেছেন আদিত্য, বলেছেন, ‘ভারতীয় দর্শক যথেষ্ট বুদ্ধিমান।’ শুধু এই সহজ কথার জোরে সত্যজিতেরও একটি অতি সহজ ও স্পষ্ট বাক্য খারিজ হয়ে যায় কি? হওয়ার কথা নয়, কারণ দুটো সময়ে দাঁড়িয়ে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন কার্যকারণকে উপেক্ষা করে দুটো মন্তব্যকে বিচার করা যায় না। সম্ভবও নয়। তাও হচ্ছে, কারণ (ইন্টার)নেটের ফাঁদ পাতা ভুবনে! এবং চণ্ডীমণ্ডপ থেকে চায়ের দোকানে যে মন্তব্য করতে মানুষ দু’বার ভাবত, এখন সমাজমাধ্যমে সেসব মন্তব্য সহজেই ছুড়ে দেওয়া যায়। তাই সত্যজিৎকে সরাসরি দাগিয়ে দেওয়া যাচ্ছে দাম্ভিক ও ভারতবিরোধী বলে।

আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রথম থেকেই তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট রেখে এগিয়েছে। ভক্তকুল যতই অস্বীকার করুক, যতই এই যুক্তি বারবার দেওয়া হোক যে, ‘সিনেমাকে তার নিক্তিতেই বিচার করতে হবে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মাপকাঠিতে নয়’. ‘ধুরন্ধর’ উগ্র জাতীয়তাবাদের কথাই কেবল বলে না, বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি সমর্থনের ভাষ্য তুলে ধরে। ‘ধুরন্ধর’-এর প্রোপাগান্ডা ঠিক অ্যাজিট প্রপ ধাঁচের নয়, বা কেবলই এসপিয়োন্যাজ থ্রিলারের আদলে পাকিস্তান-বিরোধিতাও নয়— এই ছবি সরাসরি ক্ষমতাসীনের গুণগান গায়, এবং রাজনৈতিক বার্তা দেয় ভণিতা ছাড়াই। এই নীল নকশা খুব অস্পষ্টও নয়! অনুরাগ কাশ্যপ যখন বলেন, আদিত্য ধরের রাজনীতি এটাই এবং এই রাজনীতিকেই তিনি তাঁর সমস্ত ছবির মধ্যে জারিত করে রেখেছেন, তখন বুঝতে অসুবিধে হয় না, আদিত্য ধরের চলচ্চিত্র নির্মাণের নেপথ্যের উদ্দেশ্য-বিধেয় কী।
‘ধুরন্ধর’ এবং ‘ধুরন্ধর ২’ নিয়ে বারংবার একটি কথা নানা স্তরে বলা হয়েছে, গল্প এবং শৈলীর জন্য এই ছবি উপভোগ্য, অতএব প্রোপাগান্ডা হলেও এই ছবিদু’টি ভাল প্রোপাগান্ডা। কিন্তু প্রোপাগান্ডার বিকল্প কখনওই উন্নততর প্রোপাগান্ডা নয়। এমনকী, ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটির ব্যঞ্জনাও যথেষ্ট গভীর, উৎপল দত্ত নিজেকে যে সরাসরি ‘প্রোপাগান্ডিস্ট’ বলে দাবি করতেন, তা মতাদর্শের নিরিখে। কেবল শাসকদল ও তাদের ন্যারেটিভকে পুষ্ট করা একটি বা একাধিক ছবিকে আদৌ ‘প্রোপাগান্ডা’ বলা যায় কি না, তাই নিয়েও সংশয় আছে। এই প্রসঙ্গে ধ্রুব রাঠীর মন্তব্যটিও মনে রাখা যায়। ধ্রুব রাঠী একটি ভিডিওতে মনে করিয়ে দিয়েছেন, হিটলারের আমলে গোয়েবেলসের প্রিয় প্রোপাগান্ডা-নির্দেশক লেনি রাইফেনস্টালের কথা। ছবির ‘ক্রাফট’ যাকে বলা হয়, তার নিরিখে রাইফেনস্টাল ছিলেন পৃথিবীর ‘মাস্টার’-দের মধ্যে অন্যতম, তা সত্ত্বেও, দিনের শেষে, রাইফেনস্টাল একজন প্রোপাগান্ডা পরিচালক-ই।

এই প্রেক্ষাপটটা বিচার করলে, এখন বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াচ্ছে এমনটা, আদিত্য ধর প্রোপাগান্ডা করলে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল সেন-রাও তো কখনও হিন্দুবিরোধী, কখনও বা বামঘেঁষা প্রোপাগান্ডা করেছেন। নেটিজেনদের একাংশই গলার শির ফুলিয়ে এমন যুক্তি, বা বলা ভাল অপযুক্তি তুলে আনছেন। এখন কথা হচ্ছে, রাজনৈতিক ছবিতে রাজনৈতিক ধারাভাষ্যই থাকবে। তাহলে কোথায় আলাদা হয়ে যান রাইফেনস্টাল আর আইজেনস্টাইন? নাজি প্রোপাগান্ডার থেকে কোথায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকে ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’? উত্তর সহজ, একটি ছবি ঐতিহাসিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের অভ্যুত্থানের পক্ষে, অন্যটি কেবলই শাসকের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে। এই সোজা কথাটা অযৌক্তিক ঠেকতেই পারে। কেউ বলতেই পারেন, তা বললে হবে? ওটা কেবল বামপন্থীদের ভাষ্য বলে সমর্থনযোগ্য, মানুষের পক্ষে থাকা, আর অন্যটা অপছন্দের বলেই তা ক্ষমতার পক্ষে? এর উত্তর আরও সহজ হয়তো, ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ বা ‘অক্টোবর’-এর মতো ছবি কখনও সত্যিকে বিকৃত করে, কোনও ধর্ম বা জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে কোনও তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য সাধন করেনি, এবং সেজন্যই এক শতাব্দী পরেও এই ছবি থেকে যাবে। ‘ধুরন্ধর’ কেবল জাতীয়তাবাদের কথা বলে থেমে যায় না, সে বিমুদ্রাকরণকে রাজনৈতিক নৈতিকতার লিটমাস কাগজে শুদ্ধ করারও চেষ্টা করে। সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল সেন থেকে তপন সিংহ-দের ছবিতে বেকারত্ব থেকে সমসাময়িক সমস্যার কথা যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে উঠে এসেছে, তা বারবার, বিভিন্ন সময় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সময় থেকে সময়ে, একেবারে সরাসরি শাসকপন্থী প্রোপাগান্ডা সেই প্রাসঙ্গিকতায় কোনওদিন কি পৌঁছতে পারবে?

তাহলে কোথায় আলাদা হয়ে যান রাইফেনস্টাল আর আইজেনস্টাইন? নাজি প্রোপাগান্ডার থেকে কোথায় দূরে দাঁড়িয়ে থাকে ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’? উত্তর সহজ, একটি ছবি ঐতিহাসিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষের অভ্যুত্থানের পক্ষে, অন্যটি কেবলই শাসকের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে। এই সোজা কথাটা অযৌক্তিক ঠেকতেই পারে। কেউ বলতেই পারেন, তা বললে হবে? ওটা কেবল বামপন্থীদের ভাষ্য বলে সমর্থনযোগ্য, মানুষের পক্ষে থাকা, আর অন্যটা অপছন্দের বলেই তা ক্ষমতার পক্ষে?


এই গোটা প্রতর্কটা বিচার করলে, সত্যজিৎ রায় এবং আদিত্য ধর, দু’জনের কথাই আসলে সত্যি। বিবেক অগ্নিহোত্রীর ছবিতে যে ফাইলের পর ফাইল উন্মোচিত হয়, তা ফাঁকা হলে ধুলো খায়, ‘কেরালা স্টোরি ২’ দেখতে গিয়ে হলে মাছি মারতে হয়, আর ‘ধুরন্ধর’ হাজার-হাজার কোটির ব্যবসা করে— কিন্তু দিনের শেষে এই সবই মিথ্যের বেসাতি প্রোপাগান্ডার অলকানন্দা জলে ভেসে যায়, সময় উত্তীর্ণ হয়েও ধুলোমলিনতা এড়িয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে সত্যজিৎদের ছবি। এই সত্যিটুকু সম্ভব হয় এইজন্যই, ভারতীয় দর্শক, সময়ের নিরিখে পিছিয়ে পড়া, এবং বুদ্ধিমান। সলমন খান একবার সগর্বে বলেছিলেন, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা ছবি বানিয়ে লাভ কী? যে সময়ের ছবি, সেই সময়ে বানাও। কথাটির মধ্যে ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট, এখন, এই মুহূর্তে মানুষ যদি বাণিজ্যিক হারাকিরিতে মজে, তবে সেই ছবিই বানানো হোক, যে-ছবি থেকে যাবে, ব্যবসায়িক অঙ্কে সেই ছবি কোথাও দাঁড়াবে না। আদিত্য ধররা ব্যবসা করেন, রাজনৈতিকভাবে তাঁদের পক্ষও স্পষ্ট করেন, মানুষ তা গ্রহণ করে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ, মৃণাল থেকে শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনিদের ছবি যে মাত্রায় গৃহীত হয়, ‘রোটি, কাপড়া, মকান’ বা মনোজ কুমারের দেশপ্রেমিক ছবিগুলি সেই মাত্রায় গৃহীত হয় কি, না কি তা স্মৃতিধার্য হয়ে থাকে আদৌ?
আদিত্য ধরের যে ভক্তরা সত্যজিৎকে আক্রমণ করছেন নির্বিয় ধায়, তাঁদের এটুকু বলা যায়, গণস্মৃতি তাঁদের মতামতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই করবে সম্ভবত। ‘ধুরন্ধর’ তাৎক্ষণিক, ইতিহাস তাকে ধারণ করবে না।